প্রচলিত ভুল ও কুসংস্কার

-আব্দুল বারী বিন সোলায়মান
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।

 

সকল প্রশংসা ও স্তুতি একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য, যিনি আমাদের বাকশক্তির মত বিরাট নে‘মত দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। শান্তি অবতীর্ণ হোক মানবতার মহান শিক্ষক, নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি, যিনি নিজের পক্ষ থেকে কোনো কথা বলতেন না। যা বলতেন, সবই ছিল অহি। অতঃপর বাকশক্তি মহান আল্লাহ প্রদত্ত এক শ্রেষ্ঠ নে‘মত, যা দিয়ে তিনি সৃষ্টির সেরা জীব মানবজাতিকে ধন্য করেছেন। এর মাধ্যমে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু অন্য কোনো প্রাণী ভাষা দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না।

কথা বলার শক্তি দেওয়া হয়েছে বলে যা ইচ্ছা তাই বলার স্বাধীনতা মানুষকে দেওয়া হয়নি। বরং তার প্রতিটি কথা সংরক্ষিত হচ্ছে। প্রতিটি কথার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيد ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য তার পাশেই রয়েছে তৎপর প্রহরী’ (ক্বাফ, ১৮)। কথা বলতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় এমন কথা বলে ফেলে, যা তাকে কুফরীর দিকে ধাবিত করে। পরিণতিতে সে জাহান্নামের অধীবাসী হয়ে যায়।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ، يَنْزِلُ بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ» ‘আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, মানুষ কথা বলে যায়, ভাবে না সে কী বলছে, শেষ পর্যন্ত এ কথাই তাকে জাহান্নামে নিয়ে গিয়ে পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে যে ব্যবধান, তার চেয়েও দূরে পাঠিয়ে দেয়’।[1]  ইমাম নববী (রাঃ) বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কী বলছে তা ভেবে দেখে না কিংবা কথাটি কতটুকু জঘন্য তা চিন্তা করে না। একথার পরিণতি কী হতে পারে, তাও চিন্তা করে না। অপর বর্ণনায় এসেছে, মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা বলতে থাকে, চিন্তুা করে দেখে না সে কী বলছে, কিন্তু এর মাধ্যমে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। অপর দিকে কখনো সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কথা বলতে থাকে, ভেবে দেখে না কী বলছে, এর কারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন’।[2]

এই ভয়াবহ পরিণামের কথা জেনেও আমরা আমাদের কথার ব্যাপারে সাবধান হতে পারি না। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অনেক সময় এসব কথা বলে ফেলি। আমাদের সমাজে এ ধরনের বহু কথা প্রচলিত আছে, যা স্পষ্ট কুফরী। কতক বাক্য এমন আছে যা স্পষ্ট কুফরী নয়, তবে শরী‘আতের সাথে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের ভুলগুলো ‘প্রচলিত ভুল’ শিরোনামে ধারাবহিকভাবে আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

(১) ভুল প্রবাদ : মহাভারত কি অশুদ্ধ হয়ে যাবে?

বাংলা ভাষায় একটি ভুল প্রবাদ চালু আছে, যা বাস্তবতার বিচারে ঠিক নয়। রাগ, ক্ষোভ, অভিমান ইত্যাদির প্রেক্ষিতে অনেকেই বলে ফেলে, ‘আরে খাও না, খেলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে।’

মহাভারত হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ। ‘শ্রী দ্বৈপায়ন বেদব্যাস’ কর্তৃক রচিত একটি মহাকাব্য। যেহেতু এ গ্রন্থ মানবরচিত, তাই স্বাভাবিকভাবেই এর মাঝে অসংখ্য ভুল রয়েছে। কিন্তু এ প্রবাদ ব্যবহার করার মাধ্যমে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে যে, এ গ্রন্থটি বিশুদ্ধ ও নির্ভুল। তার মানে তুমি খেলেও মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। তাই জোর দিয়ে বলা হয়, ‘খেলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?’

তাই একজন মুসলিমের জন্য এই প্রবাদ পরিত্যাগ করা একান্ত যরূরী।

(২) বলার ভুল : লক্ষ্মী ছেলে/লক্ষ্মী মেয়ে

কোনো অসীলায় মানুষের অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছলতা আসলে তখন বলে, অমুক জিনিসটাই আমার লক্ষ্মী। একজন লোকের হয়তো অভাব-অনটন চলছিল। তৃতীয় সন্তান হওয়ার পর থেকে হঠাৎ করে তার ধন-সম্পদে বরকত হতে লাগল। তখন বলে থাকে, তৃতীয় সন্তানটিই আমার লক্ষ্মী। অথবা বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে লাভের মুখ দেখতে পায়নি। একবার পাটের ব্যবসা শুরু করল। সেখান থেকে প্রচুর লাভ আসতে লাগল এবং একসময় বিত্তশালীতে পরিণত হলো। তখন বলে, পাটের ব্যবসাটাই আমার লক্ষ্মী। এভাবে কোনো কিছুকে লক্ষ্মী বলা বা মনে করা স্পষ্ট শিরক। মানুষকে কল্যাণ দান করার একমাত্র মালিক হলেন মহান আল্লাহ। অন্য কেউ নয়। তাই অন্য কিছুকে কল্যাণদাতা মনে করলে শিরক হবে। তাছাড়া লক্ষ্মী কথাটির ধারণা এসেছে হিন্দুদের দেবতা ‘লক্ষ্মী’ থেকে। যাকে তারা ‘ধন-ঐশ্বর্যও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী’ মনে করে থাকে।[3] ইসলামে এ সকল প্রতিমাপূজা ও বহু-ঈশ্বরবাদের  কোনো স্থান নেই। এমনকি স্বয়ং হিন্দু ধর্মেও নেই। অনুরূপভাবে ছেলে, মেয়ে বা স্ত্রী ভালো স্বভাবের হলে তাদেরকে লক্ষ্মী ছেলে, লক্ষ্মী মেয়ে, লক্ষ্মী বউ বলে ডাকা ঠিক নয়।

(৩) ভুল বিশ্বাস : হাত থেকে থালা-বাসন পড়ে গেলে বাড়ীতে মেহমান আসবে

কখনো কখনো কোনোভাবে হাত থেকে থালা-বাসন পড়ে যায়। তখন অনেকেই মনে করে, হাত থেকে থালা পড়ে গেল, তাহলে বাড়ীতে কুটুম্ব বা মেহমান আসবে। এ ধারণা নিতান্তই ভুল এবং সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন ধারণা। কখনো কারও ক্ষেত্রে হয়তো কাকতালীয়ভাবে তা হয়ে যেতে পারে, কিন্তু হাত থেকে থালা পড়ার কারণেই মেহমান এসেছে, এমন ধারণা একেবারেই ভিত্তিহীন। ইসলামে কুসংস্কারের কোনো স্থান নেই।

(৪) ভুল বিশ্বাস: জন্মের সপ্তম দিনে ভাগ্য লেখা হয়

অনেক এলাকায় মনে করা হয়, শিশু জন্মের সপ্তম দিনে তার ভাগ্য, আমল, আয়ুষ্কাল, রিযিক্ব ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করা হয়। কোনো কোনো এলাকায় এই দিনটিকে ‘সাঠিরার দিন’ বলা হয়। তাই এই দিনে মায়েরা তাদের শিশুকে উত্তমরূপে গোসল করিয়ে, গায়ে তেল মাখিয়ে, চোখে কাজল দিয়ে, সুন্দর পোশাক পরিয়ে পরিপাটি করে রাখে। এই বিশ্বাসে যে, শিশুটি সুন্দর ও পরিপাটি হয়ে থাকলে তার ভাগ্য ভালো হবে। এমন বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে শরী‘আত পরিপন্থী। এর উৎপত্তি হিন্দুয়ানী বিশ্বাস থেকে। তারা মনে করে থাকে যে, শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার সপ্তম দিনে ‘অন্তীম ঋষি’ এসে শিশুর কপালে তার ভাগ্য লিপিবদ্ধ করে দিয়ে যায়। এই বিশ্বাস ঠিক নয়। জন্মের পরে শিশুর ভাগ্য লিখিত হয় না। বরং জন্মের মোটামুটি আরও ছয় মাস আগে, যখন ভ্রুণের বয়স চার মাস, তখন তার ভাগ্য লিখে দেওয়া হয়।[4]  তাই এই ভ্রান্ত আক্বীদা ও আমল বর্জন করা যরূরী।

(৫) নামের ভুল : মাহিন/মুহিন/মাহিম

অনেকের নাম শোনা যায়, মাহিন/মুহিন/মাহিম ইত্যাদি। অর্থগত দিক থেকে নামগুলো সুন্দর নয়। মাহিন অর্থ অপমানিত, লাঞ্ছিত। মুহিন অর্থ অপমানকারী, বে-ইযযতকারী। মাহিম অর্থ চিন্তিত, পেরেশান, প্রচ- তৃষ্ণার্ত, প্রেমাসক্ত ইত্যাদি। নাম রাখার পূর্বে নামের অর্থের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করে নাম রাখা উচিত। প্রয়োজনে আলেমদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ নামের অর্থ খারাপ হলে তার একটা প্রভাব ব্যক্তির উপর থেকে যায়। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার দাদা (হাযণ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে আসলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী? তিনি বললেন, হাযন (চিন্তা)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, না, তোমার নাম বরং সাহল (সহজ)। আমার দাদা বললেন, আমার পিতা আমার যে নাম রেখেছেন, তা আমি পরিবর্তন করব না। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন, এর ফলে পরবর্তীতে সব সময় আমাদের মাঝে দুঃখ-চিন্তা লেগেই ছিল।[5]  এজন্য রাসূলুল্লাহ ধ ছাহাবীদের মন্দ নামগুলো পরিবর্তন করে সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখতেন।[6]

(৬) ভুল সম্বোধন : হ্যালো/হাই

অনেক সময় আমরা মোবাইলে কল রিসিভ করে বলে থাকি হ্যালো, হাই ইত্যাদি। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলাপচারিতায় কাউকে প্রথম সম্বোধনের সময় লিখে ফেলি ‘হাই’। এগুলো সব অমুসলিমদের সংস্কৃতি। এক মুসলিমের সাথে অপর মুসলিমের দেখা হলে কিংবা কথা হলে প্রথম যে সম্বোধন তার মুখ থেকে বের হবে, তা হলো আস-সালামু আলাইকুম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘কথা বলার পূর্বে সালাম দিতে হবে’।[7]  এ ছাড়াও আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তাকে বললেন, ঐ যে বসে থাকা ফেরেশতার দল দেখতে পাচ্ছো, তাদের কাছে গিয়ে সালাম দাও এবং দেখ তারা কী উত্তর দিচ্ছে। কারণ সেটাই হবে তোমার এবং তোমার সন্তাদের পরস্পরের অভিবাদনের পদ্ধতি। তিনি গিয়ে আস-সালামু আলাইকুম বললে, তারা উত্তরে বললেন, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।[8]  এই হাদীছ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিমদের সম্বোধনের শব্দ অবশ্যই সালাম হওয়া উচিত।

(৭) ভুল বিশেষণ : রাসূলে পাক

বুঝে না বুঝে অনেকেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নাম বলতে গিয়ে বলে বসে ‘রাসূলে পাক’। কিন্তু ভেবে দেখে না ‘রাসূলে পাক’ বললে কী মারাত্মক ভুল হতে পারে। ‘পাক’ শব্দটি ফারসী, অর্থ-পবিত্র। যার আরবী প্রতিশব্দ আসে ‘সুবহান’। যেমন বলা হয়, سبحان الله (সুবহানাল্লাহ) অর্থ- আল্লাহ পাক। অর্থাৎ যিনি সকল প্রকার অক্ষমতা, দুর্বলতা ও ত্রুটি থেকে পবিত্র। কিন্তু الرسول سبحان (সুবহানার রাসূল অর্থাৎ রাসূলে পাক) বলে কোনো পরিভাষা কুরআন-সুন্নাহর কোথাও পাওয়া যায় না। এর কারণ, سبحان শব্দের অর্থ হলো, ‘সকল প্রকার অক্ষমতা, দুর্বলতা ও ত্রুটি থেকে পবিত্র’। এটা শুধু আল্লাহ্র ক্ষেত্রে হতে পারে। কোনো মানবের ক্ষেত্রে নয়। এমনকি স্বয়ং রাসূল ধ-এর ক্ষেত্রেও নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পাপ থেকে মুক্ত তথা নিষ্পাপ হলেও মানুষ হিসাবে ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তিনি নিজেই বলেছেন, وَلَكِنْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ  أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ ، فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكِّرُونِى ‘কিন্তু আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমরা যেমন ভুল করো, আমিও তেমন করি। তাই যদি আমার ভুল হয়ে যায়, তাহলে তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে’।[9] তাই রাসূলে পাক শব্দটি সঠিক নয়।

(চলবে)

[1].  ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৭৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৮৮।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৭৮।

[3].  ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি, পৃঃ ১০৪৫।

[4].  ছহীহ বুখারী, হা/৭৪৫৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৩।

[5].  ছহীহ বুখারী, হা/৬১৯৩, ৬১৯০; মিশকাত, হা/৪৭৮১।

[6].  ছহীহ বুখারী, হা/৬১৯৩, ৬১৯০; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৩৯।

[7]. তিরমিযী, হা/২৬৯৯; সিলসিলাহ ছহীহাহ/৮১৬, সমর্থক হাদীছ থাকার ভিত্তিতে হাদীছটি হাসান লি-গায়রিহি।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৩১৪৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৪১।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৪০১; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭২।