আমলের গ্রহণযোগ্যতায় নিয়্যতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
-মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল


عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ t قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِامْرِئٍ مَا نَوَى فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ فَهِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ، وَرَسُولِهِ وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوِ امْرَأَةٍ يَتَزَوَّجُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ.

সরল অনুবাদ : উমার ইবনু খাত্ত্বাব c বলেন, আমি রাসূল a-কে বলতে শুনেছি যে, যাবতীয় কাজ নির্ভর করে নিয়্যত বা সংকল্পের উপর। আর মানুষ তাই প্রাপ্য হবে, যার সে নিয়্যত করবে। অতএব, যে ব্যক্তির হিজরত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ও তাঁর রাসূলের জন্য হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যই হবে। আর যে ব্যক্তির হিজরত পার্থিব সম্পদ অর্জন কিংবা কোনো নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত যে সংকল্প নিয়ে করা হয়েছে তার জন্যই হবে’।[1]

নিয়্যতের শাব্দিক ও বিশেষ অর্থ :

নিয়্যতের আভিধানিক অর্থ : ইচ্ছা পোষণ করা, দৃঢ় সংকল্প করা। নিয়্যতের আরও বেশ কয়েকটি অর্থ রয়েছে। যেমন-

(১) কোনো কাজকে কোনো কাজ থেকে পৃথক করা, নির্দিষ্ট করা। এ অর্থেই বলা হয়, ‘যোহরের নিয়্যত করা’ অর্থাৎ অপর ছালাত হতে কেবল যোহরকেই নির্দিষ্ট করা। ‘ফরযের নিয়্যত করা’ অর্থাৎ সুন্নাত বা নফল ব্যতীত কেবল ফরযকেই নির্দিষ্ট করা।[2]

(২) কার্য সম্পাদনের সংকল্প করা। যথা– হজ্জের নিয়্যত করা। অর্থাৎ হজ্জ সম্পাদনের সংকল্প করা। ইমাম নববী p বলেন, নিয়্যত বলতে অন্তরের সংকল্পকে বুঝায়।[3]

(৩) কোনো কার্য সম্পাদনে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সংকল্প করা এবং এর ব্যত্যয় না ঘটানো।

(৪) কাজের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নির্ধারণ করা।

মোটকথা, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং তাঁর নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্য কোনো কাজ করার সংকল্পকে নিয়্যত বলা হয়। মুহাদ্দিছগণের বক্তব্যে নিয়্যতের এই অর্থটি উদ্দিষ্ট হয়েছে। এখানে এই শেষোক্ত অর্থেই নিয়্যত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

‘কাজ নির্ভর করে’ অর্থাৎ কাজের ছওয়াব নির্ভর করে।

‘হিজর’ অর্থ- ত্যাগ করা, ছিন্ন করা। শরীআতে এর দুটি অর্থ রয়েছে। যথা–

(১) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ বা ধর্মীয় বিধান অবাধে পালনের উদ্দেশ্যে বাসভূমি ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করা। রাসূলুল্লাহ a ও তার কিছু ছাহাবী এ উদ্দেশ্যেই জন্মস্থান মক্কা ত্যাগ করে মদীনা গমন করেছিলেন, তাই তাদের জন্মভূমি ত্যাগ হিজরত নামে খ্যাত।

(২) শরীআতে নিষিদ্ধ কাজ ত্যাগ করা। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘প্রকৃতার্থে মুহাজির সে, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তুকে ত্যাগ করে’।[4]

‘নারীকে বিবাহ করার নিয়্যতে’ এতে একটি বিশেষ ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবরা অনারব ও দাসদেরকে হেয় মনে করত আর তাদের সাথে কন্যা সন্তানের বিবাহ দেওয়া হতে বিরত থাকত। ইসলাম সকলের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করায় আরবরা দাস ও অনারবদের সাথে কন্যাদের বিবাহ প্রদান আরম্ভ করে। ফলে কোনো কোনো অনারব ও দাস আরব মহিলা বিয়ের উদ্দেশ্যে মদীনায় হিজরত করে। হাদীছে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাছাড়া উম্মে ক্বায়েস নামের এক সুন্দরী নারীকে বিয়ের উদ্দেশ্যে এক ব্যক্তির মদীনা হিজরতের সূত্রটি নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়নি।[5]

হাদীছটির আলোকে শিক্ষা :

(১) নিয়্যত অন্তরের সংকল্পেরই নাম। সুতরাং কোনো বিষয়ের সংকল্প অন্তরে করলেই চলবে, মুখে উচ্চারণের প্রয়োজন নেই।

(২) কোনো কোনো কাজ একাধিক নিয়্যত বা উদ্দেশ্যেও করা যেতে পারে। যথা– দরিদ্র আত্মীয়কে দান করা। এতে তাদের দারিদ্র্য বিমোচন এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা– উভয় উদ্দেশ্যই একসাথে থাকতে পারে।

(৩) মুবাহ কাজের জন্যও আল্লাহর কাছে ছওয়াব পাওয়া যেতে পারে, যদি তা নেক নিয়্যতে করা হয়। ব্যাবসাবাণিজ্য, চাষাবাদ, শ্রম ইত্যাদি।

নিয়্যতের গুরুত্ব : এই হাদীছের আলোচ্য বিষয় তিনটি। যথা-

(১) নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে ইবাদত সম্পাদন।

(২) নিয়্যত ব্যতীত কোনো আমল ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না।

(৩) আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নিয়্যতের প্রভাব।

ইসলামে নিয়্যতের গুরুত্ব অত্যধিক। কোনো কাজ করতে যাওয়ার পূর্বে নিয়্যত করা অপরিহার্য। নিয়্যত ব্যতীত শরীআতের কোনো আমলই গ্রহণযোগ্য নয়। যে কোনো আমলের পুরস্কার অথবা শাস্তি নিয়্যতের ভিত্তিতেই হয়। নিয়্যত ভালো হলে প্রতিদানস্বরূপ পুণ্য আর খারাপ হলে শাস্তিস্বরূপ পাপ আমলনামায় লিপিবদ্ধ হয়। কাজেই আমলের খারাপ বা ভালো হওয়া কিংবা গ্রহণযোগ্য বা অগ্রহণযোগ্য হওয়া সবই নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। তাইতো ‘ইন্নামাল আ‘মালু বিন নিয়্যাত’ বলে শারঈ আমলকে নিয়্যতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।[6]

ভালো নিয়্যতের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন না করেও পুরস্কার পাওয়া যায়।[7] আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য হিজরতের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলো। অতঃপর রাস্তায় তার মৃত্যু হয়ে গেল, তবে আল্লাহর উপর তাকে প্রতিদান দেওয়া ধার্য হয়ে গেল’ (আন-নিসা, ৪/১০০)। তাবূক যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কিছু ছাহাবীকে উদ্দেশ্যে করে মদীনায় অবস্থানরত ছাহাবীদের সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল a বলেছিলেন, ‘তারা যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ না করেও তোমাদের মতো প্রতিদান পাবে’।[8] আবার খারাপ নিয়্যতে ব্যর্থ হলেও শাস্তি পেতে হয়।

নিয়্যতের উদ্দেশ্য : নিয়্যতের মাধ্যমে আমলকে এক আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা। অর্থাৎ মহান আল্লাহর জন্যই আমল করা। কেননা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্পাদিত আমলের পুরস্কার তাঁর নিকট পাওয়া যাবে। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তির সন্তুষ্টি অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সম্পাদিত আমলের পুরস্কার তার নিকট পাওয়া যাবে না। অন্য উদ্দেশ্যে সম্পাদিত আমলের পুরস্কার তাঁর নিকটে চাওয়া হলে তিনি বলবেন, যার উদ্দেশ্যে তুমি এই আমল করেছিলে তার নিকটেই এর প্রতিদান অন্বেষণ করো। অর্থাৎ আমলের মূল্যায়ন অন্তরে সংকল্পিত উদ্দেশ্যের আলোকে হয়। অর্থাৎ যে কোনো সৎকাজের বিনিময় পেতে হলে উদ্দেশ্য অবশ্যই সৎ হতে হবে। সৎ ও যথাযথ নিয়্যত ব্যতীত কোনো আমলই সঠিক বা পুণ্যবহ হবে না।

কুরআন ও হাদীছের বর্ণনায় নিয়্যতের গুরুত্ব : পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের কেউ দুনিয়া প্রত্যাশা (ইরাদা) করে আর কেউ আখেরাত প্রত্যাশা (ইরাদা) করে’ (আলে ইমরান, ৩/১৫২)। আয়াতে ‘ইরাদা’ দ্বারা এই অর্থই উদ্দেশ্য। এমনিভাবে হাদীছের অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়্যত শব্দটি এই একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন উমামা বাহেলী c বর্ণিত হাদীছে আল্লাহর রাসূল a বলেছেন, ‘আল্লাহ ঐ আমল কবুল করেন না, যা একনিষ্ঠভাবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করা হয় না’।[9] উবাদা ইবনু ছামেত c বর্ণিত হাদীছটি এই অর্থকেই সমর্থন করে। উবাদা ইবনু ছামেত c বলেন, আল্লাহর রাসূল a বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করে এবং একটি রশি (দুনিয়াবী স্বার্থ) পাওয়া ছাড়া তার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই, তাহলে সে তাই পাবে যার নিয়্যত সে করেছ’।

উক্ত বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে, নিয়্যত ব্যতীত কোনো আমল আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না।

সালাফে ছালেহীন ও উলামায়ে কেরামের নিকট হাদীছটির গুরুত্ব : এই অর্থে নিয়্যতের ব্যবহার সালাফে ছালেহীনের বক্তব্যে ব্যাপক পাওয়া যায়। যেমন- উমার c বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়্যত করবে না তার কোনো আমল গ্রহণযোগ্য হবে না। ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাছীর p বলেছেন, ‘তোমরা ভালো করে নিয়্যত শিখো। কেননা সেটা আমলের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ’।[10] সুফিয়ান ছাওরী p বলেন, ‘নিয়্যতের চাইতে আমি আমার জন্য কোনো বিষয়কে কঠিন করে দেখিনি। কেননা সেটা আমলের উদ্দেশ্যের সাথে পরিবর্তন হতে থাকে’।[11] তাই পবিত্রতার কোনো বিধানই নিয়্যত ছাড়া বিশুদ্ধ হবে না এবং ছালাত, যাকাত, ছওম ও হজ্জ ইত্যাদি ইবাদতের কোনোটিই নিয়্যত ছাড়া আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না।

সুধী পাঠক! নিয়্যতের গুরুত্ব উপলব্ধি, বিদ্যা অর্জন এবং অন্যান্য সকল কাজ যেন একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই সম্পাদন করেন- এ কথার প্রতি সতর্ক করার জন্য মুহাদ্দিছগণ তাদের কিতাবের প্রথমে নিয়্যত সংক্রান্ত হাদীছটি বর্ণনা করে থাকেন। মোদ্দাকথা, একজন মুসলিমকে এই শিক্ষা দেওয়া যে, তার সকল কর্মকাণ্ডের শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা এবং গ্রহণযোগ্যতা ও অগ্রহণযোগ্যতা নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল।

এই হাদীছটি ঐ সকল হাদীছের একটি যার উপর ইসলামের বিধিবিধান আবর্তিত হয়। ইমাম শাফেঈ p বলেছেন, ‘এই হাদীছটি দ্বীনী জ্ঞানের এক-তৃতীয়াংশ এবং ফিক্বহের ৭০টি অধ্যায়ের মাসআলার উৎস’।[12] ইমাম আহমাদ p বলেছেন, ‘ইসলামের সকল বিধানের উৎস হিসেবে বর্ণিত তিনটি হাদীছের অন্যতম এটি’।[13]

নিয়্যতের সম্পর্ক অন্তরের সাথে : আলোচ্য হাদীছে মুহাদ্দিছগণের

ব্যাখ্যা হতে সুস্পষ্টতই জানা যায়, নিয়্যত অন্তরের বিষয়, মুখে উচ্চারণের বিষয় নয়। যে কোনো আমল আরম্ভ করার পূর্বে নিয়্যত মুখে উচ্চারণ করতে হবে মর্মে শারঈ কোনো প্রমাণ নেই। রাসূলুল্লাহ a, ছাহাবায়ে কেরাম n, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈন o-এর আমলেও মুখে নিয়্যত উচ্চারণের প্রমাণ নেই। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী p বলেন, ‘মুখে উচ্চারণ না করার মধ্যে রাসূলুল্লাহ a-এর সুন্নাতের অনুসরণ রয়েছে’। বহু গ্রন্থ প্রণেতা আশরাফ আলী থানভী p লিখেছেন, ‘মুছল্লী মনে মনে ছালাতের নিয়্যত করবে যে, আমি যোহরের ছালাত পড়ছি। তারপর আল্লাহু আকবার বলে হাত বাঁধলেই হয়ে যাবে। সমাজে প্রচলিত লম্বা-চওড়া নিয়্যত পাঠের প্রয়োজনীয়তা নাই’।[14] মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরী p লিখেছেন, ‘অন্তরেই ছালাতের মনস্থ করে নিতে হবে। অর্থাৎ মনে মনে ধারণা করবে যে, আমি ফজরের ছালাত আদায় করছি। মুখে নিয়্যত করার কোনোই প্রয়োজন নেই’।[15]

রীআতের আলোকে মানুষের কার্যাবলি তিনভাগে বিভক্ত : গাযালী p বলেন, মানুষ যে আমল সম্পাদন করে তা তিনভাগে বিভক্ত। যথা- (১) সাইয়্যেআত বা মন্দ কাজগুলো (২) হাসানাত বা ভালো কাজসমূহ (৩) মুবাহাত বা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগের কাজসমূহ।

কুরআন-হাদীছে যেসব কাজকে স্পষ্ট ভাষায় গুনাহের বলা হয়েছে, তাকে সাইয়্যেআত বলা হয়। যথা– সূদ, ঘুষ, যেনা, জুয়া, মদ, আল্লাহর রাসূল a বা কুরআন-হাদীছের বিরুদ্ধে সমালোচনা করা ইত্যাদি। নিয়্যত দ্বারা পাপ কাজকে কিছুতেই নেকীর কাজে পরিণত করা সম্ভব নয়। যেমন- ‘কাউকে সান্ত্বনা প্রদানের উদ্দেশ্যে অন্যের সমালোচনা, অসহায়কে দানের উদ্দেশ্যে চুরি করা, মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণের জন্য আত্মসাৎ করা জায়েয নয়। অধিকন্তু যদি কেউ এরূপ কাজ ছওয়াবের আশায় করে, তবে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, সে নিষিদ্ধ কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়। যেমন কেউ বলছে, আমি মিষ্টির স্বাদ পাওয়ার জন্য নিম ফল খাচ্ছি! এমন ব্যক্তি সমাজে কেবল বোকাই হবে না, বরং পাগল বলে গণ্য হবে। এ জন্যই শরীআতে এরূপ ব্যক্তিকে শুধু ফাসেক্বই নয়, বরং কাফের বলা হবে। কারণ সে প্রকৃত অর্থে আল্লাহর সাথে ঠাট্টা করেছে।[16] এমনিভাবে লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে ছালাত আদায়কারীর জন্য ধ্বংস। আল্লাহ বলেন, ‘ঐ শ্রেণির ছালাত আদায়কারীর জন্য ধ্বংস,

যারা তাদের ছালাতের ব্যাপারে গাফেল’ (আল-মাঊন, ১০৭/৪-৬)

যে সমস্ত কাজ শরীআত পালন করতে বলেছে বা ভালো বলে উৎসাহিত করেছে, তাকে ‘হাসানাহ’ বলা হয়। যেমন- ইবাদত পালন করা, সত্য কথা বলা, ন্যায় বিচার করা, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের হক্ব আদায় করা, গরীবের সাহায্য করা ইত্যাদি। হাসানাহ পর্যায়ের কার্যাবলি অপরিহার্য পর্যায়ের হলে তাকে ফরয বা ওয়াজিব বলে। করার জন্য তাকীদ থাকলে তাকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বলা হয় এবং ভালো বলে উৎসাহ প্রদান করা হলে তাকে মুস্তাহাব বা নফল বলা হয়। এগুলো নিয়্যতের মাধ্যমে সৎ আমলে পরিণত হয়। নিয়্যত ব্যতীত আদায় করলে কোনো প্রতিদান পাওয়া যায় না। নিয়্যত কেবল আল্লাহ তাআলার জন্য করতে হবে। যদি লোকদেখানের জন্য হয়ে থাকে, তবে তা পাপে পরিণত হবে।[17]

যেসব কাজে মানুষকে আল্লাহ তাআলা স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগের অধিকার দিয়েছেন, তাকে ‘মুবাহ’ বলে। যেমন– খাওয়া, চলা, জীবিকা উপার্জন করা ইত্যাদি। নিয়্যতের তারতম্য বিশেষভাবে মুবাহ পর্যায়ের কাজগুলোতেই প্রয়োগ হয়ে থাকে। মুবাহ পর্যায়ের যেকোনো একটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়্যতে করলে তখন তা আর মুবাহ থাকে না, তা একটি ইবাদতে পরিণত হয়ে যায়।

দুনিয়ার ফয়সালা বাহ্যিক অবস্থার উপর আর আখেরাতের ফায়সলা নিয়্যতের উপর হয়ে থাকে : বর্তমানে আমরা যে জগতে আছি, যেখানে আমাদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, এটাকে আলামে যাহের বা দৃশ্যমান জগত বলা হয়। এখানে আমাদের ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও বোধ-বুদ্ধির সীমানা বাহ্যিক অবস্থা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এখানে আমরা কোনো ব্যক্তির বাহ্যিক আচার-আচরণ দেখেই তার ব্যাপারে ভালো-মন্দের মন্তব্য করতে পারি এবং এরই ভিত্তিতে তার সাথে আমরা আচরণ করে থাকি। বাহ্যিক কর্মকাণ্ড ও আচার-আচরণের বাইরে তার নিয়্যত, অন্তরের রহস্য ও মনের গোপন অবস্থা উপলব্ধি করতে আমরা অক্ষম। এ জন্যই উমার c বলতেন, ‘বাহ্যিক অবস্থার উপর বিচার করা, আর গোপন অবস্থা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়াই হলো আমাদের কাজ’।

কিন্তু আখেরাতে বিচারক হবেন আল্লাহ তাআলা, যিনি সকল গোপন বিষয় সম্যক অবগত। তাই সেখানে মানুষের নিয়্যত ও তার মনের ইচ্ছা বিবেচনায় সকল বিচার ও সিদ্ধান্ত হবে। তাই মনে রাখতে হবে, এই জগতে বিধান প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাহ্যিক আমল ও কর্মই যেমন মূল বিষয়, অনুরূপভাবে আখেরাতে নিয়্যতই হবে বিচার ও ফয়সালার উৎস। সেখানে বাহ্যিক আমল ও কর্মকে কেবল নিয়্যতের অনুগামী হিসেবে গণ্য করা হবে।[18]

হাদীছটি কুরআনের মর্মার্থের ব্যাখ্যা : আল্লাহর রাসূল a যা কিছু বর্ণনা করেন তা কুরআনে বর্ণিত নির্দেশনার ব্যাখ্যা। সকল আমল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য করতে হবে। নিম্নে বর্ণিত আয়াতসমূহে সে বিষয়ে ব্যাপক তাকীদ প্রদান করা হয়েছে। ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘তারা শুধু এজন্যই আদিষ্ট হয়েছে যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, দ্বীনকে তাঁর উদ্দেশ্যে অকৃত্রিম করবে, ছালাত আদায় করবে এবং যাকাত প্রদান করবে। আর এটিই হবে প্রতিষ্ঠিত দ্বীন’ (আল-বায়্যিনাহ, ৯৮/৫)। অপর আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুনাফেক্বরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে আর আপনি তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবেন না। তবে যারা অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর নিকট ফিরে এসেছে, নিজেকে সংশোধন করে নিয়েছে, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে আর দ্বীনকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করেছে তারা মুমিনদের সাথে থাকবে আর শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে মহাপুরস্কার দান করবেন’ (আন-নিসা, ৪/১৪৫-১৪৬)। রাসূল a-কে উদ্দেশ্য করে এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে রাসূল! আপনি বলুন আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও মরণ সবকিছুই আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। আর আমি এজন্যই আদিষ্ট হয়েছি আর আমি আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে প্রথম’ (আল-আনআম, ৬/১৬২-১৬৩)। এতে বুঝা গেলো, মানুষের যাবতীয় জন্ম, মৃত্যু ও সকল কাজ একমাত্র আল্লাহর জন্য হওয়া উচিত। নিয়্যতের হাদীছসহ এ জাতীয় অন্যান্য সকল হাদীছ প্রকৃত অর্থে এই সমস্ত আয়াতেরই ব্যাখ্যা।

কুরআন মাজীদে একনিষ্ঠ একনিষ্ঠতাবিহীন আমলের দৃষ্টান্ত : পবিত্র কুরআনের নিম্নের দুটি আয়াতে দানকারী দুই শ্রেণির মানুষের আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে ঐসব লোক, যারা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের সম্পদ কল্যাণখাতে ব্যয় করে থাকে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে ঐ সকল মানুষ, যারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিজেদের ধনসম্পদ গরীব, মিসকীন ও অভাবীদের প্রদান করে। এ দুই শ্রেণির মানুষের বাহ্যিক কর্মকাণ্ড দেখতে সম্পূর্ণ একই মনে হয়। কিন্তু যেহেতু তাদের নিয়্যত ও উদ্দেশ্য ভিন্ন, তাই তাদের আমলের ফলাফলও ভিন্ন হবে। এক শ্রেণির মানুষের আমল বরকত ও কল্যাণে পরিপূর্ণ, আর অপর শ্রেণির মানুষের আমল সম্পূর্ণ নিষ্ফল ও বিনষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খয়রাত বরবাদ করো না, সে ব্যক্তির মতো নিজেদের দান-খয়রাতকে বিনষ্ট করো না, যে নিজের ধনসম্পদ লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে থাকে এবং আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব, তার দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার উপর কিছু মাটি জমে গেল। অতঃপর এর উপর প্রবল বৃষ্টিপাত হলো আর একে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিল। তাই এ ধরনের লোকেরা নিজেদের উপার্জিত সম্পদের কোনো বিনিময় লাভ করতে পারবে না। আর আল্লাহ এই অকৃতজ্ঞদেরকে হেদায়াত বঞ্চিত রাখবেন’ (আল-বাক্বারা, ২/২৬৪)। অপরদিকে মুখলেছদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং নিজেদের মনকে সুদৃঢ় করার জন্য আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের ধনসম্পদ খরচ করে– তাদের দৃষ্টান্ত টিলায় অবস্থিত বাগানের মতো, যাতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং এর ফলে উৎপাদন দ্বিগুণ হয়…’ (আল-বাক্বারা, ২/২৬৫)

এখানে প্রথম জনের মানুষের নিকট সাময়িক বাহবা কুড়ানো ছাড়া আর কিছুই লাভ হলো না। পক্ষান্তরে, দ্বিতীয় ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তার নিয়্যতের আলোকে ফল দান করেছেন। সারকথা, এটিই হচ্ছে আল্লাহর নীতি ও বিধান। রাসূলুল্লাহ a এ হাদীছে এ কথাটিরই ঘোষণা দিয়েছেন।

ইখলাছশূন্য সৎ আমল বিরাট হলেও তার পরিণাম জাহান্নাম : একটি হাদীছে এসেছে, ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তির বিচার করা হবে। আল্লাহর আদালতে তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার ফয়সালা দেওয়া হবে। সবার প্রথমে ঐ ব্যক্তিকে হাযির করা হবে, যে জিহাদের ময়দানে শহীদ হয়েছিল। সে যখন আদালতে হাযির হবে, তখন আল্লাহ তাআলা প্রথমে তাকে নিজের নেয়ামতরাজির কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। সেও এগুলো স্মরণ করে স্বীকার করে নিবে। তারপর তাকে বলা হবে– বলো তো, তুমি কি এগুলোর হক্ব আদায় করেছ আর কী কাজ করে এসেছ? সে বলবে, হে আল্লাহ! আমি আপনার পথে জিহাদ করেছি এমনকি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য শাহাদাত বরণ করেছি। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ, তুমি তো কেবল এই উদ্দেশ্যেই জিহাদ করেছিলে যে, সে ব্যক্তি খুব সাহসী যোদ্ধা, আর দুনিয়াতে তুমি বীরের মর্যাদা পেয়েছ। এরপর তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

অনুরূপভাবে একজন দ্বীনের ও কুরআনের আলেমকে আদালতে হাযির করা হবে। আল্লাহ তাআলা তাকে তাঁর নেয়ামতরাজির কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। সেও এগুলো স্মরণ করে স্বীকার করে নিবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কী আমল করে এসেছো? সে বলবে, আমি আপনার দ্বীন ও কুরআনের জ্ঞান লাভ করেছিলাম আর তা আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অন্যকেও শিক্ষা দিয়েছিলাম। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যাবাদী, তুমি তো নিজেকে আলেম ও ক্বারী হিসেবে প্রকাশ করার জন্য ওসব করেছিলে। এরপর আল্লাহর নির্দেশে তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

তারপর আরেক ব্যক্তিকে হাযির করা হবে, যাকে আল্লাহ তাআলা প্রচুর ধনসম্পদ দান করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে তাঁর নেয়ামতরাজির কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। সেও এগুলো স্মরণ করে স্বীকার করে নিবে। তাকেও জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কী করে এসেছ? সে বলবে, হে আল্লাহ! আমি পুণ্য অর্জনের এমন কোনো খাত অবশিষ্ট রাখিনি, যে খাতে ব্যয় করলে আপনি সন্তুষ্ট হবেন। আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যাবাদী, তুমি তো কেবল এই উদ্দেশ্যে ব্যয় করেছিলে যে, তোমাকে বড় দানশীল বলা হবে, আর দুনিয়াতে তো তোমার দানশীলতার সুনাম হয়েই গিয়েছে। তারপর তাকেও উপুড় করে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৫)। মোটকথা, আল্লাহর কাছে কেবল ঐ আমলই গ্রহণযোগ্য হবে, যা বিশুদ্ধ নিয়্যতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য করা হবে।

আল্লাহ তাআলার নিকট আমলের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিদান পাওয়ার সুযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে নিয়্যত। আলোচ্য হাদীছের আলোকে নিয়্যতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে যথাযথভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নিয়্যতের ব্যবহার করতে হবে, যাতে কোনো কাজ বা আমল নিষ্ফল না হয়। যেকোনো আমলে আমরা নিয়্যতকে অবশ্যই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করব যাতে ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ইত্যাদির যথাযথ প্রতিদান পাই। তাছাড়া দৈনন্দিন জীবনে আমাদের অনেক মুবাহ কাজ করতে হয়, যেগুলো নিয়্যতসহ করলে আমাদের আমলনামায় তার পুরস্কার লিপিবদ্ধ হবে। আমরা যেন জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিয়্যতকে কাজে লাগিয়ে আমাদের প্রতিটি কাজকে ইবাদতে পরিণত করতে পারি সেই তাওফীক্ব আল্লাহ আমাদের দান করুন- আমীন!


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৭; মিশকাত, হা/১।

[2]. ইবনে রজব, জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম, ১/৪৩।

[3]. নববী, শারহু মসলিম, ১৩/৪৮।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১০।

[5]. ইবনে রজব, জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম, ১/৩৫।

[6]. আরশীফ, মুলতাক্বা আহলিল হাদীছ, পৃ. ২৬৯; ইবনে দাক্বীক্বুল ঈদ, আহকামুল আহকাম, ১/৮।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৯১।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/২৮৩৯।

[9]. নাসাঈ, হা/৩১৪০, হাদীছ ছহীহ।

[10]. জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, মুনতাহাল আমাল, পৃ. ৭।

[11]. প্রাগুক্ত।

[12]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬।

[13]. প্রাগুক্ত।

[14]. বেহেশতী জেওর, ২/১৭-১৮।

[15]. রাহে নাজাত, পৃ. ৯।

[16]. ইমাম গাজালী, ইহইয়ায়ু উলূমিদ দীন, ৪/৩৮৮।

[17]. প্রাগুক্ত।

[18]. মাআরেফুল হাদীছ, ১ম খণ্ড।