প্রচলিত ভুল ও কুসংস্কার

আব্দুল বারী বিন সোলায়মান

(পর্ব-৫)

(৪৫) চন্দ্র-সূর্যগ্রহণে আনন্দে মাতামাতি করা :

চন্দ্র-সূর্যগ্রহণ লাগলে আমাদের দেশে খুশিতে লাফালাফির যেন শেষ থাকে না। গ্রহণ দেখার আগাম প্রস্তুতি হিসাবে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ গ্লাস কেনার হিড়িক পড়ে যায়। অথচ চন্দ্র- সূর্যগ্রহণে আনন্দিত হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। চন্দ্র-সূর্যগ্রহণে পৃথিবীর জন্য মহা হুমকিস্বরূপ। এ সময় বিশাল আকৃতির পাথরখণ্ড প্রচণ্ড গতিতে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে, যা পুরো পৃথিবী ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। এটা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। যার কারণে চন্দ্রে-সূর্যে গ্রহণ লাগলে রাসূল (ছাঃ) ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় ছাহাবীদেরকে ‘গ্রহণের ছালাত’ আদায়ের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন। সুদীর্ঘ ক্বিয়াম, ক্বিরাআত, একাধিক রুকূ ও দীর্ঘ সিজদার মাধ্যমে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন। আবু বাকরা (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে বসা ছিলাম। তখন সূর্যে গ্রহণ লাগল। সাথে সাথে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং (আতঙ্কের কারণে চাদর ঠিক করার সময় পেলেন না) চাদর টানতে টানতে মসজিদে প্রবেশ করলেন। আমরাও মসজিদে গেলাম। অতঃপর গ্রহণ না কেটে যাওয়া পর্যন্ত তিনি আমাদেরকে নিয়ে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করতে থাকলেন। তারপর বললেন, চন্দ্র ও সূর্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম নিদর্শন। কারো মৃত্যুতে তাতে গ্রহণ লাগে না। তাই যখন গ্রহণ দেখবে, তখন তোমরা ছালাত আদায় করো এবং দু‘আ করো যতক্ষণ না গ্রহণ কেটে যায়।[1]  অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন গ্রহণ দেখবে তখন দু‘আ করো, আল্লাহর বড়ত্ব বর্ণনা করো, ছালাত আদায় করো এবং দান-খয়রাত করো’।[2]

(৪৬) ভুল নাম : আব্দুস সুবহান

অনেকের নাম শুনে থাকি ‘আব্দুস সুবহান’। কিন্তু নামের শুরুতে ‘আব্দ’ যুক্ত করতে হয় যদি নামটি আল্লাহর মৌলিক বা গুণবাচক নাম হয়। কিন্তু ‘সুবহান’ শব্দটি কি আল্লাহর নাম? উত্তর- ‘না’। কুরআন-সুন্নাহর কোথাও শব্দটি আল্লাহর নাম হিসাবে ব্যবহৃত হয়নি। বরং ‘সুবহান’ (سبحان) শব্দটি মাছদার বা ক্রিয়ামূল। যার অর্থ ‘পবিত্রতা বর্ণনা করা’। তাহলে ‘আব্দুস সুবহান’ এর অর্থ দাঁড়াবে ‘পবিত্রতা বর্ণনা করার বান্দা’। যা মোটেও প্রাসঙ্গিক নয়।

(৪৭) শিরকী বিশ্বাস : বাজ পাখির দেহের কোনো অংশ বাড়ীতে ঝুলিয়ে রাখলে চোর আসবে না

ঘর-বাড়ীকে চোরের উপদ্রব থেকে রক্ষার জন্য কেউ কেউ বাড়ীতে বাজ পাখির ডানা, মাথা কিংবা শরীরের কোনো অংশ ঝুলিয়ে রাখে। এই বিশ্বাস সম্পূর্ণ শিরক। এর থেকে বেঁচে থাকা একান্ত যরূরী।

(৪৮) কুসংস্কার : রাতের বেলায় ঘর ঝাড়দেওয়া, ময়লা বারান্দার বাইরে ফেলা কুলক্ষণ

রাতের বেলা ঘর-বাড়ী ঝাড়ু দেওয়ার পরে ধুলা-ময়লা বারান্দার বাইরে না ফেলে ঘর বা বারান্দার এক কোণে রেখে দেয় অনেক মা-বোন। বিশ্বাস করে, রাতের বেলা ঘরের বাইরে ধুলা-ময়লা ফেলে দিলে বাড়ী থেকে লক্ষ্মী(!) দূর হয়ে যাবে। এমন বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে শরী‘আত পরিপন্থী। শরী‘আতে এসব বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই। অশুভ লক্ষণও নেই। নেই পেঁচার কোনো অশুভ লক্ষণ। নেই ছফর মাসের কোনো অশুভ লক্ষণ’।[3]

 

(৪৯) বানোয়াট কাহিনী : ফাতিমার জারি

রাসূল (ছাঃ)-এর চার মেয়ের মধ্যে একজন হলেন উম্মে কুলছূম (রাঃ)। তিনি ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী উছমান (রাঃ)-এর স্ত্রী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তার অঢেল সম্পদ ছিল। অপরদিকে আলী (রাঃ)-এর স্ত্রী হলেন ফাতিমা (রাঃ)। তার অর্থ-সম্পদ খুবই কম ছিল। যার দরুন একেবারে সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। একবার উম্মে কুলছূম (রাঃ) মদীনার সকল মহিলাকে খাওয়ার জন্য দাওয়াত করলেন। কিন্তু ফাতিমা (রাঃ) যেহেতু গরীব ছিলেন, অনুষ্ঠানে আসার মতো জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক ছিল না। তিনি অনুষ্ঠানে আসলে উম্মে কুলছূম (রাঃ)-এর মান-সম্মানের ক্ষতি হবে, এই ভেবে তিনি তাকে দাওয়াত দিলেন না। ফাতিমা (রাঃ) যখন জানতে পারলেন যে, মদীনার সকল মহিলাকে দাওয়াত করা হয়েছে। শুধু তাকে দাওয়াত করা হয়নি। তখন তিনি মনে খুব কষ্ট পেলেন এবং ব্যথিত হলেন। এরপর দেখা গেল, মেহমানরা যখন খেতে বসল, তখন সব ভাত চাউল হয়ে গেছে এবং সব গোশত পাথর হয়ে গেছে।

এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন ঘটনা। এতে ফাতিমা (রাঃ)-এর মর্যাদা বৃদ্ধি করতে গিয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর আরেক মেয়ে, যিনি একজন মহিলা ছাহাবী, তার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে। যা চরম ধৃষ্টতা।

(৫০) কুসংস্কার : রাতে পেঁচা ডাকা অশুভ লক্ষণ

পেঁচা একটি নিশাচর প্রাণী। এদের স্বভাব হলো রাতের বেলা শিকার করা। যেহেতু এরা নিশাচর প্রাণী, তাই স্বাভাবিকভাবেই এরা রাতের বেলা ডাকাডাকি করে থাকে। পেঁচার এই ডাককে অনেকেই অনিষ্টের লক্ষণ মনে করে থাকে। তাই বাড়ীতে গর্ভবতী মহিলা কিংবা সদ্য ভূমিষ্ট শিশু থাকলে তাদের ক্ষতি হবে এই আশঙ্কায় অনেকেই পেঁচাকে তাড়িয়ে ফিরে। এটা কুসংস্কার ছাড়া কিছুই নয়। কারণ পেঁচার অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই। অশুভ লক্ষণও নেই। নেই পেঁচার কোনো অশুভ লক্ষণ। নেই ছফর মাসের কোনো অশুভ লক্ষণ’।[4]

 

(৫১) সুন্নাত অবজ্ঞা : খাওয়া শেষে আঙ্গুল ও প্লেট চেটে না খাওয়া

সভ্য হওয়া ও সামাজিকতা রক্ষার নামে রাসূল (ছাঃ)-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাতকে অবজ্ঞা করা আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। খাবার খাওয়ার পর অনেকেই আমরা হাতের আঙ্গুল ও প্লেট চেটে খাই না। আনাস (রাঃ) বলেন,  أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- كَانَ إِذَا أَكَلَ طَعَامًا لَعِقَ أَصَابِعَهُ الثَّلاَثَ. ‘রাসূল (ছাঃ) খাবার খেয়ে তিন আঙ্গুল চেটে খেতেন’।[5]  রাসূল (ছাঃ) আরও বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, তখন সে যেন তার হাত না মুছে যতক্ষণ না তা চেটে খায় অথবা অন্য কাউকে দিয়ে চাটিয়ে নেয়’।[6]

عَنْ جَابِرٍ أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم أَمَرَ بِلَعْقِ الأَصَابِعِ وَالصَّحْفَةِ وَقَالَ إِنَّكُمْ لاَ تَدْرُونَ فِى أَيِّهِ الْبَرَكَةُ.

জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) আঙ্গুলসমূহ ও প্লেট চেটে খেতে আদেশ দিয়েছেন। আর তিনি বলেছেন, ‘তোমরা জানো না তোমাদের খাবারের কোন অংশে বরকত রয়েছে’।[7]

 

(৫২) কুসংস্কার : সাইতটাই খারাপ (শুরুটাই খারাপ)

কাজের শুরুতেই যদি মন্দ কিছু ঘটে যায়, তাহলে কোনো কোনো এলাকায় বলে থাকে, ‘সাইতটাই খারাপ হয়ে গেল’। যেমন: রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হলো, বাড়ী থেকে বের হওয়ার পরই টায়ার পাংচার হয়ে গেল। তখন মনে করে, সাইতটাই খারাপ। আজকের সারাদিন মনে হয় মন্দ যাবে। রিক্সা নিয়ে বের হলো, প্রথম যে যাত্রী রিক্সায় উঠল সে বলছে, ভাই ভাড়ার টাকা পুরোটা নেই, পাঁচ টাকা কম নেন। তখন মনে করে, সাইতটাই খারাপ হয়ে গেল। আজকের সারাটা দিন ইনকাম কম হবে। বাড়ীর ছোট্ট বাচ্চাটা সকালে উঠেই কোনো কারণে আছাড় খেয়ে পড়ে গেছে, তখন মনে করে বাচ্চাটি বুঝি সারাদিন আছাড় খেতেই থাকবে। ঘুম থেকে উঠার পরপরই বাচ্চাটি কোনো কারণে মার খেল, তখন মনে করে সারাদিন বাচ্চাটি মার খাবে। এসব ক্ষেত্রে অনেক এলাকায় বলে থাকে ‘সাইত খারাপ’। এ ধরনের অশুভ লক্ষণের কোনো ভিত্তি নেই। এসব মানুষের কল্পিত ধারণা মাত্র।[8]

 

(৫৩) ভুল বিশেষণ : মরহূম/মারহূম, মাগফূর

মানুষ মারা গেলে তা নামের শুরুতে মরহূম লেখা হয়। অনেক সময় আরবী জানা মানুষরা মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলে ফেলেন, ‘মাগফূর মারহূম/মরহূম অমুক’। এভাবে বলা ঠিক নয়। এভাবে বলার মাধ্যমে অনেকটা গায়েবের জ্ঞানের দাবি করা হয়েছে। কারণ মাগফূর ও মরহূম (مَغْفُوْر ও مَرْحُوْم) এর অর্থ হলো যথাক্রমে- ক্ষমাপ্রাপ্ত ও রহমত/দয়াপ্রাপ্ত। কিন্তু মৃত ব্যক্তি ক্ষমা ও রহমত পেয়েছে কি-না, তা কি জানা সম্ভব? কখনই না। তাহলে তাকে ক্ষমাপ্রাপ্ত ও দয়াপ্রাপ্ত বলা কি ঠিক? এটা গায়েবের দাবি করার নামান্তর নয়? আর গায়েবের দাবি করা শিরক। কারণ গায়েবের সংবাদ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না (আন‘আম, ৫৯; জিন, ২৬)। যদি বলা হয়, এই শব্দ দিয়ে তো তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দু‘আ করাই আমাদের উদ্দেশ্য। তার সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা বলব, যদি তার জন্য ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এর শরী‘আতে প্রমাণিত শব্দ হলো, ‘গফারাল্লাহু লাহু’ (غَفَرَ اللهُ لَهُ) ও ‘রহিমাহুল্লাহ’ (رَحِمَهُ اللهُ) ও ‘রহমাতুল্লাহি আলায়হি’ (رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ)। হাদীছের বিভিন্ন জায়গায় এই শব্দগুলো দিয়ে বিভিন্ন জনকে দু‘আ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো বলতে আপত্তি কোথায়?

(৫৪) কুফুরী মানসিকতা : এটা ইসলামের বিধান’- এসব সেকেলে কথা-বার্তা। এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত’- সত্যিই? তাহলে তো আমল করতে হয়।

সমাজে কিছু বিকৃত মানসিকতার লোক আছে, যারা ইসলামকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে মানে না। বরং ইসলামের বিধান মানলে দুনিয়াবী উপকার আছে, এই কারণে কিছু বিধান মেনে চলে। এই ধরনের লোকদের সামনে বলে দেখুন, দাড়ি রাখছেন না কেন? দাড়ি রাখা তো ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। তখন উত্তর দিবে, দাড়ি রাখলে কেমন জংলী জংলী (আনস্মার্ট) লাগে, তাই রাখি না। আবার তাকে বলুন, বিজ্ঞান বলছে, দাড়ি সেইভ করলে ত্বকের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়, ত্বকে ব্রণ-চুলকানি জাতীয় বিভিন্ন সমস্যা হয়। তাই দাড়ি সেইভ না করা ভালো। তখন ঐ লোকটাই বলে উঠবে, তাই নাকি? সুন্দর তো! দেখো ইসলাম কত প্রাকৃতিক ধর্ম! আবার তাকে বলুন, দাঁড়িয়ে পানি পান করা থেকে শরী‘আত নিষেধ করেছে। খাওয়া শেষে আঙ্গুল ও প্লেট চেটে খাওয়ার কথা বলেছে। তখন সে মনে মনে ভাববে, হুযুরদের কাজ শুধু মানুষকে আদিম যুগে টেনে নিয়ে যাওয়া। এদের মাঝে আধুনিকতা ও সভ্যতা বলতে কিছু নেই। তখন তাকে বলুন, মেডিকেল সায়েন্স বলছে, খাবারের পুষ্টিগত নির্যাস প্লেটের তলায় এসে জমা হয় এবং খাবার খাওয়ার সময় আঙ্গুল থেকে এক ধরনের তরল পদার্থের নিঃসরণ ঘটে, যা হজম ক্রিয়ার জন্য অধিক সহায়ক। তাই আঙ্গুল ও প্লেট চেটে খাওয়া উচিত। আর দাঁড়িয়ে পানি পান করলে সেই পানি পাকস্থলীর দেওয়ালে গিয়ে সরাসরি হিট করে। তাতে পাকস্থলীর দেওয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া দাঁড়িয়ে পানি করলে পানির চাপ বেশি থাকে, বিধায় প্রচণ্ড চাপে শরীরের দূষিত পদার্থ মূত্রথলিতে গিয়ে জমা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে কিডনী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাথে সাথে চমকে উঠে বলে, হায়! হায়! সারাজীবন করেছিটা কী! আর কোনোদিন দাঁড়িয়ে পানি পান করব না।

(৫৫) কুসংস্কার : কথা ঠিক হলে টিকটিকি টিকটিক করে

দু’জনের মাঝে কোনো বিষয়ে কথা হচ্ছে। হঠাৎ ঘরে থাকা টিকটিকি টিকটিক করে ডেকে উঠে। তখন কথক ব্যক্তি বলে উঠে, দেখছো আমার কথা যে ঠিক, তা টিকটিকি টিকটিক করে জানিয়ে দিল। এটা সম্পূর্ণ অবান্তর কথা। টিকিটিকির কি মানুষের ভাষা বুঝার ক্ষমতা আছে, না সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করার যোগ্যতা আছে? এই কথাগুলো বিজ্ঞানের অতিভক্ত লোকদের কলমে উঠে আসে, তখন আরও অবাক হতে হয়। বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস একেবারেই বেমানান।

 

(৫৬) শিরকী বিশ্বাস : চাঁদে সভা বসা

প্রচণ্ড খরা মৌসুমে যখন মানুষের বৃষ্টি খুব প্রয়োজন কিন্তু আকাশে মেঘের কোনো চিহ্ন দেখা যায় না, তখন মেঘহীন আকাশের উজ্জ্বল চাঁদের চতুর্পাশে গোল বৃত্তের মতো রেখা দেখা যায়। তখন কোনো কোনো এলাকায় বলা হয়, বৃষ্টি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য চাঁদে সভা বসেছে। আগামীকাল বৃষ্টি হবে। অর্থাৎ চাঁদ হলো প্রধান কর্তা ব্যক্তি এবং তার চতুর্পাশের এই বৃত্তটি হলো তার সদস্য। তাদের নিয়ে চাঁদ সভায় বসেছে। এই বিশ্বাস পুরোপুরি শিরক। এর মাধ্যমে চাঁদকে বৃষ্টি দেওয়ার মালিক মনে করা হয়। অথচ বৃষ্টি দিতে পারেন একমাত্র আল্লাহ (লুক্বমান, ৩৪)। যায়েদ ইবনে খালেদ আল-জুহানী (রাঃ) বলেন, হুদায়বিয়ার প্রান্তরে রাতের বেলা বৃষ্টি হওয়ার পরে রাসূল (ছাঃ) আমাদের ফজরের ছালাত পড়ালেন। ছালাত শেষে তিনি আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে বললেন, ‘তোমরা কি জানো, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেছেন? ছাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, (আল্লাহ বলেছেন,) أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِى مُؤْمِنٌ بِى وَكَافِرٌ ، فَأَمَّا مَنْ قَالَ مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ . فَذَلِكَ مُؤْمِنٌ بِى كَافِرٌ بِالْكَوْكَبِ ، وَأَمَّا مَنْ قَالَ بِنَوْءِ كَذَا وَكَذَا . فَذَلِكَ كَافِرٌ بِى مُؤْمِنٌ بِالْكَوْكَبِ ‘আমার কিছু বান্দা সকালে মুমিন হয়েছে, আর কিছু বান্দা কাফির হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে যে বলেছে, আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ায় আমরা বৃষ্টি পেয়েছি, সে আমার প্রতি বিশ্বাস করেছে এবং নক্ষত্রকে অস্বীকার করেছে। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের মাধ্যমে আমরা বৃষ্টি পেয়েছি, সে আমাকে অস্বীকার করেছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাস করেছে’।[9]

(৫৭) কুসংস্কার : অমাবশ্যার রাতে যা নিষিদ্ধ

জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে অমাবশ্যা হলো চন্দ্রকলার প্রথম ধাপ। মাসের যে সময়টাতে চাঁদ ও সূর্য যখন একই বরাবর থাকে, তখন খালি চোখে চাঁদকে দেখা যায় না। এই অবস্থাকেই অমাবশ্যা বলে। হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস মতে, এই সময়ে বেশ কাজ করতে নেই। যেমন: নখ কাটতে নেই, দরজা অন্ধকার রাখা ঠিক নয়, এই সময়ে নাকি অশুভ শক্তি ভর করে, আর তা অপরিষ্কার স্থানে বেশি প্রভাব পড়ে তাই ঘর-বাড়ী অপরিষ্কার রাখতে নেই, কোনো শুভ কাজ এই দিনে না শুরু করাই ভালো, গর্ভধারণ তথা স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্ক না হওয়া উচিত প্রভৃতি। এই ধরনের বহু বিশ্বাস সমাজে চালু আছে। ইসলামী শরী‘আতে এসবের কোনো ভিত্তি নেই।[10]  বিধায় কোনোক্রমেই এমন বিশ্বাস মন-মগজে স্থান দেওয়া যাবে না।

 (চলবে)

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১০৪০।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১০৪৪।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২২২২।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২২২২।|

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/২০৩৪।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৪৫৬।

[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/২০৩৩।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২২২২।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৪৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৭১।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২২২২।