প্রভুর ঘোষণা কুরআন সুবোধ্য


তাজরীন নাহার নুসরাত*


মহান আল্লাহ মানবজাতিকে হেদায়াতের পথের সন্ধান দিতে  পবিত্র কুরআন মাজীদ নাযিল করেছেন। যাতে মানবজাতি কুরআনের বিধিবিধান সম্পর্কে ব্যাপকভাবে  চিন্তাভাবনা করতে পারে এবং সেখান থেকে উপদেশ গ্রহণ করে জীবনের প্রারম্ভ থেকে সমাপ্তি অবধি  তার জীবনকে কুরআনের আলোকে ঢেলে সাজাতে পারে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,﴿كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ﴾ ‘(হে রাসূল!) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এবং যাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে’ (ছোয়াদ, ৩৮/২৯)। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেছেন,﴿وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ﴾ ‘আর আপনার কাছে আমি স্মরণিকা অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি লোকদের সামনে ওই সব বিষয় বিবৃত করেন, যেগুলো তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তাভাবনা করে’ (আন-নাহল, ১৬/৪৪)

মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের বাণীসমূহ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে বলেছেন। কুরআনের বাণীসমূহ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হলে কুরআনকে বুঝতে হবে। আর কুরআনকে বুঝতে হলে প্রথমেই কুরআন শিখতে হবে। মহান আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন কুরআন শেখা সহজ। মহান আল্লাহর বাণী, ﴿وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ﴾ ‘বস্তুত আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। সুতরাং কেউ কি আছে যে উপদেশ গ্রহণ করবে?’ (আল-ক্বামার, ৫৪/১৭)।  

মহান প্রতিপালক তাঁর  অফুরন্ত দয়ায় কুরআনকে আমাদের জন্য সুবোধ্য করে দিয়েছেন, যাতে আমরা বুঝতে পারি। কাজেই কুরআনকে বুঝার জন্য, কুরআনকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য আমাদেরকে কুরআন শিক্ষার প্রতি বিশেষভাবে মনোনিবেশ করতে হবে। কুরআনকে বেশি বেশি অধ্যয়নের মাধ্যমে কুরআনকে বুঝার দৃঢ় অধ্যবসায় চালিয়ে যেতে হবে।

আল্লাহ তাআলা যেহেতু নিজেই বলেছেন যে, তিনি আমাদের জন্য কুরআনকে সহজবোধ্য করে দিয়েছেন। তাই এটা ভুলেও ভাবা যাবে না যে, কুরআন দুর্বোধ্য। পক্ষান্তরে  এমন ভাবা হবে মহান প্রতিপালকের বাণীর ঘোর বিরোধিতা করার শামিল (আল্লাহ আমাদের মাফ করুক)।

কুরআন শিক্ষার ব্যাপারে অপারগতা দেখানো কোনোক্রমেই যাবে না। কুরআনকে সহজ করা হয়েছে তাই বলে এটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হৃদয়ঙ্গম হবে না। এর জন্য মনস্থির করে সময় ব্যয় করতে হবে, অবিরাম পরিশ্রম করে প্রচেষ্টা চালিয়ে কুরআনকে অন্তরে পরিগ্রহ করতে হবে। প্রভুর বাণীকে আয়ত্ত করতে কোনোক্রমেই পরাজয় মানা যাবে না। তবেই কুরআন আমাদের মাঝে তার নূরের তাজাল্লী বিস্তার করবে। 

কুরআন শিক্ষা গ্রহণের সাথে সাথে কুরআনের উপদেশগুলোকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে সেই অনুযায়ী আমাদের জীবন পরিচালনা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা মূলত কুরআনকে উপদেশ লাভের নিমিত্তেই সুবোধ্য করেছেন। কুরআনে মানবজাতির জন্য আল্লাহ যেসব ম্যাসেজ দিয়েছেন, সেগুলোকে জীবনের প্রত্যেকটি স্তরে ধারণ করতে হবে। কুরআনের অনুশাসন না মেনে আমরা যদি কুরআনের বাণীসমূহকে আওড়াই, তাহলে এতে আমাদের কোনো উপকার নাই। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, একজন অসুস্থ লোক ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার তাকে একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দিল। ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে লিখে দিল যে, প্রতিদিন দিনে তিন বার এ ওষুধটি খাবেন। অসুস্থ লোকটা প্রেসক্রিপশনটি নিল এবং প্রতিদিন সেটা মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল। কিন্তু প্রেসক্রিপশনের নির্দেশনাগুলো কাজে পরিণত করল না, ওষুধগুলো ঠিকমতো খেল না। আপনার কী ধারণা? লোকটা কি সুস্থ হয়ে উঠবে? নিশ্চয়ই  সুস্থ ও বিবেকবান কোনো লোক উত্তরটা না-বোধক দিবে। এবার আমাদের কথাই ধরি,  এই যে আমরা যতটুকুই কুরআন পড়ছি এবং তা থেকে যা উপলব্ধি করছি, তা যদি বাস্তব জীবনে না মানি, তাহলে কি কোনো লাভ হবে? কখনো হবে না! 

কাজেই আমাদেরকে কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি কুরআনের আদেশ-নিষেধগুলোকে  বাস্তব জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। আল-কুরআনের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য আমাদের মহান প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এসেছে। যিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞাত। যিনি সবচেয়ে জ্ঞানী। যিনি প্রবল পরাক্রমশালী ও সবকিছুর মালিক। তাই আল-কুরআন জ্ঞানের উৎস হিসেবে অনন্য। আমাদেরকে অবশ্যই কুরআনের অমিত জ্ঞান অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে।

আজকের বিশ্বে দেখা যায়, মুসলিমরা কুরআনের মতো এত অনন্য গ্রন্থের অধিকারী হয়েও এই কুরআন থেকে হেদায়াতের নূর আহরণ করতে পারছে না। এটার অন্যতম কারণ হলো কুরআনকে মূল্যায়ন না করা ও সঠিকভাবে তা বুঝতে না পারা। এটা খুবই দুঃখজনক! আল্লাহ তাআলা কত মধুর ভাষায় বলেছেন, ﴿لَقَدْ أَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ كِتَابًا فِيهِ ذِكْرُكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ﴾ ‘আমি তোমাদের প্রতি এমন একটি কিতাব অবতীর্ণ করেছি; এতে তোমাদের জন্য উপদেশ রয়েছে। তোমরা কি বোঝ না?’ (আল আম্বিয়া, ২১/১০)। সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহর ভাষা কতটা মধুর, কতটা দরদের, কতটা স্বস্তির! যে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবে, সেই একমাত্র তা বুঝতে পারবে।   

সর্বোপরি মহান আল্লাহ নিজেই বলেছেন, কুরআন বুঝার জন্য সহজ। তাই কুরআন শেখার ভাবধারা অন্তরে লালন করে কুরআন শিক্ষায় অগ্রগামী হতে এবং তা থেকে উপদেশ লাভ করার জন্য আমাদেরকে সর্বাত্মক চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ আমাদের সফলতা দান করবেন, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কুরআন বুঝার ও সে অনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

* শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী সরকারি কলেজ, নোয়াখালী।