দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ চান?
সাঈদুর রহমান*


দৃষ্টিনন্দন একটি বাড়ির স্বপ্ন সকলের মনেই উঁকিঝুঁকি দেয়। সবাই একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ির মালিক হতে চায়। এমন লোক খুঁজে পাওয়া দায়, যারা এমন বাড়ির অধিকারী হতে চায় না। মানুষ জীবনের সবটুকু দিয়ে একটা বাড়ি তৈরি করতে চায়। সেটা কারো ভাগ্যে জোটে আবার কারো ভাগ্যে জোটে না। ঐকান্তিক প্রচেষ্টার পরও স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। শুধু মানসপটে হাতছানি দিয়ে ডাকে একটি আরামদায়ক বাড়ি। প্রত্যাশিত বাড়ি না পেয়ে অনেকে হীনমন্যতায় ভোগে। আজ আপনাদের এমন একটি বাড়ির সন্ধান দিব, যা কখনো কল্পনায় আসে না। যে বাড়ির সৌন্দর্য পার্থিব চক্ষু কোনোদিন দেখেনি। যে বাড়ির একেকটা ইট হবে স্বর্ণ-রৌপ্যের ও বিভিন্ন কারুকার্য দ্বারা গঠিত। হরহামেশা মৃদু হিম সমীরণ প্রবাহিত হবে তার ভিতর-বাইরে। বাড়ির সামনে থাকবে নয়নাভিরাম চোখ ধাঁধানো প্রস্রবণ, থাকবে পানির ফোয়ারা। পানির অস্ফুট কলকল ছন্দে পুলকিত হবে বাড়ির মালিকের হৃদয়পট। বাড়ির আঙিনায় পুষ্পকাননে থাকবে নানা প্রজাতির প্রজাপতি ও ভ্রমর। এ ফুল থেকে ওই ফুলে পরাগরেণু নিয়ে করবে ছোটাছুটি। পাখির গানে রোমাঞ্চিত হবে অন্তরাত্মা। ডানা মেলে গাইতে মন চাইবে তাদের সুরে। …বুঝতে পেরেছি, পাঠকদের আর তর সইছে না। এমন অনিন্দ্য সুন্দর প্রাসাদের অধিকারী হতে মন চাইছে। হ্যাঁ, আমি আপনাকে সব বলব, একটু ধৈর্য ধরে শুনুন। আপনার জন্যেই আমার এই প্রয়াস।

পাঠক! আশ্চর্য হবেন, এই বাড়ি তৈরি করতে দুনিয়ার বাড়ির মতো পয়সা খরচ হয় না, অসম্ভব পরিশ্রমও করতে হয় না। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা আর অটুট মনোবল। যে কোনো ব্যক্তিই তা করতে পারবে। জান্নাতে এই রকম সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করতে চাইলে কিছু আমল করতে হবে। ভয় পাওয়া বা ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। আমলগুলো একেবারেই সহজ। আরে ভাই! বাড়ি তৈরি না করলে জান্নাতে থাকবেন কোথায়? জান্নাতে প্রসারিত মাঠ, উন্মুক্ত প্রান্তর পড়ে আছে। এগুলোকে বসবাস উপযোগী করে তুলুন নিজ আমল দিয়ে। আর কালক্ষেপণ না করে চলুন জান্নাতে বাড়ি তৈরি শুরু করি। নবী করীম a বলেছেন,‏مَنْ بَنَى لِلَّهِ مَسْجِدًا بَنَى اللَّهُ لَهُ مِثْلَهُ فِي الْجَنَّةِ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ একটি ঘর তৈরি করবেন’।[1]

কী পাঠক! আপনি দুঃখ পেলেন? টাকা-কড়ি নেই আমি কীভাবে মসজিদ বানাব? আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী যতটুকু পারেন মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা করুন। আরে ভাই! আল্লাহ তো আপনার হৃদয় দেখেন। আপনার হৃদয়ের ব্যাকুলতা আল্লাহ চান। আল্লাহ তাআলা আমাদের ইবাদতের মুখাপেক্ষী নন। তিনি যদি আমাদের ইবাদতের মুখাপেক্ষী হতেন, তাহলে যে সমস্ত মানুষ তার ইবাদত করে না, তিনি তাদের কখনো জীবিকা দান করতেন না। আপনি মসজিদ বানান বা না বানান, এতে আল্লাহর কী লাভ! আপনি নিরাশ হবেন না। দান করে যান, আল্লাহ অবশ্যই আপনার জন্যও একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন। একেবারে দরিদ্র হলে এই আমলটা তো করতে পারবেন! রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,

‏مَنْ صَلَّى فِي يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ ثِنْتَىْ عَشْرَةَ رَكْعَةً بُنِيَ لَهُ بَيْتٌ فِي الْجَنَّةِ أَرْبَعًا قَبْلَ الظُّهْرِ وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَهَا وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْمَغْرِبِ وَرَكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْعِشَاءِ وَرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ صَلاَةِ الْفَجْرِ

‘যে ব্যক্তি দিনে-রাতে ১২ রাকআত ছালাত আদায় করবে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করা হবে। যোহরের ছালাতের পূর্বে চার রাকআত ও পরে দুই রাকআত, মাগরিবের ছালাতের পরে দুই রাকআত, এশার ছালাতের পরে দুই রাকআত এবং ফজরের ছালাতের পূর্বে দুই রাকআত’।[2]

বাজারে গিয়েও জান্নাতে ঘর তৈরি করতে পারবেন। অবাক হচ্ছেন? অবাক হবারই কথা! এই হইচই কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে এত সুন্দর বাড়ি তৈরি সম্ভব! আপনাকে ভাবনার দরিয়ায় নিক্ষেপ করে হাদীছটা নিয়ে আসি, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,

مَنْ قَالَ حِينَ يَدْخُلُ السُّوقَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ حَىٌّ لاَ يَمُوتُ بِيَدِهِ الْخَيْرُ كُلُّهُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ كَتَبَ اللَّهُ لَهُ أَلْفَ أَلْفِ حَسَنَةٍ وَمَحَا عَنْهُ أَلْفَ أَلْفِ سَيِّئَةٍ وَبَنَى لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ

‘যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশকালে বলে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ইউহ্‌য়ী ওয়া ইউমীতু ওয়া হুয়া হায়্যুন লা ইয়ামূতু বিইয়াদিহিল খইরু কুল্লুহু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই। তিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন। তিনি চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না, তাঁর হাতেই সমস্ত কল্যাণ নিহিত এবং তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান) আল্লাহ তার আমলনামায় ১ লক্ষ পুণ্য লিপিবদ্ধ করেন, তাঁর ১ লক্ষ গুনাহ মাফ করেন এবং তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করেন’।[3]

পাঠক! আশ্চর্য হচ্ছেন? এত ছোট্ট একটা দু‘আ আর এর ছওয়াব কত বড়! আমি আগেও বলেছি, আল্লাহ আপনার মনের দিকে তাকান। বাজারে এত ভিড়ের মধ্যে আপনি আল্লাহকে ভুলে যান কি-না। কিন্তু না, শত ব্যস্ততার মাঝেও আপনি তাকে ভুলে যাননি। তাই সমস্ত প্রাচুর্যের অধিকারী মহান প্রতিপালক আপনাকে উত্তম বদলা দিয়েছেন। আসুন! আরও একটি বাড়ি নির্মাণ করুন।

مَنْ قَرَأَ قُلْ هُوَ الله أَحَدٌ عَشَرَ مَرَّاتٍ بَنَى الله لَهُ بَيْتاً في الجَنَّةِ

‘যে ব্যক্তি ১০ বার কুল হুয়াল্লাহু আহাদ (সূরা ইখলাছ) পাঠ করবে, জান্নাতে আল্লাহ তার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন’।[4]
আপনি নির্দিষ্ট একটা সময় বের করুন। সে সময় এই সূরাটি ১০ বার পড়বেন। হতে পারে সময়টা নিঝুম রাতে দূরাকাশে স্নিগ্ধ জোছনার প্রতি তাকিয়ে বিড়বিড় করে পড়বেন অথবা ঘুমের সময় লাইট অফ করে নিজ গুনাহের কথা স্মরণ করে নীরবে-নিভৃতে পড়বেন অথবা ব্যস্ত জীবনে শত কাজের ফাঁকে একটু অবসর পেয়ে পড়তে পারেন। ব্যস্ত জীবনের পেছনে অনেক সময় নষ্ট করেছেন, এবার ফিরে আসুন সত্যিকার আখেরাতমুখী জীবনের দিকে। আমাদের কর্মমুখী জীবনের বাঁকে বাঁকে অনেক অবসর সময় আমরা পাই, কিন্তু আমরা ওই সময়গুলো বেখেয়ালি অযথা কাজে নষ্ট করে দেই। আজ থেকে কিন্তু আর সময় নষ্ট করলে চলবে না। চলুন! আরও কিছু বাড়ি তৈরির আমল জেনে নেই। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,

إِذَا مَاتَ وَلَدُ الْعَبْدِ قَالَ اللَّهُ لِمَلاَئِكَتِهِ قَبَضْتُمْ وَلَدَ عَبْدِي فَيَقُولُونَ نَعَمْ‏ فَيَقُولُ قَبَضْتُمْ ثَمَرَةَ فُؤَادِهِ‏ فَيَقُولُونَ نَعَمْ فَيَقُولُ مَاذَا قَالَ عَبْدِي فَيَقُولُونَ حَمِدَكَ وَاسْتَرْجَعَ‏ فَيَقُولُ اللَّهُ ابْنُوا لِعَبْدِي بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَسَمُّوهُ بَيْتَ الْحَمْدِ

‘কোনো বান্দার সন্তান মারা গেলে, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর ফেরেশতাদের প্রশ্ন করেন, তোমরা আমার বান্দার সন্তানকে কি ছিনিয়ে আনলে? তারা বলেন, হ্যাঁ। পুনরায় আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন করেন, তোমরা তার কলিজার টুকরাকে ছিনিয়ে আনলে? তারা বলেন, হ্যাঁ। পুনরায় তিনি প্রশ্ন করেন, তখন আমার বান্দা কী বলেছে? তারা বলেন, সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন পাঠ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, জান্নাতের মধ্যে আমার এই বান্দার জন্য একটি ঘর তৈরি করো এবং তার নাম রাখ বায়তুল হামদ বা প্রশংসালয়’।[5]

পাঠক! আমরা অকপটে স্বীকার করি, এই মুহূর্তে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, তথাপি যদি আপনি ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে পারেন, তাহলে অবশ্যই আপনি এই মহাপুরস্কারের অধিকারী হবেন। ধরুন! কিছুদিনের জন্য আপনাকে আমি একটা কাপড় ধার দিলাম। আমি যদি এটা ফেরত চাই, আপনি কি আমার উপর রাগ করবেন? কখনো না। এটা করলে সবাই আপনাকে বোকা বা নির্বোধ বলবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের চোখ শীতলকরণে সন্তান দান করেন। আবার মাঝে মাঝে আমাদের পরীক্ষা করেন। মারা যায় আমাদের সাত রাজার ধন। যখন সন্তানের মোহে আমরা আল্লাহকে ভুলে যাই, আল্লাহকে গুরুত্ব কম দেই, তাঁর আদেশ অমান্য করি, তাঁর ইবাদতে মশগূল থাকি না, তখন তিনি চান যেন আমরা তাঁর দিকে ফিরে আসি। তাঁর ইবাদত করি। এজন্যই তিনি বিপদাপদ দিয়ে থাকেন। যখন আমরা তাঁর দিকে রুজূ হই, তখন তিনি আমাদের জন্য উত্তম জিনিসের ব্যবস্থা করেন। অনেক বিষয় আমাদের বিবেকের পরিপন্থি, অথচ এটা প্রতিপালকের কাছে প্রিয়। আমরা চাই এটা করতে, ওটা করতে। মহান প্রতিপালক জানেন এটা আমার জন্য ক্ষতিরক, তখন তিনি আমাদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য করে প্রিয় বস্তুটি উঠিয়ে নেন বা আমাদের মর্জিমাফিক দেন না। বাচ্চারা পুকুরপাড়ে পানি নিয়ে খেলা করতে পছন্দ করে। আপনি কি আপনার প্রিয় আদরের দুলালকে পুকুরের ধারে পানি নিয়ে খেলা করার জন্য ছেড়ে আসবেন? বলবেন, আব্বু তুমি মজা করে খেল, আমি চললাম? কখনো এটা আমাদের দ্বারা হবে না। বাচ্চার অশ্রুতেও ওই সময় আমাদের হৃদয়ে মায়া স্থান পাবে না। বাচ্চাকে জোর করে হলেও সেখান থেকে নিয়ে আসবেন, এটাই স্বাভাবিক। আমরা অনেক সময় না জেনে প্রবল ঊর্মিমালায় সমুদ্রে ছোট তরি নিয়ে যাত্রা করি। আমাদের কাছে এই ভ্রমণটা খুবই আকর্ষণীয়। আমাদের অন্তরাত্মা চায় এই ভ্রমণে যেতে অথচ আল্লাহ জানেন মাঝ সমুদ্রে গেলেই আমরা বিপদের সম্মুখীন হব। বিশাল তরঙ্গমালা ক্ষীণকায় তরিকে ভেঙে চুরমার করে দিবে। আমাদের আঁছড়ে নিয়ে যাবে সমুদ্রের অতল গহ্বরে। চিরতরে স্তব্ধ করে দিবে আমাদের জীবনবায়ু। তাই আল্লাহ তাআলা মুছীবতের সম্মুখীন হওয়ার আগেই আমাদের সেখানে যেতে বাধা দেন। কিন্তু আমরা না জেনে তাঁকেই দোষারোপ করি। রুষ্ট হই তাঁর উপর। অভিযোগের বন্যা বইয়ে দেই তাঁর উপর।

আসুন! আরও একটি বাড়ি নির্মাণ করা যাক।

أنا زَعِيمُ بَيتٍ في رَبَضِ الجنةِ، لِمَنْ تَرَكَ المِراءَ وإنْ كان مُحِقًا، وبَيتٍ في وسَطِ الجنةِ لِمَنْ تَرَكَ الكَذِبَ وإنْ كان مازِحًا، وبَيتٌ في أعلى الجنةِ لِمَنْ حَسُنَ خُلُقُهُ.

‘যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ের উপযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তর্ক বর্জন করবে, জান্নাতের উপকণ্ঠে তার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করা হবে। যে ব্যক্তি মজা করেও মিথ্যা বলবে না, জান্নাতের মধ্যভাগে তার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করা হবে। যার চরিত্র সুন্দর, জান্নাতের শীর্ষদেশে তার জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করা হবে। এ ব্যাপারে আমি দায়িত্ব নিলাম’।[6]

প্রিয় ভাই! আমরা যদি একটু নিজেকে সংযত রাখতে পারি, ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলি, কটু কথার প্রত্যুত্তরে মুচকি হাসি উপহার দিতে পারি, তাহলে জান্নাতে আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলা নয়ন জুড়ানো বাড়ি নির্মাণ করবেন। মনে রাখবেন, বিনয়-নম্রতার পথ এবড়োথেবড়ো, কণ্টকাকীর্ণ ও বন্ধুর। এ পথে হাঁটা খুবই মুশকিল। মাঝে মাঝে তো রাগ আপনাকে পরাজিত করবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা একটু কষ্ট হয়ে যাবে। মন চাইবে ক্ষমতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটাই। আমার শরীরে তো তারুণ্যের শক্তি সঞ্চিত আছে, ক্ষমতার দাপটও আছে যথেষ্ট। প্রতিশ্রুত শত্রু শয়তান আপনাকে প্রলুব্ধ করবে। তোমার মতো এত প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে সাধারণ এক রিকশাচালক মুখের উপর কথা বলে। ভেঙে ফেলো তার রিকশা, চরম শাস্তি দাও তাকে।

প্রিয় দ্বীনী ভাই! নিজের রাগ একটু প্রশমিত করুন। তবেই তো জান্নাতে বাড়ি তৈরি করা হবে। শ্রমিক ১০০ টাকা বেশি চেয়েছে, আপনার সাথে একগুঁয়ে আচরণ করছে। রাগে আপনার গর্দানের রগ স্ফীত হয়ে গেছে। মাথা একটু শীতল করুন নবী a-এর শেখানো দু‘আ পড়ে। প্রবৃত্তি ও শয়তান যেন কোনো অবস্থাতেই বিজয়ীর গোল্ড মেডেল না পায়। তাহলে আপনি ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলবেন। তবে মাঝেমধ্যে তো বন্ধুদের হাসানোর উদ্দেশ্যে বা গল্পের আসর মাতানোর জন্য আমরা মিথ্যার আশ্রয় নিই। নিজের মাঝে একটু প্রশান্তি অনুভব করি, যখন দেখি আমার কথা শুনে বন্ধুমহল হু হু করে হাসছে। দেদারসে মিথ্যার ঝুলি উন্মোচন করছি। একবারও বিবেক দিয়ে চিন্তা করে দেখি না এর আখেরী রেশ কী হতে পারে!

আল্লাহ তাআলা তো এই জিভকে তীক্ষ্ণ ধারালো ছুরি দিয়ে কচকচ করে কেটে দিবেন। বন্ধুদের হাসিয়ে আমার কী লাভ? মহাপ্রলয়ের দিন যদি বন্ধুদের বলেন, আমি তো বেহুদা কথা বলে তোমাদের চিত্তরঞ্জন করেছি, এখন আমাকে একটু সাহায্য করো! তখন বন্ধুরা তৎক্ষণাৎ বলে উঠবে, আমরা কি তোমাকে হাসাতে বলেছিলাম? তুমি তো স্বেচ্ছায় আমাদের প্রিয়পাত্র হওয়ার জন্য এ কাজ করেছো। আমাদের দোষ দিচ্ছ কেন এখন? তারা বেমালুম ভুলে যাবে আপনার কথা। তাহলে এখন কী করতে হবে? মিথ্যা কথা পরিহার করতে হবে। জান্নাতে তাহলে আপনার জন্য বাড়ি তৈরি হয়ে থাকবে। চরিত্র যদি কোমল করতে পারি, মানুষের সাথে চলাফেরার ক্ষেত্রে যদি ভদ্রোচিত আচরণ করতে পারি, জীবনকে যদি নিষ্কলুষতার আদলে, ভদ্রতার চাদরে আবৃত করতে পারি, তাহলে ইহলৌকিক জগতে পাব মানুষের অগাধ ভালোবাসা আর পরকালে পাব শান্তির নীড় জান্নাতী বাড়ি।

প্রিয় পাঠক! চলুন এবার একটু কষ্ট করে আমলগুলো করি। আপনি তো বন্ধুর আড্ডায় বেখেয়ালিপনায় অনেক সময় নষ্ট করে ফেলেন। কিছু সময় বের করে আমলগুলো করে জান্নাতে বাড়ি নির্মাণ করুন। হাসপাতালে ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, নড়াচড়া করার কোনো কায়দা নেই। ভিড় ঠেলে সামনে যেতেও পারছেন না, গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন আপনি। আত্মাকে একটু প্রবোধ দিয়ে বিড়বিড় করে ১০ বার সূরা ইখলাছ পাঠ করুন। আপনার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ি নির্মাণ করা হবে। অফিসে কাজ নেই, একা একা আনমনে বসে আছেন। আকাশটাও আবার গুমোট হয়ে আছে, কলিগরা সবাই যার যার বাসায় চলে গেছে। আপনিও চলে যান, তবে ফিরতি পথে ১০ বার সূরা ইখলাছ পাঠ করুন। আপনার কলিগরা তো এই আমলগুলো সম্পর্কে বেখবর। আপনি তো জেনেছেন। আমলের প্রতি অগ্ৰসর হোন। স্ত্রীর ঘ্যানঘ্যানানিতে আর পেরে উঠলেন না, গত্যন্তর না দেখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাজারে যেতে হয়েছে। তাই কী হয়েছে, সেখানে গিয়েই বাড়ি নির্মাণ করুন। বাজারে ঢুকেই দু‘আটা পড়ে ফেলুন। প্রিয়তম স্বামী আছে প্রবাস জীবনে, একা একা বসে থেকে সময় ফুরায় না, মন চলে যায় অজানা গন্তব্যে, মাঝে মাঝে তো মন বিষণ্নতায় ছেয়ে যায়। ওই সময় কারো সাথে খোশগল্প করতে মন চায়, অবলা কথাগুলো ব্যক্ত করতে মন চায়। শয়তানের এই প্রবঞ্চনা থেকে দূরে সরে ১২ রাকআত সুন্নাতের প্রতি মনোযোগী হোন। হৃদয়ের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে জান্নাতে বাড়ি তৈরির আমল করার চেষ্টা করুন। কাজকর্ম শেষ করে পড়ন্ত বিকেলে প্রশান্তির চেয়ারে বেলকনিতে বসে আছেন। শরীরে শক্তি আছে, ফুরসতও আছে পর্যাপ্ত পরিমাণ। তাহলে আল্লাহর ধ্যানে আত্মমগ্ন হোন, অবসর সময় পেলেই ইবাদতে মশগূল হোন। আল্লাহ বলছেন, ‘ফুরসত পেলেই তোমার প্রতিপালকের ইবাদতে মশগূল হও’ (আল-ইনশিরাহ, ৯৪/৮)। এমন হতে পারে বিকেল গড়ানোর আগেই আপনি অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন বা চলে যেতে পারেন না ফেরার দেশে। এজন্যই নবী করীম a তার উম্মতকে উদ্দেশ্য করে বলেন,اغْتَنِمْ خَمْساً قبْلَ خَمْسٍ حَياتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ وفَراغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ وشَبابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ وغِناكَ قَبْلَ فَقْرِكَ ‘পাঁচটি বিষয় আসার পূর্বে পাঁচটি বিষয়কে গনীমত মনে করবে— (১) মৃত্যু আসার পূর্বে জীবিত অবস্থাকে (২) রোগ-ব্যাধি গ্ৰাস করার পূর্বে সুস্থতাকে (৩) অতিব্যস্ত হওয়ার পূর্বে অবসর সময়কে (৪) বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার পূর্বে তারুণ্যকে এবং (৫) দৈন্যদশা আসার পূর্বে সচ্ছলতাকে’।[7] নিজেকে সদা ইবাদতের প্রতি প্রাণবন্ত রাখবেন। কোনো অবস্থাতেই যেন সময় অপচয় বা অপব্যবহার না হয়। আমরা প্রায় সবাই একটা প্রবাদ বাক্য জানি, ‘বেকার মস্তিষ্ক শয়তানের ঘর’। আপনি অযথা বসে থাকবেন না। কোনো কাজে আত্মনিয়োগ করুন। বসে থাকলেই শয়তান আপনাকে পাপের কাজের প্রতি প্রলুব্ধ করবে। আল্লাহ আমাদের দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন- আমীন!


[1]. তিরমিযী, হা/৩১৮, হাদীছ ছহীহ।

[2]. তিরমিযী, হা/৪১৫, হাদীছ ছহীহ।

[3]. ইবনু মাজাহ, হা/২২৩৫, হাদীছ হাসান।

[4]. ছহীহুল জামে, হা/৬৪৭২।

[5]. তিরমিযী, হা/১০২১, হাদীছ হাসান।

[6]. ছহীহুল জামে, হা/১৪৬৪।

[7]. জামেউছ ছাগীর, হা/১২০৫।