নারী-পুরুষের অধিকার

কাযী ফেরদৌস করীম (মুন্নি)

আল্লাহ তা‘আলা পুরুষকে নিজ স্ত্রী এবং নারীকে নিজ স্বামী নির্বাচনের স্বাধীনতা দিয়েছেন। আর সন্তানকে তার মা-বাবাকে তাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে বলেছেন। তার মানে এই নয় যে, মা-বাবার খুশির জন্য ছেলেকে তার পসন্দের স্ত্রী অথবা মেয়েকে তার পছন্দের স্বামীকে অন্যায়ভাবে বিসর্জন দিতে হবে। এটা সন্তানের উপর পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় যুলুম, যা আল্লাহ তা‘আলা জায়েয করেননি। কিন্তু যদি কোনো স্ত্রী স্বামীকে তার পিতা-মাতার হক্ব দিতে না চায়, এটাও স্বামীর পিতা-মাতার উপর সবচেয়ে বড় যুলুম। তাই কারও জন্য কারও হক্ব নষ্ট করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা স্ত্রীর হক্ব আলাদা বলে দিয়েছেন আর পিতা-মাতার হক্বও আলাদাভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কেউ কারও হক্ব নষ্ট করার অধিকার রাখে না। মা-বাবা অথবা স্ত্রী, যে কোনো এক তরফকে নির্বাচন করার ইখতিয়ার বা ইচ্ছা কাউকে দেওয়া হয়নি। কোনো স্ত্রী বা কোনো মা-বাবা একজন স্বামী বা সন্তানকে একথা বলার অধিকার রাখেন না যে, ‘এদের যে কোনো একজনকে বেছে নাও’। এটা অনেক বড় যুলুমে পরিপূর্ণ একটা কথা, যার কোনো স্বীকৃতি ইসলাম দেয় না। আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার তাওফীক্ব দান করুন।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও ইহসান (সর্বোত্তম উপায় অবলম্বনে)-এর আদেশ দেন’ (নাহল, ৯০)। মহান আল্লাহ মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহারের আদেশ করছেন এবং স্ত্রীর সাথেও উত্তম আচরণের আদেশ করছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা তাদের সাথে উত্তম আচরণ করো’ (নিসা, ১৯)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম, সেই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি’।[1]

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উহ্ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না; তাদের সাথে বলো শিষ্টাচারপূর্ণ কথা। তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে নম্রভাবে মাথা নত করে নাও এবং বলো, হে আমাদের পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছে। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে, তা ভালোই জানেন’ (ইসরা, ২৩-২৫)।

আর স্ত্রীদের ব্যাপারে স্বামীর প্রতি আল্লাহর আদেশ হচ্ছে,  ‘পুরুষ নারীর দ্বায়িত্বশীল। কারণ আল্লাহ তাদের একের উপর অপরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং এ কারণেও যে, পুরুষরা তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করে’ (নিসা, ৩৪)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘নারীর উপর পুরুষের যেমন, তেমন নীতি অনুযায়ী পুরুষের উপরও নারীর অধিকার রয়েছে। তবে নারীদের উপর রয়েছে পুরুষদের একস্তর শ্রেষ্ঠত্ব’ (বাক্বারাহ, ২২৮)।

মুসলিম নারী-পুরুষের অন্যতম দ্বায়িত্ব হলো, আল্লাহর দেওয়া সকল সম্পর্কের সাথে ইনছাফ ক্বায়েম করা। সে হতে পারে একজন মা, একজন বাবা, একজন ছেলে, একজন মেয়ে, অথবা একজন বোন, একজন ভাই, একজন স্বামী, অথবা স্ত্রী। কোনো নারী বা পুরুষকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে সবচেয়ে বড় যুলুম। তাই কোনো স্বামী যেন তার স্ত্রীর প্রতি যুলুম না করে, তেমনি স্ত্রীও যেন স্বামীর প্রতি যুলুম না করে। এরকম প্রতিটা সম্পর্কের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।

হাদীছে কুদসীতে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! আমি নিজের উপর যুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের মাঝেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর অবিচার কারো না’।

বর্তমানে আমাদের সমাজের মানুষের চরিত্রগুলো পারিবারিক বিবাদ, দাম্পত্য কলহ, হিংসা, বিদ্বেষ, বিশ্বাসঘাতকতা,  প্রবঞ্চনা, আত্মসাৎ যুলুমের চক্রে এমনভাবেই আবর্তিত হচ্ছে যে, ইনছাফ যেন সুদূরপ্রসারী কোনো কল্পনা মাত্র। ইসলামের মূল্যবোধ শিক্ষা শিষ্টাচারের সঠিক চর্চা বা অনুশীলন অনুসরণ নেই, বিধায় আল্লাহর দেওয়া পবিত্র সম্পর্কগুলো আজ ধুঁকে ধুঁকে মরছে। সমাজ-পরিবেশ-রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি এর কোনো সমাধান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইসলামী শরী‘আতের বিধানের প্রতি উদাসীনতাই এর মূল কারণ। আর তাই ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনে অর্থবহ সংস্কার আনতে চাইলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের সকল বিধানের অনুশীলনে সচেষ্ট হতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

 

[1]. তিরমিযী, হা/১১৬২।