ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামী সমাধান
-সাঈদুর রহমান*


মানব জাতি পৃথিবীতে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হয়ে জীবনযাপন করুক এটাই আল্লাহ তাআলার চাওয়া। কিন্তু শয়তান, কুপ্রবৃত্তি ও অসৎ মানুষের সংস্পর্শে তারা পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। যেনা-ব্যভিচার, ধর্ষণ, খুন-খারাবি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সূদ, ঘুষ ও পরের সম্পদ দখল করার ন্যায় অসংখ্য পাপ কাজ তারা নির্দ্বিধায় করছে। ইসলাম মানব জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষতিকারক বিষয়ের পূর্ব প্রতিষেধক গ্রহণ করেছে। যেনা-ব্যভিচার ও ধর্ষণ রোধ করার জন্য ইসলাম যে পন্থা অবলম্বন করেছে, তা বিদ্যমান বিকৃত অন্য কোনো ধর্ম অবলম্বন করেনি। নিম্নে স্বল্প পরিসরে ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামের পদক্ষেপগুলো আলোচনা করা হলো-

(১) চোখ নিম্নগামী করা :

যেনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার পাঁচটি পর্যায় রয়েছে। তার মাঝে অন্যতম হলো নারী-পুরুষ একে অপরের দিকে তাকানো। আল্লাহ তাআলা যেনা-ব্যভিচারের মূলেই কুঠারাঘাত করেছেন। তিনি বলেন, قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ‘(হে নবী!) মুমিনদেরকে বলো, তারা যেন চোখ নিম্নগামী করে ও লজ্জাস্থানের সংরক্ষণ করে’ (আন-নূর, ২৪/৩০)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন,يَا عَلِيُّ لاَ تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ فَإِنَّ لَكَ الأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الآخِرَةُ ‘হে ‘আলী! কোনো নারীকে একবার দেখার পর দ্বিতীয়বার দেখবে না। কেননা তোমার জন্য প্রথমবার দেখার অনুমতি আছে, কিন্তু দ্বিতীয়বার দেখা জায়েয নয়’।[1]

(২) যাদের সাথে বিয়ে বৈধ, তাদের সাথে কোনো নারী নির্জনে একাকী যেতে পারবে না :

রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান করলেই তৃতীয়জন হয় শয়তান’।[2] এই একটি হাদীছ অমান্য করার কারণে অসংখ্য নারী ধর্ষিত হচ্ছে। যুবতীরা নির্দ্বিধায় বয়ফ্রেন্ডের সাথে বিভিন্ন স্থানে বের হচ্ছে আর বাড়ি ফিরছে ধর্ষিতাবস্থায়।

(৩) কোনো নারী মাহরাম (যাদের সাথে বিয়ে হারাম) ব্যতীত সফর করতে পারবে না :

বর্তমানে বাসে-ট্রাকে নারী ধর্ষণের অন্যতম কারণ হলো মাহরাম ব্যতীত সফর করা। একটি মেয়ে কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মাহরাম ছাড়াই যাতায়াত করে, আর পথিমধ্যে কিছু কুরুচিসম্পন্ন ব্যক্তি দ্বারা ধর্ষিত হয়। এজন্যই নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,لاَ يَحِلُّ لاِمْرَأَةٍ مُسْلِمَةٍ تُسَافِرُ مَسِيرَةَ لَيْلَةٍ إِلاَّ وَمَعَهَا رَجُلٌ ذُو حُرْمَةٍ مِنْهَا ‘কোনো মুসলিম নারীর জন্য সাথে মাহরাম (যার সাথে বিবাহ হারাম এমন আত্মীয়) ছাড়া এক দিনের রাস্তা সফর করা বৈধ নয়’।[3] একজন ছাহাবী যুদ্ধে নাম লিখিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমার স্ত্রী তো হজ্জ করার মনস্থ করেছে। তখন নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার নাম যুদ্ধের তালিকা থেকে কেটে স্ত্রীর সাথে হজ্জে যেতে বলেন।[4] 

একটু লক্ষ্য করুন, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ ছাহাবীকে তার স্ত্রী একাকী হজ্জে যাবে বিধায় যুদ্ধে পর্যন্ত যেতে দেননি। আর বর্তমানে আমরা আমাদের মা-বোন-মেয়েদের মাহরাম ছাড়াই দূর-দূরান্তে যেতে দিচ্ছি!

(৪) কোনো নারী সুগন্ধি মেখে ঘর থেকে বের হতে পারবে না :

নারী যদি সুগন্ধি মেখে ঘর থেকে বের হয়, তাহলে লালায়িত চোখ তার প্রতি নিবদ্ধ হবে। তাই নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেনার এই পথ রুদ্ধ করতে চেয়েছেন। তিনি বলেন,كُلُّ

عَيْنٍ زَانِيَةٌ وَالْمَرْأَةُ إِذَا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالْمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا يَعْنِي زَانِيَةً

‘প্রতিটি চোখই যেনাকারী। কোনো নারী সুগন্ধি মেখে কোনো মজলিসের পাশ দিয়ে গেলে সে এমন এমন অর্থাৎ যেনাকারিণী’।[5]

আফসোসের কথা হচ্ছে! বর্তমানে অনেক মুসলিম নারী সুগন্ধি মেখে রাস্তাঘাটে বের হচ্ছে, আর পথে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

(৫) স্ত্রী তার স্বামীর কাছে অন্য কোনো নারীর সৌন্দর্য বা গুণাগুণ বর্ণনা করবে না:

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,لاَ تُبَاشِرِ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ فَتَنْعَتَهَا لِزَوْجِهَا كَأَنَّهُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا ‘কোনো নারী যেন তার দেখা অন্য নারীর দেহের বর্ণনা নিজ স্বামীর নিকট এমনভাবে না দেয়, যেন সে তাকে (ঐ নারীকে) চাক্ষুষ দেখতে পাচ্ছে’।[6] 

যখন স্ত্রী তার স্বামীর কাছে অন্য কোনো নারীর সৌন্দর্য বা গুণাগুণ বর্ণনা করে, তখন ঐ স্বামীর তার স্ত্রীর প্রতি অনীহা চলে আসে এবং ধীরে ধীরে ঐ নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আর এভাবেই সমাজে ব্যভিচার বৃদ্ধি পায়।

(৬) কোনো নারী জোরে হাঁটবে না :

নারীরা রাস্তাঘাটে বের হলে জোরে হাঁটবে না। কারণ অনেক সময় নারীরা পায়ে নূপুর পরে থাকে, আর নূপুরের ঝনঝন আওয়াযে কোনো পুরুষের কুদৃষ্টি তার দিকে পড়তে পারে। তাই আল্লাহ তাআলা এই পথ রুদ্ধ করতে চেয়েছেন। তিনি বলেন, وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ ‘তারা যেন (নারীরা) তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে’ (আন-নূর, ২৪/৩১)

(৭) সাবালক হলে ছেলে-মেয়ের বিছানা পৃথক করে দেওয়া :

ইসলাম সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখেছে। মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সে মৃতের ন্যায়। ভাই-বোন যদি একই বিছানায় ঘুমায়, তাহলে মনের অজান্তেই কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দুর্ঘটনা রোধ করার লক্ষ্যে বলেন,مُرُوا أَوْلاَدَكُمْ بِالصَّلاَةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে ছালাতের জন্য নির্দেশ দাও। যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়ে যাবে, তখন (ছালাত আদায় না করলে) এজন্য তাদেরকে মারবে এবং তাদের ঘুমের বিছানা আলাদা করে দিবে’।[7]

(৮) অভিভাবক ছাড়া কোনো নারী নিজে নিজে বিয়ে করতে পারবে না :

মেয়েরা পুরুষের তুলনায় একটু বেশি আবেগপ্রবণ। কারণ তাদের মন নরম। দুষ্ট ছেলের মিষ্টি কথায় তারা অল্পতেই ফেঁসে যেতে পারে। নিজ খেয়াল খুশি অনুযায়ী ঐ দুষ্ট ছেলের সাথে বিয়ে করে নিতে পারে। আর কিছুদিন পর ঐ ছেলে তাকে ছেড়ে দিতে পারে। পরে ঐ নারী জড়িয়ে পড়তে পারে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে। এ পথ বন্ধ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

أَيُّمَا امْرَأَةٍ نُكِحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ فَإِنْ دَخَلَ بِهَا فَلَهَا الْمَهْرُ بِمَا اسْتَحَلَّ مِنْ فَرْجِهَا فَإِنِ اشْتَجَرُوا فَالسُّلْطَانُ وَلِيُّ مَنْ لاَ وَلِيَّ لَهُ

‘অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত কোনো মহিলা বিয়ে করলে তার বিয়ে বাতিল, তার বিয়ে বাতিল, তার বিয়ে বাতিল। কিন্তু তার সাথে তার স্বামী সহবাস করলে তবে সে তার লজ্জাস্থান হালাল মনে করে সঙ্গত হওয়ার কারণে তার নিকট মোহরের অধিকারী হবে। যদি অভিভাবকগণ বিবাদ করে, তাহলে যে ব্যক্তির কোনো অভিভাবক নেই, তার ওয়ালী হবে দেশের শাসক’।[8]

(৯) নারীরা প্রয়োজন ব্যতীত পরপুরুষের সাথে আলাপচারিতায় মগ্ন হবে না :

বর্তমানে আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, শালি-দুলাভাই ও দেবর-ভাবির অযথা কথাবার্তা সর্বত্রই বিরাজমান। যার কারণে হরহামেশাই শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। দুলাভাই শালিকে নিয়ে চলে গেছে, দেবর ভাবিকে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। নিত্যনতুন কত যে সমস্যা উদ্ভব হচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। এ সকল সমস্যা দূরীকরণে আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا

‘হে নবীপত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মতো নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথাবার্তা বলো না। কারণ এতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হবে। সুতরাং তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে’ (আল-আহযাব, ৩৩/৩২)

জাতির কর্ণধারদের বলছি, প্রথমে নৌকার ছিদ্র বন্ধ করুন, তারপর পানি সেচুন। অন্যথায় সেচে কোনো কাজে আসবে না। ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে প্রথমে এর কারণগুলো উদ্ঘাটন করুন, তারপর উদ্যোগ নিন। তাহলেই সফলতা অর্জন করার আশা করতে পারবেন। ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করুন। সমাজে শান্তি চলে আসবে ইনশাআল্লাহ।


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. আবূ দাঊদ, হা/২১৪৯।

[2]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৪।

[3]. আবূ দাঊদ, হা/১৭২৩।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৩০০৬।

[5]. তিরমিযী, হা/২৭৮৬।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২৪০।

[7]. আবূ দাউদ, হা/৪৯৫।

[8]. তিরমিযী, হা/১১০২।