প্রচলিত ভুল ও কুসংস্কার

-আব্দুল বারী বিন সোলায়মান*
* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ,
ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।

(মে’২০ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

(পর্ব-৬)

(৫৮) ভুল প্রচলন : পশ্চিম দিক থেকে কবরে লাশ নামানো

আমাদের দেশের অনেক জায়গায় মৃত ব্যক্তিকে পশ্চিম দিক থেকে কবরে নামানো হয়। মনে করা হয় পশ্চিম দিকেই যেহেতু আমাদের ক্বিবলা, তাই শেষ বিদায়টা পশ্চিম দিক থেকেই দিই। কিন্তু এই বক্তব্য সঠিক নয়। বরং ছহীহ হাদীছে পায়ের দিক থেকে লাশ নামানোর কথা বলা হয়েছে।

عَنْ أَبِى اِسحَاقَ قَالَ أَوْصَى الْحَارِثُ أَنْ يُصَلِّىَ عَلَيْهِ عَبْدُ اللهِ بْنُ يَزِيدَ فَصَلَّى عَلَيْهِ ثُمَّ أَدْخَلَهُ الْقَبْرَ مِنْ قِبَلِ رِجْلَىِ الْقَبْرِ وَقَالَ هَذَا مِنَ السُّنَّةِ..

আবু ইসহাক্ব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হারেছ অছিয়ত করে গিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ যেন তার জানাযা পড়ান। তিনি তার জানাযা পড়ালেন, অতঃপর তাকে পায়ের দিকে থেকে কবরে প্রবেশ করালেন। আর বললেন, এটাই সুন্নাত।[1]

عَنْ مُحَمَّدٍ قَالَ كُنْتُ مَعَ أَنَسٍ فِى جَنَازَةٍ فَأَمَرَ بِالْمَيِّتِ فَسُلَّ مِنْ قِبَلِ رِجْلِ الْقَبْرِ.

মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রহি.) বলেন, আমি আনাস (রা.)-এর সাথে এক জানাযায় ছিলাম। তার আদেশক্রমে লাশকে পায়ের দিক থেকে কবরে প্রবেশ করানো হলো।[2]  উল্লেখ্য, লাশকে কবরের মাথার দিক থেকে কিংবা পশ্চিম দিক থেকে লাশ নামানো সম্পর্কে যে হাদীছগুলো বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো দুর্বল।[3]

(৫৯) জামাআত শুরু হয়ে যাওয়ার পরও সুন্নাত ছালাতে রত থাকা :

অনেকেই ফরয ছালাতের ইক্বামত হয়ে যাওয়ার পরও সুন্নাত ছালাত পড়তে থাকে। অথচ ইক্বামত হয়ে গেলে অন্য কোনো ছালাত পড়া যায় না। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল (ছা.)  বলেছেন, إِذَا أُقِيمَتِ الصَّلاَةُ فَلاَ صَلاَةَ إِلاَّ الْمَكْتُوبَةُ   ‘যখন ছালাতের ইক্বামত দেওয়া হবে, তখন ফরয ছালাত ব্যতীত অন্য কোনো ছালাত চলবে না’।[4]  ফজরের সুন্নাতও এই হুকুমের বাইরে নয়। অনেকেই অন্য ওয়াক্তে না পড়লেও ফজরের দুই রাক‘আত সুন্নাত ইক্বামতের পর হলেও ফরয ছালাতের আগে পড়ার চেষ্টা করে। এমনকি ইমামের সালাম ফিরানোর পূর্ব মুহূর্তে হলেও। অথচ ফজরের ছালাতের ইক্বামত হয়ে যাওয়ার পর রাসূল (ছা.) এক ব্যক্তিকে সুন্নাত পড়তে দেখে বলেছিলেন, آلصُّبْحَ أَرْبَعًا ، آلصُّبْحَ أَرْبَعًا ‘তুমি কি ফজরের ছালাত চার রাক‘আত পড়তে চাও? [5]  তুমি কি ফজরের ছালাত চার রাক‘আত পড়তে চাও?  ছহীহ মুসলিমের বর্ণনায় আছে, ইক্বামত দেওয়া হচ্ছিল এমন অবস্থায় এক ব্যক্তিকে সুন্নাতে রত থাকতে দেখে রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বলেছিলেন,  أَتُصَلِّى الصُّبْحَ أَرْبَعًا ‘তুমি কি ফজরের ছালাত চার রাক‘আত পড়বে?’ [6]

উল্লেখ্য, ফজরের সুন্নাত আগে পড়তে না পারলে পরে পড়ে নেওয়া যায়। ক্বায়েস ইবনে আমর (রা.) বলেন, রাসূল (ছা.)  একদা ফজরের ছালাতের পর এক ব্যক্তিকে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করতে দেখে বললেন, ফজরের ছালাত তো দুই রাক‘আত। (তাহলে তুমি কীসের ছালাত পড়ছো?) লোকটি বললেন, ফজরের পূর্বে দুই রাক‘আত আদায় করিনি। তাই এখন সেই দুই রাক‘আত আদায় করলাম। রাসূল (ছা.)  তখন চুপ থাকলেন।[7]

(৬০) তাকবীরে তাহরীমা ধরার আশায় মাসবূক হয়ে গেলে জামাআতে শামিল না হওয়া :

আমাদের দেশের একটি বিশেষ মানহাজের দাওয়াতী গোষ্ঠী আছে, তারা একনাগাড়ে ৪০ দিন তাকবীরে উলা তথা তাকবীরে তাহরীমার[8] সাথে জামা‘আতে ছালাত আদায় করার হাদীছটি[9]  গুরুত্বের সাথে আমল করার চেষ্টা করে থাকে। এটা করতে গিয়ে কোনো কারণে যদি তাদের তাকবীরে তাহরীমা ছুটে যায়, তাহলে তারা জামা‘আতে শামিল না হয়ে উক্ত জামা‘আত শেষে দ্বিতীয় জামা‘আত করে তাকবীরে তাহরীমা ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু এই কৌশলপূর্ণ আমল সম্পূর্ণ ভুল। হাদীছে বর্ণিত উক্ত ফযীলত পেতে হলে নির্দিষ্ট সময়ে হওয়া প্রথম জামা‘আতেই তাকবীরে তাহরীমা ধরতে হবে। অন্যথা উক্ত ছওয়াব লাভ করা সম্ভব হবে না।

(৬১) সালামের উত্তর নীরবে দেওয়া :

একে অপরে সাক্ষাত হলে সালাম দেওয়া ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান। সালামের মাধ্যমে পরস্পরের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।[10]  কিন্তু অনেকেই এমনভাবে সালামের উত্তর দেয় যে, এর মাধ্যমে ভালোবাসা সৃষ্টির পরিবর্তে মনের মধ্যে বিদ্বেষ জন্ম নেয়। কেউ তাকে আগ্রহ নিয়ে সালাম দিল, কিন্তু সে আগ্রহের সাথে উত্তর না দিয়ে খুব নিম্নস্বরে কিংবা মনে মনে উত্তর দেয়। এতে সালাম প্রদানকারী ব্যক্তি বুঝতে পারে না, আসলে উত্তর দিয়েছে কি না। তখন বরং মনে মনে তার প্রতি বিরক্ত হয়। পরবর্তীতে তাকে সালাম দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এক সময় তাদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। এ কারণেই মহান আল্লাহ বলেছেন, وَإِذَا حُيِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا ‘যখন তোমাদের সালামের মাধ্যমে অভিবাদন জানানো হবে, তখন তোমরা তার চেয়ে ভালোভাবে উত্তর প্রদান কর অথবা (অন্ততপক্ষে যেভাবে দিয়েছে) সেভাবে উত্তর দাও’ (নিসা, ৮৬)।

(৬২) সভা-সেমিনারে সম্বোধন করার পরে সালাম দেওয়া :

কথা বলার পূর্বে সালাম দিতে হবে, এটাই ইসলামের রীতি।[11]  কিন্তু আমাদের দেশে কিছু লোককে বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের দেখা যায়, তারা কথা শুরু করে উপস্থিত জনগণকে সম্বোধন করেন, পূর্ববর্তী নেতাদের কীর্তিসমূহ স্মরণ করে তারপর বর্তমান নেতাদের সাফল্যের কথা তুলে ধরার পর জনগণের উদ্দেশ্যে সালাম প্রদান করে। এর প্রভাব দুয়েকজন আলেমের মাঝেও পরিলক্ষিত হয়। অথচ ইসলাম বলে, কথা শুরুই করতে সালাম দিয়ে।[12]  তাই শরী‘আতের নির্দেশ মেনে কথা শুরু করার পূর্বে সালাম দেওয়াই কর্তব্য।

(৬৩) পুরুষদের জামাআত না হওয়া পর্যন্ত মহিলাদের ছালাত আদায় না করা :

শরী‘আত সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে আমাদের দেশের অনেক নারী মনে করে, মসজিদে পুরুষের জামা‘আত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িতে মহিলাদের ছালাত বিশুদ্ধ হবে না। তাই কোনো কাজ না থাকা সত্ত্বেও মসজিদ থেকে পুরুষদের ফিরে আসার অপেক্ষা করতে থাকে। অথচ তাদের ছালাত বিশুদ্ধ হওয়ার সাথে পুরুষদের জামা‘আত হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং ছালাতের ওয়াক্ত শুরু হলেই যে কারও জন্য ছালাত পড়া বিশুদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন,  إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا ‘নিশ্চয়ই ছালাত মুমিনদের উপরে নির্দিষ্ট সময়ে ফরয’ (নিসা, ১০৩)।

(৬৪) আযান না হওয়া পর্যন্ত সময় হলেও ছালাত হবে না :

অনেক সময় এই জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়েছি, ‘যোহরের আযান হবে দুপুর ১.০০ টায়। কোনো কারণে ১২.৩০ টার দিকে ছালাত আদায় করে নেওয়া প্রয়োজন। এখন আযান হওয়ার আগে ছালাত হবে কি?’ তাদের ধারণা আযান না হওয়া পর্যন্ত মনে হয় ছালাত হবে না। কিন্তু তা সঠিক নয়। ছালাত বিশুদ্ধ হওয়ার সম্পর্ক ‘সময় হওয়া’র সাথে। ‘আযান হওয়া’র সাথে নয়। তাই ছালাতের ‘সময়’ হয়ে গেলে ছালাত আদায় করা যাবে, আযান হোক বা না হোক। সচেতন মুসলিম হিসাবে ছালাতের সময় সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। বর্তমান যুগে ছালাতের সঠিক সময় নির্ধারণী অনেক ক্যালেন্ডার/পঞ্জিকা পাওয়া যায়। আপনার হাতের নাগালে বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ রয়েছে। সেখান থেকে ছালাতের সঠিক সময় সম্পর্কে জেনে প্রয়োজনে ছালাত আদায় করতে পারেন।

(৬৫) রামাযানের ২৭ এর রাতকে লায়লাতুল ক্বদর হিসাবে নির্দিষ্ট করা :

আমাদের দেশে রামাযান মাসের ২৭ তারিখকে লায়লাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদর হিসাবে পালন করা হয়ে থাকে। সরকারিভাবে এ দিনকে ছুটিও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দ্বীন সম্পর্কে সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, নির্দিষ্টভাবে ২৭ তারিখ লায়লাতুল ক্বদর হতে পারে না। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘তোমরা রামাযানের শেষ দশকে লায়লাতুল ক্বদর সন্ধান করো’।[13]  নূন্যতমপক্ষে শেষ দশকের বেজোড় পাঁচ রাতে এই রাত তালাশ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বলেছেন, إِنِّى أُرِيتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ ، ثُمَّ أُنْسِيتُهَا أَوْ نُسِّيتُهَا فَالْتَمِسُوهَا فِى الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ فِى الْوَتْرِ ‘…আমাকে ক্বদরের রাত্রিটা নির্দিষ্টভাবে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব তোমরা রামাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লায়লাতুল ক্বদর সন্ধান করো’।[14]

(৬৬) সিজদায় নাক ও এক/দুই পা উঠিয়ে নেওয়া :

সিজদায় গিয়ে অনেকে মাটিতে নাক না ঠেকিয়ে শুধু কপালের উপর সিজদা করে। এটা ঠিক নয়। নাক কপালের অন্তর্ভুক্ত। তাই সিজদায় কপালের সাথে সাথে নাকও মাটিতে ঠেকিয়ে রাখতে হবে। অনেকে আবার সিজদায় গিয়ে পায়ের পাতা মাটিতে ঠেকিয়ে রাখে না। কেউ এক পা, কেউ বা আবার উভয় পায়ের পাতা উঠিয়ে নেয়। এই কাজও ভুল। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূল (ছা.) বলেছেন, أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ عَلَى الْجَبْهَةِ وَالْيَدَيْنِ وَالرُّكْبَتَيْنِ وَأَطْرَافِ الْقَدَمَيْنِ وَلَا نَكْفِتَ الثِّيَابَ وَلَا الشّعْرَ ‘আমাকে সাত অঙ্গের উপর সিজদা করতে বলা হয়েছে- কপাল, দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের শেষ প্রান্তের উপর। আর মাথার চুল এবং কাপড় গুটিয়ে না রাখার আদেশ করা হয়েছে’।[15]

(৬৭) লাশের মাপ নেওয়া লাঠি/কাঠি কবরের মাটির সাথে পুঁতে দেওয়া :

কোনো কোনো এলাকায় লাশ কতটুকু লম্বা তা মাপ নিয়ে সে অনুযায়ী তার কবর খনন করা হয়। যে কাঠি দিয়ে মাপ নেওয়া হয়, দাফনের সময় সেটা আবার ভেঙ্গে তার কবরের মাটির মধ্যে পুঁতে দেওয়া হয়। আমার বুঝে আসে না, কবরের মাপ ঠিক করার জন্য লাশের মাপ নেওয়ার আবশ্যকতা কেন? একজন মানুষকে জীবিত অবস্থায় দেখলেই বুঝা যায় তার কবরের দৈর্ঘ্য কতটুকু হতে পারে। আর যদি একান্তই লাশের দৈর্ঘ্য বুঝা না যায়, তাহলে লাঠি বা কাঠি দিয়েই কেন মাপ নিতে হবে? ফিতা দিয়ে কেন হবে না? যদি লাঠি বা কাঠি দিয়ে মাপ নিলেনই বা, তাহলে সেই কাঠি কবরের মাটিতে পুঁতে দিতে হবে কেন? এর কারণ হতে পারে, লাশের মাপকাঠিকে মানুষ হয়ত অশুভ মনে করে অন্য কাজে ব্যবহার করা উচিত মনে করে না। এজন্য তা কবরের মধ্যেই পুঁতে দেওয়া ভালো মনে করে। শরী‘আতে এমন কাজের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই এসব থেকে বিরত থাকা যরূরী।

(৬৮) ভুল ফৎওয়া : অহঙ্কার না আসলে টাখনুর নিচে পোশাক পরাতে কোনো সমস্যা নেই :

টাখনুর নিচে পোশাক পরিধান করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছা.)  কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন।

عَنْ سَالِمِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ عَنْ أَبِيهِ عَنِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ «الإِسْبَالُ فِى الإِزَارِ وَالْقَمِيصِ وَالْعِمَامَةِ مَنْ جَرَّ مِنْهَا شَيْئًا خُيَلاَءَ لَمْ يَنْظُرِ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ».

সালেম (রহি.) তার পিতা ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘লুঙ্গি, জামা (জুব্বা/আলখিল্লা), পাগড়ি সবকিছুর ক্ষেত্রে ঝুলিয়ে পরার নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য। সুতরাং যে ব্যক্তি অহঙ্কারবশত এর কোনোটি ঝুলিয়ে পরবে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তার দিকে তাকাবেন না’।[16]   হাদীছে ‘অহঙ্কারবশত’ শব্দটি থাকায় কেউ কেউ বলেছেন, ‘অহঙ্কার’ ছাড়া টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তাদের এই দাবি সঠিক নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছা.) অন্য হাদীছে বিষয়টিকে ‘অহঙ্কার’ শব্দ ছাড়াই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, مَا أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ مِنَ الإِزَارِ فَفِى النَّارِ ‘লুঙ্গির যে অংশ টাখনুর নিচে ঝুলে থাকবে, তা জাহান্নামে যাবে’।[17]  এক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দলীল হলো, আবুবকর (রা.)-এর হাদীছটি- আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) যখন বললেন, ‘যে ব্যক্তি অহঙ্কার করে কাপড় ঝুলিয়ে পরবে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না’। এ কথা শুনে আবুবকর (রা.) বললেন, (হে আল্লাহর রাসূল!) সতর্ক হয়ে না থাকলে আমার কাপড়ের এক প্রান্ত তো ঝুলে যায়? তখন রাসূলুল্লাহ (ছা.) বললেন, إِنَّكَ لَسْتَ تَصْنَعُ ذَلِكَ خُيَلاَءَ  ‘তুমি সেটা অহংকার করে করছো না’।[18]  এই হাদীছ থেকে তারা দলীল দেয়, অহঙ্কার না আসলে ঝুলিয়ে পরা নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু এই হাদীছ থেকে তাদের বক্তব্য প্রমাণিত হয় না। কারণ হাদীছের প্রথম অংশে আবুবকর (রা.) বলেছেন, ‘সতর্ক হয়ে না থাকলে ঝুলে যায়’। তার মানে তিনি সতর্ক থাকতেন যেন না ঝুলে যায়। কিন্তু কখনো কখনো অসতর্ক অবস্থায় ঝুলে যেত। ইচ্ছাকৃত তিনি এটা করতেন না। এ কারণে রাসূল (ছা.) তাকে বলেছেন, ‘তুমি এটা অহঙ্কার করে করছো না’। (বরং তা অসতর্কতার কারণে হয়ে যায়)। তাহলে যারা এই হাদীছের মাধ্যমে দলীল পেশ করছেন, তাদের কাপড় ঝুলে যাওয়াটা অসতর্কতার কারণে হয়, না ইচ্ছাকৃত হয়? যদি আপনার এটা অসতর্কতাবশত হয়, তাহলে আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন। আর যদি সেটা হয় ইচ্ছাকৃত, তাহলে তার পরিণতি কী হবে, সেটা আল্লাহই ভালো জানেন।

এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। কিছু লোককে দেখা যায়, তারা টাখনুর সামান্য উপরে লুঙ্গি বা প্যান্ট পরিধান করে। কিছুক্ষণ হাঁটা-চলা করলে লুঙ্গি বা প্যান্ট টাখনুর নিচে নেমে যায়। তখন যদি তাদেরকে বলা হয়, টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরেন কেন? তখন উত্তর দেয়, উপরেই তো পরি, নিচে নেমে যায়, কী করব? তাদের উদ্দেশ্যে বলব, টাখনুর সামান্য উপরে কাপড় পরা কি আপনার সতর্কতার পরিচয়? যদি এটা সতর্কতা না হয়, তাহলে সতর্কতা কাকে বলে তা রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর হাদীছ থেকে জেনে নিন, তাহলেই সমাধান হয়ে যাবে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর সম্মুখ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেই সময় আমার লুঙ্গি ঝুলানো ছিল। তিনি আমাকে বললেন, يَا عَبْدَ اللهِ ارْفَعْ إِزَارَكَ ‘হে আব্দুল্লাহ! তোমার লুঙ্গি উঠিয়ে নাও’। আমি তা উঠিয়ে নিলাম। অতঃপর বললেন, « زِدْ » ‘আরও উঠাও’। আমি আরও উঠালাম। এর পর হতে আমি সর্বদা লুঙ্গি উপরে পরার ব্যাপারে তৎপর থাকতাম। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করল, কতটুকু উপরে উঠাতে হবে। তিনি বললেন, দুই পায়ের অর্ধ নলা পর্যন্ত’।[19]  অন্য বর্ণনায় আছে, নবী (ছা.) বললেন, ‘তুমি আব্দুল্লাহ হয়ে থাকলে তোমার লুঙ্গি উপরে তোলো। তখন আমি আমার লুঙ্গি উপরে করলাম। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি (ইবনে ওমর) এভাবেই ছিলেন।[20]

(চলবে)

[1]. আবুদাঊদ, হা/৩২১১।

[2]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৪০৮১; মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, ৪/১৩০, শু‘আইব আল-আরনাউত্ব বুখারী-মুসলিমের শর্তে ছহীহ বলেছেন; আলবানী, আহকামুল জানায়িয, ১/১৫১।

[3]. বিস্তারিত দেখুন: আলবানী, আহকামুল জানায়িয, পৃ. ১৫১, মাসআলা নং ১০৩।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭১০; আবুদাঊদ, হা/১২৬৬।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩২।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭১১।

[7]. আবুদাঊদ, হা/১২৬৭; মিশকাত, হা/১০৪৪।

[8]. মিরকাত, ৩/৮৮০, হা/১১৪৪-এর ব্যাখ্যা দ্র.।

[9]. তিরমিযী, হা/২৪১; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৬৫২।

[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৪; আবুদাঊদ, হা/৫১৯৩; মিশকাত, হা/৪৬৩১।

[11]. তিরমিযী, হা/২৬৯৯; মিশকাত, হা/৪৬৫৩।

[12]. তিরমিযী, হা/২৬৯৯; মিশকাত, হা/৪৬৫৩।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৯।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৭।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/৮১২; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯০; মিশকাত, হা/৮৮৭।

[16].  আবুদাঊদ, হা/৪০৯৪; নাসাঈ, হা/৫৩৩৪; ইবনে মাজাহ, হা/৩৫৭৬; মিশকাত, হা/৪৩৩২, হাদীছ ছহীহ।

[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৮৭; মিশকাত, হা/৪৩১৪।

[18]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬৬৫, ৫৭৮৪; নাসাঈ, হা/৫৩৩৫; মিশকাত, হা/৪৩৬৯।

[19]. ছহীহ মুসলিম, হা/২০৮৬; মিশকাত, হা/৪৩৬৮।

[20]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৬২৬৩; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৫৬৮।