নবী (ছাঃ)-কে নিয়ে কটূক্তি, ভোলার নির্মমতা এবং ব্যক্তিবিশেষের করণীয় ও শিক্ষা

-জুয়েল রানা

খত্বীব, গছাহার বেগপাড়া জামে মসজিদ, সহকারি শিক্ষক, আলহাজ্ব শাহ্ মাহতাব-রওশন ব্রাইট স্কুল

উত্তর পলাশবাড়ী, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।

 

অবতরণিকা :

যুগে যুগে নবী-রাসূলকে গালি দেওয়ার প্রথা প্রচলিত আছে। সাধারণত মুসলিম বিদ্বেষী অমুসলিমরা এ কাজে মনের তৃপ্তি লাভ করে বেশি। কিন্তু ইদানিং কিছু নামধারী মুসলিমও এ কাজে চরম দক্ষতা প্রদর্শন করে যাচ্ছে। মুফতি আব্দুল্লাহ আল-মাসঊদ ওরফে বিশ্বাস ম-লের নাস্তিক হওয়ার ঘটনা এর জ্বলন্ত উদাহরণ। অবশ্য তারা আসলে মুনাফিক্ব। খোদ নবী (ছাঃ)-এর যুগে এদের অস্তিত্ব ছিল। বর্তমানে তো অবশ্যই থাকবে। এরা এদের মাথা ও কলম বিক্রি করে। অর্থের বিনিময়ে, রাজনৈতিক স্বার্থ লাভের বিনিময়ে, সুনাম ও প্রসিদ্ধি লাভের বিনিময়ে দ্বীন ও তার নবীকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে, কটূক্তি করে, কটাক্ষ করে।

নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে নিয়ে কটূক্তি :

আজকে অনেক অবিবেচক দুষ্কৃতি মানুষ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে ‘মহা উম্মাদ’ বলে। আর প্রাচীন যুগের সেই জাহেলরাও একই কথা বলত। আল-কুরআনে তার একাধিক নমুনা রয়েছে। যেমন- ‘তারা (অবিশ্বাসীরা) বলে, ‘ওহে যার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে! (কুরআন প্রাপ্তির দাবিদার হে মুহাম্মাদ!) আসলে তুমি একটা পাগল’ (হিজর, ৬)।

নবী (ছাঃ)-কে এভাবে নানা তীর মেরে আঘাত করা হয়েছে। নানাভাবে কথার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া হয়েছে। তিনি ধৈর্যের সময় ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং শাস্তির সময় শাস্তি দিয়েছেন। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি কত শত কটু কথা শুনেছেন। মহান আল্লাহ তাঁকে মোকাবিলা করতে বলেছেন, কখনও সান্ত¡না দিয়েছেন, কখনও প্রতিশোধ নিতে বলেছেন। যখন যেটা করা বেশি ফলপ্রসূ তখন সেটা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তুমি ভালো দ্বারা মন্দের মোকাবিলা করো। তারা যা বলে, আমি সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত’ (মুমিনূন, ৯৬)। আবার কখনও বলেছেন, ‘যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করো, তাহলে ঠিক ততখানি করবে যতখানি অন্যায় তোমাদের প্রতি করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, তাহলে অবশ্যই ধৈর্যশীলদের জন্য সেটিই উত্তম’ (নাহ্ল, ১২৬)। তাঁর চেহারা রক্তাক্ত করা হয়েছিল। তিনি রক্ত মুছতে মুছতে দু‘আ করে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দাও। কারণ, তাদের জ্ঞান নেই’।[1]  অত্যাচারের নিদারুন আঘাতের শিকার হয়ে তাঁর ছাহাবীগণ তাঁকে আল্লাহ্র নিকট মুশরিকদের উপর বদদু‘আ (অভিশাপ) করতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অভিশাপকারীরূপে প্রেরিত হইনি। আমি তো করুণারূপে প্রেরিত হয়েছি’।[2]

অত্যাচারের নিদারুন আঘাতের শিকার হয়েও নবী করীম (ছাঃ) তায়েফবাসীদেরকে মারতে চাননি, তার বদদু‘আ ছিল এ্যাটম বোমার চাইতেও বেশি শক্তিশালী; কিন্তু তিনি তা প্রয়োগ করেননি। পর্বত নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতা তাঁকে আহ্বান জানিয়ে বলেছিল, ‘হে মুহাম্মাদ! আপনার সম্প্রদায় আপনাকে যা বলেছে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা শুনেছেন। আর আমি পর্বতের ফেরেশতা। আপনার প্রতিপালক আমাকে আপনার নিকট প্রেরণ করেছেন। আপনি ওদের ব্যাপারে আমাকে যা ইচ্ছা তাই নির্দেশ দিন। যদি আপনি চান যে, আমি মক্কার দুই পাহাড়কে একত্রিত করে ওদেরকে  পিষে ধ্বংস করে দিই, তাহলে তাই হবে। কিন্তু নবী করীম (ছাঃ) বললেন, ‘না, বরং আমি এই আশা করি যে, আল্লাহ ঐ জাতির পৃষ্ঠদেশ হতে এমন বংশধর সৃষ্টি করবেন যারা একমাত্র তাঁরই (আল্লাহ্র) ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে না’।[3]

সুধী পাঠক! মহানবী (ছাঃ) হাতের কাছে পেয়েও শত্রুদেরকে হত্যা করেননি। তিনি বৃহত্তর ইসলামী স্বার্থে অনেক সময় ক্ষমা করেছেন। আর যখন ক্ষমা করেননি, তখন তিনি রাষ্ট্রনেতা হয়ে শাস্তি প্রদান করেছেন। এ ছিল তাঁর জীবদ্দশায়। কিন্তু তাঁর ইন্তিকালের পরেও তিনি অনুরূপ মন্তব্য থেকে রেহাই পেলেন না। যেহেতু নবী বিরোধীদের রুহানী সন্তান ক্বিয়ামত পর্যন্ত থাকবে এবং মাঝেমধ্যে নিজেদের গোপন বিষ উদগার করবে।

বর্তমানেও ফেসবুকে কত কাফেরের প্রোফাইলে আল্লাহ, নবী ও দ্বীন-বিরোধী নোংরা মন্তব্য লেখা থাকে। কত রকমের কার্টুন ও ব্যঙ্গ চিত্র অঙ্কন করে বিদ্রুপ করা হয় আল্লাহ, তাঁর দ্বীন ও রাসূলকে। গত ২০০৫ সালের ২৯ সেপেটম্বর ডেনমার্কের এক পত্রিকায় নবীর ব্যঙ্গ চিত্র প্রকাশ করা হয় এবং তা নিয়ে সারা বিশ্বে বিক্ষোভের কত ঝড় বয়ে যায়, কত মানুষ হতাহত হয়। আমেরিকায় তাঁর চরিত্রকে কলঙ্কিত করে ফিল্ম বানানো হয়। যুগে যুগে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিকে নিয়ে এভাবে খেলা খেলে ধর্মহীন নাস্তিকরা। ১৯৭৩ সালে দাঊদ হায়দার নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে উদ্দেশ্য করে লিখেছিল, ‘মোহাম্মাদ তুখোড় বদমাশ। চোখে মুখে রাজনীতি’। ৮০-এর দশকে যখন নাস্তিক সালমান রুশদী পবিত্র কুরআনকে ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বা ‘শয়তানের পদাবলি’ বলে অভিহিত করে তখনো মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছে। খ্রীস্টপৃথিবী বা পাশ্চাত্য রুশদীকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেয়। ইউরোপ ও আমেরিকার রাষ্ট্র ও সমাজ যদিও ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলে, কার্যত তারা মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে দারুন মজা অনুভব করে। যেমন, তাসলিমা নাসরীন ইসলামের বিধি-বিধানকে গালি দিয়ে পরিচিতি অর্জন করে। আসলে এই ধরনের খায়েশী লোকগুলো হঠাৎ করে বিখ্যাত হতে চায়। তাই তারা এহেন কর্মকা- করে বসে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কেউ যদি ভারত, আমেরিকা, ইউরোপে স্থায়ী নাগরিকত্ব পেতে চায় বা সুবিধা পেতে চায় তাহলে সে যেন ইসলাম তথা আল্লাহ, তাঁর দ্বীন ও তাঁর নবীকে নিয়ে কটূক্তি করে। ব্যাস! এতটুকুই যোগ্যতা হলেই চলবে! আবার, অনেক অবিবেচক সমালোচনা করে বলে, ‘মুহাম্মাদ সন্ত্রাসী! একদিন আসবে যেদিন বিশে^র মানুষ মুহাম্মাদকে থুথু দেবে। যেমন হিটলারকে থুথু দিচ্ছে’। হায়! হায়! শালে আর জালে? কোথায় শেখ সাদী, আর কোথায় ছাগলের লাদি। কোথায় লিয়াকত আলী, আর কোথায় জুতার কালি? মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে হিটলারের সাথে তুলনা! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজে‘ঊন।

দ্বীন বা রাসূল (ছাঃ)-কে নিয়ে কটূক্তির কারণসমূহ :

(১) দ্বীন সমন্ধে  উদাসীন হয়ে, দ্বীনের হালাল-হারাম না জেনে, দ্বীনের শিক্ষা ও শিষ্টাচারিতা থেকে দূরে থেকে মানুষ এমন দুষ্কর্ম করে বসে। যার ফলে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে তিরস্কারস্বরূপ ভ্রষ্টতা তার নসীব হয়। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তারা যখন বাঁকা পথ ধরল, আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বাঁকা করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারীদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না’ (ছফ, ৫)।

(২) দ্বীনহীন পরিবেশ থেকে সে ধারণা নেয় যে, দ্বীনদারী একটা ফালতু কর্ম। আধুনিক বিশ্বে তার প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে গেছে। দ্বীন মানুষকে পশ্চাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দ্বীন মানুষকে উন্নতি ও প্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। দ্বীন মানুষকে ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও ইচ্ছা-সুখে বাধা প্রদান করে। দ্বীন মানুষের মাঝে হানাহানি ও সহিংসতায় উদ্বুদ্ধ করে। ব্যাস। অতএব, দ্বীন সেই মানুষের কাছে ‘চোখের বালি’ হয়ে যায়। অথচ অনেক সময় সে ভুল বুঝে এমন অনেক দ্বীন-বিরোধী কাজকেও ‘দ্বীন’ ধারণা করে দ্বীন-বিদ্বেষী হয়ে উঠে! অতঃপর শুরু করে দ্বীন-বিরোধী মন্তব্য।

(৩) খেয়াল-খুশী, কু-প্রবৃত্তি তথা শয়তানের পদাঙ্কানুসরণ মানুষকে দ্বীন বা রাসূলবিরোধী মন্তব্য করতে উদ্বুদ্ধ করে।

(৪) ‘সব ধর্ম সমান’—এই বিশ্বাসে সে বিশ্বাসী হয় অথবা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, ‘মানবতাবাদ’, বা ‘সাম্যবাদ’ ইত্যাদি ইসলামবিরোধী মতবাদকে আদর্শরূপে সে বরণ করে। আর তখন ইসলাম হয় তার চোখের জ্বালা এবং ইসলামবিরোধী মন্তব্যই হয় তার কথামালা!

(৫) কাফেরদের আয়-উন্নতি দেখে নিজের বার-বরকতের আশায় তাদেরকে ‘প্রভু’ ভেবে বসে। আর তার মানেই ইসলাম হল তার মূল কারণ! ফলে বাক্যবাণ চালাতে শুরু করে তার দিকে, তার নবীর দিকে, তার বিধানের দিকে!

(৬) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) যা হারাম করেছেন, তা সে হালাল মনে করে। স্বার্থবশে সূদ, ঘুষ, ব্যভিচার, মদ্যপান, গান-বাজনা ইত্যাদিকে সে বৈধ ধারণা করে।

(৭) কিছু মুসলিম আছে, যারা বিধান না জেনে অন্য ধর্ম বা তার প্রবর্তককে গালি দেয়। সুতরাং গালির বিনিময়ে তাদের দ্বীনও গালি খায়। এজন্যই মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে আহ্বান করে, তাদেরকে তোমরা গালি দিও না। কেননা, তারা বৈরীভাবে অজ্ঞানবশত আল্লাহকেও গালি দেবে’ (আন‘আম, ১০৮)।

(৮) সকল জাতি ও শ্রেণির মানুষের মাঝে যেমন কট্টরপন্থী বা চরমপন্থী আছে, তেমনি মুসলিম জাতির মধ্যেও এমন লোক অবশ্যই আছে। তারা যখন ভুল বুঝে জিহাদের নামে সন্ত্রাসী কর্মতৎপরতায় মত্ত হয়, তখন ইসলাম গালি খায়। মুসলিমরা এমন কাজ করে যা ইসলামে নেই। কিন্তু তার ফলে গালি খায় ইসলাম। মুহাম্মদী সঠিক পথ-নির্দেশনা না মেনে যেখানে-সেখানে বোমা ফাটিয়ে নিরপরাধ মানুষ খুন করে কিছু উগ্র মুসলিম। আর তার ফলে মুহাম্মাদ (ছাঃ) -এর মাথাকে বোমা বানিয়ে ব্যঙ্গ চিত্র অঙ্কন করা হয়। বোরকা পরে সমাজবিরোধী কাজ করে কিছু মুসলিম পুরুষ বা মহিলা। আর তার ফলে ব্যঙ্গ করা হয় প্রত্যেক পর্দানশীন মহিলা ও বোরকাকে!

(৯) এক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা কাফেরদের নিকট সম্মান, সমৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠা চায়। তখন তারা তাদেরকে সন্তুষ্ট ও খোশ করার জন্য তাদের মনের অনুকূলে লেখালেখি করে। নিজের ঘরকে গালি দিয়ে পরকে খোশ করার আচরণে সাফল্য লাভ করে। এরা আসলে ঘরের শত্রু বিভীষণ। এদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা বিশ্বাসীদের পরিবর্তে অবিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারা কি তাদের নিকট সম্মান অনুসন্ধান করে? অথচ সমস্ত সম্মান তো আল্লাহরই’ (নিসা, ১৩৯)।

(১০) নেহাতই শত্রুতা ও বিদ্বেষবশত সে সাদা কাপড়ে কাদা ছিটায়। নির্দোষ নিষ্পাপ ব্যক্তিত্বে কলঙ্কের কালিমা লেপন করে। [4]

ভোলার নির্মমতা :

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ভোলা সরকারি কলেজের ছাত্র শুভ তার ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী (ছাঃ)  সম্পর্কে কটূক্তি করেছিল। এক পর্যায়ে সেটি ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রতিবাদে জনগণ ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। শুভ অবশ্য দাবি করে যে, তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অন্য কেউ এটা করেছে। অনুমান করা হয়, ঘটনার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে সে তা অস্বীকার করার কৌশল নিয়েছে। এলাকায় তার শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হলেও পুলিশ দুই জন ইমামসহ নেতৃস্থানীয়দের আটক করে। এটা জেনে জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পুলিশের ভাষ্যে বলা হয়, তারা কাউকে গ্রেফতার করেনি। সংবাদপত্রে বলা হয়, এক পর্যায়ে জনতার একটি দল ইমামের সাথে থাকা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পুলিশ দৌঁড়ে মসজিদের দোতলায় একটি কক্ষে আশ্রয় নেয়। বিক্ষোভকারীরা  সেখানে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকলে একপর্যায়ে পুলিশ গুলি ছোড়ে। এ সময় আহত হন বোরহান উদ্দীন আলিয়া মাদরাসার আরবী প্রভাষক, বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের খত্বীব হাবীবুর রহমান জাজেরি। এতে জনতা তখন আরো ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশও গুলি ছোড়ে। পুলিশের গুলিতে চার জন নিহত হয়। অনেকেই আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুলিশ ও প্রশাসন যদি আরো ধৈর্য ধারণ করে পরিস্থিতির মোকাবেলা করত, তাহলে এই মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেত। সংবাদভাষ্যে দেখা যায়, পুলিশ প্রথমেই গুলি ছুড়েছে। প্রথাগতভাবে সতর্কীকরণ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ না করেই বেধড়ক গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ। এটি আইন ও উচ্চ আদালতের নিদের্শের খেলাফ। [5]

ব্যক্তিবিশেষের করণীয় :

কোন ব্যক্তি যখন জানতে পারবে যে, আল্লাহ, তাঁর রাসূল (ছাঃ) বা দ্বীনকে গালি দিচ্ছে, তখন তার উচিত পর্যায়ক্রমে তার প্রতিবাদ করা। কেননা, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়। যদি তাতে ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ জিভ দ্বারা (উপদেশ দিয়ে) পরিবর্তন করে। যদি তাতেও সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। আর এটাই হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান’। [6]

ইসলামী শাসন থাকলে সে শাসন-কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ করবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেবে না। ইসলামী  শাসন না থাকলে যথাসম্ভব তাকে উপদেশ দিতে থাকবে। প্রিয় নবীকে গালি দিলে রাগে অন্তর ফেটে পড়বে ঠিকই, তবুও ধৈর্য ধারণ করবে এবং আবেগবশে এমন কিছু করে বসবে না, যা তার জন্য বৈধ নয়। যেহেতু দ-বিধি প্রয়োগ করা কোন ব্যক্তিবিশেষের জন্য বৈধ নয়। মাক্কী জীবনে বসবাস করলে মাক্কী জীবনের মতো ধৈর্য ধারণ করে বসবাস করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদের এবং অংশীবাদী (মুশরিক)-দের কাছ থেকে অবশ্যই তোমরা অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনতে পাবে। সুতরাং যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং সংযমী হও তাহলে তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ’ (আল-ইমরান, ১৮৬)। এই উপদেশ শুনে অনেক আবেগী যুবক হয়তো আমাকে নাস্তিকদের দালাল, ইয়াহূদী-খ্রীস্টানদের দোসর বলবে। তারা অবশ্য যা বলবে মনের আবেগ বশে বলবে। কিন্তু যে আবেগের শারঈ লাগাম নেই, সে আবেগ নিয়ে বেগ পেতে হয় পথে পথে, পদে পদে। তারাই যেন ইসলামী শাসনের ঠিকাদারী পেয়ে বসে আছে। অথচ তারা যদি আবেগ থেকে সরে এসে সুস্থ বিবেক নিয়ে ভেবে দেখে, তাহলে এ কথা সহজে বুঝতে পারবে যে, মানুষ খুন করাই উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো মানুষ হেদায়াত করা। আর তাও আবার আল্লাহর হাতে আছে।

আমরা বলি, মানুষ তৈরি করুন। তাওহীদপন্থী মানুষ প্রস্তুত করুন। কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে জাতি ও দেশ গড়ুন এবং সেই মানুষদের দাবিতেই ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে তুলুন। তারপর ইসলামী দ-বিধি প্রয়োগ করুন। দেশ থেকে শিরকী প্রতীক ও পরিবেশ দূর করুন মানুষ তৈরির মাঝে। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আগে তাওহীদ প্রতিষ্ঠায় বেশি বেশি মন দিন। নচেৎ শিরকের আখড়ার উপর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা বা ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আশা দুরাশা হবে এবং ক্ষমতায় আসার পর বল প্রয়োগ করে শিরকের আখড়া ভাঙ্গার সংকল্প থাকলে তার আগে গদির পায়াই ভেঙ্গে সব কিছু উল্টে যাবে।  ইমারত গড়ার আগে ইট ভালোভাবে প্রস্তুত করুন। ঐক্যের সিমেন্ট সংগ্রহ করুন। নচেৎ বুঝতেই পারছেন, বিচ্ছিন্নতার সিমেন্ট দিয়ে কাঁচা ইটের ইমারত গেঁথে তুললে অচিরেই তা ভেঙ্গে পড়বে। ইসলামী জিহাদের শর্তাবলী পূরণ ও পালন করে তার পথ ধরুন। নচেৎ জিহাদের নামে এককভাবে এমন কোনো কাজ করবেন না, যাতে ইসলাম ও মুসলিমরা ঘৃণ্যরূপে পরিচয় পায়। গায়ে বল থাকলেই কেউ জয়ী হয় না, বল প্রয়োগ করার হিকমত জানতে হয়। নচেৎ বলের অপপ্রয়োগ ঘটালে বিজয়ের বল গোলপোস্টে পৌঁছে না।

ইসলামে যে সকল অপরাধের ক্বিছাছ ও হুদূদ (দ-বিধি) আছে, তা প্রয়োগ করবে একমাত্র ক্ষমতাসীন সরকার বা শাসক। খুনের বদলে খুন, বিবাহিত ব্যভিচারীকে হত্যা, মুরতাদকে হত্যা, চোরের হাত কাটা ইত্যাদি শাস্তি কোনো পাবলিক দিতে পারে না। যেহেতু সকলেই নিজের ইচ্ছানুযায়ী বিচার করে দ- দিতে থাকলে পরিবেশে বিশাল বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেবে। সবল দুর্বলকে ধ্বংস ও বিনাশ করে ছাড়বে। তবুও বহু আবেগময় মানুষ আছে, যারা সাধারণ নাগরিক হয়ে খলীফা ওমর সাজতে চায়। খলীফা না হয়ে খলীফার শাস্তি প্রয়োগ করতে চায় স্বাধীন মানুষদের উপরে। খবরদার! আবেগ ও রাগবশে মহান আল্লাহ্র দ-বিধি নিজেই প্রয়োগ করে বসবেন না। নচেৎ হিতে বিপরীত হতে পারে। সুতরাং ধৈর্য সহকারে অন্যান্য বৈধ পন্থা অবলম্বন করুন। মহানবী (ছাঃ) -এর জীবনের কয়েকটি ধাপ রয়েছে। যার প্রধান হলো দুটি: মাক্কী জীবন ও মাদানী জীবন। নবী করীম (ছাঃ) -কে মাক্কী জীবনে ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছিল। যেহেতু সেটা ছিল প্রতিষ্ঠার জীবন। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র ক্বায়েম হওয়ার পর প্রতিশোধ ও শাস্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং সমস্যা যে জীবনের হবে, সমাধানও সেই জীবনের নিতে হবে। মাক্কী জীবনে বসবাস করে মাদানী জীবনের সমাধান নিতে গেলে ভুল হবে। এর বিপরীতেও তাই। তাছাড়া প্রত্যেক পার্টিই ক্ষমতায় না থাকলে প্রতিষ্ঠা লাভের সময় উদারতা দেখায়, নমনীয়তা স্বীকার করে ও ধৈর্য ধারণ করে। অতঃপর ক্ষমতায় এলে নিজেদের বিধান প্রয়োগ করে এবং বিরোধীদেরকে শায়েস্তা করে। এটাই দুনিয়ার নীতি।

অতএব, ইসলামী শাসন ব্যবস্থা না থাকলে মাক্কী জীবনের মতো ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কিন্তু যে দেশে ইসলামী সংবিধান ও শাসন আছে, সে দেশে ঐ জঘন্য অপরাধের শাস্তি আছে। তাইতো অপরাধীরা ইসলামী সংবিধান ও শাসনকে ভয় করে এবং মুসলিম দেশেও ধর্ম নিরপেক্ষ (ধর্মহীন) শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালায়।

সম্প্রতি ভোলার ঘটনা আসলে ভোলার মতো নয়। কেননা এই ভোলাতেই সম্প্রতি একদল আবেগী মানুষ কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর মসজিদ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল! মুসলিম হয়ে আল্লাহর ঘর মসজিদ পুড়িয়ে দিতে পারে- ভাবতেই গা শিউরে উঠে। মুসলিম হয়ে যখন মসজিদ ভেঙ্গে দেবে বা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবে তখন অমুসলিমরা কী বসে থাকবে? এর উত্তর সবারই জানা আছে- বিধায় প্রসঙ্গটির এখানেই ইতি টানছি।

ভোলার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ :

ইসলাম এখনো জীবন্ত ধর্ম এবং এর অনুসারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ধার্মিক। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানলে তার পরিণতি যে, কী হতে পারে ভোলার ঘটনা এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। মানুষ ধার্মিক না হতে পারে, কিন্তু নিজের ধর্ম সম্পর্কে গভীর আবেগ পোষণ করেন, তিনি যে ধর্মেরই মানুষ হোন না কেন। একজন মুসলিম ধর্মের অনুশাসন মেনে চলতে নাও পারেন, কিন্তু তিনি ধর্মের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত।

ভোলার ঘটনার কারণ যাই হোক না কেন আধিপত্যবাদী শক্তি এ ধরনের ঘটনাকে হাতিয়ার করে বাংলাদেশকেও কাশ্মীরের পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে অনেকে শঙ্কিত। বাংলাদেশে অমুসলিম, বিশেষত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর যেকোনো প্রকার হামলা মূলত উপমহাদেশে নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ববাদকে শক্তিশালী করে এবং বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) তৎপরতা ও অন্তর্ঘাতমূলক কাজের পথকে সুগম করে। যারা অতি উৎসাহী হয়ে হিন্দুরের বাড়ী-ঘরে হামলা চালিয়েছে, মন্দির ভাঙচুর করেছে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে তারা স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের হয়ে কাজ করেছে। তারা বাংলাদেশে দিল্লির উদ্দেশ্য সাধন করতে চায়। তারা চায় বাংলাদেশে একটা দাঙ্গা হোক। আর হিন্দুদের রক্ষা করার জন্য কাশ্মীরের মতো বাংলাদেশেও ভারতীয় সেনাবাহিনী মোতায়েন হোক। এটা আগুন নিয়ে খেলার শামিল। এতে তারা নিজেরাও পুড়বে, সাথে বাংলাদেশকেও পোড়াবে।[7]

সমাপ্তি ঘোষণা : 

হে আল্লাহ্! তুমি তোমার দ্বীনকে বিজয়ী করো। তোমার দুশমনদেরকে পরাস্ত করো। তোমাকে তোমার রাসূল ও দ্বীনকে যারা গালি দেয়, তাদেরকে শায়েস্তা করার মতো শক্তি যদি আমাদের না থাকে, তাহলে তুমি তো সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান, তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করো না। তাদেরকে শাস্তি দিয়ে আমাদের মনে শান্তি দাও, আমাদের চোখে শীতলতা আনো, আমাদের হৃদয়ের আগুন নির্বাপিত কর।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৭৪৭।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭৭৮।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২৩১।

[4]. আব্দুল হামীদ ফাইযী আল-মাদানী, নবী নিয়ে ব্যঙ্গ, কুফরির অঙ্গ, পৃঃ ১৫-২৩।

[5]. ড. আবদুল লতিফ মাসুম, ধর্মীয় অনুভূতি ও ভোলার নির্মমতা, উপসম্পাদকীয়, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৪ অক্টোবর, ২০১৯।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৮।

[7].www.dailynayadiganta.com/incident-accident/450714.