দুর্নীতির ভারে ন্যুব্জ প্রিয় জন্মভূমি

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। মহান রব্বুল আলামীন এদেশটাকে অনেক সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। চতুর্মুখী অসংখ্য নে‘মত তিনি ঢেলে দিয়েছেন এখানে। ভূপৃষ্ঠে ও ভূগর্ভে শুধু নে‘মত আর নে‘মত। ভূগর্ভে গ্যাস, কয়লার মতো বহু খনিজ সম্পদ মহান আল্লাহ দান করেছেন আমাদের। ভূপৃষ্ঠের যেখানে-সেখানে বীজ ফেললেই শস্য-ফসল, ফল-ফলাদি আমাদের উপহার দেন তিনিই। পুরো দেশটা যেন একটি ফলের বাগান, একটি বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্র। জনশক্তিও এদেশের কম বড় সম্পদ নয়। এদেশের রূপ বৈচিত্রের শেষ নেই। এখানকার খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড়, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, সমুদ্রশোভা, ঝর্ণাধারা, গাছগাছালি, পাখ-পাখালি, বনবনানি মহান আল্লাহর অপরূপ সৃষ্টি। তাই তো কবি বলেছেন, ‘সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা, আমার সোনার বাংলাদেশ। আহ! কি দারুন দেখতে লাগে বেশ’। ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি’। এতোসব নে‘মতকে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগানো গেলে আমাদের এতোদিন আরো উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের কথা ছিলো। কিন্তু দুর্নীতির ভয়াল ছোবলে তা সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি আমাদের দেশের প্রতিটি রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্র দুর্নীতির ছড়াছড়ি। দুর্নীতির বিষাক্ত ছোবলে রাষ্ট্রযন্ত্রে পচন ধরেছে। এমন কোনো সেক্টর খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যেখানে দুর্নীতি নেই। দুর্নীতি আমাদের রক্তে-মাংসে মিশে গেছে। দুর্নীতি আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। নানা দুর্নীতির কিছু খবর নানা মিডিয়ায় মাঝেমধ্যে একটু-আধটু যা বের হয়, তা খণ্ডচিত্র মাত্র; দুর্নীতির আসল ফিরিস্তি যে কত লম্বা, তা আল্লাহই ভালো জানেন। সূদ, ঘুষ, চুরি, ডাকাতি, লুটতরাজ, দখলদারি, জালিয়াতি, দালালি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ফাঁকিবাজি, ধোঁকাবাজি, নকলবাজি আমাদের সমাজে মহামারিতে রূপ নিয়েছে। দুর্নীতিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ার গৌরবও আমাদের রয়েছে! বহির্বিশ্বে আমরা আমাদের মান-সম্মান খোয়ায়েছি।

দুর্নীতির মূল কারণ অর্থ ও ক্ষমতা লিপ্সা। এছাড়াও ঈমানের দুর্বলতা, ইখলাছশূন্যতা, মৃত্যু ও পরকাল বিমুখতা, আল্লাহভীতির অভাব, দুর্নীতির পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব, শরী‘আতের দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন না করা, অসৎসঙ্গ, একজন মানুষের ইসলামী আদর্শে বেড়ে না উঠাও দুর্নীতির বড় কারণ। ইসলাম এসবগুলো কারণ বিশ্লেষণ করে এর উপযুক্ত প্রতিষেধক দিয়েছে। ইসলামে সব ধরনের দুর্নীতি নিষিদ্ধ। ইসলামের দৃষ্টিতে দুর্নীতি হারাম ও কাবীরা গোনাহ। দুর্নীতিবাজ খেয়ানতকারী, প্রতারক, যালেম ও মিথ্যাবাদী। ইহকাল ও পরকালে এর ভয়াবহতা মারাত্মক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্নীতি অন্যের অধিকার সম্পর্কিত পাপ হওয়ায় খোদ মহান আল্লাহও এই অপরাধ ক্ষমা করেন না। দুর্নীতির ইহকালীন ও পরকালীন নানাবিধ ক্ষতির মধ্যে আরো রয়েছে- (১) এর মাধ্যমে আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর নাফরমানী করা হয়। (২) দুর্নীতি নষ্ট ও নীচু মনের পরিচায়ক। (৩) এর মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ নিজের নেকী নষ্ট করে এবং অন্যের পাপ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে নেয়। সেজন্য ক্বিয়ামতের দিন সেই হবে বড় নিঃস্ব। (৪) এর মাধ্যমে ব্যক্তির কাজকর্ম, মাল ও বয়সের বরকত নষ্ট হয়ে যায়। (৫) দুর্নীতি দ্বারা আল্লাহর নযরদারি ও তদারকিকে তুচ্ছ মনে করা হয়। (৬) দুর্নীতির প্রভাব দুর্নীতিবাজের ছেলে-মেয়ের উপরও পড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে তাদের উপর বদনামের কালিমা লাগে। (৭) দুর্নীতি করলে দো‘আ কবুল হয় না। (৮) দুর্নীতির মাধ্যমে এমন প্রজন্ম তৈরি হয়, যাদের দেশ-জাতির দায়িত্ববোধ হারিয়ে যায়। (৯) এর কারণে সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ, ফেতনা-ফাসাদ, খুন-খুরাবি সৃষ্টি হয়; মানুষের মধ্যে বিশ্বস্ততা হারিয়ে যায়। (১০) দুর্নীতিবাজকে মানুষ অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে। (১১) এর কারণে যালেম ও কাফেররা কর্তৃত্ব করতে সক্ষম হয়।

ইসলাম মুমিন নর-নারীকে কষ্ট দিলে স্পষ্ট পাপের ঘোষণা দিয়েছে (আল-আহযাব, ৩৩/৫৮)। আর দুর্নীতি মানুষকে কষ্ট দেয়ার খুব সহজ একটি মাধ্যম! ইসলামে পূর্ণ মুমিন হওয়ার জন্য আবশ্যিক শর্ত হচ্ছে, অপর মুমিনের জন্য তাই চাইতে হবে, যা সে নিজের জন্য চায় (বুখারী, হা/১৩; মুসলিম, হা/৪৫)। দুর্নীতিবাজ কি চায় যে, তার সাথে কেউ দুর্নীতি করুক? দুর্নীতি করে কারো মাল খেতে ইসলাম নিষেধ করেছে (নিসা, ৪/২৯)। বিদায়হজ্জে নবী (ছা.) অন্যের মালে অন্যায় আক্রমণ হারাম করেছেন (বুখারী, হা/৬৭; মুসলিম, হা/১২১৮)। পবিত্র কুরআনে ওযনে কমদানকারীদের ধ্বংসের কথা ঘোষিত হয়েছে (আল-মুতাফফিফীন, ৮৩/১)। ওযনে সামান্য (!) কম দিলে যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বড় বড় দুর্নীতিবাজদের কী অবস্থা হতে পারে! রাসূল (ছা.) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’ (মুসলিম, হা/১০১)। তিনি এক ব্যক্তিকে ভেজা খাবার নিচে ও শুকনো খাবার উপরে রেখে বিক্রি করতে দেখে ধমক দিয়ে বলেন, ‘কেন তুমি ভেজাটাই উপরে রাখোনি, তাহলে মানুষ দেখতো?’ (মুসলিম, হা/১০২)। নবী (ছা.) প্রতারণামূলক দালালী করতে নিষেধ করেছেন (বুখারী, হা/২১৪০; মুসলিম, হা/১৪১৩)। চড়া দাম পাওয়ার লক্ষ্যে গরু-ছাগলের ওলানে দুধ জমা করে সেই গরু-ছাগল বিক্রি করতে ইসলাম নিষেধ করেছে এবং এর জন্য জরিমানা ধার্য করেছে (বুখারী, হা/২১৪৮; মুসলিম, হা/১৫১৫)। ইসলাম পণ্যবাহী কাফেলা বাজারে প্রবেশের পূর্বে সস্তায় পণ্য কিনতে এবং বাজারবাসী গ্রামবাসীর পক্ষে বিক্রয় করতে নিষেধ করেছে (বুখারী, হা/২১৫০)। ইসলাম বলেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা ও স্বচ্ছতা থাকলে বরকত হবে আর না থাকলে বরকত নষ্ট হয়ে যাবে (বুখারী, হা/২০৭৯; মুসলিম, হা/১৫৩২)। এককথায় ধোঁকা থাকতে পারে এমন সব ক্রয়-বিক্রয় ইসলামে নিষিদ্ধ (মুসলিম, হা/১৫১৩)। ইসলাম বলেছে, হারাম অর্থ দ্বারা সৃষ্ট ও পরিপুষ্ট দেহের জন্য আগুনই উপযুক্ত (তিরমিযী, হা/৬১৪)। মহান আল্লাহ চোরের হাত কেটে দিতে বলেছেন (মায়েদাহ, ৫/৩৮) এবং তিনি নিজে চোরের উপর অভিশাপ করেছেন (বুখারী, হা/৬৭৮৩; মুসলিম, হা/১৬৮৭)।

এমনকি অমুসলিমের সাথে দুর্নীতি করতেও ইসলাম নিষেধ করেছে (আবুদাঊদ, হা/৩০৫২)। অন্যায়ভাবে সামান্য পরিমাণ জমি দখল করলে ক্বিয়ামতের দিন তাকে সাত তবক যমীনের নিচ পর্যন্ত ধসিয়ে দেয়া হবে (বুখারী, হা/২৪৫৪)। সূদের সাথে জড়িতদেরকে সূদ ছাড়তে বলা হয়েছে, নতুবা মহান আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বলা হয়েছে (বাক্বারাহ, ২/২৭৮-৭৯)। ঘুষখোর ও ঘুষদাতার উপর আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.) অভিশাপ করেছেন (ইবনে মাজাহ, হা/২৩১৩; তিরমিযী, হা/১৩৩৬)। শ্রমিক খাটিয়ে তার মজুরি না দিলে ক্বিয়ামতের দিন খোদ আল্লাহ তার বিরুদ্ধে বাদী হবেন (বুখারী, হা/২২২৭)। যারা জনগণের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত, তারা দুর্নীতি করলে তাদের জন্য জান্নাত হারাম (মুসলিম, হা/১৪২), বরং তারা জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না (বুখারী, হা/৭১৫০)। অনুরূপভাবে জনগণও শাসকশ্রেণির সাথে প্রতারণা করতে পারবে না। যমীনে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের হত্যা করার বা শূলে চড়াবার বা বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে দেয়ার অথবা দেশান্তরিত করার শাস্তির ঘোষণা ইসলাম দিয়েছে (মায়েদাহ, ৫/৩৩)। এগুলো ইসলামের দুর্নীতি বিরোধী পদক্ষেপের কয়েকটি নমুনামাত্র মাত্র।

দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ, দুদকের মতো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং মাঝেমধ্যে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানই যথেষ্ট নয়; বরং এগুলো দিয়ে কিছুই হবে না- যদি ইসলামী আদর্শকে উপেক্ষা করা হয়। সেজন্য যরূরী হলো- (১) সর্বক্ষেত্রে ইসলামী অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলা। কারণ কেবলমাত্র ইসলামই দুর্নীতির সব ধরনের ফাঁকফোকড় বন্ধের কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে, যার কিছু নমুনা আমরা দেখলাম। (২) জনগণকে দ্বীনদার, আল্লাহভীরু, পরকালমুখী ও আমানতদার করে গড়ে তোলা। সেজন্য অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রয়োজন দ্বীনমুখী লালন-পালন ও শিক্ষাব্যবস্থা। মানুষকে দ্বীনদার বানাতে পারলেই আর কিছু লাগবে না। (৩) রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি সেক্টরে শক্তিশালী ও আমানতদার লোক নিয়োগ দেয়া। পবিত্র কুরআনে দায়িত্ব পালনের এ মৌলিক শর্ত দু’টির প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায় (আল-ক্বছাছ, ২৮/২৬)। (৪) কঠোরহস্তে ইসলামী দ-বিধির বাস্তবায়ন করা এবং এক্ষেত্রে কোনো প্রকার দুর্নীতির আশ্রয় না নেয়া। (৫) যথাযথ আইন প্রণয়ন করা ও প্রয়োগে কঠোর হওয়া এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে কোনো অযুহাতে ছাড় না দেয়া; বরং কঠোরহস্তে দমন করা।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় দুর্নীতি থেকে বাঁচার এবং একটি শান্তি ও সমৃদ্ধির সমাজ উপহার দেয়ার পাশাপাশি পরকালে মুক্তি লাভের তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!