পবিত্র কুরআনের অপব্যাখ্যা ও সংশয় নিরসনে সালাফীদের ভূমিকা
-ড.আব্দুল বাসির বিন নওশাদ*


(পর্ব- ৩)

ইবাদত সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। আর তাঁদের নিকটে প্রেরিত মহান স্রষ্টার বাণীই হলো ওহী। সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর আল্লাহ তাআলা জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে ২৩ বৎসরে যে কালামে পাক নাযিল করেছেন, তা-ই আল-কুরআনুল কারীম। সকল জাতি-গোষ্ঠী, জিন-ইনসান, এমনকি সকল সৃষ্টিজীবের জন্য এটি রহমতস্বরূপ বিশ্বজনীন মহাগ্রন্থ।

বলাবাহুল্য যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ছাহাবায়ে কেরাম মৃত্যুর পর প্রকৃত পক্ষে সালাফী আলেমগণই কুরআন-সুন্নাহর সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার তাগিদে হিজরীর প্রথম শতাব্দী থেকে অদ্যাবধি বাতিলপন্থিদের সব ধরনের মিথ্যা অপবাদ, অপব্যাখ্যা এবং সংশয় নিরসনে বহুমুখি ভূমিকা রেখেছেন। তন্মধ্যে শুধু লেখনীর মাধ্যমে কুরআন সংশ্লিষ্ট মিথ্যা অপবাদ, অপব্যাখ্যা ও সংশয় নিরসনে সালাফীদের অনস্বীকার্য অবদানের কয়েকটি নমুনা নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

১. কুরআন সম্পর্কে নাস্তিক্যবাদী সংশয় নিরসনে সালাফীদের ভূমিকা :

কুরআন সম্পর্কে নাস্তিকদের বিভিন্ন সংশয় নিরসনে যে সকল ক্ষণজন্মা আলেমে দ্বীনের কলম ছিল বিরামহীন, শাণিত, দুর্বার, তাদের মধ্যে অন্যতম ইবনু কুতায়বা (রাহিমাহুল্লাহ) (২১৩-২৭৬ হি.), কাযী আবূ বকর বাকিল্লানী (রাহিমাহুল্লাহ) (৩৩৮-৪০৩ হি.), ইবনু তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) (৬৬১-৭২৮ হি.) এবং আল্লামা আব্দুর রহমান নাছের আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) (১৩০৭-১৩৭৬ হি.) প্রমুখ। এ বিষয়ে তাদের কয়েকটি গ্রন্থের পরিচিতি নিম্নরূপ :

তা’বীলু মুশকিলিল কুরআন (تَأْوِيْلُ مُشْكِلِ الْقُرْآنِ) : এটি ইবনু কুতায়বা (রাহিমাহুল্লাহ) প্রণীত। তিনি এ গ্রন্থে কুরআনের অপবাদকারীদের বিপক্ষে উপযুক্ত যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে নাস্তিকদের সংশয় খণ্ডন করেছেন।

আল-ইন্তেছার লিল-কুরআ ন  (اَلْاِنْتِصَارُ لِلْقُرْآنِ): এটি কাযী আবূ বকর বাকিল্লানী (রাহিমাহুল্লাহ) প্রণীত। তিনি এ গ্রন্থের মাধ্যমে

কুরআনে সংযোজন-বিয়োজনের দাবি এবং এর উদ্ধৃতির মাঝে ভারসাম্যহীনতার দাবি খণ্ডন করত সমুচিত জবাব দিয়েছেন।

মাজমূউল ফাতাওয়া(مَجْمُوْعُ الْفَتَاوَى)  : ইবনে তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) প্রণীত। তিনি এ গ্রন্থে ভ্রান্ত ও বিপথগামীদের ষড়যন্ত্র উন্মোচন করেছেন এবং অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা তাদের সংশয় খণ্ডন করতে সক্ষম হয়েছেন।

আল-আদিল্লাতুল কাওয়াতে‘ ওয়াল-বারাহীন ফী ইবতালি উছুলিল মুলহিদীন(اَلْأَدِلَّةُ الْقَوَاطِعُ وَالْبَرَاهِيْنُ فِيْ إِبْطَالِ أُصُوْلِ الْمُلْحِدِيْنَ)  : আল্লামা আব্দুর রহমান নাছের আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) প্রণীত। তিনি এ গ্রন্থে নাস্তিক্যবাদীদের দাবি মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন এবং তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে তাদের চ্যালেঞ্জ করেছেন যে, তারা ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত। তারা যে আল্লাহর রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর মারাত্মক শত্রু, সে বিষয়ে তিনি বলেন,

أَنَّ البَرَاهِيْنَ الدَّالَّةِ عَلَى رِسَالَةِ مُحَمَّدٍ وَرِسَالَةِ سَائِرِ الرُّسُلِ -صَلَوَات اللهِ وَسَلَامُهُ عَلَيْهِمْ- مِنْ أَكْبَرِ الْبَرَاهِيْنَ عَلَى إِبْطَالِ قَوْلِ الْمُلْحِدِيْنَ، وَآيَاتُ الرُّسُلِ عُمُوْماً وَمُحَمَّدٍ خُصُوْصاً لَا تُعَدُّ وَلَا تُحْصَى، مُتَنَوِّعَةٌ مِنْ كُلِّ وَجْهٍ، تُوْجِبُ العِلْم الضُّرُوْرِيّ بِصِدْقِهِمْ وَصِحَّةِ مَا جَاءُوا بِهِ، وَهَؤُلَاءِ المُلْحِدُوْنَ أَكْبَرُ أَعْدَاءِ الرُّسُلِ فِي كُلِّ زَمَانٍ وَمَكَانٍ.

‘নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রিসালাত ও অন্যান্য রাসূল (আলাইহিমুস সালাম)-এর রিসালাতের দলীলগুলোই নাস্তিক্যবাদীদের বক্তব্যের অসারতার বড় প্রমাণ। সাধারণভাবে রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর নিদর্শন এবং বিশেষ করে মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিভিন্নমুখী অগণিত নিদর্শন তাঁদের সত্যতা ও তাঁদের আনীত বিধানের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চিত ধারণা দেয়। আর ঐ নাস্তিকরাই সর্বযুগে এবং সর্বস্থানে রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম)-এর বড় শত্রু’।[1]

২. কুরআন সম্পর্কে কাদিয়ানীদের অপব্যাখ্যা নিরসনে সালাফীদের ভূমিকা :

আল-কুরআনুল কারীম সম্পর্কে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের অপব্যাখ্যাও কম ভয়াবহ নয়। তাদের এ অপব্যাখ্যা ও ভ্রান্ত মতবাদ নিরসনে সালাফী আলেমগণ যথার্থ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম আল্লামা শায়খ আবুল ওয়াফা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী (রাহিমাহুল্লাহ) (১৮৬৮-১৯৪৮ খ্রি.) এবং আল্লামা শায়খ ইহসান ইলাহী যহীর (রাহিমাহুল্লাহ) (১৯৪১-১৯৮৭ খ্রি.) প্রমুখ।

শায়খ আবুল ওয়াফা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ভূমিকা :

তিনি ভারতের জমঈয়তে আহলেহাদীছের আমীর ছিলেন। কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের নোংরা দাবির বিরুদ্ধে তিনি শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। বিশেষভাবে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ইমাম মির্যা গোলাম আহমাদের সাথে তিনি বাহাছ-বিতর্ক করেছেন, তার দলীল খণ্ডন করেছেন। তার শয়তানী উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, তার মতবাদের কুফরী ও বক্রতা তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে তার একটি রচিত গ্রন্থও রয়েছে, যার নাম ‘ফাছলু ক্বযিইয়াতিল কাদিয়ানী’ (فَصْلُ قَضِيَّةِ القَادْيَانِي)। এতো কিছুর পরও গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী যখন সঠিক পথে ফিরে আসেনি, তখন শায়খ আবুল ওয়াফা তার সাথে এই মর্মে মুবাহালা করেছেন যে, তাদের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী, সে যেন সত্যবাদীর জীবদ্দশায় মারা যায়। কিছুদিন যেতে না যেতেই মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী ১৯০৮ সালে ধ্বংস হয়।[2] আর শায়খ আবুল ওয়াফা গোলাম আহমাদের মৃত্যুর পরে আরও ৪০ বছর জীবত ছিলেন। তিনি ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

আল্লামা শায়খ ইহসান ইলাহী যহীর (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ভূমিকা :

তিনি পাকিস্তানের একজন খ্যাতিমান আলেমে দ্বীন এবং জমঈয়তে আহলেহাদীছ পাকিস্তানের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল। বিশ্ববরেণ্য অনন্য প্রতিভার অধিকারী এই ব্যক্তি একাধারে অনলবর্ষী বাগ্মী, সংগঠক, কলমসৈনিক, শিকড় সন্ধানী গবেষক ছিলেন। বিশেষ করে কাদিয়ানী, শীআ, ব্রেলভী, বাহাইয়্যা, বাবিয়া প্রভৃতি ভ্রান্ত ফেরক্বার কুরআন সংশ্লিষ্ট অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে তার অবদান অনস্বীকার্য।

তিনি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ‘আল-কাদিয়ানিয়্যাহ : দিরাসাতুন ওয়া তাহলীল’ (القَادْيَانِيَّة: دِرَاسَاتٌ وَتَحْلِيْلٌ) নামে গবেষণাধর্মী গ্রন্থ লিখে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত মতবাদের মুখোশ উন্মোচিত করেছেন। তিনি এ গ্রন্থে লিখেছেন,

غُلَامُ أَحْمَدَ أَوَّلُ مَنْ أَسَّسَ تَحْرِيْفَ القُرْآنَ بِاسْمِ الإِسْلَامِ، وتَبِعَهُ بَعْدُ مُرِيْدُوْهُ وَمُتَّبِعُوْهُ، التَّحْرِيْفَ بِأَشْنَعِ الفَضَاحَةِ، وَبِأَقْبَحِ الأُسْلُوبِ.

‘গোলাম আহমাদ সর্বপ্রথম ইসলামের নামে কুরআন পরিবর্তনের জঘন্য নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। অতঃপর তার ভক্ত ও অনুসারীরা তাকে অনুসরণ করেছে। যে পরিবর্তন ছিল জঘন্যতম এবং তা করেছিল নিকৃষ্টতম পদ্ধতিতে’।[3]

৩. কুরআন সম্পর্কে শীআদের অপব্যাখ্যা নিরসনে সালাফীদের ভূমিকা :

আল-কুরআনুল কারীম সম্পর্কে শীআ-রাফেযী সম্প্রদায়ের ভ্রষ্টতা প্রসিদ্ধ। তাদের অপব্যাখ্যা ও ভ্রষ্টতা উন্মোচনে সালাফী আলেমগণ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম আবূ মানছূর আব্দুল কাদের বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত্যু: ৪২৯ হি.)[4], ইবনু তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) (৬৬১-৭২৮ হি.), মুহিব্বুদ্দীন খতীব (রাহিমাহুল্লাহ) (১৩০৩-১৩৮৯ হি.) এবং বর্তমানকালের শায়খ রবী ইবনু হাদী  মাদখালী (হাফিযাহুল্লাহ) প্রমুখ।

আবূ মানছূর আব্দুল কাদের বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ভূমিকা :

তিনি অঢেল সম্পদের মালিক ছিলেন, যার অধিকাংশই জ্ঞানার্জনে খরচ করেছেন। শীআ, মু‘তাযিলা, কার্রামিয়্যা, কাদারিয়্যা প্রভৃতি ভ্রান্ত ফেরক্বার কুরআনের অপব্যাখ্যা ও মিথ্যা অপবাদের বিরুদ্ধে তার অবদান অনস্বীকার্য। এ সম্পর্কে তার রচনাবলীর মধ্যে ‘আল-ফারক্বু বায়নাল ফিরাক্ব ওয়া বায়ানিল ফেরক্বাতিন নাজিয়াহ’ (الْفَرْقُ بَيْنَ الْفِرَقِ وَبَيَانِ الفِرْقَةِ النَّاجِيَةِ), ‘নাফয়ু খালক্বিল কুরআন (نَفْيُ خَلْقِ القُرْآن), আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল (اَلْمِلَلُ وَالنِّحَلُ) গ্রন্থগুলো অন্যতম। তিনি শীআদের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন,

كُفْرُ هَذِهِ الْفِرْقَة ]الرَّافِضَة[ أَكْفَرُ مِنْ كُفْرِ الْيَهُوْدِ …، فَاليَهُوْدُ مَعَ كُفْرِهِمْ بِالنَّبِيِّ وَمَعَ عَدَاوَتِهِمْ لِجِبْرِيْلَ لَا يَلْعَنُوْنَ جِبْرِيْلَ، وَإِنَّمَا يَزْعُمُوْنَ أَنَّهُ مِنْ مَلائِكَةِ العَذَابِ دُوْنَ الرَّحْمَةِ، والغُرابِيَّةُ مِنَ الرَّافِضَةِ يَلْعَنُونَ جِبْرِيْلَ وَمُحَمَّدًا عَلَيْهِمَا السَّلام.

‘এই ফেরক্বার (শীআ-রাফেযী) কুফরী ইয়াহূদীদের কুফরীর চেয়েও ভয়াবহ। কেননা, ইয়াহূদীরা তো নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অস্বীকার এবং জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে শত্রুতা থাকা সত্ত্বেও তারা জিবরীলকে অভিশাপ করে না। বরং তারা ধারণা করে যে, জিবরীল রহমতের ফেরেশতা নয়, আযাবের ফেরেশতা মাত্র। পক্ষান্তরে শীআ-রাফেযীদের ‘গোরাবিইয়্যা ফেরক্বা’ জিবরীল ও মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উভয়কে অভিশাপ করে’।[5]

ইবনু তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ভূমিকা :

তিনি ‘মিনহাজুস সুন্নাহ ফী নাকযি কালামিশ শীআ ওয়াল কাদারিয়্যা’ (مِنْهَاجُ السُّنَّةِ فِيْ نَقْضِ كَلَامِ الشِّيْعَةِ وَالْقَدَرِيَّةِ) নামক বিশাল গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে শীআ ও কাদারিয়্যা সম্প্রদায়ের ভ্রষ্টতা তুলে ধরেছেন। তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, শীআ ও জাহমিয়্যারাই নাস্তিক্যবাদের প্রবেশদ্বার। তাদের পথ অনুসরণ করেই আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ এবং কুরআনের অসংখ্য আয়াতের অপব্যাখ্যা করার মাধ্যমে ভ্রষ্টতা অবলম্বন করেছে, যা ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদীদের অগ্রণী কারামেতা সম্প্রদায় কর্তৃক একটি স্বীকৃত বিষয়। ইবনু তায়মিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) তার এ গ্রন্থে অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা তাদের কুফরী-মতবাদসমূহ খণ্ডন করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বলেন,

الرَّافِضَةُ فَإِنَّهُمْ أَعْظَمُ ذَوِي الْأَهْوَاءِ جَهْلاً وَظُلْماً، يُعَادُوْنَ خِيَارَ أَوْلِيَاءِ اللهَ تَعَالَى مِنْ بَعْد النَّبِيِّيْنَ مِنَ السَّابِقِيْنَ الأَوَّلِيْنَ مِنَ المُهَاجِرِيْنَ وَالْأَنْصَارَ.

‘শীআ-রাফেযীরাই সবচেয়ে প্রবৃত্তিবিশিষ্ট অজ্ঞ ও অত্যাচারী সম্প্রদায়। তারাই নবীগণ (আলাইহিস সালাম)-এর পরে আল্লাহ তাআলার সর্বোত্তম অলি-আউলিয়া মুহাজির ও আনছারগণের মধ্যে অগ্রগামী ছাহাবীগণের সাথে শত্রুতা পোষণ করে’।[6] তিনি আরও বলেন,

وَالرَّافِضَةُ وَالْجَهْمِيَّةُ هُمُ البَابُ لِهَؤُلَاءِ الْمُلْحِدِيْنَ، مِنْهُمْ يَدْخُلُوْنَ إِلَى سَائِرِ أَصْنَافِ الْإِلْحَادِ فِي أَسْمَاءِ اللهِ وَآيَاتِ كِتَابِهِ الْمُبِيْن.

‘শীআ ও জাহমিয়্যারাই ঐ সকল নাস্তিক্যবাদীদের প্রবেশদ্বার, যারা তাদের মাধ্যমে আল্লাহর নামসমূহ এবং তাঁর স্পষ্ট কিতাবের আয়াতসমূহকে সর্বক্ষেত্রে অস্বীকার করে থাকে’।[7]

মুহিব্বুদ্দীন খতীব (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ভূমিকা :

তিনি মিসরের কায়রোতে ‘জমঈয়তে শুব্বানিল মুসলিমীন’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি মৃত্যু অবধি সালাফী আদর্শের পক্ষে বিরামহীন কলম ধরেছেন। তিনি একাধারে সুসাহিত্যিক, কলমসৈনিক, সংগঠক, শিকড় সন্ধানী সাংবাদিক, প্রকাশক এবং দাঈ ইলাল্লাহ ছিলেন। মিসরে তার প্রসিদ্ধ সালাফী লাইব্রেরি ও ছাপাখানা ছিল, যার মাধ্যমে সেখানে সালাফী আদর্শ প্রচার ও প্রসার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশেষত মুহাম্মাদ কুম্মী রাফেযী ১৩৬৮ হিজরী সনে যখন মিসরে শীআ আদর্শ প্রচারের লক্ষ্যে ‘দারুত তাকরীব’ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তিনিই তার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি শীআ সম্প্রদায়ের মুখোশ উন্মোচন করে ‘আল-খুতূতুল আরিযাহ আল্লাতি ক্ব-মা আলাইহা দ্বীনুশ শীআ আল-ইছনা আশারিয়্যা’ (الخُطُوْطُ الْعَرِيْضَةُ الَّتِيْ قَامَ عَلَيْهَا دِيْنُ الشِّيْعَةِ الاثْنَى عَشَرِيَّة) নামক গ্রন্থ রচনা করেন, যা শীআদের কুরআন সংশ্লিষ্ট ও অন্যান্য অপবাদের বিরুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখে।

শায়খ রাবী ইবনু হাদী মাদখালী (হাফিযাহুল্লাহ) এর ভূমিকা :

তার প্রণীত ‘আল-ইন্তেছার লি-কিতাবিল্লাহিল আযীযিল জাব্বার’ (الانْتِصَارُ لِكِتَابِ اللهِ الْعَزِيْزِ الْجَبَّار) নামক গ্রন্থটি কুরআনের অপব্যাখ্যা ও আহলে বায়তের ইমামগণের উপরে মিথ্যা অপবাদ উন্মোচনে শীআ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ‘নীরব টাইমবোমা’ সদৃশ। তিনি এ গ্রন্থে শীআ আলেমগণ কর্তৃক কুরআনের বহু উদ্ধৃতির পরিবর্তন, অপব্যাখ্যা এবং ছাহাবীগণ দ্বারা তাতে সংযোজন-বিয়োজনের যে দাবি করা হয়েছে, তার বিশ্লেষণমূলক উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন। তিনি শীআদের মিথ্যা অপবাদ সম্পর্কে বলেন,

واللهِ مَا جَنَى عَلَى الإِسْلَامِ وَافْتَرَى عَلَى القُرْآنِ وَمُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ وَأَصْحَابِهِ وَآلِ بَيْتِهِ مِثْلُ الرَّوَافِضِ البَّاطِنِيَّةِ لَا يَهُوْدٌ وَلَا نَصَارَى وَلَا مُنَافِقُوْنَ!

‘আল্লাহর শপথ! শীআ-বাতেনীদের মতো আর কেউ ইসলামের ক্ষতি করেনি এবং কুরআন, মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ছাহাবীবর্গ ও আহলে বায়তের উপরও এমন মিথ্যা রটনা কেউ রটায়নি। না ইয়াহূদী করেছে, না করেছে খ্রিস্টান, না মুনাফিক!’[8]

উল্লিখিত আলেমগণ ছাড়াও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম শাত্বেবী (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম আবূল ইয আল-হানাফী (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম ইবনু উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম ছালেহ আল-ফাওযান (রাহিমাহুল্লাহ) সহ সালাফী অসংখ্য আলেম কুরআন সংশ্লিষ্ট মুসলিম দাবিদার ফেরক্বা এবং অমুসলিম ফেরক্বাসমূহের অপব্যাখ্যা ও সংশয় নিরসনে অসংখ্য গ্রন্থরচনা, বক্তব্য, সভা-সমাবেশ, বাহাছ-মুনাযারা ইত্যাদির মাধ্যমে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। আল্লাহ তাআলা তাদের সকলের খেদমত কবুল করুন এবং সকলকে উত্তম প্রতিদান দিন- আমীন!


* পি-এইচ.ডি. (দাওয়াহ), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

[1]. আল্লামা আব্দুর রহমান সা‘দী, আল-আদিল্লাতুল কাওয়াতে‘ ওয়াল-বারাহীন ফী ইবতালি উছূলিল মুলহিদীন (প্রকাশক : মাকতাবাতুল মাআরিফ, রিয়াদ, সঊদী আরব, প্রকাশকাল : ১৪০২ হি.), পৃ. ২৭-২৮।

[2]. ড. মানে আল-জুহানী, আল-মাওসূআ আল-মুয়াস্‌সারা ফিল আদইয়ান ওয়াল মাযাহিব ওয়াল আহযাবিল-মুআছিরা (প্রকাশক : দারুন নাদওয়া আল-আলামিয়্যা, রিয়াদ, সঊদী আরব, ৪র্থ প্রকাশ : ১৪২০ হি.), ১/৪১৬।

[3]. আল্লামা ইহসান ইলাহী যহীর, আল-কাদিয়ানিয়্যা : দিরাসাতুন ওয়া তাহলীল (প্রকাশক : ইদারাতু তরজুমানিস সুন্নাহ, লাহোর, পাকিস্তান, পঞ্চদশ প্রকাশ : ১৪০১ হি.), পৃ. ৮৫।

[4]. বলা হয় তিনি আশআরী, কিন্তু তৎকালীন সালাফীদের পক্ষে এবং সকল বিদআতীদের বিরুদ্ধে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন।

[5]. আবূ মানছূর বাগদাদী, আল-ফারক্বু বায়নাল ফিরাক্ব ওয়া বায়ানিল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ (প্রকাশক : দারুল আফাক্ব আল-জাদীদা, বৈরূত, লেবানন, ২য় প্রকাশ : ১৯৭৭ খ্রি.), পৃ. ২৩৮।

[6]. ইবনু তায়মিয়্যা, মিনহাজুস সুন্নাহ ফী নাকযি কালামিশ শীআ ওয়াল-কাদারিয়্যা (সম্পাদনা : মুহাম্মাদ রাশাদ সালেম, প্রকাশক : ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সাঊদ ইউনিভার্সিটি, রিয়াদ, সঊদী আরব, ১ম প্রকাশ : ১৯৮৬ খ্রি.), ৩/২০।

[7]. প্রাগুক্ত, ২/৭।

[8]. শায়খ রবী ইবনু হাদী মাদখালী, আল-ইন্তেছার লি-কিতাবিল্লাহিল আযীযিল জাব্বার (প্রকাশক : দারুল মিদাদ, কায়রো, মিসর, ১ম প্রকাশ : ২০১৮ খ্রি.), পৃ. ৪১।