প্রচলিত ভুল ও কুসংস্কার

আব্দুল বারী বিন সোলায়মান

(জানুয়ারি২০ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

(পর্ব-৩)

(২২) নামের ভুল : নূরনবী/নবীউল্লাহ

কারও কারও নাম শোনা যায় নূরনবী, নবীউল্লাহ ইত্যাদি। এই নামগুলো সঠিক নয়। কারণ নূরনবী শব্দের অর্থ হলো ‘নবীর নূর’। আর এই বিশ্বাসটা এসেছে ‘নবী নূরের তৈরি’ এই ধারণা থেকে। অথচ এই ধারণা মোটেও সঠিক নয়। নবী ধ অন্য সকল মানুষের মত মাটিরই তৈরি। আল্লাহ বলেন, قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ ‘হে রাসূল! বলে দাও! আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ…’ (কাহফ, ১১০)। নূরনবী নাম রাখার অর্থ হলো, একটি ভুল বিশ^াসকে লালন করা এবং স্বীকার করে নেওয়া।

অপরদিকে নবীউল্লাহ শব্দের অর্থ হলো ‘আল্লাহর নবী’। তো যার নাম রাখা হয়েছে নবীউল্লাহ, সে কি আল্লাহর নবী। (নাঊযুবিল্লাহ)। নবী তো তারাই, যাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে অহি আসে। এই ব্যক্তির কাছে অহি আসে? তাছাড়া মুহাম্মাদ (ছাঃ) ছিলেন পৃথিবীর সর্বশেষ নবী ও রাসূল (আহযাব, ৪০)। তারপরে আর কোনো নবী-রাসূল আসবেন না। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, وَأَنَا الْعَاقِبُ الَّذِى لَيْسَ بَعْدَهُ أَحَدٌ ‘আমি হলাম শেষ নবী, যার পরে আর কোনো নবী নেই’।[1]   মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর পরে কেউ নবুঅতের দাবি করলে সে ব্যক্তি সুস্পষ্ট কাফের ও মুরতাদ বলে গণ্য হবে। তাহলে কারও নাম নবীউল্লাহ তথা আল্লাহর নবী রাখা কত ভয়াবহ অপরাধ তা সহজেই অনুমেয়।

(২৩) একটি বর্জনীয় অভ্যাস : পড়ে যাওয়া খাবার উঠিয়ে না খাওয়া

আমাদের মুসলিম সমাজের একটি বাজে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমরা পড়ে যাওয়া খাবার উঠিয়ে খায় না। ভাত খাচ্ছি, আর দেখা যাচ্ছে, প্লেটের চতুর্পাশে ভাতের ছড়াছড়ি। পড়ে যাওয়া সেই খাবার ফেলে রেখেই উঠে যাচ্ছি। অথচ রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِذَا سَقَطَتْ لُقْمَةُ أَحَدِكُمْ فَلْيُمِطْ عَنْهَا الأَذَى وَلْيَأْكُلْهَا وَلاَ يَدَعْهَا لِلشَّيْطَانِ ‘যখন তোমাদের কারও খাবারের লোক্বমা পড়ে যায়, তখন সে যেন তার ময়লা দূর করে খেয়ে ফেলে। শয়তানের জন্য ফেলে না রেখে দেয়’।[2]

(২৪) ছহীহ হাদীছের ভুল অর্থ : জুম‘আর দিনে যে ব্যক্তি ‘প্রথমে’ প্রবেশ করবে, সে উট কুরবানীর ছওয়াব পাবে

আবু হুরায়রা (ছাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَنِ اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ غُسْلَ الْجَنَابَةِ ثُمَّ رَاحَ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَدَنَةً، وَمَنْ رَاحَ فِى السَّاعَةِ الثَّانِيَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَقَرَةً، وَمَنْ رَاحَ فِى السَّاعَةِ الثَّالِثَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ كَبْشًا أَقْرَنَ، وَمَنْ رَاحَ فِى السَّاعَةِ الرَّابِعَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ دَجَاجَةً، وَمَنْ رَاحَ فِى السَّاعَةِ الْخَامِسَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَيْضَةً، فَإِذَا خَرَجَ الإِمَامُ حَضَرَتِ الْمَلاَئِكَةُ يَسْتَمِعُونَ الذِّكْرَ.

‘যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন ফরয গোসল করে মসজিদে গেল, যেন সে উট কুরবানীর ছওয়াব পেল। আর যে ব্যক্তি দ্বিতীয় সময়ে গেল, সে যেন গরু কুরবানীর ছওয়াব পেল। আর যে ব্যক্তি তৃতীয় সময়ে গেল, সে যেন দুম্বা কুরবানীর ছওয়াব পেল। আর যে ব্যক্তি চতুর্থ সময়ে গেল, সে যেন মুরগি কুরবানীর ছওয়াব পেল। আর যে ব্যক্তি পঞ্চম সময়ে গেল, সে যেন ডিম কুরবানী করার ছওয়াব পেল’।[3]

এই হাদীছের অর্থ করতে গিয়ে অনেকেই বলে থাকে, জুম‘আর দিন যে ব্যক্তি ‘প্রথমে’ মসজিদে প্রবেশ করবে, সে যেন উট কুরবানীর ছওয়ার পেল। এভাবে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ব্যক্তি এই উল্লেখিত ছওয়াব পাবে।

লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, উক্ত হাদীছে কিন্তু ব্যক্তির কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে সময়ের কথা। তাই শুধু ‘প্রথমে প্রবেশকারী’ মাত্র একজন ব্যক্তি এই ছওয়াবের অধিকারী হবে, তা নয়। বরং ‘প্রথম সময়ের’ মধ্যে যতজন প্রবেশ করবে, সবাই উট কুরবানীর ছওয়াবের অধিকারী হবে। অনুরূপভাবে ‘দ্বিতীয় সময়ে’ যতজন প্রবেশ করবে, সবাই গরু কুরবানীর ছওয়াবের অধিকারী হবে। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে একই কথা। তবে এই সময়টা কীভাবে নির্ধারিত হবে, এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। সঠিক কথা হলো, সূর্যোদয় থেকে শুরু করে আযান পর্যন্ত এই সময়টুকুকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে যা হয়, তার প্রথম ভাগ হবে প্রথম সময়, দ্বিতীয় ভাগ হবে দ্বিতীয় সময়। বাকিগুলো অনুরূপ।[4]

(২৫) প্রাণী যবেহ করার সময় দক্ষিণ দিকে প্রাণীর মাথা করা আবশ্যক মনে করা :

অনেক এলাকায় পশু-প্রাণী যবেহ করার সময় দক্ষিণ দিকে প্রাণীর মাথা রেখে ক্বিবলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে যবেহ করা আবশ্যক মনে করে। শরী‘আতে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। যবেহ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো ‘আল্লাহর নামে তথা বিসমিল্লাহ বলে’ যবেহ করা। কোন দিকে মুখ করে যবেহ করা হলো, তা বিবেচ্য নয়। যদি তাই হত, তাহলে পশু-পাখি শিকার করে খাওয়া হালাল হত না। কেননা শিকারকে লক্ষ্য করে তীর-গুলি নিক্ষেপ করার সময় পশু-পাখির মুখ ক্বিবলার দিকে অনেক সময়ই থাকে না। তবে, ক্বিবলার দিকে করে যবেহ করা ভালো।

(২৬) ভুল নিয়ম : ওযূ, গোসল, খাওয়া বা যে কোনো কাজের শুরুতে পূর্ণ বিসমিল্লাহ পড়া

কুরআনের কোনো সূরা প্রথম থেকে পড়া শুরু করলে পূর্ণ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ পড়তে হয়। সূরা ভিতর থেকে পড়লে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ পড়াই লাগে না। কুরআন তেলাওয়াত ছাড়া অন্য কাজ- যেমন : ওযূ, গোসল, খাওয়া, পান করা, লেখা-পড়া, পশু-প্রাণী যবেহ করা, যানবাহনে আরোহন করা, স্ত্রী সহবাস করা ইত্যাদি কাজ শুরু করার পূর্বে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ পড়তে হয়। পূর্ণ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ পড়া লাগে না।[5]

(২৭) সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালানো :

যানবাহনে চলাচল করার সময় আমরা অনেকেই লক্ষ্য করেছি, সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে গাড়ির চালকেরা গাড়ির বাতি জ্বালিয়ে দেয়। এমনকি দূর পাল্লার গাড়িগুলোতে যেখানে সাধারণত বাতি বন্ধ থাকে, সে গাড়িতেও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও বাতি জ্বালিয়ে রেখে আবার বন্ধ করে দেয়। অনেক বাড়ীতে মা-বোনেরা সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ঘরে বাতি জ্বালিয়ে দেয়। এমনকি যে ঘরে কেউ থাকে না, সে ঘরেও কিছু সময়ের জন্য হলেও বাতি জ্বালায়। এটা সম্পূর্ণ হিন্দুয়ানি কুসংস্কার এবং তাদের সন্ধ্যাপূজার অংশ। তাই এই কাজ থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। অবশ্য একটি কথা উল্লেখ করা যরূরী মনে করছি; সেদিন একটি অটোরিক্সায় উঠলাম। মাগরিবের আযান শুরু হওয়া মাত্রই চালক অটোরিক্সার হেড লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। চালকের কাছে লাইট জ্বালানোর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, মাগরিবের পর লাইট না জ্বালালে ট্রাফিক পুলিশ জরিমানা করে। কারণ লাইট না জ্বালালে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। তো যদি বিশেষ কোনো কুসংস্কারের কারণে না হয়ে কল্যাণকর কোনো প্রয়োজনে বাতি জ্বালানো হয়, তাতে কোনো সমস্যা নেই।

(২৮) বলার ভুল : ছালেহ আল-উছায়মীন

আধুনিককালের শ্রেষ্ঠ তিনজন আরব বিদ্বানের মধ্যে শায়খ ‘মুহাম্মাদ ইবনে ছালেহ আল-উছায়মীন’ (১৯২৫-২০০১ ঈসায়ী) অন্যতম। কিন্তু তার নাম বলতে গিয়ে ভুল করে অনেকেই। বলে থাকে ‘ছালেহ আল-উছায়মীন’। অথচ ‘ছালেহ’ হলেন তার পিতা। নাম বলার সময় অবশ্যই সঠিকভাবে নাম বলা উচিত। সংক্ষেপে বলতে চাইলে এভাবে বলা যেতে পারে, ‘ইবনে উছায়মীন’ বা ‘মুহাম্মাদ আল-উছায়মীন’।

(২৯) কুসংস্কার : খাওয়ার সময় বিষম লাগলে প্রিয়জন স্মরণ করছে

খাবার খেতে খেতে কখনো কখনো আমাদের বিষম লাগে। তখন অনেকেই বলে থাকে, মা-বাবা বা প্রিয়জন কেউ স্মরণ করছে কিংবা ভাবছে সোনামণিটা কী যে খেল, তাই বিষম লেগেছে। অথচ বিষম লাগার সাথে কারও স্মরণ করার কোনো সম্পর্ক নেই। তা নিছক কুসংস্কার। মানুষের শ্বাসনালী ও খাদ্যনালীর অবস্থান খুবই কাছাকাছি। খাবার গ্রহণের সময় কোনোভাবে যদি খাবারের কোন অংশ শ্বাসনালীতে চলে যায়, তখন সেই খাদ্যাংশকে তৎক্ষণাৎ বের করে ফেলার জন্য হাঁচি ও কাশির মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়। এটাই হলো বিষম লাগার কারণ। এর ফলে শ্বাসনালীতে যাওয়া খাদ্যাংশ নাক কিংবা মুখ দিয়ে বের হয়ে গিয়ে শ্বাসনালী পরিষ্কার হয়ে যায়।

(৩০) কোনোদিন দাঁড়ি না কাটলে জান্নাতে লায়লী-মজনুর বিয়ে খেতে পাবে :

বাংলা ভাষায় ‘দৌলত উযীর বাহরাম খান’ বিরচিত ‘লায়লী-মজনু’ রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান কাব্যটি পার্সিয়ান কবি ‘জামী’ বিরচিত ‘লায়লী-মজনু’ নামক কাব্যের ভাবানুবাদ। এই কাহিনীর মূল উৎস আরব্য লোকগাঁথা। সেখানে আমীর পুত্র ‘ক্বায়েস’ বণিক কন্যা ‘লায়লী’র প্রেমে পড়ে পাগল হয়ে যায়। আরবীতে যাকে বলা মজনু। যা এসেছে মাজনূন (مجنون) থেকে। অর্থ- পাগল। এ থেকে কাহিনীর নাম দেওয়া হয় ‘লায়লী-মজনু’। শেষ পর্যন্ত তাদের মাঝে বিবাহ হয়নি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বেহেশতে গিয়ে তারা মিলিত হবে এবং সেখানে তাদের বিবাহ হবে। আর দুনিয়াতে যারা একবারের জন্যও দাঁড়ি ছাঁটেনি কিংবা কাটেনি, তারা তাদের বিবাহের অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাবে।

কিন্তু এই গল্পটি ভিত্তিহীন, কাল্পনিক ঘটনা এবং আরবদের লোকগাঁথামাত্র। জান্নাতে তাদের বিবাহ হওয়া এবং দাঁড়ি না কাটলে তার দাওয়াত পাওয়া, এই কথাগুলোও সম্পূর্ণ অবান্তর। সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য কবি-সাহিত্যিকগণ এসব অলীক কথার জাল বুনেন।

(চলবে)

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৫৪।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/২০৩৪।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৮১; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৫০।

[4]. মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইলি ইবন উছায়মীন, ১৬/১৪০।

[5]. হূদ, ৪১; ছহীহ বুখারী, হা/১৪১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৩৪; ছহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/২৮৯৯; সিলসিলাহ ছহীহাহ, ১/৩৪৫।