হালাল হারামের ক্ষেত্রে একজন মুমিনের করণীয়
  -মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল*



عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ يَقُولُ وأَهْوَى النُّعْمَانُ بِإِصْبَعَيْهِ إِلَى أُذُنَيْهِ إِنَّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ والْحَرَامَ بَيِّنٌ وبَيْنَهُمَا مُشْتَبِه يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ فَقَدِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ، وعِرْضِهِ ومَنْ وقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ وقَعَ فِي الْحَرَامِ كَالرَّاعِي يَرْعَى حَوْلَ الْحِمَى يُوشِكُ أَنْ يَقَعَ فِيهِ أَلَا وإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمًى أَلَا وإِنَّ حِمَى اللَّهِ مَحَارِمُهُ أَلَا وإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ وإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ أَلَا وهِيَ الْقَلْب. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ       

নু‘মান ইবনু বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি। নু‘মান তাঁর আঙ্গুলদ্বয়কে তাঁর কানের নিকট নিয়ে গেলেন। নিশ্চয় হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। এ দুইয়ের মধ্যে অস্পষ্ট বিষয়গুলো আছে, যা বেশির ভাগ মানুষ জানে না। যে সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও সম্ভ্রমকে পবিত্র রাখবে। আর যে সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে পতিত হবে, সে হারামের মধ্যে পড়ে যাবে। (তার দৃষ্টান্ত হলো) ঐ রাখালের মতো, যে নিষিদ্ধ এলাকার সীমানায় গবাদিপশু চরায়। তাদের তার মধ্যে পতিত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। মনোযোগ দিয়ে শোনো! নিশ্চয় প্রত্যেক শাসকের নিষিদ্ধ এলাকা রয়েছে। আল্লাহর নিষিদ্ধ (এলাকা) হলো তাঁর হারামকৃত বিষয়। মনোযোগ দিয়ে শোনো! নিশ্চয় শরীরে একটি মাংসপিণ্ড আছে। যখন মাংসপিণ্ডটি সুস্থ থাকে, তখন সমস্ত শরীর সুস্থ থাকে। যখন এই মাংসপিণ্ডটি নষ্ট হয়ে যায়, তখন সমস্ত শরীর নষ্ট হয়ে যায়। মনোযোগ দিয়ে শোনো! আর তা হচ্ছে ক্বলব বা অন্তর।[1]

হাদীছটির গুরুত্ব :

আল্লামা কিরমানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘শরীআতে এই হাদীছের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান সম্পর্কে আলেমগণ একমত পোষণ করেছেন’। এটি ঐ হাদীছগুলোর অন্যতম, যেগুলোর উপর ইসলামের বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠিত। একদল মুহাদ্দিছ বলেছেন, ‘এটি ইসলামের এক-তৃতীয়াংশ’। বিদ্বানগণ বলেছেন, ‘এই হাদীছটি’, ‘নিয়্যতের হাদীছ’ এবং ‘একজন ব্যক্তির আদর্শবান মুসলিম হওয়ার জন্য এতটুকু যাথেষ্ট যে, অনর্থক কথাবার্থা বর্জন করা’ এই তিনটি হাদীছের উপর ইসলামের বিধি-বিধান আবর্তিত হয়। ইমাম আবূ দাঊদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘ইসলাম চারটি হাদীছের উপর প্রতিষ্ঠিত। উল্লিখিত তিনটি এবং তোমাদের কেউ ততক্ষণ মুমিন হতে পারবে না, যতখন না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য করে’।[2] আল্লামা ইবনু দাক্বিক আল-ঈদ বলেছেন, ‘এটি ইসলামী শরীআতের মূলনীতির সবচেয়ে বড় উত্স’।[3]

আল্লামা জিরদানী বলেছেন, ‘এ হাদীছের ব্যাপক উপকারিতা সম্পর্কে আলেমগণ একমত পোষণ করেছেন। যে এই হাদীছে গভীর দৃষ্টি দিবে, সে শারঈ বিধান সংক্রান্ত সকল জ্ঞান এই একটিমাত্র হাদীছের মধ্যে খুঁজে পাবে। কারণ এটি হালাল গ্রহণ, হারাম বর্জন, সন্দেহপূর্ণ বিধান থেকে বিরত থাকা, দ্বীন ও সম্ভ্রম সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন, খারাপ ধারণা উদ্রেক করে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকা, নিষিদ্ধ বিষয়ে জড়ানোর পরিণাম এবং আত্মার প্রভাব ও সংশোধনমূলক কাজ ইত্যাদি এই হাদীছটি শামিল করে’।[4] এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বৃহৎ হাদীছ। হাদীছটি ইসলামের সকল মূলনীতি শামিল করে। এই হাদীছের শিক্ষা সমাজে বাস্তবায়িত হলে নবুঅতের জ্ঞানসমৃদ্ধ ফলক আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠবে। রিসালাতের তাক আলোকিত হয়ে উঠবে। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাপক অর্থবোধক প্রাঞ্জল ভাষার অন্যতম এটি’।[5]

ব্যাখ্যা :

এই হাদীছে দুটি মৌলিক সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যথা— (১) আমল বিশুদ্ধকরণ ও (২) আত্মাকে ত্রুটিমুক্তকরণ। অবস্থাগতভাবে এই সমস্যা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর চিরন্তন বিধান অনুযায়ী জীবন গঠনের ক্ষেত্রে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সংশোধনে এদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এই হাদীছে আলোচিত বিষয়গুলোকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে।

(১) স্পষ্ট হালাল : যার হালাল হওয়াতে কোনো প্রকার অস্পষ্টতা বা অসচ্ছতা নেই। অর্থাৎ যার হালাল হওয়া শরীআতের স্পষ্ট বা প্রকাশ্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত। যেমন- মধু। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে। আর আহলে কিতাবদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে’ (আল-মায়েদা, ৫/৫)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘এদের ব্যতীত অন্য সব নারীদের তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে’ (আন-নিসা-৪/২৪)

(২) স্পষ্ট হারাম : যার হারাম হওয়া একেবারে স্পষ্ট এবং শারঈ দলীল দ্বারা প্রমাণিত। সব ধরনের অস্পষ্টতা থেকে মুক্ত। যেমন শূকর, মদ, ব্যভিচার, আপন মা বা মেয়েকে বিবাহ করা ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের মা, কন্যাকে (বিবাহ করা) হারাম করা হয়েছে’ (আন-নিসা-৪/২৩)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘যতক্ষণ তোমরা ইহরাম অবস্থায় থাকবে, ততক্ষণ স্থল প্রাণী শিকার করা তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, ‘আপনি বলে দিন, আমার পালনকর্তা কেবল অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন, যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য….’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৩৩)। তাছাড়া যেসব বিষয়ে শাস্তি কিংবা ভয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোও হারামের পর্যায়ভুক্ত।

মুশতাবিহাত বা অস্পষ্ট বিষয় : এই পর্যায়ভুক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট হালাল কিংবা স্পষ্ট হারামের অন্তর্ভুক্ত নয়। এদের হালাল ও হারাম উভয়ই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এদের মধ্যে উভয় দিকের সম্ভাবনা প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকে। এখানে কিতাব ও সুন্নাহর দলীলের অবস্থান এমন যে, এদের হালাল বা হারাম যে কোনোটি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এগুলোকে বাহ্যিকভাবে দেখলে মনে হবে যে, উভয় দিকের সম্ভাবনা সমানভাবে লক্ষ্য করা যায়। এই অস্পষ্ট বিষয়ের ব্যাখ্যা সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ ব্যাপারে আলেমগণের তিনটি অবস্থান রয়েছে।

প্রথম মত : একদল আলেমের মতে, এখানে অস্পষ্ট বিষয় বলতে হারামকে বোঝানো হয়েছে। কেননা মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে অস্পষ্ট বিষয় থেকে বিরত থাকল, সে তার দ্বীন ও সম্ভ্রমকে পবিত্র করে নিল’। অর্থাৎ তার দ্বীন ও সম্ভ্রমকে প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া হতে রক্ষা করল। এ রকম অস্পষ্ট বিধানের ক্ষেত্রে উম্মাতে মুহাম্মাদীকে তাক্বওয়ার পথ অবলম্বন করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহপূর্ণ স্থান থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর যে এগুলোতে জড়িয়ে গেল, তার দ্বীন ও সম্ভ্রম অপবিত্রতার সাথে মিশে গেল। সে হারামের মধ্যে পড়ে গেল।

দ্বিতীয় মত : আরেক দলের মতে, সেগুলো হালাল। যেমন আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে হারামের আশেপাশে ঘুরবে তার অবস্থা হবে ঐ রাখালের মতো, যে নিষিদ্ধ এলাকার সীমানায় গবাদিপশু চরায়’। এতে প্রমাণিত হয় এটি হালাল, কিন্তু এ জাতীয় কাজ থেকে বিরত থাকা তাক্বওয়ার লক্ষণ। তবে সুধী পাঠক! মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করুন, ‘যে সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে বিরত থাকল, সে হারাম থেকে আরও বেশি দূরে থাকল’। এর ব্যাখ্যা অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, ‘যে এমন পাপ বর্জন করল যা তার নিকট অস্পষ্ট, সে প্রকাশ্য পাপ বর্জনের ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে গেল। সে মানহানিকর যে কোনো পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হলো’। এই হাদীছ থেকে স্পষ্ট গুরুত্বপূর্ণ শারঈ আইন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরী বিষয়। আর তা হচ্ছে, হারাম পথে অগ্রসর হতে সহায়তা করে এমন সকল পথ বন্ধ করা। কাজেই বিবাহ বৈধ এমন নারীর সংমিশ্রণ, মুছাফাহা এবং নির্জন স্থানে তার সাথে সাক্ষাৎ করা সম্পূর্ণ হারাম। কেননা এটি ব্যভিচারের পথে অগ্রসর হওয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। একইভাবে সরকারি পদে চাকরিধারী কিংবা সমাজের সুবিধাজনক পদাধিকারীর সাধারণ জনগণের উপঢৌকন গ্রহণ করা হারাম। কেননা এটি ঘুষের সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

অতঃপর পূর্বে বর্ণিত অস্পষ্ট বিষয়কে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে এবং অন্তরে একে দৃশ্যমান করে উপস্থাপন করতে চমৎকার এক দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। অস্পষ্ট বিষয়ে পতিত ব্যক্তির উদাহরণ দেওয়া হয়েছে এমন এক রাখালের সাথে, যে নিষিদ্ধ এলাকার সীমান্তে গবাদিপশু চরায়। অসাধারণ সবুজে-শ্যামলে ভরা সেই নিষিদ্ধ এলাকা। প্রচুর ঘাস আর রকমারি শ্যামলে পরিপূর্ণ একটি এলাকা, যা ‍খুব সহজে যে কাউকে মোহিত করে। বিভিন্ন গাছপালা আর নানা লতা-পতায় ঘেরা শ্যামল দৃশ্য ক্ষুধার্ত গবাদিপশুকে খুব সহজে প্রলুব্ধ করে। এমন সংরক্ষিত চারণভূমির প্রান্তে চরতে থাকা গবাদিপশুর দৃষ্টি যখন সে ভূমিতে পড়ে, তখন তারা দ্রুত সেদিকে অগ্রসর হয়। রাখাল তখন গবাদিপশুর নিয়ন্ত্রণে এত ব্যস্ত থাকে যে, সে অন্য কোথাও যাওয়ার আর সুযোগ পায় না। একটা সময় সে ক্লান্ত হয়ে যায়। তার অসতর্কতার সুযোগে গবাদিপশু তাকে ফাঁকি দিয়ে নিষিদ্ধ স্থানে প্রবেশ করে এবং পুরো চারণভূমি ধ্বংস করে দেয়। ঠিক এমনই হবে অস্পষ্ট বিষয়ে জড়িত ব্যক্তির অবস্থা।

দুনিয়ার জীবনকে সমস্যামুক্ত করতে একজন সতর্ক মানুষ যেমন সতর্কতার সহিত জীবনযাপন করে, সরকারি বা ক্ষমতাধরের নিষিদ্ধ এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্ব অবস্থান করে, ঠিক তেমনি একজন মুমিন ঐ সব অস্পষ্ট বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখে, যেগুলো তার পরকালীন জীবনকে কষ্টকর বানিয়ে দেবে; জান্নাতপ্রাপ্তির সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করবে। সম্মানিত পাঠক! মনোযোগ দিয়ে শুনতে চেষ্টা করুন, প্রত্যেক শাসকের কিছু নিষিদ্ধ এলাকা রয়েছে। আর আল্লাহর নিষিদ্ধ এরিয়া হচ্ছে তাঁর হারামকৃত বিষয়সমূহ। আল্লাহ তাআলা হলেন সত্যিকারের অধিপতি। সুদৃঢ় ও শক্ত জালের বুনন দিয়ে তিনি শরীআতকে ঘিরে রেখেছেন। দ্বীন ও দুনিয়ায় ক্ষতিকর প্রত্যেক বস্তুকে তিনি মানুষের জন্য হারাম করেছেন।

ক্বলব যেহেতু শরীরের নিয়ন্ত্রক তাই ক্বলবের সংশোধন হলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আপনাআপনি বিশুদ্ধ হয়ে যায়। এই উদাহরণে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ক্বলবের বর্ণনা করে এ কথা বুঝিয়েছেন যে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে ক্বলবের প্রভাব রয়েছে। তিনি বলেছেন, তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোনো! নিশ্চয় শরীরে একখণ্ড মাংসপিণ্ড আছে। যখন মাংসপিণ্ডটা বিশুদ্ধ হয়, তখন সমস্ত শরীর বিশুদ্ধ হয়। আর যখন মাংসপিণ্ড নষ্ট হয়ে যায়, তখন সমস্ত শরীর নষ্ট হয়ে যায়। ক্বলবের দ্বারা নামকরণের কারণ হলো হৃদয় খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যায়। যেমন হাদীছে এসেছে, ‘আদম সন্তানের হৃদয় হাঁড়ির পনির চেয়ে অধিক পরিবর্তনশীল, যখন তা ফুটতে থাকে’।[6] এই জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেশির ভাগ দু‘আ হৃদয়ের পরিবর্তন কেন্দ্রিক। তিনি বলেছেন, ‘হে হৃদয়ের পরিবর্তনকারী তুমি আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো’।[7]

উল্লিখিত আলোচনা ব্যতীত মানুষের সুস্থতা-অসুস্থতা ক্বলবের সুস্থতা-অসুস্থতার উপর নির্ভরশীল। জান্নাত লাভে ধন্য হওয়া এবং ইহকাল ও পরকালে সৌভাগ্য লাভ করা হৃদয়ের সংশোধন ও পরিচর্যার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেদিন অর্থসম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো কাজে আসবে না। তবে যে পবিত্র হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হবে, (সে সফল হবে)’ (আশ-শুআরা, ২৬/৮৮-৮৯)

তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রতি মানুষ যেরূপ গুরুত্ব প্রদান করে, হৃদয়ের প্রতি সেরূপ গুরুত্ব প্রদান করে না। শারীরিক অসুস্থতা অনুভূত হলেই তাদেরকে খুব দ্রুত চিকিৎসকের নিকট যেতে দেখা যায়। কিন্তু তাদেরকে হৃদয় সংশোধনে চরম উদাসীন দেখা যায়। এক পর্যায়ে হৃদয় কালিমাযুক্ত হয়ে যায় এবং ঐ অবস্থার উপর আল্লাহ তাকে মোহর মেরে দেন। এরপর তার হৃদয় পথরের চেয়ে বেশি শক্ত হয়ে যায়। তার জাহান্নামের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। আমরা এ থেকে মুক্তি চাই।

একজন আল্লাহভীরু মুমিন তার হৃদয়কে পরিচর্যা করে। সে তার থেকে পাপের সমস্ত পথ বন্ধ করে দেয়। সে হৃদয়কে ব্যাপক পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখে। কারণ সে জানে হৃদয়কে ক্ষতিকর পথে পরিচালিত করার অনেক উপায় আছে। যখনই সে তার হৃদয়ে কঠোরতা লক্ষ্য করে, তখনই দ্রুত তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। যাতে করে যে অবস্থার উপর থাকা তার জন্য প্রশংসনীয় সে আবস্থার উপর থাকতে পারে।

এভাবে সে এমন কোনো কাজে জড়ায় না, যার কারণে তার হারামে পতিত হওয়া প্রমাণিত হয়। অপরদিকে যে ব্যক্তি এরূপ কাজ থেকে বিরত থাকে না, তার আত্মা এরূপ অস্পষ্ট কাজে জড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অভ্যস্ত হয়ে যায়। হারামে পতিত হওয়ার জন্য শয়তান তার সহযোগী হয়ে কাজ করে, এমনকি হারামে পতিত হওয়ার জন্য তাকে চিৎকার দিয়ে আহ্বান করে। এই হাদীছের আর একটি রেওয়ায়েত আছে, যা এই অর্থই বহন করে। পাপে পতিত হওয়ার আশঙ্কা আছে এমন কাজ করার জন্য যে ব্যক্তি উৎসাহী হবে, তার স্পষ্ট হারামে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। শয়তান তার সাথে মিশে তাকে পবিত্র অবস্থা থেকে অপবিত্র অবস্থায় নিয়ে যেতে চেষ্টা করবে। মুবাহ তথা শরীআত কর্তৃক অনুমোদিত কাজে জড়ানোকে শয়তান তার জন্য আকর্ষণীয় করবে। এভাবে শয়তান একদিন তাকে অপছন্দনীয় কাজে জড়িত হতে উৎসাহ দিবে। এক সময় তাকে ছোট থেকে পর্যায়ক্রমে বড় গুনাহে জড়িয়ে ফেলবে। সে এতটুকু করেই ক্ষান্ত হবে না; সে তাকে দ্বীন ইসলাম থেকে বের করে ছাড়বে। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ সম্পর্কে আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করেছেন, তাদেরকে ভয় দেখিয়েছেন, যাতে তারা পথভ্রষ্ট না হয়। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ঘোষণা এসেছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, শয়তান তাকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের আদেশ দিবে। ভ্রষ্ট হওয়ার পদস্খলন থেকে প্রত্যেক মুমিনের সতর্ক থাকা উচিত। শয়তানের ষড়যন্ত্র এবং তার কৌশল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।

তৃতীয় মত : তৃতীয় আরেক দল রয়েছেন, যারা হাদীছে উল্লিখিত অস্পষ্ট বিষয়গুলোকে না হালাল, না হারাম বলেছেন। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একে হালাল ও হারামের মধ্যবর্তী একটি জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন। কাজেই আমাদের উচিত হবে, এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত না নেওয়া। এটিও তাক্বওয়ার পর্যায়ে পড়ে। এ জাতীয় বিষয়কে নিম্নের ঘটনা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্বাছ এবং আব্দ ইবনু যামআ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর মধ্যে এক কিশোরের উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। সা‘দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ আমার ভাই উতবা ইবনু ওয়াক্কাছ শপথ করে বলেছে যে, সে তার সন্তান। দেখুন! তার সাথে গঠনগত মিল আছে। আব্দ ইবনু যামআ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতার বাসায় জন্ম নেওয়া তার সন্তান সে। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছেলেটিকে দেখে বললেন, উতবার সাথে তার গঠনের স্পষ্ট মিল আছে। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হে আব্দ ইবনু যামআ! ছেলেটি তোমার। কারণ সন্তান তো তারই হয় যার বিছানায় প্রতিপালিত হয় আর ব্যভিচারী পাবে পাথর (সে কিছুই পবে না)। হে সাওদা! তুমি তার থেকে পর্দা করো। তারপর থেকে সে সাওদা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে কখনও দেখেনি। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাসায় প্রতিপালিত হওয়ার কারণে বাহ্যিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে ছেলেটিকে আব্দ ইবনু যামআ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) -এর বলে ফয়সালা দিলেন। ফলে সে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী সাওদা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর ভাই হয়ে গেল। কারণ সাওদা যামআর কন্যা। এটি একটি অনুমান নির্ভর ফয়সালা। অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে এই ফয়সালা ছিল না। উতবার সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থেকে তিনি সাওদাকে পর্দা করতে বলেছেন। এটা আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সতর্কতার জন্য করেছেন। এটা তাদের কাজ, যারা আল্লাহকে ভয় করে থাকেন। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জানা মতে যুবকটি যামআ (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর সন্তান হলেও অতিরিক্ত সতর্কতা থেকে সাওদাকে পর্দা করতে বলেছেন, যেখানে অন্যান্য ভাইয়ের ক্ষেত্রে পর্দা করতে বলেননি।

আদী ইবনু হাতিম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহর নামে কুকুরকে শিকারে পাঠায়। সেখানে আমার কুকুরের সাথে অন্য কুকুরকে দেখতে পাই। আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘তুমি ঐ শিকারের গোশত খাবে না, কেননা তুমি তো তোমার কুকুরকে বিসমিল্লাহ বলে প্রেরণ করেছ, যা অন্য কুকুরের ক্ষেত্রে করনি। যে কুকুরকে বিসমিল্লাহ বলে পাঠানো হয়নি, তার শিকারে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা থেকে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিকারটিকে খেতে নিষেধ করেছেন। হতে পারে যে, তাকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো দেবতার নামে প্রেরণ করা হয়েছে। তাছাড়া এ জাতীয় সন্দেহপূর্ণ কাজে জড়ানোকে কুরআনে ‘ফিসক্ব’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। হালাল ও হারামের সম্ভাবনাময় অবস্থার প্রেক্ষিতে সতর্কতার অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ঐ ফৎওয়া। এই অর্থ বোঝাতে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে দেয়, তা বর্জন করো এবং যা তোমাকে সন্দেহমুক্ত রাখে, তা করো’।

একদল আলেমের মতে মুশতাবিহাত তথা অস্পষ্ট বিষয়গুলো তিনভাবে বিভক্ত। প্রথমত, মানুষ যা জানে যে, এটা হারাম। কিন্তু তারপরও এক্ষেত্রে সন্দেহ পোষণ করে যে, এটি কি হারাম থেকে মুক্ত হয়েছে, না-কি এখানেও হারাম আছে। এর দৃষ্টান্ত যাকাত প্রদানের পূর্বে কোনো ব্যক্তির যাকাতযোগ্য মাল খাওয়া- যখন কেউ যাকাত প্রদানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে। এটি হারাম বলে গণ্য হবে, যতক্ষণ না যাকাত প্রদান সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস অর্জিত হয়। এক্ষেত্রে দলীল হলো আদি ইবনু হাতিমের বর্ণিত হাদীছটি।

দ্বিতীয়ত, এর বিপরীতে কোনো বস্তু মূলত হালাল হবে। কিন্তু বস্তুটির হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। যেমন কোনো ব্যক্তির স্ত্রী আছে। তার স্ত্রীর তালাক হওয়ার ক্ষেত্রে তার সন্দেহ হওয়া অথবা কোনো দাসীর স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া— এ জাতীয় বিষয়গুলো বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে- যতক্ষণ না এদের হারাম হওয়া সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা যায়। এক্ষেত্রে দলীল হলো আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ বর্ণিত হাদীছটি। ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে পবিত্রতার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন করার পর ওযূ ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কায় সন্দেহ পোষণ করে।

তৃতীয়ত, এমন সব বিষয় যার হালাল বা হারাম হওয়া কোনোটাই জানা যায় না। উভয়টি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। একটিকে প্রাধান্য প্রদানের কোনো প্রমাণ নেই। এক্ষেত্রে উত্তম হলো এ জাতীয় বিষয় থেকে দূরে থাকা। যেমনটা আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়ে থাকা খেজুরের ক্ষেত্রে করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি ছাদাক্বার হওয়ার যদি আমি ভয় না করতাম, তবে আমি এটা খেয়ে ফেলতাম। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কোনো বস্তুর হালাল বা হারাম হওয়ার হুকুম প্রদান করার কোনো বাস্তবতা নেই। যেমন বৈশিষ্ট্য বজায় থাকা সত্ত্বেও পানির ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এই মনে করে যে, গোপনে কোনো অপবিত্রতা এতে মিশে গেছে। এমন কথার কোনো ভিত্তি নেই। একইভাবে প্রস্রাবের কোনো চিহ্ন নেই এমন জায়গায় ছালাত আদায় থেকে বিরত থাকা এই ভেবে যে, হতে পারে এখানে পেশাব ছিল কিন্তু শুকিয়ে গেছে। অথবা কোনো কাপড় ধৌত করা এই ভয়ে যে, সেখানে কোনো অপবিত্রতা লেগেছিল যা দেখা যায়নি। এগুলো বিষয় এমন যার প্রতি ভ্রক্ষেপ না করা অপরিহার্য।

পরিশেষে, হালাল পথে জীবনযাপন করার জন্য আমাদের যে শিক্ষার প্রয়োজন, তার সকল উপাদান এই হাদীছে বিদ্যমান আছে। এই হাদীছের আলোকে মানুষ তার কর্মকাণ্ড সম্পাদন করলে সে সব ধরনের হারাম থেকে রক্ষা পাবে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সম্পাদিত কাজগুলো হালাল, না-কি হারাম তা বুঝতে ব্যাখ্যায় উল্লিখিত উদাহরণগুলো পরিপূর্ণ সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ। জীবনের প্রতিটি কর্মের হালাল-হারাম সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে-বুঝে করতে পারি সেই চেষ্টা আমাদের প্রত্যেকের করতে হবে। আল্লাহ আমাদের হাদীছটির আলোকে জীবন গড়ার তাওফীক্ব দিন- আমীন!


* প্রভাষক, বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, বরিশাল।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৯৯; মিশকাত, হা/২৭৬২।

[2]. শারহু কিরমানী আলা ছহীহুল বুখারী, ১/২০৩; শারহু মুসলিম লিন নববী, ১১/২৩।

[3]. ইবনু দাক্বিকুল ঈদ, শারহুল আরবাঈন আন-নাবাবিয়্যা, পৃ. ২৪।

[4]. জাওয়াহিরুল লুলুইয়্যাহ শারহুল আরবাঈন আন-নাবাবিয়্যা, পৃ. ৬৪।

[5]. তায়সীরুল আল্লাম শারহু উমদাতুল আহকাম, ৩/২৩৮।

[6]. আহমাদ, হাকেম।

[7]. তিরমিযী, হা/৩৫২২।