দুনিয়াবী জীব
-সোলায়মান*


বাহিরে বৃষ্টি পড়ছে। মেঘের গর্জন শুনে আব্দুর রহীমের ঘুম ভেঙে গেল। সে ঘুম থেকে উঠে দেখল সকাল ৫:৩০ বাজে। সে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠল। তারপর গিয়ে ওযূ করে ছালাতে দাঁড়ালো। ছালাত শেষ করার পর সে যখন দু‘আ পড়ছিল, তখন সে তার স্ত্রীর চিৎকার শুনতে পেল। তার স্ত্রী ছিল গর্ভবতী, তার স্ত্রীর পেটে খুব ব্যথা হচ্ছিল। তার স্ত্রীর চিৎকারে বাড়ির সকলে দৌঁড়ে এলো। আব্দুর রহীমের মা বললেন, ‘এখন কী হবে? আমার বউমার কী হলো?’ এ বলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। আব্দুর রহীমের পিতা তার স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর উপর ভরসা রাখো, কিছু হবে না ইনশা-আল্লাহ। আব্দুর রহীমের বড় ভাই তাদের প্রতিবেশীকে তাদের ভ্যান নিয়ে আসতে বলল। তখন তাদের প্রতিবেশী হাসিবুল ইসলাম বৃষ্টির মধ্যে কষ্ট করে হলেও তাদের বাড়িতে আসল। বৃষ্টির পানিতে রাস্তা কর্দমাক্ত রয়েছে। কর্দমাক্ত পথে খুব কষ্ট হচ্ছে ভ্যান নিয়ে যেতে। সন্তানসম্ভবা স্ত্রী নাসিমা বেগম অবর্ণনীয় ব্যথা অনুভব করছেন। খুব কষ্টে তারা হাসপাতালে পৌঁছালো। তাকে হাসপাতালের একটি কেবিনে নেওয়া হলো। পাঁচ মিনিট যায়, দশ মিনিট যায়, কিন্তু কোনো খবর আসে না। এক ঘণ্টা পর একজন নার্স এসে খবর দিলেন, নাসিমার দুটি ছেলে সন্তান হয়েছে। আব্দুর রহীম নার্সকে বললেন, আমি কি আমার স্ত্রী ও সন্তানের সাথে দেখা করতে পারি? তখন নার্স বললেন, অবশ্যই। দুটি সন্তানই দেখতে ফুটফুটে সুন্দর। তিনি একটি ছেলের নাম রাখলেন আব্দুল্লাহ আরেকজনের নাম রাখলেন সাব্বির।

দেখতে দেখতে তারা বড় হলো। দুই ভাই-ই পড়াশুনায় খুব ভালো। সাব্বির খুব চতুর, কিন্তু আব্দুল্লাহ খুব বোকা। সে প্রায় মানুষের কাছে ঠকে যায়। একদিন সাব্বির বসে বসে ভাবে যে, মাদরাসা পড়া বেশি সহজ নাকি স্কুলে পড়া। সে তার ধারণা অনুযায়ী দেখল স্কুলে পড়া খুব সহজ। তাই সে তার মা-বাবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক স্কুলে ভর্তি হলো। এদিকে আব্দুল্লাহ একটু বোকাসোকা মানুষ কিন্তু মনের দিক থেকে অনেক সরল ও ভালো। সে তার মা-বাবার কথা অনুযায়ী মাদরাসায় ভর্তি হলো। দু্ই ভাইয়ের খুব ভালো পড়াশুনা চলছে। আব্দুর রহীম তার দুই ছেলেকেই ভালোবাসতেন। কিন্তু সাব্বির সব কিছুতেই ধান্দা খুঁজত। একবার সে তার বন্ধুদের সাথে কুটবুদ্ধি আঁটলো। তারপর সে তার বাবাকে বলল, ‘বাবা, আমার একটি মোবাইল ফোনের খুব প্রয়োজন। আমার ক্লাসের পড়া বুঝতে ও কিছু বই পড়তে মোবাইলের খুব প্রয়োজন হয়। তার বন্ধুরাও তার সাথে সায় দিল। আব্দুর রহীম কোনো উপায় না পেয়ে তাকে মোবাইল ফোন কিনে দিল। দু্ই ভাই বড় হলো। সাব্বির ইঞ্জিনিয়ার হলো আর আব্দুল্লাহ মাদরাসায় পড়াশুনার পর মেডিকেলে পড়াশুনা শেষ করল। সে একজন বড় ডাক্তার এবং আলেম হলো। আব্দুল্লাহ এবং সাব্বিরের পড়াশুনার সময়  আব্দুর রহীম তার জমি ও বাড়ি বন্ধক রেখে সেই টাকা সাব্বির ও আব্দুল্লাহর পোড়াশুনায় ব্যয় করেছিল। তারা পড়াশুনা শেষ করে চাকরি করে ভালো অর্থ উপার্জন করতে থাকে। তাদের পিতাকে যারা টাকা ধার দিয়েছিলেন তারা এখন তাদের পাওনা চাইতে আসলে তিনি তার ছেলেদের কাছে টাকা চাইলে সাব্বির বলাল, ‘বাবা, আমার উপার্জিত অর্থ দিয়ে আমার নিজেরই চলে না, তোমাকে কী দিব? অন্য দিকে আব্দুল্লাহ তার তার কাছে গচ্ছিত সব টাকা দিয়ে দিল। সাব্বির বিদেশে চলে গেল। আব্দু্র রহীমের কাছে যারা টাকা পেত, তারা বারবার এসে বলতে লাগল, সে যদি তাড়াতাড়ি ঋণের টাকা না পরিশোধ করে, তাহলে তার সব বন্ধকী সম্পদ বিক্রি করে টাকা আদায় করে নিবে। আব্দুর রহীম ও নাসিমা বেগম এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না। নাসিমা বেগম তার ছেলে সাব্বিরকে কল দিয়ে বললেন, বাবা, আমরা তোমার জন্য কত কষ্ট করেছি, আমাদের সম্পদ এখন বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, আমাদের সম্পদগুলো রক্ষা করো। সাব্বির বলল, কোথায় তোমরা কষ্ট করেছ, বরং আমিই সারা জীবন কষ্ট করেছি। একথা শুনে নাসিমা বেগম দুঃখে কাঁদতে লাগলেন। তখন আব্দুল্লাহ বাড়িতে ফিরল, তারপর তার মায়ের হাতে কিছু কাগজ দিয়ে বলল, ‘মা, এই নাও আমি সকল বন্ধকী সম্পদ ছাড়িয়ে নিয়েছি’। তখন আব্দুর রহীম ও নাসিমা কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, ‘আল-হামদুলিল্লাহ, আমাদের একটা ছেলেতো ভালো শিক্ষা গ্রহণ করেছে। কয়েক বছর পরে আব্দুর রহীম সাহেব মারা গেলেন। আব্দুল্লাহ তার ভাই সাব্বিরকে কল দিয়ে বলল, ‘ভাইয়া, আমাদের বাবা আর বেঁচে নেই, তুমি তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে এসো’। তখন সাব্বির অনেক বিরক্তির সাথে বলল, তুই তো জানিস না আমি কত ব্যস্ত, আর আমি এখন ছুটি নিতে পারব না; এখন ছুটি নিলে আমার চাকরি চলে যাবে, তুই ওদিকে দেখে নে’। এরকম অনেক দিন কেটে গেল, তারপর নাসিমা বেগমও মারা গেলেন। আব্দুল্লাহ সাব্বিরকে কল দিয়ে এই খবর জানালে সে আবারো বিভিন্ন বাহানা দিতে থাকে। কিছুদিন পর আব্দুল্লাহ সাব্বিরকে কল দিয়ে বলল, ‘বাবা-মা আমাদের জন্য সম্পদ রেখে গেছেন, তা ভাগাভাগি হবে তাড়াতাড়ি চলে এসো। তখন সাব্বির বলল, ‘সমস্যা নেই, যেতে আর কী এমন সমস্যা, শুধু প্লেনে উঠা আর দেশে চলে আসা। সাব্বির লোভ করে দেশে আসলো, জমি ভাগাভাগি হলো। কিন্তু কিছুদিন পরে তার চাকরি চলে গেল। সে আব্দুল্লাহর বাসায় থাকতে লাগল। কিছুদিন পর সাব্বির হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেল। আব্দুল্লাহ তার ভাইকে খোঁজার অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু সে আর তার ভাইকে খুঁজে পেল না। এর কিছুদিন পরে একটি ড্রেনে লাশ পাওয়া গেল। আব্দুল্লাহ জানতে পারল সেই লাশটা নাকি তার ভাইয়ের মতো দেখতে। সে তাড়াতাড়ি সেখানে গেল এবং দেখল সেটা আসলেই তার ভাইয়ের লাশ। পুলিশ অনুসন্ধান করে দেখল যে, সাব্বির বে-আইনী কাজ করত। তার লোক দেখানো চাকরি চলে যাওয়ার পর সাব্বিরের সাথী তার পাওনা চাওয়ার পর সাব্বির তাকে টাকা না দিতে পারায় সাব্বিরের সাথী তাকে মেরে বস্তায় ভরে ড্রেনে ফেলে রেখেছিলে।


* ছাত্র, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।