পোশাক ও বর্তমান পরিস্থিতি : একটি পর্যালোচনা

-সাজ্জাদ সালাদীন*


ইসলামে পোশাকের গুরুত্ব অপরিসীম। পোশাক-পরিচ্ছদ মানুষের সতর আবৃত করা এবং দেহ সজ্জিত করার মাধ্যম। এর দ্বারা লজ্জা নিবারণের পাশাপাশি এটা ব্যক্তিত্ব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। সাধারণত পোশাকের মাধ্যমে ব্যক্তির প্রকৃতি অনুভব করা যায়। আমাদের দেশে বর্তমানে ‘সুন্নাতী লেবাস’ বলে এক ধরনের বিশেষ কাটিং ও বিশেষ পরিমাণের লম্বা কোর্তা পরিধান করা হচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে যে, এটাই হচ্ছে সুন্নাতী পোশাক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুন্নাতী পোশাক বলতে কী বোঝায়? কোনো বিশেষ কাটিং বা বিশেষ লম্বা মাপের জামা পরা কি সত্যিই সুন্নাত? সে সুন্নাত কোন দলীলের ভিত্তিতে প্রমাণিত হলো? কুরআন থেকে? হাদীছ থেকে? আসুন! কুরআন ও হাদীছের আলোকে আমরা বিষয়টিকে বুঝার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সেই তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

পোশাকের গুরুত্ব :

মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে যেসব নেয়ামত দান করেছেন, পোশাক তার মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا بَنِيْ آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِيْ سَوْآتِكُمْ وَرِيْشًا، وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ ذَلِكَ مِنْ آيَاتِ اللهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُوْنَ

‘হে আদম সন্তান! আমি তোমাদেরকে পোশাক-পরিচ্ছদ দিয়েছি তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করার জন্য এবং শোভা বর্ধনের জন্য। আর তাক্বওয়ার পোশাক হচ্ছে সর্বোত্তম। ওটা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে’ (আল-আ‘রাফ, ৭/২৬)। এই আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, পোশাক মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ দান।

অতএব পোশাক সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সে পোশাক কী রকমের হতে হবে, সে বিষয়ে এ আয়াত থেকে দুটি কথা জানতে পারা যায়। একটি হলো, পোশাক এমন হতে হবে, যা অবশ্যই মানুষের লজ্জাস্থানকে আবৃত করে রাখবে। যে পোশাক মানুষের লজ্জাস্থানকে আবৃত করে না, তা মানুষের পোশাক হতে পারে না। আর দ্বিতীয় কথা হলো, সে পোশাককে ‘ভূষণ’ হতে হবে। অর্থাৎ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, চাকচিক্য, শোভাবর্ধক হতে হবে। সুন্দর পোশাক পরিধান সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِى قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ .قَالَ رَجُلٌ إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُوْنَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً. قَالَ انَّ اللهَ جَمِيْلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ

‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি বললেন, মানুষ তো পছন্দ করে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক এবং তার জুতা সুন্দর হোক। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার হলো হক্বকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করা’।[1]

পোশাকের প্রকারভেদ :

ইসলামী শরীআতে পোশাক তিন প্রকার। যথা- ওয়াজিব, মুস্তাহাব ও হারাম।

ওয়াজিব পোশাক : যে পোশাক সতর আবৃত করে, গরম ও শীত থেকে শরীরকে রক্ষা করে এবং ক্ষতি থেকে দেহকে হেফাযত করে, সে পোশাক ওয়াজিব।

عَنْ بَهْزِ بْنِ حَكِيمٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ عَوْرَاتُنَا مَا نَأْتِى مِنْهَا وَمَا نَذَرُ قَالَ احْفَظْ عَوْرَتَكَ إِلاَّ مِنْ زَوْجَتِكَ أَوْ مَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ إِذَا كَانَ الْقَوْمُ بَعْضُهُمْ فِى بَعْضٍ قَالَ إِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ لاَ يَرَيَنَّهَا أَحَدٌ فَلاَ يَرَيَنَّهَا قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ إِذَا كَانَ أَحَدُنَا خَالِيًا قَالَ اللهُ أَحَقُّ أَنْ يُسْتَحْيَا مِنْهُ مِنَ النَّاسِ

বাহয ইবন হাকীম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তার পিতা হতে, তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের আবরণীয় অঙ্গসমূহ কার সামনে আবৃত রাখব এবং কার সামনে অনাবৃত করতে পারি? তিনি বললেন, ‘তোমার স্ত্রী ও দাসী ব্যতীত সকলের সামনে তা আবৃত রাখো’। রাবী বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! অনেক লোক যখন পরস্পর একসাথে থাকে? তিনি বলেন, ‘যতদূর সম্ভব কেউ যেন অন্যের গোপন অঙ্গের দিকে না তাকায়’। রাবী বলেন, আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কেউ যখন নির্জনে থাকে? তিনি বলেন, ‘লজ্জার ব্যাপারে আল্লাহ মানুষের চাইতে বেশি হক্বদার’।[2]

মুস্তাহাব পোশাক : বিভিন্ন ইবাদতের সময়, জুমআ, দুই ঈদ ও জনসমাবেশে সুন্দর পোশাক পরার গুরুত্ব অত্যধিক। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

مَا عَلَى أَحَدِكُمْ إِنْ وَجَدَ أَوْ مَا عَلَى أَحَدِكُمْ إِنْ وَجَدْتُمْ أَنْ يَتَّخِذَ ثَوْبَيْنِ لِيَوْمِ الْجُمُعَةِ سِوَى ثَوْبَىْ مَهْنَتِهِ

‘তোমাদের কারও সামর্থ্য থাকলে সে যেন তার পেশাগত কাজে ব্যবহৃত পোশাক ব্যতীত জুমআর দিনের জন্য এক জোড়া পোশাক তৈরি করে’।[3]

হারাম পোশাক : বিভিন্ন কারণে ইসলামে কতিপয় পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপ :

(১) পুরুষের জন্য মহিলাদের পোশাক।

(২) মহিলাদের জন্য পুরুষদের পোশাক।

(৩) খ্যাতি বা প্রসিদ্ধির পোশাক।

(৫) ভিন্ন ধর্মীয় বা বিজাতীয় পোশাক।

(৬) আঁটসাঁট পোশাক ও পাতলা কাপড়।

(৭) ছবি বা ধর্মীয় প্রতীক সম্বলিত পোশাক।

(৮) যে পোশাক পরলেও উলঙ্গ মনে হয়।

পুরুষের পোশাকের শর্তাবলি : পুরুষদের লেবাস বা পোশাকের শর্তাবলি নিম্নে আলোচনা করা হলো-

(১) লেবাস যেন নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ অবশ্যই আবৃত রাখে। যেহেতু ঐটুকু অঙ্গ পুরুষের লজ্জাস্থান।[4]

(২) এমন পাতলা না হয়, যাতে ভিতরের চামড়া নযরে আসে।

(৩) এমন আঁটসাঁট না হয়, যাতে দেহের উঁচু-নিচু ফুটে ওঠে।

(৪) কাফেরদের লেবাসের অনুকৃত না হয়।

(৫) মহিলাদের লেবাসের অনুরূপ না হয়।

(৬) জাঁকজমকপূর্ণ প্রসিদ্ধিজনক না হয়।

(৭) পরিহিত লেবাস (পায়জামা, প্যান্ট, লুঙ্গি, কামীছ প্রভৃতি) যেন পায়ের গোড়ালির নিচে না যায়। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘গোড়ালির নিচের অংশ লুঙ্গি জাহান্নামে’।[5] 

অর্থাৎ অহংকারমুক্ত সুন্দর ও ভদ্রতা-মার্জিত ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করা একজন পুরুষের জন্য আবশ্যক।

মহিলাদের পোশাকের শর্তাবলি : মহিলাদের পোশাকের শর্তাবলি নিম্নে আলোচনা করা হলো-

(১) লেবাস যেন দেহের সর্বাঙ্গকে ঢেকে রাখে। দেহের কোনো অঙ্গ বা সৌন্দর্য যেন কোনো বেগানা (যার সাথে কোনোও সময়ে বিবাহ বৈধ নয় এমন) পুরুষের সামনে প্রকাশ না পায়। কেননা মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘মেয়ে মানুষের সবটাই লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভিত করে তোলে’।[6] 

(৩) লেবাস যেন এমন পাতলা না হয়, যাতে কাপড়ের উপর থেকেও ভিতরের চামড়া নযরে আসে। নচেৎ ঢাকা থাকলেও খোলার পর্যায়ভুক্ত।[7] 

(৪) পোশাক যেন এমন আঁটসাঁট (টাইট ফিট) না হয়, যাতে দেহের উঁচু-নিচু ফুটে ওঠে। কারণ এমন ঢাকাও খোলার পর্যায়ভুক্ত এবং দৃষ্টি-আকর্ষী।

(৫) পোশাক যেন কোনো কাফের মহিলার অনুকৃত না হয়। প্রিয় নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন (লেবাসে-পোশাকে, চাল-চলনে অনুকরণ) করবে সে তাদেরই দলভুক্ত’।[8]

(৬) তা যেন পুরুষদের পোশাকের অনুরূপ না হয়। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই নারীদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন, যারা পুরুষদের বেশ ধারণ করে এবং সেই পুরুষদেরকেও অভিশাপ দিয়েছেন, যারা নারীদের বেশ ধারণ করে।[9] তিনি সেই পুরুষকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে মহিলার মতো পোশাক পরে এবং সেই মহিলাকেও অভিশাপ দিয়েছেন, যে পুরুষের মতো লেবাস পরে।[10]

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)


* এম. এ., ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯১; আবূ দাঊদ, হা/৪০৯২; তিরমিযী, হা/১৯৯৯; মিশকাত, হা/৫১০৮।

[2]. আবূ দাঊদ, হা/৪০১৭; ইবনু মাজাহ, হা/১৯২০; তিরমিযী, হা/২৭৬৯।

[3]. আবূ দাঊদ, হা/১০৭৪; ইবনু মাজাহ, হা/১০৯৬।

[4]. ছহীহুল জামে‘, হা/৫৫৮৩।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৮৭; মিশকাত, হা/৪৩১৪।

[6]. তিরমিযী, হা/১১৭৩; মিশকাত, হা/৩১০৯।

[7]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হ/৩৩৮৩; মিশকাত, হা/৪৩৭৫।

[8]. আবূ দাঊদ, হ/৪০৩১; মিশকাত, হা/৪৩৪৭।

[9]. আবূ দাঊদ, ৪০৯৭; ইবনে মাজাহ, হা/১৯০৪।

[10]. আবূ দাঊদ, ৪০৯৮, ইবনে মাজাহ, হা/১৯০৩।