পড়াশোনা ও ভালো ফলাফলের কৌশল
-মহিউদ্দিন বিন জুবায়েদ*


শিক্ষার পূর্ণ ধারণা বর্ণিত হয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার বাণীতে। শিক্ষার তাগিদ দিতে গিয়ে কুরআনুল কারীমের সূরা আল-আলাক্বের প্রথমেই বলা হয়েছে—

﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ – خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ – اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ – الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ – عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ﴾

‘পড়ুন! আপনার প্রভুর নামে। যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাঁধা রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ুন! আর আপনার প্রভু বড়ই অনুগ্রহশীল, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান শিখিয়েছেন, যা সে জানত না’ (আল-আলাক্ব, ৯৬/)

উক্ত আয়াতসমূহে শিক্ষার অর্থ হচ্ছে, নিজেকে জানা, সৃষ্টিকে জানা, স্রষ্টাকে জানা এবং স্রষ্টা, সৃষ্টি ও তাঁর মাঝে মানুষের অবস্থান ও দায়িত্ব সচেতনতা অর্জন ও পালনের কৌশল অর্জন। কুরআনুল কারীমের এ আয়াতের মর্মার্থ অনুধাবন করে যদি মানুষ শিক্ষা অর্জনের প্রচেষ্টা চালায় তাহলেই শিক্ষার পূর্ণতা ও সার্থকতা অর্জন সম্ভব।

শেখার আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস ও পরিবেশ :

কোনো কিছু শিখতে হলে শেখার আগ্রহ ও ইচ্ছাশক্তি প্রবল থাকতে হবে। অর্থাৎ শেখার প্রবণতা ও শেখার বিষয়টির গুরুত্ব দিতে হবে। তবে এ কাজটি খুবই কঠিন। কেননা, কেউ শত চেষ্টা করেও একটি রচনা মুখস্থ করতে পারছে না। আবার কেউ এক নজর দেখেই মুখস্থ করে ফেলছে। কারণ, যে শিখতে পারছে না, সে পড়াটি শেখার আগ্রহ নিয়ে পড়ছে না। আর যে শেখার আগ্রহ নিয়ে পড়ছে, সে অল্প সময়েই রচনাটি মুখস্থ করে ফেলছে। সুতরাং এ কাজটি অনেকের পক্ষে অসম্ভব। শিখতে চাওয়াটা খুবই কঠিন কাজ। কাজেই কিছু শিখতে চাইলে আগ্রহ ও ইচ্ছাশক্তি পুরোপুরি থাকা চাই।

আবার মনে আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি না থাকলে সে কাজে সফল হওয়া যায় না। কেউ যদি মনে করে পরীক্ষায় পাশ করা বড় কঠিন কাজ। তাহলে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়।

আত্মবিশ্বাসের জোরে মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। সব সময় মনে রাখতে হবে অন্যরা যদি পারে, তাহলে আমিও পারব। মনে ভয় থাকলে সহজ কাজও কঠিন হয়ে যায়। তাই মন থেকে ভয় দূর করে আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে।

কবির ভাষায়- ‘সকলে পারে যাহা আমিও পারিব তাহা’।
এ আত্মবিশ্বাসের কথাটা বারবার স্মরণ রাখতে হবে। নিজেকে এগিয়ে নিতে হবে। অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে।

দার্শনিক প্লেটো বলেছেন, ‘যার নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস নেই, তার শেখার কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা, তার কাছ থেকে উঁচুমাত্রার শেখার ধরন আশা করা যায় না। মূলত সে কিছুই শিখতে পারে না’।

পড়ালেখা করার পরিবেশ থাকা যেমন জরুরী, তেমনি আবার জরুরীও নয়। কেননা, মনে আগ্রহ থাকলে পরিবেশ কোনো বিষয় না। আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস ব্যক্তিকে যে কোনো পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে। যেমন, বিভিন্ন মনীষীর মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রাস্তার ধারে লাইট পোস্টের নিচে বসে পড়াশোনা করেছেন। তাই পরিবেশের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। পরিবেশ যার যেমন আছে, সেখানেই আগ্রহ সহকারে পড়াশোনা করতে হবে। তবে দরকার জায়গাটা শব্দমুক্ত ও নিরিবিলি। বিপরীত পক্ষে এমন লোকও আছে সামান্য শব্দেই যারা বিরক্তিবোধ করে। আবার কারো কানের কাছে হাঁতুড়ি পিটালেও গ্রাহ্য করে না। তবে আসল কথা হলো পড়ালেখায় পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া। পড়া মুখস্থ না হলে নিরাশ হওয়ার কারণ নেই। ব্রেনে অনেক সময় কাজ করে না। চেষ্টা করতে থাকলে আস্তে আস্তে হয়ে যায়। এজন্য মানসিক ও শারীরিক শক্তি দরকার। কেননা, শরীর ভালো না থাকলে মনও ভালো থাকে না। কাজে আগ্রহ সৃষ্টি হয় না। কাজেই স্বাস্থ্যের প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে। শরীর তো একটা মেশিনের মতো। চালু রাখতে হলে এনার্জি দরকার। হাঁটাচলা, চিন্তা-ভাবনা, চোখ-কান এসবের পিছনে অনেক শক্তি খরচ হয়। এজন্য পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। ব্যায়াম করতে হবে। পরিমিত ঘুমাতে হবে। এসব বিষয় খেয়াল রাখলে পড়ালেখার গতি বেড়ে যায়। ভালো কিছু করা সম্ভব হয়।

অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস একে অপরের পরিপূরক :

যেসব শিক্ষার্থী ভালো রেজাল্ট করে তারা সবাই অধ্যবসায়ী ও আত্মবিশ্বাসী। সাথে সাথে পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীলও বটে। অধ্যবসায় হলো, কোনো কাজে ব্যর্থ হলে সে কাজে সাফল্য লাভ করার জন্য ধৈর্য ও সাধনার সাথে বারবার এমনকি শতবার চেষ্টা করা বা সক্রিয়ভাবে তৎপর হওয়া।

বিজ্ঞানী নিউটন বলেছেন, ‘আমার আবিষ্কারের কারণ আমার প্রতিভা নয়; বহু বছরের পরিশ্রম ও নিরবচ্ছিন্ন চিন্তা ও ধৈর্য্যের ফলেই আমি আমাকে সার্থক করেছি’।

সুতরাং পড়াশোনা ও ভালো ছাত্র-ছাত্রী হওয়ার জন্য অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও ধৈর্য ছাড়া সম্ভব নয়।

পড়াকে আয়ত্ত করার কিছু কৌশল :

১. আল্লাহর নামে শুরু করা ও বেশি বেশি দু‘আ করা।

২. নিয়মিত, বুঝে বুঝে, মনোযোগ সহকারে পড়া এবং তা খাতায় লিখে রাখা।

৩. লক্ষ্য বাস্তবায়নের আগ্রহ ও কৌতুহল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পড়াগুলো নোট করে রাখা।

৪. শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝে পরস্পর সুসম্পর্কের সেতুবন্ধন থাকা।
৫. চরিত্রহীন, অমনোযোগী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।

৬. নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থেকে শিক্ষকের পাঠদান গ্রহণ এবং মূল বই বেশি বেশি অধ্যয়ন করা।

৭. হতাশা, দ্বিধা-সংকোচ দূরে ঠেলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। এ কথা ভাবা যাবে না— আমরা গরীব, চাকরি হবে কী হবে না, তাই এখন থেকেই একটা কিছু করা দরকার।

৮. প্রতিকূল পরিবেশ, নানা উপকরণের সমস্যাকে গুরুত্ব না দিয়ে পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

৯. ভুলেও কখনো নারীর প্রতি আসক্ত হয়ে ভালোবাসায় নিজেকে জড়িয়ে পড়াশোনা নষ্ট যাতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবেই পড়াকে আয়ত্ত করা করা সম্ভব।

পরিবেশ ও পড়াশোনার উপকরণ :

নিরিবিলি পরিবেশের সাথে সাথে ভালো ছাত্র-ছাত্রী হওয়ার কিছু উপকরণ প্রয়োজন। যা শিক্ষার্থীর টেবিলে সাজানো থাকবে।
১. পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি কুরআন মাজীদ ও ইসলামী বইয়ের কিছু সমাহার থাকবে। মননশীল ও রুচিশীল মার্জিত লেখকদের কিছু বইও থাকবে। যা চরিত্র গঠনে সহায়ক হবে।

২. নোট করার জন্য সাদা কাগজের শীট, ফাইল, স্ট্যাপলার, ভালো কলম, স্কেল, জ্যামিতি বক্স হাতের কাছে থাকবে।

৩. বিগত বছরগুলোর প্রশ্নপত্রসমূহ সংগ্রহ করে ক্লিপে আটকে রাখা।

নিয়মিত মন দিয়ে বুঝে পড়া :

প্রতিদিন কম হোক আর বেশি হোক নিয়মিত পাঠ্যবই পড়া। কোনোদিন ৫/৬ ঘণ্টা পড়াশোনা করে, মন মেযাজ ভালো না ছুঁতোয় কোনোদিন একেবারেই পড়াশোনা না করলে চলবে না। এটা জীবনের জন্য মারাত্মক ভুল। বরং ৫/৬ ঘণ্টা না হোক, অল্প সময় হলেও পড়াশোনাকে নিয়মিত করা। ভালো রেজাল্ট ও সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করতে চাইলে এর বিকল্প নেই।

ভালো রেজাল্টের পেছনে নিয়মিত পড়াশোনার ভূমিকা অপরিসীম। পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা, মন দিয়ে বুঝে পড়া, ভালো ফলাফলের সহায়ক। প্রেমের ভাবনা, অর্থের লোভ, শারীরিক বিলাসিতা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনের অন্তরায়। মনকে হীনমন্যতা, দুর্বলতা, অপারগতা থেকে মুক্ত করে মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করা মেধা বিকাশের সোনালী সোপান।


* মুহিমনগর, চৈতনখিলা, শেরপুর।