একটি শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ : পিতা-মাতার করণীয়

-মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল*


সরল বাংলা অনুবাদ :

عن أَبِي هُرَيْرَةَ صلي الله عليه وسلم قَالَ قَالَ النَّبِيُّ رضي الله عنه كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘প্রতিটি শিশুই ফিত্বরাত তথা ইসলামী আদর্শের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়’।[1]

শব্দ বিশ্লেষণ :

كُلُّ – প্রত্যেক, সকল, مَوْلُودٍ – সদ্যজাত সন্তান, নবজাতক, يُولَدُ  – জন্মগ্রহণ করে, عَلَى – উপরে, الفِطْرَةِ  – ফিত্বরাত, স্বভাব, সৃষ্টিগত আচরণ, فَ – অতঃপর, أَبَوَاهُ – দ্বিবচন এর শব্দ, অর্থ- পিতামাতা, هُ – তার বা তাকে  يُهَوِّدَانِهِ- ইয়াহূদী বানায়,  يُنَصِّرَانِهِ  – তাকে খ্রিষ্টান বানায়, يُمَجِّسَانِهِ – অগ্নিপূজক বানায়।

ব্যাখ্যা :

আল্লাহ তাআলার প্রত্যেকটি কাজ বিজ্ঞানভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর এবং শিক্ষণীয়। মানুষের জীবন পদ্ধতি কেমন  হবে, কোন পন্থা অবলম্বন করলে তার জীবন আরও সুন্দর ও সার্থক হবে সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত (আল-বাক্বারা, ২/২৯)

মানব জাতির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ধারা অত্যন্ত জটিল ও বিষ্ময়কর। একজন শিশুকে কীভাবে গড়ে তুলতে হবে বা এক্ষেত্রে তার পিতা-মাতার ভূমিকা কেমন হবে তার সুস্পষ্ট বর্ণনা আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। কোন পদ্ধতি অবলম্বন করলে একটি শিশুর বিকাশ অত্যন্ত সূক্ষ্ম, যৌক্তিক, কল্যাণকর ও স্বার্থক হবে সে সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে পিতা-মাতাকে অবহিত করা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমার পরিবার থেকে শিষ্টাচার শেখানো থেকে কখনও বিরত হবে না আর তাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে ভয় দেখাও’।[2]

জন্মগতভাবে একটি মানব শিশু সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ ও পরিচ্ছন্ন আত্মা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু জিন ও মানব শয়তানের আছর বা অন্য কোনো ভ্রষ্টতা দ্বারা প্রভাবিত হলে এর ব্যত্যয় ঘটে। আল্লামা ইবনু আছির তার নেহায়া গ্রন্থে বলেছেন, ‘আল্লাহর অমোঘ নিয়মানুসারে সে একটি আদর্শিক অবস্থার উপর এবং স্বভাবগতভাবেই সত্য দ্বীন গ্রহণে উপযোগী হয়ে জন্মগ্রহণ করে’।[3]

কিন্তু তার শারীরিক ও মানুষিক বিকাশ পরিবেশ ও অবস্থার উপর নির্ভরশীল। পিতা-মাতার আচার-আচরণ, পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক অবস্থা এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তার শারীরিক ও মানুষিক বিকাশে পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক কৃষ্টি-কালচার ও আচার-অনুষ্ঠান ব্যাপক প্রভাব ফেলে। সে ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান, অগ্নি অথবা অন্য কোনো জড়পদার্থের পূজা করে।

পিতা-মাতার বিশ্বাস, আদর্শ, সামাজিক পরিবেশ ও অবস্থার আলোকে তার মানসিকতা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আত্মবিশ্বাস, চেতনাবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে।

এর ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম তার শিফাউল আলীল গ্রন্থে বলেছেন, প্রতিটি শিশুর ইসলামী আদর্শ ও ধর্মীয় চেতনার উপর জন্মগ্রহণ করার অর্থ এটা নয় যে, সে জন্মের সময় ইসলাম সম্পর্কে জানত বা ইসলামকে পছন্দ করত। কারণ আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন যখন তোমরা কিছুই জানতে না (আন-নহল, ১৬/৭৮)[4] তবে হ্যাঁ, তার স্বভাব ইতিবাচক এবং ইসলামী আদর্শ অনুযায়ী হওয়া স্বাভাবিক।

অতএব, ফিত্বরাতের প্রকৃতি হলো, তার মধ্যে স্রষ্টার স্বীকৃতি, ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ও একনিষ্ঠতা বিরাজ করা। পারিপার্শ্বিক বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত একটি শিশুর হৃদয়ে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ ধারা তার মনে অব্যাহত থাকে। কিন্তু পরিবেশের প্রভাবে সে ভুল পথে পরিচালিত হলে এ কথা বলা যাবে না যে, সে নির্দোষ বা নিষ্পাপ। তার নিকট আল্লাহর আদেশ বা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপদেশ এসেছিল কিন্তু সে পারিপার্শ্বিক প্রভাবের কারণে গ্রহণ করতে পারেনি বিধায় তার শাস্তি হওয়া উচিত নয় এমন বিশ্বাস পোষণ করা সঠিক হবে না।

মোটকথা প্রত্যেক শিশুই ইসলামী স্বভাব এবং আল্লাহকে প্রতিপালক হিসেবে গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। যদি সে প্রতিবন্ধকতা মুক্ত থাকে, তবে সে ইসলামবিমুখ হবে না। যেমনভাবে সে শরীর সহায়ক খাদ্যের প্রতি আসক্ত হয় জন্ম থেকেই। পাপপ্রবণতা মানবাত্মার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় মানুষের আত্মা মন্দ কর্মপ্রবণ’ (ইউসুফ, ১২/৫৩)

মানুষের আত্মা বা রূহ এমন একটি বিষয়, যার নষ্ট হওয়া, কালিমাযুক্ত হওয়ার প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ, মারাত্মক বিপর্যয়কর এবং ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক। মানবাত্মার বিকাশ না ঘটার কারণে মানব সভ্যতার বিপর্যয় ঘটতে পারে। চরম বিশৃঙ্খলা হতে পারে, সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। এমন পরিবেশ পূর্বে ঘটেছিল, যার কারণে এই পৃথিবী থেকে বহু জাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেমন ছালেহ (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায় সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘ভয়ংকর গর্জন পাপিষ্ঠদের পাকড়াও করল, ফলে ভোর হতে না হতেই তারা নিজ নিজ গৃহসমূহে উপুড় হয়ে পড়ে রইল’ (হূদ, ১১/৬৭)

কঠোর অধ্যবসায়, চরম সাধনা এবং ইস্পাতসম দৃঢ় মনোবল নিয়ে শিশুর যত্ন ও পরিচর্যা করতে হবে। এর অব্যাহত উন্নয়ন ও ক্রমাগত উৎকর্ষ সাধনে আত্ম নিয়োগ করতে হবে। একে উৎকর্ষের চরম সীমানায় পৌঁছানোর জন্য অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘প্রকৃত যোদ্ধা তো সেই ব্যক্তি, যে নিজের আত্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে’।[5]

উল্লিখিত আলোচনার আলোকে প্রত্যেক নবজাতককে পারিপার্শ্বিক, সামাজিক বিরূপ প্রভাব থেকে‍ মুক্ত করে ইসলামী আদর্শের আলোকে গড়ে ওঠার সুযোগ করে দিন। মুসলিম সমাজে গড়ে ওঠা কোনো শিশু যেন পিতা-মাতা বা সামাজিক অথবা বিজাতীয় প্রভাবে বিপথগামী না হয় সেই ব্যবস্থা আল্লাহ সকল শিশুর জন্য করুন- আমীন!


* প্রভাষক, বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, বরিশাল।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৫৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৫৮; মিশকাত, হা/৯০।

[2]. ইমাম বুখারী, আদাবুল মুফরাদ, হা/২০।

[3]. ইবনুল আছির, কিতাবুন নেহায়া, ৩/১৫৭।

[4]. ইবনুল ক্বাইয়িম, শিফাউল আলীল, পৃ. ২৮৩।

[5]. তিরমিযী, হা/১৬২১।