নফসের জিহাদ
-কাযী ফেরদৌস করীম মুন্নি*


মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যে তোমাদের মুখমণ্ডল পূর্ব বা পশ্চিম দিকে প্রত্যাবর্তিত করো তাতে পুণ্য নেই; বরং পুণ্য তার, যে ব্যক্তি আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তারই ভালোবাসা অর্জনের জন্য আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, দরিদ্র, মুসাফির ও ভিক্ষুকদেরকে এবং দাসত্ব মোচনের জন্য ধন-সম্পদ দান করে আর ছালাত প্রতিষ্ঠিত করে ও যাকাত প্রদান করে এবং অঙ্গীকার করলে যারা সেই অঙ্গীকার পূর্ণকারী হয় এবং যারা অভাবে ক্লেশ এবং যুদ্ধকালে ধৈর্যশীল, তারাই সত্যপরায়ণ এবং তারাই আল্লাহভীরু’ (আলবাক্বারা, /১৭৭)

সৎকাজ গ্রহণের শর্ত হচ্ছে : ১. আল্লাহর উপর ঈমান আনা। ২. নিষ্ঠার সাথে একমাত্র আল্লাহর সস্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সৎকাজ করা। ৩. যে কোনো সৎকাজ রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ত্বরীক্বা মতে তার প্রদর্শিত আদর্শ অনুযায়ী সম্পাদন করা।

ঈমানের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষ অথবা নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকার্য করে আর সে বিশ্বাসীও হয়, তবে তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তারা খেজুর কণা পরিমাণও অত্যাচারিত হবে না’ (আন-নিসা, ৪/১২৪)। সুতরাং মহান আল্লাহর বিধান মোতাবেক আমরা ঈমান এনে শুধুমাত্র তার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সৎকর্ম সম্পাদন করতে পারলেই আল্লাহর দরবারে সফলকাম হতে পারব ইনশা-আল্লাহ। এখন পৃথিবীতে সর্বপ্রথম সর্বোৎকৃষ্ট সৎকর্ম হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমান। 

অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি ও কাজে পরিণত করা আল্লাহর প্রতি ঈমানের যরূরী অনুসঙ্গ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জিহাদ করো আল্লাহর ব্যাপারে যেভাবে জিহাদ করা উচিত’ (আল-হজ্জ, ২২/৭৮)। অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করা এবং এজন্য কষ্ট স্বীকার করা। আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এ স্থলে জিহাদ বলে নিজ প্রবৃত্তি ও অন্যায় কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে জিহাদ করা বোঝানো হয়েছে, আর এটাই হচ্ছে যথাযোগ্য জিহাদ।[1]

বর্তমানকালে মুসলিম সমাজ এই নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ বর্জন করার ফলে মুসলিম তার সেই চারিত্রিক সৌন্দর্য হারিয়ে লম্পট, ধর্ষণকারী, সূদখোর, ঘুষখোর, চোর, ডাকাত, বদমাশ, গুণ্ডা, ওয়াদাভঙ্গকারী, খিয়ানতকারী, চরিত্রহীন, দিশাহারা, পথহারা পথিক হয়ে পড়েছে। আমাদের হারানো সেই চারিত্রিক সৌন্দর্য ফিরে পেতে চাইলে প্রথমে আমাদের নিজের সাথে শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরয হয়ে পড়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং ধারণা করে যে, তারা সৎপথে রয়েছে’ (আল-‘রাফ, ৭/৩০)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (আল-বাক্বারা, ২/২০৮)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আসলে শয়তান তোমাদের দুশমন। অতএব, তোমরাও তাকে দুশমন মনে করো। সে তো তার অনুসারীদের নিজের পথে ডাক দিচ্ছে এজন্য যে, যেন তারা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে শামিল হয়ে যায়’ (ফাত্বির, ৩৫/৬)

শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ হচ্ছে, শয়তানের বিরুদ্ধাচরণ করে তার কুমন্ত্রণার অনুসরণ না করা এবং নিজ নফসকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে উদ্বুদ্ধ করা। বাস্তবিকভাবে নিজেকে শয়তানের বিরুদ্ধে বিজয়ী করার লক্ষ্যে আল্লাহর একনিষ্ঠ মুজাহিদ হওয়ার জন্য তাওফীক্ব চাইতে হবে মহান আল্লাহর দরবারে। আর তাই আমাদের অন্তরে যে যালেম শয়তান রাজত্ব করছে, তার বিরুদ্ধে জিহাদ করেতে হবে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দ্বারা। আমাদের নিজ অন্তর নামক রাষ্ট্রের পরিচালক কে? তা সকল মুসলিমের নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তর জানা দরকার। যদি কোনো মুসলিমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হয় দুনিয়াবী সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ, বিলাসিতা এবং হারাম-হালাল, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যার অনুভূতিশূন্য, তবে বুঝতে হবে তার অন্তরে শয়তান রাজত্ব করছে। পক্ষান্তরে যে মুসলিম আল্লাহর ভয়ে তার প্রতিটি পদক্ষেপে শয়তানকে পরাজিত করে, আল্লাহ ও তার রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদর্শের অনুসরণ করে, সেই শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত আছে সর্বদা। আর যে এই জিহাদকে পরিত্যাগ করবে, সে দুনিয়া ও আখিরাতে লাঞ্ছিত-পদদলিত হবে। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যখন তোমরা ধার-বাকিতে লেনদেন ও বেচাকেনা আরম্ভ করবে ও গরুর লেজ ধরে হাল লাঙ্গল দিয়ে কাজে যাবে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা ত্যাগ করবে, তখন মহান আল্লাহ তোমাদের উপর এমন লাঞ্ছনা চাপিয়ে দিবেন যে, তা তোমাদের উপর থেকে দূরীভূত হবে না; যতক্ষণ না তোমরা স্বীয় দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে’।[2]

আল্লাহ আমাদেরকে তার সন্তুষ্টি অর্জনে আত্মিক, দৈহিক, আর্থিক, ফরয, ওয়াজিব সর্বপ্রকার জিহাদ জানার, বুঝার ও আমল করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!  


* বি’র আলী, হাই উম্মে খালেদ, মদীনা, সঊদী আরব।

[1]. তাফসীর বাগাবী, ৩/৩৫৪।

[2]. সুনানে আবু দাঊদ, হা/৩৪৬২, হাদীছ ছহীহ।