পাবলিক প্লেসে স্মার্টফোন ব্যবহারের শালীনতা
-সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী*


আধুনিক ডিজিটাল বিশ্বে দৈনন্দিন জীবনযাপনে মোবাইল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবন আজ মোবাইল ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ। বিশেষ করে স্মার্টফোন ডিভাইস। আমাদের জীবনযাপন এমন হয়ে গেছে যে, অর্থ ছাড়া একদিন চলতে পারলেও স্মার্টফোন ছাড়া এক মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না। যার ফলে মোবাইলের প্রতি আমাদের এই আসক্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা আমাদেরকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে ধীরে ধীরে।

মোবাইল ডিভাইস শুধু একটি শ্রেণি নয়, বরং সমাজের প্রতিটি শ্রেণি ও বয়সের মানুষকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে নিয়েছে। আজ আমরা স্মার্টফোনে এমনই আসক্ত হয়ে পড়েছি যে, হিতাহিত জ্ঞানও কাজ করছে না। বিশেষ করে  অবসরে প্রকাশ্যে মোবাইল ব্যবহার। আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ কাজকর্মে, অফিস-আদালতে কিংবা স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে যাতায়াতের জন্য পাবলিক বাস ব্যবহার করে। বিভিন্ন গন্তব্যে এই যাত্রার সময় আমরা একপ্রকার অবসরেই থাকি। আর এই অবসর সময়টিকে আমরা কাজে লাগাই স্মার্টফোন ব্যবহার করে। বিশেষ করে অধিকাংশ মানুষ এই সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় ব্যয় করে। যা দোষের কিছু নয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষা এবং জ্ঞান এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, আমরা কী করছি কী দেখছি তা আর নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকাশ্যে সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছি। পাবলিক প্লেস কিংবা পাবলিক বাসের অধিকাংশ যাত্রী মোবাইল ব্যবহারে শালীনতা বজায় রাখে না। যা অবশ্যই ভদ্রতার দৃষ্টিতে দৃষ্টিকটু। একইসাথে দ্বীনের ক্ষেত্রে পাপের ভাগীদার। আমরা মোবাইলে বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিও দেখছি, যা একান্ত ব্যক্তিগত। যা অন্যের নিকট প্রকাশ হওয়া সভ্যতা ও শালীনতার লক্ষণ নয়। যা দ্বীনের দৃষ্টিতে পাপ।

শুধু তাই নয়, অধিকাংশ মানুষই বাসে মোবাইল ব্যবহার করে হেডফোন বা ইয়ারফোন ছাড়া। যার ফলে অতিরিক্ত শব্দদূষণ সৃষ্টি হয়, যা মানুষ হিসেবে বিরক্তির কারণ। উচ্চ শব্দে মোবাইল ব্যবহার অন্যের নিকট নিজের ব্যক্তিত্বহীনতার প্রমাণ। একইসাথে ভার্চুয়াল জগৎ আজ আমাদের এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, সেখানে ধর্মের কোনো অস্তিত্বই নেই। আজ ধর্মের চিন্তা তো অনেক দূরের কথা। পাশে যে একজন মুরব্বী কিংবা আলেম কিংবা একজন বড় ভাই বসে আছেন, তারও কোনো তোয়াক্কা নেই!

পাবলিক বাসে উঠেই আমরা মনে করি, এখানে তো আমার পরিচিত কেউ নেই! সুতরাং প্রেমিকার সাথে চ্যাটিং অথবা কথা বলা থেকে শুরু করে ভিডিও কল কিংবা যা তা ভিডিও বা ছবি দেখতে কোনো বাধা নেই। শুধু পাবলিক বাসে নয়, আজ আমরা যেখানেই যাচ্ছি বসছি অর্থাৎ যেকোনো পাবলিক প্লেসে সময় পেলেই স্মার্টফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। যার ফলে পাবলিক বাস বা পাবলিক প্লেসগুলোতে ছোট-বড় সবাই, যে যার মতো করে সুস্থ-অসুস্থ বিনোদনে জড়িত হচ্ছি। 

আজ আমাদের পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে ধর্মীয় চর্চার বড় অভাব। যার ফলে মানুষের মনে দ্বীনের কোনো ভয় আর কাজ করছে না। আগে মানুষ আল্লাহকে ভয় করার কারণে মানুষের সামনে পাপ করা থেকে বিরত থাকত। করলেও তা গোপনে করত। আর এখন আমাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় তো নেই-ই, এমনকি মানুষ আমার কাজে কী মনে করছে তার-ই কোনো তোয়াক্কা নেই। অথচ আমাদের মাঝে দ্বীনের ভয় থাকা দরকার বেশি। আগে পাপ গোপনে করলেও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তা আল্লাহ ক্ষমা করে দিতে পারতেন। আর এখন পাপ করছি তো করছি তাও আবার সাক্ষী রেখে! এই সাক্ষী রাখার কারণে কীভাবে আমরা ক্ষমা পেতে পারি?

একইসাথে নিজেও পাপ করছি, অন্যকেও পাপের ভাগীদার বানাচ্ছি। যার ফলে তার পাপের ভাগও আমাদের নিতে হবে। আজ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীলতা এমন পর্যায়ে গেছে, তা কখনোই সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ হতে পারে না। বিশেষ করে টিকটক, লাইকিসহ আরও অন্য বিনোদন এ্যাপসগুলো— কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আর এভাবেই এসব এ্যাপস দ্বারা আমরা নিজেরই অজান্তে পাপের একটি জালে জড়িয়ে পড়ছি। যা সমাজ ও রাষ্ট্রে পাপের বিস্তারকে উৎসাহিত করছে।

আসুন! আমরা এই পাপ থেকে বিরত থাকি। আমাদের উচিত, সকল গোপন পাপ থেকে বিরত থাকা। অশ্লীলতা আছে এমন এ্যাপস বর্জন করা। প্রবৃত্তির কারণে যদি পাপ থেকে বিরত থাকা না যায়, তবুও যেন এই পাপের ভাগীদার ও সাক্ষী না রাখি। চেষ্টা করি যেন পাবলিক প্লেসে ও যানবাহনে যতটুকু সম্ভব শালীনতার ভিতরে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে। ভুলেও যেন প্রকাশ্যে, উচ্চ শব্দে গান-বাজনার ভিডিওসহ কোনোপ্রকার অশ্লীল ভিডিও কিংবা ছবি পাবলিক প্লেসে না দেখি। আল্লাহ আমাদের সঠিক দ্বীন বুঝার, জানার এবং মানার তাওফীক্ব দিন- আমীন!


* পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।