পাপ কাজে আনন্দ আছে কিন্তু তা সাময়িক এবং যার পরিণাম ভয়াবহ

ফরীদুল হাসান
সাবেক শিক্ষক (গণিত), আল জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ
বীরহাটাব-হাটাব, রুপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

উপক্রমণিকা :

প্রথমে আমরা পাপ কাজ কী, সে ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা নিই। প্রত্যেক ধর্মেই কিছু কাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যে কাজ করলে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা, নিরাপত্তাহীনতা, অশান্তি, এককথায় সমাজিক অবক্ষয় দেখা দেয়, তাই পাপ কাজ। সমাজে এ রকম কিছু পাপ কাজের সাথে আমরা এখন পরিচিত হব।

যেনা-ব্যভিচার :

নবী করীম (ছাঃ)-এর হাদীছ থেকে ক্বিয়ামতের লক্ষণ হিসাবে অন্যতম একটি লক্ষণ আমরা জানি, মানুষ পাপ কাজকে পাপ বলে মনে করবে না, হারামকে হালাল মনে করবে। বর্তমান সমাজে ৮-১০ বছরের কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্ক বিভিন্ন বয়সী নর-নারীর মধ্যে যে প্রেম কিংবা পরকীয়ার ছড়াছড়ি আমরা লক্ষ্য করছি, তা এ হাদীছেরই বাস্তব প্রতিফলন। বর্তমানে প্রেমকে মনে করা হয় স্বাভাবিক ব্যাপার। পিতা-মাতা সহ প্রায় অধিকাংশ অভিভাবকই এটাকে মোটেও গুরুত্বের সাথে অনৈতিক বা পাপ কাজ হিসাবে দেখেন না, বরং তারা মনে করেন বয়স হলে ছেলে-মেয়েরা অবাধে মেলা-মেশা করবে, হাসি-ঠাট্টা করবে, মজা করবে, একসাথে আড্ডা দিবে, ঘুরতে যাবে, সময় কাটাবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই স্বাভাবিক চিন্তা থেকেই সৃষ্টি হয় কিছু অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড।

একজন মেয়ে কিংবা ছেলের মধ্যে সম্পর্কের সৃষ্টি হয় অবাধে মেলামেশার ফলে। এতে অনেক সময় সৃষ্টি হয় বন্ধু কিংবা বান্ধবীর মধ্যে দ্বন্দ্ব বা কলহ। যার প্রেক্ষাপটে ঘটে আত্মহত্যা, খুনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়ার ঘটনা। যেমন মাদক সেবন, ধূমপান। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বরগুনার রিফাত হত্যা, নয়নবন্ডের ক্রস ফায়ার সহ অসংখ্য জানা-অজানা ঘটনা, যা আমরা অনেকে জানি আবার অনেকে জানি না।

অনেক সময় প্রেমের ফাঁদে ফেলে অনেক দুষ্কৃতিকারী তাদের দুষ্কর্ম হিসাবে ছিনতাই, পকেটমারসহ নানা অপকর্ম করে থাকে। যার শিকার হয় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী কিংবা বয়স্ক নারী-পুরুষ এ ধ্বংসাত্মক পাপ কর্মে লিপ্ত হয়। কারণ তারা এতে আনন্দ পায় এবং মনোবাসনা পূর্ণ করে সুখ লাভ করে। কিন্তু এটা নিতান্তই সাময়িক যা আমরা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারি। এর পরিণাম যে কত ভয়াবহ তা হয়তো ভেবে দেখি না। কিন্তু বর্তমান এই ভয়াবহতা আমাদেরকে গ্রাস করছে এবং আগামীতে আরও ভয়াল থাবা মেলে তা এগিয়ে আসছে মানব সমাজের দিকে। প্রেম করে বিয়ে যদি সফলতাই আনতো কিংবা পরকীয়া-প্রেম যদি মানব সমাজের জন্য কল্যাণকর হতো, তবে তা এই বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা বৈধ করে দিতেন এবং আমাদের সমাজের এই চিত্র আজ দেখতে হতো না।

একবার চিন্তা করে দেখুন, যে মেয়েটা প্রেমের জের ধরে আত্মহত্যা করে কিংবা বাড়ী থেকে পালিয়ে বিয়ে করে কিংবা এসিডদগ্ধ হয় বা ধর্ষণের শিকার হয়, তখন তার পরিবারের অবস্থার কথা, উক্ত পরিবারের সামাজিক অবস্থার কথা। এটা তো গেল বর্তমান সমাজে তাদের অবস্থা। যেটা হয়তো ততটা মনে রেখাপাত করে না। কারণ সামাজের লোকদের আত্মা কলুষিত হয়ে এই ঘটনার অনুকূলে হয়েছে। কিন্তু এই গার্লফ্রেন্ড, প্রেমিকা বা পরকীয়া নারীর তো সন্তান হবে। আর সেই সন্তান কী করে সৎ সন্তান হবে? সেই সন্তানের কাছ থেকে আমরা কি করে সূদ, ঘুষ, দুর্নীতি, ধর্ষণ, ব্যভিচারমুক্ত সমাজ আশা করতে পারি? কোনোক্রমেই নয়। সেই মা-বাবাকে তো বৃদ্ধাশ্রমে নিক্ষিপ্ত হতেই হবে। সেই সন্তানরাই তো গর্ভপাত ঘটাবে, ডাস্টবিনে ফেলে রাখবে শত শত নবজাতক শিশুকে। দেশ-সমাজ জারজে ভরে যাবে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মতো। আর সেই সন্তানেরাই পিতা-মাতার চোখ উপড়ে ফেলবে ফেনীর ঘটনার মতো। বৃদ্ধা মাতার মাথায় লাঠির আঘাত করবে রাজশাহীর সেই ঘটনার মতো।

সেই সন্তান হবে নারীর দেহ লোভী। আর সে লালসার শিকার হবে ঢাকার সাদিয়ার মতো ৪-৫ বছরের শিশু। এভাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে এবং যাবে অশান্তি, নিরাপত্তাহীনতা আর সামাজিক অবক্ষয় (Social Errosion), যার পরিণাম বা ফলাফল হচ্ছে বর্তমান সমাজের সার্বিক পরিস্থিতি। এর পরকালীন শাস্তি তো চির অশান্তির জায়গা জাহান্নাম।

আমাদের দেশের বর্তমান স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রেম নামক যে যেনা-ব্যভিচারের ছড়াছড়ি তা সবাই অবগত। জ্ঞান অর্জনের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের ছেলে-মেয়েরা পড়ালেখার নামে যে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েছে, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। রাস্তা-ঘাটে চলতে-ফিরতে আমরা এসব তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী কিংবা যুবক-যুবতীদের মধ্যে যে বেলেল্লাপনা বর্তমানে লক্ষ্য করছি, তা যে কেবল সামাজিক অবক্ষয় কিংবা নৈতিক অবক্ষয় তা নয়, এটা সমাজের জন্য, জাতির জন্য একটা অশনি সংকেত। জ্ঞানার্জন তো দূরের কথা, নিয়মিত সিলেবাসভিত্তিক পড়ালেখাটাও তারা তৈরি করতে পারে না ঠিকমতো। তারা সময় ব্যয় করে মোবাইলের পিছনে। যার মুখ্য চালিকাশক্তি হচ্ছে এই প্রেম নামক ব্যভিচার। আমাদের সমাজ তথা মুসলিম বিশ্ব আজ নৈতিক অবক্ষয়ের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। আমরা অমুসলিম শক্তির হাতে মার খাচ্ছি প্রকাশ্যে ও গোপনে। তাদের ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি আমরা অনায়াসে, যা আমরা বুঝতেই পারছি না এবং বুঝার চেষ্টাও করি না। জ্ঞান চর্চা করা থেকে বিরত থাকার কারণে আজ মুসলিম বিশ্বে এতটা পশ্চাৎপদতার সৃষ্টি হচ্ছে যে, এসব দ্বীন ও জ্ঞানশূন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু জঙ্গি সংগঠন সৃষ্টি হচ্ছে, যারা ইসলামের নামে বোমাবাজি, চোরা-গোপ্তা হামলা চালিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। যা ইসলামকে চরম ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলছে। এতে ইসলামের তথা মুসলিমদেরকে দেখা হয় বিদ্রুপাত্মক দৃষ্টিতে। দাঁড়িওয়ালা, টুপিওয়ালা, পাঞ্জাবী পরা দেখলেই মানুষের মনে আতঙ্কের বা নেতিবাচক চিন্তার উদ্রেক করতে অতি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এসব ঘটনা। এতে করে অনেকেই মাদরাসা শিক্ষাসহ দ্বীনী শিক্ষা গ্রহণে ভয় পাচ্ছে। এই জঙ্গি সৃষ্টি হলো কোথা থেকে? কারা এদের মদদদাতা? কীভাবে এরা সৃষ্টি হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খতিয়ে দেখা যায়, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের সেইসব শিক্ষার্থী এ সমস্ত কাজের সাথে জড়িত, যারা ছোট থেকে বড় হয়েছে, কিন্তু দ্বীনী শিক্ষা এদেরকে দেওয়া হয়নি। মক্তব কিংবা মাদরাসা তো দূরের কথা ন্যূনতম ইসলামী শিক্ষাও এসব তথাকথিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত পরিবারগুলো থেকে বেরিয়ে আসা ছেলে-মেয়েদের দেওয়া হয়নি। যার ফলে এরা অতি সহজেই অমুসলিমদের পাতা ফাঁদে পা ফেলে এবং সহজ শিকারে পরিণত হয়। এদেরকে যা বুঝানো হয়, এরা তাই বুঝে যা বলা হয় ইসলাম বা দ্বীন সম্পর্কে, এরা তাই গোগ্রাসে গিলে খায় আর এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আর তার প্রভাব পড়ে প্রকৃত ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের উপর। এরকম অসংখ্য সামাজিক, পারিবারিক সমস্যায় বর্তমান সমাজ জর্জরিত শুধুমাত্র এই একটা মাত্র অনৈসলামিক কারণে।

ইতিহাস স্বাক্ষী, আমরা জানি, পৃথিবী সৃষ্টির সেই প্রাথমিক সময় থেকে আজ পর্যন্ত যত জাতি ধ্বংস হয়েছে, তার পিছনে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কারণ হিসাবে কাজ করেছে শয়তানের রশি হিসাবে ব্যবহার হওয়া এই নারী। এর মানে এই নয় যে, আমি নারী জাতির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করছি। আমি যা বুঝাতে চাচ্ছি, তা হলো এরা সহজেই শয়তানের প্ররোচনার শিকার হয়। এরা প্রকৃতিগতভাবেই সরল ও বিশ্বাসপ্রবণ। তাই এদেরকে অত্যন্ত যত্ম সহকারে রাখতে হয়, যা ইসলামের বিধান। উল্লেখ্য, ইসলাম নারীদেরকে যত সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে, অন্য কোনো জাতি বা ধর্মে তা দেওয়া হয়নি।

প্রতিকার :

ইসলাম হচ্ছে পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। বিদায় হজ্জের ভাষণ থেকে আমরা জানতে পারি যে, ইসলামকে পরিপূর্ণ দ্বীন হিসাবে চয়ন করা হয়েছে। যা উপরের উক্তিটির সাথেই সাদৃশ্যপূর্ণ। এ সমস্যার সমাধান হিসাবে ইসলাম যে বিধি-বিধান দিয়েছে, তা হলো নারীদের পর্দা, যা বর্তমানে অনায়াসেই অবহেলা করা হয়। পর্দা করলেও তা আবার আঁটো-সাঁটো এবং নানা ধরনের কারুকার্যপূর্ণ বোরকা বা পর্দা পরিধান করে, যা ইভটিজিংকে উৎসাহিত করে। আর পর্দা ছাড়া যারা চলে তাদের কথা তো বলাই বাহুল্য। কেবল ধর্ষিত হলেই বা এসিডদগ্ধ হলেই আমাদের চেতনা জাগ্রত হয়, তাও আবার ধর্ষিতার পরিবার-পরিজন ছাড়া অন্য কারও মনে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করে বলে মনে হয় না। সম-অধিকারের নামে যে বেহায়া-বেলেল্লাপনার ছড়াছড়ি তা সবাই অবগত। যেখানে সবাইকে আল্লাহ অধিকার বণ্টন করে দিয়েছেন, সেখানে তাঁর সৃষ্টি কীভাবে সে বিধানকে অগ্রাহ্য করে বিশ্বে শান্তি আশা করতে পারে?

আবার সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার যে দায়িত্ব তা হলো সময়মতো বা বালেগ হলে (যে আবহাওয়ায় যে বয়স প্রযোজ্য) বিয়ের ব্যবস্থা করা। শুধুমাত্র এই একটা বিধান কার্যকর করলেই এই সমস্যার প্রায় ৬০% সমাধান সম্ভব। আর বাকি ৪০% এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য যে নিয়মাবলী রয়েছে যেমন পর্দা ছাড়া নারীদের বাইরে বের না হওয়া এবং মাহরাম পুরুষের সঙ্গে বের হওয়া, দৃষ্টির হেফাযতকরণ (নারী-পুরুষ উভয়ই), নিজের সৌন্দর্যের হেফাযতকরণ, এমন সুগন্ধির ব্যবহার না করা যা অন্যকে আকর্ষণ করে, জাহিলী যুগের মতো সাজসজ্জা করে পরপুরুষের সামনে না আসা বা বাইরে বের না যাওয়া, বোরকা পরলেও খোপা উটের কুঁজের মতো করে না রাখা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার উপর এবং সর্বোপরি ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিতকরণের উপর নির্ভর করছে। আল্লাহ তা‘আলা এ সমস্ত বিধান দিয়েছেন শুধুমাত্র এই নারী জাতির এই ধরাধামে পরিচালিত হওয়ার জন্য। এত বিধান দেওয়ার কারণ আজ আমরা অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পারছি। এই সৃষ্টির স্রষ্টা যিনি কেবল তিনিই ভালো জানেন তার সমস্ত সৃষ্টির কল্যাণ কোন কাজের উপর নির্ভর করে বা কীভাবে পরিচালিত করলে তা মানব সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। এটা সচেতন তথা জ্ঞানী ব্যক্তিমাত্রই জানেন।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি হেদায়াত আল্লাহর এক অপর দান। মুসলিম হিসাবে যা প্রাপ্তির আপ্রাণ প্রচেষ্টা আমাদের একান্ত কাম্য। আমাদের তথা গোটা বিশ্বের মুসলিম নর-নারীর ইসলামী বিধি-বিধানের প্রতি আনুগত্যবোধ জাগ্রত হওয়ার এবং এসব বিধি-বিধান মেনে চলার তাওফীক দান করুন। তবেই দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে। আল্লাহ এ কথা বুঝার তাওফীক দান করুন- আমীন!