পদ্মা বহুমুখী সেতু : উন্নতির আরো এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

একটি দেশের উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির অনেকাংশে নির্ভর করে সে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর। সে লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতুর মাধ্যমে দেশের উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও পূর্বাঞ্চলের সরাসরি সড়কপথে সংযোগ হয়। ঠিক তারপরই পদ্মার উপরও সেতু নির্মাণের দাবি ওঠে। যদিও পদ্মার উপর একটি সেতু নির্মাণ ছিল বিশেষ করে দক্ষিণ বঙ্গের মানুষের বহুকালের স্বপ্ন। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক পথে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকায় দাবিটি মোটেও অযৌক্তিক ছিল না। কিন্তু পদ্মার মতো খরস্রোতা ও প্রশস্ত নদীকে বাগে এনে এর বুকে একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল সেতু নির্মাণ মোটেও সহজসাধ্য ছিলো না। তবে নানা জল্পনা-কল্পনার পর ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সালে সেতু নির্মাণের পূর্ব সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। এরপর ২০০১ সালে জাপানিদের সহায়তায় সম্ভাবত্য যাচাই হয়। ২০০৪ সালে জুলাই মাসে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার সুপারিশ মেনে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করে। ঐ বছর জানুয়ারিতেই সেতুর বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান MAUNSELL-AECOM -কে নিযুক্ত করা হয়।

সেতুটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হলেও তাতে আসে নানা বাধাবিপত্তি। বিশ্বব্যাংক থেকে ওঠে দুর্নীতির অভিযোগ, সেতুর অর্থায়ন নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। অবশেষে ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণের সাহসী উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন হয়। ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ইত্যাদির পাশাপাশি চলতে থাকে বহুমুখী কর্মযজ্ঞ। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পদ্মা সেতু। এরপর একে একে ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৪১টি স্প্যান বসিয়ে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সেতুটি পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়। এরপর সেতু প্রকল্পের উভয় প্রান্তে অ্যাপ্রোচ রোড ও সার্ভিস এরিয়ার কাজ, মূল সেতুর ভৌত কাজ, সেতুতে কার্পেটিং, ভায়াডাক্ট কার্পেটিং, ওয়াটারপ্রুফ মেমব্রেন, মূল সেতু ও ভায়াডাক্টের মুভমেন্ট জয়েন্ট, ল্যাম্পপোস্ট, অ্যালুমিনিয়াম রেলিং, গ্যাসের পাইপলাইন, ৪০০ কেভিএ বিদ্যুৎ ও রেললাইন নির্মাণের কাজ প্রায় শতভাগ শেষ। বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতুটি এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি জুনেই যান চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। সেতুটির ধরণ: দ্বিতলবিশিষ্ট, দৈর্ঘ্য: ৬.১৫ কিলোমিটার, পানির স্তর থেকে উচ্চতা: ৬০ ফুট, পাইলিং গভীরতা: ৩৮৩ ফুট, উপাদান: কংক্রিট ও স্টিল, সংশোধিত ব্যয়: ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা, অন্যান্য সুবিধা: গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগসহ পরিবহন ব্যবস্থা।

বহু বিস্ময় ও বিশ্ব রেকর্ডের জন্ম দেওয়া এ সেতুটির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরবে। প্রায় ৪৪,০০০ বর্গ কি.মি. বা বাংলাদেশের মোট এলাকার ২৯% অঞ্চলজুড়ে ৩ কোটিরও অধিক জনগণ প্রত্যক্ষভাবে এর মাধ্যমে উপকৃত হবে আর পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে গোটা দেশের মানুষ। পদ্মাসেতুর দু’পারে শিল্পকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক ও প্রাইভেট শিল্পনগরী গড়ে উঠবে; বাড়বে কর্মসংস্থান। পর্যটনশিল্পের প্রসার ঘটবে। পুরো দেশের অর্থনীতিতে এ সেতুর প্রভাব পড়বে। এডিবি-এর মতে, এই সেতুর ফলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং আঞ্চলিক জিডিপি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে সহজ হবে রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা; সময় বাঁচবে বহুগুণ। কারণ দেশের ঐ অঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব গড়ে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে (এন-৮) ও ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সংযোগ স্থাপিত হবে। স্থানীয় জনগণ উন্নততর স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য খুব সহজেই রাজধানী যেতে পারবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কৃষিতে উন্নত। ফলে এই সেতুর মাধ্যমে তাদের কৃষিপণ্য খুব সহজেই ঢাকায় চলে আসবে। মংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগর চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পদ্মাসেতুর কারণে মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দর পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি পরিবর্তন হওয়ার আশা করা যায়।