নারীমুক্তির অগ্রদূত : বিশ্বনবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
-মুহাম্মাদ দিদার বিন আজাহার*



সর্বশক্তিমান আল্লাহ ধরিত্রীর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে যুগলবন্দী করিয়া পাঠাইয়াছেন। অপরূপ মেলবন্ধনে সাজাইয়াছেন এই বসুধা। যুগ থেকে যুগান্তর তথা কিয়ামত পর্যন্ত ক্রন্দসীকে সবুজ-শ্যামল প্রাণবন্ত রাখিবার কি কৌশলই না গ্রহণ করিয়াছেন! বৈপরীত্যের আকর্ষণ দিয়া ধরণীতে বসবাসের উপয়ান্তর দেখাইয়াছেন। তাঁহারই প্রয়াসে সৃষ্টি করিয়াছেন নর-নারী। স্রষ্টা যেন এই সংসারকে টিকাইয়া রাখিবার নিমিত্তেই নারীকে এক অপরিহার্য নিয়ামক হিসেবে ধরাধামে রাখিয়াছেন; সমুন্নত রাখিয়াছেন তাহার অধিকার। প্রতিপালক  বলিয়াছেন,

﴾يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً﴿

‘ওহে মানবকুল! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করিয়াছেন এক নফস হইতে। আর তাহা হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন তাহার ভার্যাকে এবং তাহাদের হইতে ছড়াইয়া দিয়াছেন অসংখ্য মানব-মানবী’ (আন-নিসা, ৪/১)। মহান প্রভু আরও ঘোষণা করিলেন,

﴾يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا﴿

‘হে মানবজাতি! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী হইতে সৃজিয়াছি এবং বিভক্ত করিয়াছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাহাতে তোমরা পরস্পর পরস্পরকে পরিচয়দান করিতে পারো’ (আল-হুজুরাত, ৪৯/১৩)। রব্বে কারীম মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে নিসা নামে সূরাও অবতীর্ণ করিয়াছেন। তিনি কি শুধু এতেই ক্ষান্ত হইয়াছেন! ৫৭ বার ‘নিসা’ এবং ২৬ বার ‘ইমরাআ’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করিয়া নারীর গুরুত্বই যেন অপরিহার্য করিয়া তুলিয়াছেন। মহাকবিগণ কি তাহার ব্যত্যয় ঘটাইবার সাহস করিয়াছেন? 

‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।

এই অমোঘ বাণীকে অস্বীকার করিবার দুঃসাহস কি কেউ দেখাইয়াছে? এই মহাসত্যকে অস্বীকার করা মানে মানবজাতিকে অস্বীকার করা; স্রষ্টার বিধানকে অস্বীকার করা। আর যাহারা নারীর এই সমুন্নত অভিখ্যা স্বহস্তে কুক্ষিগত করিতে চায় এবং  তাহার ভূয়সী মর্যাদাকে করে ভূলুণ্ঠিত, তাহাদের কি মানব বলিবার অবকাশ থাকে? তাহাদের বর্বর, নরাধম, বর্ণচোরা, বিড়ালতপস্বী কি বলিয়া সম্বোধন করিলে তাহাদের হক্বের যথার্থতা আদায় হইবে তাহা খুঁজিয়া পাওয়াই ভার! যেথায় জীবন্ত মেয়েশিশুকে হত্যার নিমিত্তে জন্মেছিল কতশত  দানব; যেইখানে পণ্ডিতমূর্খ কংস মামারা মেয়ে জন্মের সংবাদকে দুঃসংবাদ মনে করিয়া অসহনীয় মনস্তাপে চেহারা মলিন করিতো এবং জ্ঞানপাপীরা গান্তকামী হইয়া জুগুপ্সার নিমিত্তে নিজ সম্প্রদায় হইতে লুকাইয়া বেড়াইতো। তেমনি এক ক্ষণকালে যদি কেহ সেই পণ্যতুল্য রমণীদের মৃতকল্প মর্যাদাকে পুনজন্ম দিয়া পুরুষের পৌরুষ থেকে দেয় তিনগুণ মর্তবা তাহা হইলে কেমন হইবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ?

হ্যাঁ, যিনি মাহিন্দ্রক্ষণে আলোকবর্তিকা হইয়া আবির্ভূত হইলেন তিনিই বসুমতীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, নবীগণের সর্দার, সারা জাহানের রহমত, মহানবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তমিস্রাচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থা হইতে ন্যায়ের ঝাণ্ডা লইয়া নারীমুক্তির অগ্রদূত হইয়া যেন চোখের পলকে দারুণ ঝলকে প্লবগতিতে অদৃষ্টপূর্ব সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান হইয়া সত্যের মশাল হস্তে উদিত হইলেন। আগমন করিলেন নারীমুক্তির অগ্রদূত বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। মেয়েশিশুদের বরকত (প্রাচুর্য) ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করিলেন। বলিলেন, ‘কাহারো যদি একজন দুহিতা থাকে এবং সে তাহাকে হত্যা করেনি কোনো প্রকার অবহেলা করেনি এবং আত্মোদ্ভবকে দুহিতার উপর প্রাধান্য দেয়নি; তাহা হইলে আল্লাহ তাহাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাইবেন’।[1] তিনি আরও আজ্ঞপ্তি  প্রদান করিলেন, ‘তোমরা রমণীদের অত্যুৎকৃষ্ট  উপদেশ প্রদান করিবে (উত্তম শিক্ষায় শিক্ষিত করিবে)’।[2] সমতার এক সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করিয়া ঘোষণা করিলেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর অবশ্য কর্তব্য’।[3] এ যেন স্বপ্নলোকের বাস্তবনমুনা, যাহার কল্পনাই ছিলো দুরূহ ব্যাপার; তাহাই যেন বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করিয়া পরিস্ফুটিত হইল আয়েশা ছিদ্দীক্বা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মাধ্যমে। যিনি  ২ হাজার ২১০টি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন, যাহা হাদীছশাস্ত্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। যেইখানে নারীর অস্তিত্বই ছিল সংকটাপন্ন, সেইখানে নারীকে শিক্ষার অধিকার দেওয়া হইলো।

ইবাদত-বন্দেগী ও প্রভুর নৈকট্য লাভেও মানব ও মানবীকে সমান অধিকার দেওয়া হইয়াছে। ভামিনীদের সেই কাজের আদেশ দেওয়া হইয়াছে, যেই কাজের আদেশ মনুষ্যদেরও দেওয়া হইয়াছে। কিয়ামত দিবসে তাহাদের কাহারো সহিত কোনো প্রকার বৈষম্য করা হইবে না। রব্বুল আলামীন ঘোষণা করিলেন,

إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا

‘নিশ্চয়ই মুসলিম নর-নারী, মুমিন নর-নারী, অনুগত নর-নারী, সত্যবাদী নর-নারী, ধৈর্যশীল নর-নারী, বিনয়াবনত নর-নারী, দানশীল নর-নারী, ছিয়ামপালনকারী নর-নারী, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাযতকারী নর-নারী এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নর-নারী, তাহাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রাখিয়াছেন’ (আল-আহযাব, ৩৩/৩৫)

বিধানদাতা সম্পত্তিতেও পুরুষদের পাশাপাশি  নারীদের উত্তরাধিকারিণী বানাইয়াছেন। ঘোষণা করিয়াছেন সেই অমোঘ সত্য বাণী,

﴾لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ نَصِيبًا مَفْرُوضًا ﴿

‘নরদের জন্য জনক-জনিকা ও নিকটাত্মীয়রা যাহা রাখিয়া গিয়াছে, তাহা হইতে একটি অংশ রহিয়াছে। আর নারীদের জন্য রহিয়াছে জনক-জনিকা ও নিকটাত্মীয়রা যাহা রাখিয়া গিয়াছে, উহা কম হোক কিংবা বেশি হোক তাহা হইতে নির্ধারিত হারে একটি অংশ’ (আন-নিসা, ৪/৭)। শুধু কি পিতার সম্পত্তিতে নারীকে অংশীদার সাব্যস্ত করা হইয়াছে? না! পিতৃব্য, জননী, সৃষ্টিকর্তা এমনকি দারকের বৈভবেও জনয়িত্রীর অধিকার সমুন্নত রাখিয়াছেন৷ বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আরও ফরমাইলেন,

﴾لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبْنَ﴿

‘তোমাদের পুরুষেরা যাহা উপার্জন করিবে, তাহা পুরুষদের থাকিবে আর যাহা নারীরা উপার্জন করিবে, তাহা নারীদেরই থাকিবে’ (আন-নিসা, ৪/৩২)

স্পষ্ট নির্দেশ আসিল,

﴾فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ﴿

‘অতঃপর ছালাত শেষ হইলে তোমরা জমিনে ছড়াইয়া পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিযিক) অন্বেষণ  করো’ (আল-জুমআ, ৬২/১০)। যেই যুগে নারীদেরকে মানব জ্ঞানই করা হইতো না, সেইখানে নারীর অর্থনৈতিক অধিকারের ঘোষণা  কি সাধারণ কোনো ঘোষণা হইতে পারে? এ কি বিংশ শতাব্দীর ক্লারা জেটকিনের ঘোষণা? আর যিনি এই ঘোষণা বহন করিয়া আনিয়াছেন, তাঁহাকে নারীমুক্তির অগ্রদূত বলিলেও কি নেহাতই কম বলা হইবে না? হ্যাঁ! তিনিই সেই ক্ষণজন্মা পুরুষ মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), যিনি বহুমাত্রিকতায় নারীকে চিত্রিত করিয়াছেন; সিক্ত করিয়াছেন মাতৃকা হিসেবে, ভগিনী  হিসেবে, নন্দিনী হিসেবে, জায়া হিসেবে; ঘোষণা করিয়াছেন ভিন্ন ভিন্ন মর্যাদা ও অধিকার।     

প্রজনিকা হিসেবে নারীকে দেওয়া হইয়াছে আকাশচুম্বী সম্মান। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, ‘প্রসূতির চরণতল অপত্যের জান্নাত’।[4] জনিকার অধিকার সম্পর্কে করুণাময় আল্লাহ বলিয়াছেন,

وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا – وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

‘আর তোমার পালনকর্তা  আজ্ঞাপন করিয়াছেন যে, তোমরা তাহাকে ছাড়া অন্য কাহারো উপাসনা  করিবে না এবং জনক-জনিকার সহিত সদাচরণ করিবে। তাহাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাহাদের ‘উফ’ বলিও না এবং তাহাদের ধমকও দিও না। আর তাহাদের সহিত সম্মানজনক কথা বলিও। আর তাহাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হইয়া ডানা নত করিয়া দাও এবং বলো, হে আমার রব! তাহাদের প্রতি কৃপা  করুন, যেভাবে শৈশবে তাহারা আমাকে লালন-পালন করিয়াছেন’ (বানী ইসরাঈল, ১৭/২৩-২৪)। একবার জনৈক ছাহাবী মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে  জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! সবচেয়ে বেশি ভালো ব্যবহারের উপযুক্ত কে? তিনি বলিলেন, তোমার মা, লোকটি বলিলেন, তারপর কে? তিনি বলিলেন, তোমার মা, লোকটি আবারো বলিলেন, তারপর কে? তিনি এবারও বলিলেন, তোমার মা। লোকটি চতুর্থবার জিজ্ঞাসিলে মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলিলেন, তোমার বাবা’।[5] অধিকারে ত্রিমাত্রা যোগ করিয়া তিনি আরবের জাহেলিয়াত সমাজ তথা গোটা বিশ্বের মানব সমাজের কাছে এক অনন্য নজির স্থাপন করিলেন।

তনয়াদের  যত্নের ব্যাপারে পিতা-মাতা তথা অভিভাবকদের উৎসাহিত করিয়া বলিয়াছেন, ‘যেই ব্যক্তি দুইজন অথবা তিনজন দারিকা অথবা দুইজন বা তিনজন ভগিনীকে তাহাদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করিবে, অথবা তাহাদের মারা যাওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করিবে, জান্নাতে আমি ও সেই ব্যক্তি  দুইটি অঙ্গুলির মতো মিলিয়া মিশিয়া একসাথে থাকিব। রাসূলুল্লাহ  (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁহার শাহাদাত অঙ্গুলি দ্বারা বৃদ্ধা অঙ্গুলির দিকে ইশারা করিয়া দেখাইয়া দিলেন’।[6]

সংসারে যোষিতার গুরুত্বকেও ফুটাইয়া তুলিয়াছেন অপরিসীম চাহিদার মানসে। দয়িতাদের ব্যাপারে নবীজী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বাগ্রে দেন-মোহর আদায়ের তাগিদ দিয়াছেন এবং দয়িতদের উপর তাহা রবের পক্ষ হইতে  অবশ্য কর্তব্য বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। পত্নীদের যাবতীয় অধিকারকে অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য পতিদের নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। মহান আল্লাহ বলিয়াছেন

﴾هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ﴿

‘তাহারা (কলত্ররা) তোমাদের আবরণস্বরূপ আর তোমরা তাহাদের আবরণ’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৭)। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলিয়াছেন,

﴾وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوف وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ﴿

‘কান্তিমানদের তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার রহিয়াছে, যেমনি রহিয়াছে তাহাদের উপর কান্তদের; কিন্তু কান্তিমানদের উপর কান্তদের মর্যাদা রহিয়াছে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ (আল-বাক্বারা, ২/২২৮)। আল্লাহ আরও বলিয়াছেন,

﴾وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴿

 ‘তোমরা তোমাদের সহধর্মিণীদের সহিত সদাচরণ করিবে’ (আন-নিসা, ৪/১৯)

ধর্মপত্নীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তাহার স্ত্রীর নিকট  উত্তম’।[7] এমনকি হুদায়বিয়ার সন্ধির দিনেও উপায়ান্তর না দেখিয়া খুলাফায়ে রাশেদীনের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও করণীয় ঠিক করিয়াছিলেন তাঁহারই অর্ধাঙ্গী উম্মু সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর নিকট হইতে পরামর্শ গ্রহণ করিয়া। 

বনিতাদের এইসব অধিকার সেই যুগে তাহাদের মনোজগতে এক বিপ্লবের দ্বার উন্মোচিত করিয়াছিল। তাইতো বীতশোক উনপাঁজুরে শর্বরীরা মুশরিকদের কতশত অতলস্পর্শী  কাঠখোট্টা অত্যাচার, অবর্ণনীয় যুলুম আর অনির্বচনীয় নির্যাতন সত্ত্বেও দলে দলে মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। 

যেইখানে পুত্রিকাদের কোনো অধিকার ছিল না, সেইখানে বিধবার অধিকারের কথা চিন্তা করা তো ছিল আকাশে অট্টালিকা  নির্মাণ করিবার মতো দুঃসাহস। আর তাহাদের প্রতি অবিচারের শাস্তির অনুবিধি  তো ছিলো কল্পনাতীত। সেইখানে তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘোষণা করিলেন, ‘যাহারা বিধবা আওরতের ভরণ–পোষণের দায়িত্ব নিবে, তাহারা যেন আল্লাহর পথে জিহাদকারী এবং নিরলস ছালাত ও সদা ছিয়াম পালনকারী’।[8] আর যাহারা সতী-সিদ্ধ বামাদের অপবাদ দেয়, তাহাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিলেন,

﴾وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً﴿

‘আর যাহারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করিবে এবং চারজন সাক্ষী লইয়া  না আসিবে, তাহা হইলে  তাহাদের (অপবাদ আরোপকারীদের) আশিটি বেত্রাঘাত করিতে হইবে’ (আন-নূর, ২৪/৪)। আর তাহাদের ফাসিক্ব বলিয়াও আখ্যায়িত করিলেন। গ্রীক সভ্যতায়, রোমান সভ্যতায়, ভারতীয় সভ্যতায়   এবং চৈনিক সভ্যতায় ও বিভিন্ন ধর্মে লাঞ্ছনা আর যুলুমের শিকার হইয়াছিল যে নারী ও নারিত্ব, ইসলাম তথা মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেইখান হইতে নারীদের মুক্তি দিয়া পৃথক ব্যক্তিসত্ত্বা স্বীকার করিয়া সমাসীন করিয়াছেন মর্যাদার সুউচ্চ শিখরে। বিশ্বনবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যথার্থই বলিয়াছেন, ‘মেদিনীর সবকিছুই সম্পত্তি, ইহাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট সম্পত্তি হইলো

 সাধ্বী অঙ্গনা’।[9]


* শিক্ষার্থী, একাউন্টটিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস (AIS) বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

[1]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৩।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৩১।

[3]. ইবনু মাজাহ, হা/২২৪।

[4]. নাসাঈ, হা/৩১০৪।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৭১।

[6]. মুসনাদে আহমদ, হা/১৪৭।

[7]. তিরমিযী, হা/৩৮৯৫।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০০৭; ছহীহ মুসলিম হা/২৯৮২।

[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৭।