নারীদের ছিয়ামের বিধান
-অধ্যাপক ওবায়দুল বারী বিন সিরাজউদ্দীন*


ছিয়াম সাধনার মাস রামাযান। শব্দটি আরবীرمض –‘রময’ ধাতু থেকে উৎপত্তি হয়েছে। যার অর্থ- দহন করা, ঝলসে দেওয়া, জ্বালিয়ে দেওয়া। রামাযানে দীর্ঘ এক মাস ছিয়াম পালনের মাধ্যমে ছিয়াম সাধকের সকল পাপ-পঙ্কিলতা, গুনাহ-খাতা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আত্মার কালিমা মুছে যায়। মুমিনের হৃদয়ে ঔজ্জ্বল্য আসে। তাই ছিয়াম সাধনার এ মাসটির নাম রামাযান বলা হয়েছে।

আরবী صوم ‘ছওম’ শব্দ থেকে ছিয়াম শব্দের উৎপত্তি যার অর্থ- বিরত থাকা। শারঈ পরিভাষায়, ছুবহে ছাদিক্ব থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়্যত সহকারে কোনো ধরনের পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকাকে ছিয়াম বলা হয়।

মহান আল্লাহ ছিয়াম বান্দার ফরয করেছেন, পবিত্র কুরআনে তিনি বলেন,

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ﴾

‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি ছিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। অবশ্যই এর মাধ্যমে তোমরা তাক্বওয়া তথা আল্লাহভীতি অবলম্বন করতে পারবে’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৩)

নারীর উপর ছিয়াম কখন ফরয হয় :

একজন কিশোরীর মাঝে সাবালিকা হওয়ার কোনো নিদর্শন স্পষ্ট হলে সে প্রাপ্তবয়স্কা হিসাবে গণ্য হয় এবং তখন থেকে তার উপর আল্লাহ প্রদত্ত ফরয বিধানগুলো কার্যকর হয়। সুতরাং কিশোরী প্রাপ্তবয়স্কা হলে তার উপর ছিয়াম ফরয হয়ে যায়। নারীদের সাবালিকা হওয়ার অন্যতম নিদর্শন হায়েয তথা ঋতু আরম্ভ হওয়া। একজন কিশোরীর ঋতু কখনো নয় বছরেই আরম্ভ হয়ে যায়। কিন্তু সে নিজেকে অপ্রাপ্তবয়স্কা ছোট ধারণা করে ছিয়াম পালন করা থেকে বিরত থাকে। আর তার পরিবারও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। যার ফলে সে থাকে উদাসীন। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরয বিধান সম্পর্কে উদাসীনতা প্রদর্শন করা নিতান্ত অন্যায়। কারো ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে গেলে ঋতু আরম্ভের পর থেকে যে ছিয়ামগুলো ছুটে গিয়ে ছিল তা পরবর্তীতে ক্বাযা করতে হবে।

নারীদের ছিয়ামের মাসআলা :

(১) হায়েয ও নিফাসের সময় নারীদের ছিয়াম থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে, পরবর্তীতে তা ক্বাযা করা ওয়াজিব। এ মর্মে আয়েশা g থেকে ইমাম বুখারী ও  মুসলিম p

বর্ণনা করেন, كُنَّا نُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّوْمِ وَلاَ نُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّلاَةِ ‘আমাদেরকে ছিয়াম ক্বাযা করার নির্দেশ দেওয়া হতো; কিন্তু ছালাত ক্বাযা করার নির্দেশ দেওয়া হতো না’।[1]

(২) গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীর জন্য শারঈ কোনো কারণ ছাড়া ছিয়াম পরিত্যাগ করা জায়েয নয়। যেমন- ছিয়াম রাখার কারণে শিশুর দুধের ঘাটতি, গর্ভধারিণী কিংবা গর্ভজাত সন্তানের ক্ষতি। শারঈ কারণে তারা ছিয়াম পরিত্যাগ করে থাকলে পরবর্তীতে ক্বাযা আদায় করবে।[2] তারা চাইলে ফিদইয়াও প্রদান করতে পারে।[3] আর যদি কেউ রামাযান মাসে সফরের কারণে অথবা অস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ছিয়াম রাখতে অক্ষম হয় তাহলে সে পানাহার করবে এবং ছুটে যাওয়া ছিয়াম সুস্থতার পরে ক্বাযা আদায় করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ﴾

কাজেই তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে ছিয়াম পালন করে আর যে পীড়িত কিংবা সফরে আছে, সে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৫)। আর যদি এমন কোনো স্থায়ী রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ছিয়াম রাখতে পারছে না যা থেকে সুস্থ হয়ে উঠার সম্ভবনা নেই, তাহলে সে ব্যক্তি ফিদইয়া হিসেবে প্রতি ছিয়ামের জন্য একজন মিসকীনকে আধা ছা‘ (সোয়া কেজি) খাদ্যদ্রব্য প্রদান করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ﴾ ‘আর যাদের জন্য তা কষ্টকর হবে, তাদের কর্তব্য ফিদইয়া তথা একজন দরিদ্রকে খাবার প্রদান করা’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৫)। গর্ভধারিণী এবং দুগ্ধদানকারী নারী অসুস্থ ব্যক্তির ন্যায়। সুতরাং গর্ভজাত, দুগ্ধপোষ্য সন্তানের স্বাস্থ্যহানি বা দুগ্ধদানকারী নারীর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে পরবর্তীতে ছুটে যাওয়া ছিয়ামের ক্বাযা আদায় করবে। অথবা সে ফিদইয়া হিসেবে মিসকীনকে আধা ছা‘ খাদ্য প্রদান করবে। যদিও এই দুই শ্রেণির নারীর ফিদইয়া দেওয়ার বিষয়টি মতানৈক্যপূর্ণ।

সন্তানের কিংবা নিজের স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কায় ছিয়াম পরিত্যাগকারিণী নারীর ছিয়াম ছেড়ে দেওয়ার হুকুম সম্পর্কে শায়খ উছায়মীন p বলেন, গর্ভবতী নারীর দুটি অবস্থার কোনো একটি হতে পারে :

(১) হয়ত সে শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও কর্মোদ্যমী। যার কারণে ছিয়াম রাখতে কষ্ট হয় না এবং গর্ভস্থিত সন্তানের উপর কোনো প্রভাব পড়ে না- এ নারীর উপর ছিয়াম রাখা ফরয। যেহেতু ছিয়াম ছেড়ে দেওয়ার জন্য তার কোনো শারঈ কারণ নেই।

(২) গর্ভধারণের কাঠিন্যের কারণে অথবা তার শারীরিক দুর্বলতার কারণে অথবা অন্য যে কোনো কারণে। এ অবস্থায় এ নারী ছিয়াম রাখবে না। বিশেষত, যদি তার গর্ভস্থিত সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা করে সেক্ষেত্রে ছিয়াম ছেড়ে দেওয়া তার উপর ফরয। যদি সে ছিয়াম ছেড়ে দেয় তাহলে অন্য ওযরগ্রস্ত ব্যক্তিদের যে হুকুম তার ক্ষেত্রেও একই হুকুম হবে তথা পরবর্তীতে এ ছিয়ামগুলো ক্বাযা পালন করা তার উপর ফরয। অর্থাৎ সন্তান প্রসব ও নিফাস থেকে পবিত্র হওয়ার পর এ ছিয়ামগুলো ক্বাযা পালন করা তার উপর ফরয। তবে কখনো হতে পারে গর্ভধারণের ওযর থেকে সে মুক্ত হয়েছে ঠিক; কিন্তু নতুন একটি ওযরগ্রস্ত হয়ে পড়েছে অর্থাৎ দুগ্ধপান করানোর ওযর। দুগ্ধদানকারী নারী পানাহার করার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়তে পারে। বিশেষত, গ্রীষ্মের দীর্ঘতর ও উত্তপ্ত দিনগুলোতে। এ দিনগুলোতে এমন নারী তার সন্তানকে বুকের দুধ পান করানোর জন্য ছিয়াম ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এমতাবস্থায় আমরা সে নারীকে বলব, আপনি ছিয়াম ছেড়ে দিন। এ ওযর দূর হওয়ার পর আপনি এ ছিয়ামগুলো ক্বাযা আদায়া করবেন।[4]

ছিয়ামের মাসআলায় নারীদের জন্য কয়েকটি জ্ঞাতব্য :

(১) যে নারীর হায়েয শেষ হওয়ার পরও কোনো কারণে রক্ত নির্গত হয়, তাকে মুস্তাহাযা নারী বলে। তার উপর ছিয়াম রাখা জরুরী। ইস্তেহাযার কারণে ছিয়াম পরিত্যাগ করা তার পক্ষে বৈধ নয়। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যা p ঋতুমতী নারীর পানাহার করার আলোচনা শেষে বলেন, ইস্তেহাযা এর বিপরীত। কারণ ইস্তেহাযা দীর্ঘ সময় ধরে থাকে; তার এমন কোনো সময় নেই যেখানে তাকে ছিয়ামের নির্দেশ দেওয়া হবে। আবার ইস্তেহাযা থেকে তার বাঁচারও উপায় নেই। ইস্তেহাযার রক্ত হচ্ছে সামান্য বমি, আঘাতের কারণে বা পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্ত বের হওয়া কিংবা স্বপ্নদোষ ইত্যাদির মতো, যার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই; যার থেকে বেঁচে থাকা অসম্ভব। অতএব, এটা হায়েযের রক্তের মতো ছিয়ামের পথে বাঁধা নয়।[5]

(২) ঋতমতী, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারী যদি শারঈ কারণে ছিয়াম ছেড়ে দিয়ে থাকে এবং ক্বাযা করার নিয়্যতে ফিদইয়া না দিয়ে থাকে, তাহলে রামাযান পরে ওযর চলে গেলে তা যত দ্রুত সম্ভব ক্বাযা করে দিবে। পরবর্তী রামাযান পর্যন্ত তার ক্বাযা আদায় হয়নি এমনটি যেন না হয়।

(৩) স্বামী বাড়িতে থাকাবস্থায় স্বামীর অনুমতি ব্যতীত নারীর নফল ছিয়াম রাখা জায়েয নয়। আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণনা করেন, নবী a বলেছেন, لاَ يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلاَّ بِإِذْنِهِ ‘কোনো নারীর পক্ষে জায়েয নয় যে, সে তার স্বামীর উপস্থিতিতে ছিয়াম রাখবে তার অনুমতি ব্যতীত’।[6]

অবশ্য যদি স্বামী নফল ছিয়াম রাখার সাধারণ অনুমতি দিয়ে রাখে অথবা স্বামী উপস্থিত না থাকে অথবা তার স্বামীই না থাকে, তাহলে তার পক্ষে নফল ছিয়াম রাখা ভালো। বিশেষভাবে যে দিনগুলোকে ছিয়াম রাখা মুস্তাহাব, যেমন— সোমবার, বৃহস্পতিবার ও প্রত্যেক মাসে তিনটি ছিয়াম, শাওয়াল মাসের ছয় ছিয়াম, জিলহজ্জ মাসের ১০ দিনের ছিয়াম, আরাফার ছিয়াম এবং আগে কিংবা পরে একদিন মিলিয়ে আশূরার দিন ছিয়াম রাখা।

(৪) ঋতুমতী নারী যদি রামাযান মাসে দিনের মধ্যবর্তী সময় পাক হয়, তাহলে বিশুদ্ধ মতানুসারে সে অবশিষ্ট দিন বিরত থাকবে এবং পরবর্তীতে ক্বাযা করবে। সময়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে অবশিষ্ট দিন তার বিরত থাকা উচিত।[7]

রামাযান মাসের জরুরী কর্তব্য :

(১) বেশি বেশি কালেমা পাঠ করা।

(২) বেশি বেশি ইস্তিগফার করা।

(৩) বেশি বেশি আল্লাহর কাছে জান্নাত কামনা করা।

(৪) জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া।

(৫) বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা।

(৬) আল্লাহর যিকির করা ও তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করা।

(৭) রাসূল a-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা।

(৮) বাড়িতে কুরআন তেলাওতের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের তা‘লীম দেওয়া, ইসলামী পুস্তকাদি পাঠ করা।

(৯) ফরয ছালাতের পাশাপাশি ছালাতুত তারাবীহ/তাহাজ্জুদ আদায় করা।

(১০) সব ধরনের অনর্থক ও অন্যায়-অশ্লীল কাজকর্ম থেকে বিরত থাকা। বিশেষ করে গীবত-পরনিন্দা না করা এবং টেলিভিশনে কিংবা অনলাইনে সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা।

(১১) সর্বোপরি সকল অন্যায়-অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা এবং নেক আমলগুলোকে গুরুত্ব প্রদান করা।

আল্লাহ তাআলা সকল মুসলিম নর-নারীকে ছিয়ামের বিশুদ্ধ বিধানাবলি জেনে ছিয়াম সাধনার পূর্ণ ফযীলত অর্জন করা এবং উক্ত আমলগুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে রামাযান মাসের বিশেষ রহমত লাভে ধন্য হয়ে তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৩১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৫; তিরমিযী, হা/১৩০; নাসাঈ, হা/২৩১৮; আবূ দাঊদ, হা/২৬২।

[2]. আল-বাক্বারা, ২/১৮৫; ফিকহুস সুন্নাহ, পৃ. ৫৯০।

[3]. আবূ দাঊদ, হা/২৩১৮।

[4]. শায়খ উছায়মীন, ফাতাওয়া আছ-ছিয়াম, পৃ. ১৬২।

[5]. মাজমূঊল ফাতাওয়া, ২৫/২৫১।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৮৯৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১০২৬; আহমাদ, ২/৩১৬, আহমাদ ও আবূ দাঊদের কতক বর্ণনায় আছে, তবে রামাযান ব্যতীত।

[7]. মাজমূউল ফৎওয়া ইবনু বায, ১৫/১৯৩।