সওয়াল-জওয়াব



ইমানআক্বীদা



প্রশ্ন (১) : আল্লাহকে গড, ঈশ্বর, খোদা, ভগবান ইত্যাদি বলা যাবে কি?

-আহসানুল্লাহ
মণ্ডলপাড়া, গোপীনাথপুর।

উত্তর : আল্লাহকে তার নির্ধারিত নামেই ডাকতে হবে। কেননা নামের কখনো পরিবর্তন হয় না এবং অর্থের বিবেচনায় নাম বাদ দিয়ে উক্ত নামের অর্থ নাম হতে পারে না। যেমন: আব্দুল্লাহ নামের ব্যক্তিকে আব্দুল্লাহ-ই ডাকতে হবে অর্থের বিবেচনায় আল্লাহর বান্দা বলে সম্বধোন করার দ্বারা উদ্দেশ্যে পুরণ হবে না। আর আল্লাহর নামের ক্ষেত্রে তো এমনটি করাই যাবে না। কেননা আল্লাহ তাঁকে তাঁর নির্ধারিত নামে ডাকার আদেশ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহর রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাকো। আর যারা তাঁর নাম সম্বন্ধে বক্রপথে চলে তাদেরকে বর্জন করো, তাদের কৃতকর্মের ফল তাদেরকে দেওয়া হবে’ (আল-আ’রাফ, ১৮০)। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আল্লাহর নিরানব্বই অর্থাৎ এক কম একশটি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি তা স্মরণ রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (তিরমিযী, হা/৩৫০৭)।


প্রশ্ন (২) : শয়তান কি আমাদের অন্তরের কোনো বিষয় যেমন. কল্পনা, ইচ্ছা, চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি অনুধাবন করতে পারে?

-মো. নেকবার আলি
মুর্শিদাবাদ, ওয়েস্ট বেঙ্গল, ইন্ডিয়া।

উত্তর : শয়তানসহ কোনো মাখলূক মানুষের অন্তরের খবর জানে না। অন্তর্যামী শুধুমাত্র আল্লাহ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় তিনি অন্তর্যামী’ (আল-মুলক, ৬৭/১৩)। তবে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত হায়াত দিয়েছেন। সে মানুষকে দ্বীন ইসলাম থেকে বিচ্যূত করার যাবতীয় কলা-কৌশল ব্যবহার করবে। গুনাহের কাজ লোভনীয় করে পেশ করবে এবং মানুষের শিরায় শিরায় মিশে থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন, শয়তান বলল, আপনি আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ বললেন, ‘তুমি অবকাশ প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত/তোমাকে সময় দেওয়া হল’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৪-১৫)। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘নিশ্চয় শয়তান মানুষের রক্তনালীতে চলাচল করে (অর্থাৎ রক্ত যেমন মানুষের দেহে চলাচল করে, কোনো সময়ের জন্য বন্ধ হয় না ঠিক তেমনিভাবে শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য সর্বদায় অপচেষ্টা চালিয়ে যায় এবং তার পিছে লেগে থাকে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২১৭৪; মিশকাত, হা/৬৮)।


শিরক



প্রশ্ন () : শিক্ষক, পিতা-মাতা বা কোনো সম্মানিত ব্যক্তির কদমবুসি (চুমু দেওয়া) করা যাবে কি?

 –জহিরুল ইসলাম
বাসাইল, টাঙ্গাইল।

উত্তর : শিক্ষক পিতা-মাতাসহ কোনো সম্মানিত ব্যক্তির কদমবুসি (চুমু দেওয়া) করা যাবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। কোনো ছাহাবী কিংবা তাঁর আদরের কন্যা ফাতেমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা), তাঁর এগার জন স্ত্রীর কেউ তাঁর কদমবুসি করেছেন এর কোনো প্রমাণ নেই। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান করাকে অপছন্দ করতেন। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ছাহাবীদের কাছে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চেয়েও প্রিয় কোন ব্যক্তি ছিল না। কিন্তু তাঁকে দেখেও তারা দাঁড়াতেন না। কেননা, তাঁরা জানতেন যে, তিনি দাঁড়ানো পছন্দ করেন না’ (মিশকাত, হা/ ৪৬৯৮; তিরমিযী, হা/২৭৫৪; সিলসিলা ছহীহা, হা/৩৫৮)।


প্রশ্ন () : দোকানে তাবিযের মাদুলী বিক্রি করা যাবে কি?

-খোকন
চাঁদপুর।

উত্তর :  তাবিয ব্যবহার করা, গলায় বা কোমরে ঝুলানো শিরক। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ ‘যে ব্যক্তি তাবিয ঝুলালো সে শিরক করল’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৬৭৮১)। আর যা ব্যবহার করা হারাম তা বিক্রয় করাও হারাম। যেমন বিড়ি-সিগারেট খাওয়া হারাম এজন্য তার ব্যবসাও হারাম। তাবিযের মাদুলী যদিও তাবিয নয় কিন্তু তাবিয তার মধ্যে ঢুকিয়ে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং তাবিযের মাদুলী বিক্রয় করার মাধ্যমে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা হয়। আর অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা হারাম। মহান আল্লাহ বলেন, تَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ‘তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে পরস্পরকে সহযোগিতা করো আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।


প্রশ্ন () : আমার মা পাইলসের রুগী। এজন্য তিনি এক মহিলার নিকট থেকে একটা গাছের শেকড় তাবিযে মতো করে কোমরে ঝুলিয়ে রেখেছেন। এখন এটা কি তাবীয? এটা ঝুলানো কি জায়েয? যদি তাবি হয় তাহলে আমি কীভাবে তাকে বুঝাব?

-আমাতুল্লাহ
কবিরহাট, নোয়াখালী।

উত্তর : রোগ মুক্তি, নারী-পুরুষের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনসহ যেকোনো উদ্দেশ্যে সুতা, গাছের ছিলকাসহ ধাতব যা কিছু শরীরে ঝুলানো হয় তাই তাবিয। আর তাবিয ঝুলানো সরাসরি শিরক। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তাবিয ঝুলাল সে শিরক করল’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪৫৮)। তাবিয ঝুলানোর দ্বারা অবসন্নতা ‍বৃদ্ধি পায়। ইমরান ইবনু হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তির হাতে পিতলের বালা পরিহিত দেখে জিজ্ঞেস করেন, এই বালাটা কী? সে বললো, এটা অবসন্নতা জনিত রোগের জন্য ধারণ করেছি। তিনি বলেন, এটা খুলে ফেলো। অন্যথায় তা তোমার অবসন্নতা বৃদ্ধিই করবে (ইবনু মাজাহ, হা/৩৫৩১) দ্বিতীয়ত, তাবিয মানুষের কোনো উপকার করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি আল্লাহ আপনাকে কষ্ট দেন তবে তিনি ব্যতীত তা অপসারণকারী কেউ নেই’ (আল-আন’আম, ৬/১৭)। আপনি আপনার মাকে তাবিয শিরক বা এর ভয়াবহতা বিষয়ক বই কিনে দিতে পারেন। আপনি নিজে তাকে মৃত্যুর পর শিরককারীর পরিণতি সম্পর্কে নছীহার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করুন। আল্লাহ চাহেন তো বুঝার তাওফীক্ব দান করবেন; ইনশা-আল্লাহ!


ইবাদত-ছালাত



প্রশ্ন () : আমি কোথাও শুনেছিলাম পরিবারের সকলে মিলে জামা’আত সহকারে ছালাত আদায় করা অধিক ছওয়াবের কাজ। এটা কি মসজিদে জামা’আতে আদায়ের থেকেও বেশি ছওয়াবের না-কি কোন ক্ষেত্র বিশেষ অধিক ছওয়াব?

-মাহমুদুল হাসান
ফুলবাড়িয়া, ময়মনসিংহ।

উত্তর : উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। বরং পুরুষের জন্য আযান শোনার পর মসজিদে গিয়ে জামা’আত সহকারে (ফরয) ছালাত আদায় করা ওয়াজিব। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আযান শুনার পর কোনো শারয়ী ওযর ব্যতীত আযানের জবাব (মসজিদে আসলা না) দিল না। তার কোনো ছালাত নেই’ (ইবনু মাজাহ, হা/৭৯৩; মিশকাত, হা/১০৭৭)। শুধু তাই নয় যারা ফরয ছালাত মসজিদে জামা’আতের সাথে আদায় করতে যায় না, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের বাড়ি-ঘর আগুন দ্বারা পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। (ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৪, ২৪২০)। ইমাম বুখারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) অধ্যায় রচনা করেছেন এভাবে بَابُ وُجُوْبِ صَلَاةِ الْجَمَاعَةِ অর্থাৎ ‘জামা’আতে ছালাত আদায় করা ওয়াজিব’। ইবনু উম্মু মাকতুম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–কে জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি অন্ধ তদুপরি মসজিদও আমার ঘর হতে অনেক দূরে, আমাকে মসজিদে আনা-নেওয়ার জন্য কোনো লোক নেই। এমতাবস্থায় আমি কি ঘরে (ফরয) ছালাত আদায় করতে পারি? নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি আযান শুনতে পাও’? আমি বললাম, হ্যাঁ। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘আমি তোমার জন্য (জামা’আত) থেকে অব্যাহতির কোনো কারণ পাচ্ছি না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৩; আবূ দাউদ, হা/৫৫২)। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা তোমাদের বাড়িতেও কিছু কিছু ছালাত আদায় করবে এবং ঘরকে কবরে পরিণত করবে না। (ছহীহ বুখারী, হা/৪৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৭৭)। বাড়িতে নফল ছালাত মাহরাম মহিলাদের সাথে গায়রে মাহরাম হলে পর্দার ব্যবস্থা করে জামা’আতসহ আদায় করা যায়। এক্ষেত্রে অবশ্যই পুরুষ সামনে দাঁড়াবে পিছনে মহিলাগণ দাঁড়াবে (ছহীহ বুখারী, হা/৭২৭; মিশকাত, হা/১১০৪)।


প্রশ্ন (৭) : ছালাতে ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা কীভাবে পড়ব। যদিও আমি ইমাম বুখারীর লিখিত জুয’উল ক্বিরা’আত বইটি পড়েছি। ২৭৩, ২৭৪, ২৮৩, ২৮৪ সিরিয়ালে যা বর্ণিত তাতে দুই সাকতার মাঝে পড়ার কথা আছে। যদি প্রথম সাকতায় সূরা ফাতিহা পড়ে ফেলি তাহলে ইমামকে অনুসরণের বিষয়ে বর্ণিত হাদীছের জবাব কী হবে? আমি কীভাবে আমল করব?

-মো. দাউদ হোসেন
মহেশপুর, ঝিনাইদাহ।

উত্তর : সূরা ফাতিহা ইমামের পিছনে চুপে চুপে এবং ইমামের প্রতি আয়াত পাঠের পরে পরে পড়তে হবে। তাকবীরে তাহরীমার পরবর্তী সাকতার সময় নয়। তাহলে ইমামের অনুসরণ হয়ে যাবে। কেননা তাকবীরে তাহরীমা এবং সূরা ফাতিহার মধ্যবর্তী সাকতা (নিরবতা) মূলত সানা পড়ার জন্য (নাসাঈ, হা/৮৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৪১৩)। আলী ইবনু হুজর (রাহিমাহুল্লাহ) আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছালাত আরম্ভ করার পর অল্পক্ষণ নীরব থাকতেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক; তাকবীর ও ক্বিরা’আতের মধ্যবর্তী নীরবতার সময় আপনি কি পড়েন? তিনি বলেন, আমি তখন পড়ি:

اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِى وَبَيْنَ خَطَايَاىَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اللَّهُمَّ نَقِّنِى مِنْ خَطَايَاىَ كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ اللَّهُمَّ اغْسِلْنِى مِنْ خَطَايَاىَ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ

দুই সাকতার (অর্থাৎ তাকবীরে তাহরীমার পর এবং সূরা ফাতিহার পর) হাদীছ যঈফ (আবূ দাউদ, হা/৭৭৭, ৭৭৯; ইরওয়া, হা/৫০৫)। ইমাম সূরা ফাতিহা পাঠ করার পর চুপ থাকা এবং মুক্তাদীগণ সূরা ফাতিহা পাঠ করা মর্মে কোনো হাদীছ নেই। ছাহাবীগণ ইমামের সাথে সাথে সরবে তেলাওয়াত করতেন বলেই রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর তেলাওয়াতে সমস্যা হত। তাই তিনি তাদেরকে নীরবে পাঠ করার নির্দেশ প্রদান করে ছিলেন। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, اقْرَأْ بِهَا فِي نَفْسِكَ ‘তুমি তা নীরবে পাঠ করো’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯৫; মিশকাত, হা/৮২৩)।


প্রশ্ন (৮) : রুকূ পেলে পূর্ণ রাকা’আত হিসাবে গণ্য হয়। কিন্তু ইমাম বুখারীর লিখিত জুয’উল ক্বিরা’আত বইয়ে বর্ণিত অনেক হাদীছ প্রমাণ করে যে, সূরা ফাতিহা ছাড়া ছালাত হয় না। এই বিরোধপূর্ণ হাদীছের সমাধান কী?

-রাশেদ খান মেনন
নিলফামারী।

উত্তর:  সূরা ফাতিহা ব্যতীত ছালাত হবে না এ কথাই ঠিক। উবাদা ইবনু ছামেত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করল না তার ছালাত নেই’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৬)। আবার রুকূ’ পেলে রাকা’আত গণ্য হবে মর্মেও ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা ছালাতে এসে আমাদেরকে সিজদা অবস্থায় পেলে সিজদায় চলে যাবে। তবে এ সিজদাকে (ছালাতের রাক‘আত) গণ্য করবে না। আর যে ব্যক্তি রুকূ পেলো সে ছালাত (রাকা’আত) পেয়েছে (আবূ দাউদ, হা/৮৯৩; মুসতাদরাক আলাছ-ছহীহাইন, হা/১০১২)। সমাধান: প্রথম হাদীছ দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় সূরা ফাতিহা পাঠের সময় পাওয়ার পরেও যদি সূরা ফাতিহা পাঠ না করে, তাহলে তার ছালাত হবে না। দ্বিতীয় হাদীছ দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, কেউ যদি ইমামকে সরাসরি রুকূ’তে পায় এবং ফাতিহা পাঠের সময় না পায় তাহলে, তার জন্য উক্ত রুকূ রাকা’আত হিসাবে গণ্য হবে। কেননা সে সূরা ফাতিহা পাঠের সময় পায়নি। সুতরাং দুই হাদীছের মাঝে কোনো বিরোধ নেই। আবূ বাকরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, একদা তিনি মসজিদে এসে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে রুকূ’তে দেখে কাতারে শামিল না হয়েই রুকূতে যান। শেষে তিনি কাতারে গিয়ে শামিল হন। ছালাতান্তে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘তোমাদের কোন ব্যক্তি কাতারে শামিল হওয়ার পূর্বে রুকূ’ করেছে, অতঃপর সে কাতারে শামিল হয়েছে? আবূ বাকরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘আল্লাহ ইবাদতের প্রতি তোমার আগ্রহ করুন! তুমি পুনর্বার এরূপ করবে না (আবূ দাউদ, হা/৬৮৪)। অত্র হাদীছে আল্লাহর নবী ছাহাবী আবূ বাকরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)–কে রুকূ’ প্রাপ্ত রাকা’আতকে আবার পড়ার ব্যাপারে কিছুই বলেননি। যদি তা রাকা’আত হিসাবে গণ্য না হত তাহলে অবশ্যই তাকে ঐ রাকা’আত পড়ার নির্দেশ দিতেন।


প্রশ্ন () : আমি হানাফী ইমামের পিছনে ছালাত পড়ি। কখনো কখনো ইমামের সাহু সিজদার প্রয়োজন হয়। এমতাবস্থায় ইমামের সাথে সুন্নাহ পরিপন্থি পদ্ধতিতে সাহু সিজদা দিব না-কি একা একা সুন্নাহ পদ্ধতিতে সাহু সিজদা দিয়ে সালাম ফিরিয়ে নিব?

-এবাদুল হক হাওলাদার
গোপালগঞ্জ।

উত্তর : এ অবস্থায় ইমামের সাথেই থাকতে হবে। কেননা ইমাম নির্ধারণ করা হয় তার অনুসরণের জন্য। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, إِنَّمَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ ‘ইমাম নির্ধারণ করা হয় তার অনুসরণ করার জন্য’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৪; আবূ দাউদ, হা/৬০৫; মিশকাত, হা/৮৫৭)। সুতরাং ইমামের পূর্বে কোনো কাজ করা বৈধ নয়। এতে কোনো ক্ষতি হলে তা ইমামের উপর বর্তাবে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, يُصَلُّونَ لَكُمْ، فَإِنْ أَصَابُوا فَلَكُمْ، وَإِنْ أَخْطَئُوا فَلَكُمْ وَعَلَيْهِمْ ‘তারা তোমাদের ইমামতি করে। যদি তারা সঠিকভাবে আদায় করে তাহলে তার ছওয়াব তোমরা পাবে। আর যদি তারা ত্রুটি করে, তাহলে তোমাদের জন্য ছওয়াব রয়েছে, আর ত্রুটি তাদের (ইমামের) উপরই বর্তাবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৪; মিশকাত, হা/১১৩৩)।


প্রশ্ন (১০) : একই ছালাত নাম ৩টা। ইশরাক্ব, চাশত, আওয়াবীন। ইশরাক্বের ছালাত আদায় করলে বাকি ২টা (চাশত, আওয়াবীন) আদায় করা যাবে কি? আর যদিও করি, তাহলে কি ছওয়াব পাওয়া যাবে? দয়া করে জানাবেন।

-নজরুল ইসলাম
দূর্গাপুর, রাজশাহী।

উত্তর : ইশরাক্বের ছালাত দিনে একবার আদায় করে নিলে দ্বিতীয়বার আদায় করা যাবে না। কেননা নাম ভিন্ন হলেও ছালাত একই। মূলত হাদীছে صلاة الضحى নামটি এসেছে (মিশকাত, হা/১৩১০)। এই ছালাত আদায়ের সময় যেহেতু রোদ্রের তীব্রতা থাকে তাই ইশরাক্ব বলা হয়। ফার্সী ভাষায় চাশত বলা হয়। আর এর আদায়কারীদের أوابين (আওয়াবীন- আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী) বলা হয়।


প্রশ্ন (১১) : পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতে মহিলা মহিলাদের ইমাম হতে পারবে কি? যদি হতে পারে তাহলে জাহরী ছালাতে ক্বিরা’আত উচ্চৈস্বরে পড়বে না-কি নিম্নস্বরে?

-আকতার
সুনামগঞ্জ।

উত্তর : মহিলা মহিলার ইমামতিতে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করতে পারে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, أَنَّهَا كَانَتْ تُؤَذِّنُ وَتُقِيمُ وَتَؤُمُّ النِّسَاءَ وَتَقُومُ وَسَطَهُنَّ.  ‘ অর্থাৎ তিনি আযান ও ইক্বামত দিতেন এবং মহিলাদের ইমামতি করতেন। এ সময় তিনি কাতারের মাঝে দাঁড়াতেন’ (সুনানুল কুবরা ‘বায়হাক্বী’, হা/১৯৯৮, ৫৫৬২ ‘সনদ ছহীহ’)। রমাযান মাসে উম্মু ওয়ারাক্বা বিনতু আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিছ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইমামতির দায়িত্ব অর্পণ করে তার বাড়ির সকলকে নিয়ে ছালাত আদায় করার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন (আবূ দাঊদ, হা/৫৯২)। তবে জাহরী ছালাতে পার্শ্বস্থ্ মহিলারা শুনতে পায় এতটুকু নিম্নোস্বরে পড়বে। উল্লেখ্য যে, খুতবা থাকায় জুম‘আ ও ইদের ছালাতে মহিলারা ইমামতি করতে পারবে না।


প্রশ্ন (১২) : ইমামকে শেষ বৈঠকে পেলে কয়টি তাকবীর দিয়ে বসতে হবে? এখানে কি রাফউল ইয়াদাঈন করে বসতে হবে?

-রাহাত
মিরপুর-১০।

উত্তর : ইমামকে শেষ বৈঠক বা যেকোনো অবস্থায় পেলে তাকবীর দিয়ে রাফউল ইয়াদাঈন করে ইমামের সাথে শরিক হয়ে যেতে হবে। আলী ও মু‘আয ইবনু জাবাল (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তারা দুইজন বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ ছালাতে উপস্থিত হয়ে ইমামকে কোনো এক অবস্থায় পাবে, তখন ইমাম যা করছে সে যেন তাই করে’ (তিরমিযী, হা/৫৯২; মিশকাত, হা/১১৪২)। সুতরাং বৈঠকে বসার সময়েও তাকবীর দিয়ে রাফ’উল ইয়াদাঈন করে বসে যাবে।

উল্লেখ্য যে, বুকে হাত বাঁধার পর বসার যে প্রথা সমাজে চালু আছে তা দলীল দ্বারা প্রমাণত নয়।


প্রশ্ন (১৩) : বিতর ছালাত ১ রাকা‘আত, ৩ রাকা’আত ও ৫ রাকা’আত ইত্যাদি সংখ্যায় পড়া যায়। রাকা’আতের কম-বেশির কারণে বিতর ছালাতের ছওয়াবে কম-বেশি হবে কি?

 -মো. আব্দুল ওয়াহেদ
শিবগঞ্জ, গাইবান্ধা।

উত্তর : নেকীর কম-বেশি নয় বরং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর সুন্নাহ বাস্তবায়নের মধ্যেই নেকী রয়েছে। যেহেতু এক রাকা’আত বিতর পড়ার প্রমাণে হাদীছের সংখ্যা অনেক বেশি। সেহেতু রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর অনুসরণ করত এক রাকা’আত বিতর পড়াই উত্তম। এছাড়াও আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল হলো, যা নিয়মিত করা হয়। যদি ও তা অল্পই হোক না কেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৬৫; মিশকাত, হা/১২৪২)।


প্রশ্ন (১৪) : কিছু আলেম বলে থাকেন, ছালাতে ‘রাফ’উল ইয়াদাঈন’ ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাহ কোনোটি নয়। ইহা না করলেও ছালাত হয়ে যাবে। এমন বক্তব্য কি সঠিক?

-মো. আব্দুল গফুর
জিপিও ৯০০০, খুলনা।

উত্তর : রাফ’উল ইয়াদাঈন না করলে ছালাত হয়ে যাবে। তবে রাফ’উল ইয়াদাঈন রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর সুন্নাহ একথা অমান্য করলে নবীর সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা হবে। রাফ’উল ইয়াদাঈন ছালাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এমনকি রাফ’উল ইয়াদাঈন না করলে ছালাতের ছওয়াব কমে যায়। ‘রাফ’ঊল ইয়াদাঈন’ করা সম্পর্কে চার খলীফাসহ প্রায় ২৫ জন ছাহাবী থেকে বর্ণিত ছহীহ হাদীছ রয়েছে। এক হিসাব মতে ‘রাফঊল ইয়াদাঈন’-এর হাদীছের রাবী সংখ্যা ‘আশারায়ে মুবাশ্শারাহ’সহ ৫০ জন ছাহাবী। এবং সর্বমোট ছহীহ হাদীছ ও আছারের সংখ্যা কমপক্ষে চার শত। ইমাম সুয়ূত্বী ও আলবানী প্রমুখ বিদ্বানগণ ‘রাফ’ঊল ইয়াদাঈন’-এর হাদীছকে ‘মুতাওয়াতির’ (যা ব্যাপকভাবে ও অবিরত ধারায় বর্ণিত) পর্যায়ের বলে মন্তব্য করেছেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী, ২/১০০, ১০৬ পৃ.; আলবানী, ছিফাতু ছালা-তিন্নবী, পৃ. ১০৯)| ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, لَمْ يَثْبُتْ عَنْ أَحَدٍ مِّنْهُمْ تَرْكُهُ. وقَالَ لاَ أَسَانِيْدَ أَصَحُّ مِنْ أَسَانِيْدِ الرَّفْعِ  অর্থাৎ কোনো ছাহাবী রাফ’ঊল ইয়াদাঈন তরক করেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি। তিনি আরও বলেন ‘রাফ’ঊল ইয়াদাঈন’-এর হাদীছ সমূহের সনদের চেয়ে বিশুদ্ধতম সনদ আর নেই’ (ফৎহুল বারী, ২/২৫৭ পৃ., হা/৭৩৬-এর ব্যাখ্যা)। সুতরাং রাফ’উল ইয়াদাঈনকে উপেক্ষা করার কোনোই সুযোগ নেই। কেউ যদি স্বেচ্ছায় তা উপেক্ষা করে তাহলে সে সুন্নাহকে অমান্য করল (ছহীহ ইবনু খুযায়মা, হা/১৯৭; সিলসিলা ছহীহা, হা/২১৩০)| ছালাতে রাফ’ঊল ইয়াদাঈনের জন্য ১০টি করে নেকী বেশি হয় (সিলসিলা ছহীহা, হা/৩২৮৬)। উক্ববা ইবনু আমের জুহানী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, যখন মুছল্লী রুকূতে যাওয়ার সময় এবং রুকূ থেকে উঠার সময় দুই হাত উত্তোলন করবে তখন তার জন্য প্রত্যেক ইশারায় দশটি করে নেকী হবে (বায়হাক্বী, মা‘রেফাতুস সুনান, হা/৮৩৯; আলবানী, ছিফাতু ছালাতিন নবী, পৃ. ১২৯)। পক্ষান্তরে, রাফ’ঊল ইয়াদাঈন না করলে ছালাতের নেকী কম হয়। আম্মার ইবনু ইয়াসার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, এমন অনেক লোক আছে যারা ছালাত আদায় করে কিন্তু তাদের ছালাত পুরাপুরি কবুল না হওয়ায় পরিপূর্ণ নেকী প্রাপ্ত হয় না। বরং তাদের কেউ দশ ভাগের এক ভাগ, কেউ নয় ভাগের এক ভাগ, কেউ আট ভাগের এক ভাগ, কেউ সাত ভাগের এক ভাগ, কেউ ছয় ভাগের এক ভাগ, কেউ পাঁচ ভাগের এক ভাগ, কেউ চার ভাগের এক ভাগ, কেউ তিনের একাংশ বা অর্ধাংশ নেকী প্রাপ্ত হয়ে থাকে (আবূ দাঊদ, হা/৭৯৬)|


প্রশ্ন (১৫) : যোহরের ফরয ছালাতের পূর্বের চার রাকা’আত সুন্নাত এক সালামে পড়তে হবে নাকি দুই সালামে?

-মো. আব্দুল গফুর
জিপিও ৯০০০, খুলনা।

উত্তর :  যোহরের পূর্বের চার রাকা’আত ছালাত এক সালামেও পড়া যায় দুই সালামেও পড়া যায়। ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, صَلاَةُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ مَثْنَى مَثْنَى  ‘রাতের এবং দিনের ছালাত দুই দুই রাকা’আত করে’ (আবূ দাউদ, হা/১২৯৫; নাসঈ, হা/১৬৬৬)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, দিন-রাতের সকল নফল ছালাত দুই দুই রাকা’আত করে পড়া সুন্নাত। তবে যে সকল নফল ছালাত এক সালামে চার রাকা’আত প্রমাণিত হয়েছে সে ছালাতগুলো উক্ত হাদীছের আওতাভুক্ত হবে না। আর যোহরের পূর্বের চার রাকা’আত ছালাত এক সালামে পড়া যাবে মর্মে ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে (ইবনু মাজাহ, হা/১১৯২)।


প্রশ্ন (১৬) : ছালাতে যে অঙ্গ ঢেকে রাখা ফরয, তার মাঝে যদি সামান্য ছিদ্র থাকে, তাহলে ছালাত শুদ্ধ হবে কি?

সদরুদ্দীন
ঢাকা।

উত্তর : নারী-পুরুষ সকলের জন্য ছালাতে সতর ঢেকে রাখা শর্ত এবং আবশ্যক (আল-মুগনী, ১/৩৩৭)। কেননা সতর খোলা অবস্থায় ছালাত কবুল হয় না। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ صَلاَةَ حَائِضٍ إِلاَّ بِخِمَارٍ ‘কোনো প্রাপ্তবয়স্কা মহিলা ওড়না ছাড়া ছালাত আদায় করলে, আল্লাহ তার ছালাত কবুল করবেন না’ (ইবনু মাজাহ, হা/৬৫৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৮৭৬)। সুতরাং স্বেচ্ছায় কোনো ব্যক্তি সতর খোলা রেখে ছালাত আদায় করলে তার ছালাত বাতিল হবে। তাই এই ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে এবং সতর বের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন পোশাক পরিধান করা হতে বিরত থাকতে হবে। আর অজ্ঞতা বা ভুলক্রমে যদি সতরের কোনো অঙ্গ ছালাতে খুলে যায় তাহলে তার ছালাত হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ বান্দার অনিচ্ছাকৃত ভুল ক্ষমা করে দিয়েছেন (ইবনু মাজাহ, হা/২০৪৫; মিশকাত, হা/৬২৮৪)। আর ছিদ্র যদি অতি সামান্য হয়ে থাকে যার কারণে সতর দেখা যায় না বা মানুষের নজরে পড়ে না, তাহলে এমন ছিদ্রের কারণে ছালাতের কোনো সমস্যা হবে না।


প্রশ্ন (১৭) : কাপড়ে রক্ত ছিটা লেগে থাকাবস্থায় উক্ত কাপড়ে ছালাত আদায় করলে ছালাত শুদ্ধ হবে কি?

-মো. হাফিজুর রহমান
কেএমপি, খুলনা।

উত্তর : রক্ত ছিটা কাপড়ে লেগে থাকাবস্থায় ছালাত আদায় করাতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ সাধারণ রক্ত নাপাক নয়। যেমন: একদা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কা’বা চত্বরে ছালাতরত ছিলেন। এমতাবস্থায় আবূ জাহেল, উতবা, শায়বাসহ মক্কার নেতৃস্থানীয় নেতাদের আদেশ ক্রমে সিজদারত অবস্থায় আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর উপর যবেহকৃত উটের নাড়ি-ভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের উদ্দেশ্যে বদ-দু’আ করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/২৪০)। তবুও রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছালাত ছেড়ে দেননি। বরং ছালাত শেষ পর্যন্ত আদায় করেছেন। এছাড়াও এক যুদ্ধ সফরে ঘুমন্ত ছাহাবীদের পাহারায় নিযুক্ত ছালাতরত ছাহাবীকে শত্রু পক্ষ তীর নিক্ষেপ করে, যার ফলে তার শরীর হতে রক্ত প্রবাহিত হয়। পরবর্তীতে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–কে বিষয়টি অবগত করলে, তিনি তাকে পূনরায় ছালাত আদায় করতে বা ছালাত বাতিল মর্মে কোনো কিছুই বলেননি (আবূ দাউদ, হা/১৯৮)। তবে শরীরে বা কাপড়ে নাপাক রক্ত লেগে থাকাবস্থায় ছালাত আদায় করা যাবে না। বরং তা ধুয়ে ছালাত আদায় করতে হবে। যেমন হায়েযের রক্ত। কেননা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হায়েযের রক্ত ধুয়ে ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। ফাতেমা বিনতে হুবায়শ রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–কে এই মর্মে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বলে,إِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْسِلِى عَنْكِ الدَّمَ ثُمَّ صَلِّى ‘যখন তোমার হায়েয শেষ হয়ে যাবে, তখন তুমি তা ধুয়ে ছালাত আদায় করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/২২৮)।


প্রশ্ন (১৮) : ২ জনে জামা’আতে ছালাত পড়তেছে। পরবর্তীতে আমি তৃতীয় ব্যক্তি হলে আমি জামা’আতের কোথায় দাঁড়াব?

-মো: সৌরভ
কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

উত্তর : এ অবস্থায় ইমামের বাম পাশে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। ইমাম যখন দেখবে তার দুই পাশে দুই জন হয়ে গেছে, তখন ইমাম তাদেরকে পিছনে ঠেলে দিবে। জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছালাতে দাঁড়ালে আমি এসে তার বাম পাশে দাঁড়ালাম। তখন তিনি আমার হাত ধরে ঘুরিয়ে আমাকে ডান পাশে নিয়ে আসলেন। কিছুক্ষণ পরে জাব্বার ইবনু ছাখর এসে তার বাম পাশে দাঁড়াল। তখন তিনি আমাদের দুজনের হাত ধরে আমাদেরকে ঠেলে দিয়ে তার পিছনে দাঁড় করালেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০১০; মিশকাত, হা/১১০৭)।


মসজিদ- নির্মাণ



প্রশ্ন (১৯) : মসজিদের আশে-পাশে যদি কবর থাকে তাহলে ঐ মসজিদে ছালাত বৈধ হবে কি? বিস্তারিত জানাবেন।

-আব্দুর রহমান
ডিমলা, নিলফামারী।

উত্তর : মসজিদকে কবর রূপে গ্রহণ করা হতে সর্বদা বিরত থাকতে হবে। কারণ এ ব্যাপারে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠোরতা আরোপ করেছেন। রাসূলের বাণী, ‘আল্লাহ ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে লানত করেছেন। কারণ তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ রূপে গ্রহণ করেছিল’ (ছহীহ মুসলিম,  হা/১৩৩০; ছহীহ মুসলিম, হা/৫২৯; মিশকাত, হা/৭১২)। তবে কবর যদি মসজিদের এরিয়ার বাহিরে ডানে-বামে হয় তাহলে কোনো সমস্যা নেই (মাজমূউল ফতওয়া বিন বায, ১৩/৩৫৭ পৃ.)। তবুও সতর্ক স্বরূপ মসজিদের পাশে কবর না দিয়ে কবরস্থানে কবর দেওয়ায় উত্তম হবে। কারণ এতে মূর্খরা ফেতনায় পড়ার সম্ভবনা রয়েছে।


মসজিদ- প্রবেশের সময় সালাম



প্রশ্ন (২০) : মসজিদে প্রবেশের পর মুছল্লীদের উদ্দেশ্যে যে সালাম দেওয়া হয় তা কতটুকু শরীয়া সম্মত?

-মো. দাউদ হোসেন
মহেশপুর, ঝিনাইদাহ।

উত্তর : মসজিদে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলে রাসূলের উপর দরূদ পাঠ করে মসজিদে প্রবেশের দু’আ পড়ে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা ‍সুন্নাত। অর্থাৎ এইভাবে বলা, بِسْمِ اللَّهِ وَالسَّلاَمُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِى ذُنُوبِى وَافْتَحْ لِى أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ  (আবূ দাঊদ, হা/৪৬৫; ইবনু মাজাহ, হা/৭৭১; তিরমিযী, হা/৩১৪)। প্রবেশের পর মুছল্লীদের উদ্দেশ্যে সালাম দেওয়া যায়। কেননা ছালাম দেওয়ার জন্য নিষিদ্ধ কোনো সময় নেই। যদিও পেশাব-পায়খানার সময় সালামের জবাব দেওয়া যাবে না। বরং পরবর্তীতে দিতে হবে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন সে যেন তাকে সালাম দেয়। অতঃপর দুজনের মাঝে যদি গাছ, দেয়াল বা পাথর আড়াল হয়ে যায় এবং তারপর আবার সাক্ষাৎ হয়, তাহলেও যেন তাকে সালাম দেয় (আবূ দাউদ, হা/৫২০০; মিশকাত, হা/৪৬৫০)। এক ব্যক্তি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে মসজিদে সালাম দিলে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার উত্তর দিয়ে ছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯৭)। উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন মাযহাবী ফিক্বহের বইয়ে প্রায় ১৪ স্থানে সালাম দেওয়া যাবে না মর্মে বলা হয়েছে। যেমন. আযানের সময়, খাবারের সময়, ওযূর সময় ইত্যাদি। এসব কথার শারঈ কোনো ভিত্তি নেই।


ইবাদত- যাকাত-ওশর



প্রশ্ন (২১) : কোনো ব্যক্তি জমি বন্ধক নিলে তার টাকার যাকাত দিতে হবে না জমির শস্যের ওশর দিতে হবে।

-মোঃ আল আমিন
কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ।

উত্তর : প্রচলিত নিয়মে যে বন্ধক দেওয়া হয়ে থাকে তা শরীয়ায় হারাম। তবে যে বন্ধকের জন্য টাকা দেওয়া হয় তা যদি নেসাব পরিমাণ হয় বা তার মূল সম্পদের সাথে মিলিয়ে নেসাব পরিমাণ হয়ে যায় এবং তার উপর ১ বছর অতিবাহিত হয় তাহলে অবশ্যই যাকাত আদায় করতে হবে (আল-মাজমূ‘, ৫/৩১৮ পৃ.)। তবে যার কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে তার অনুমতি নিতে হবে (মাজমূউল ফতওয়া ইবনে ‍উছাইমীন, ১৮/৩৪ পৃ.)। আর টাকার যাকাত স্বর্ণের হিসাবে প্রায় ৫ লাখ টাকা এবং রৌপ্যর হিসাবে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। অনুরূপভাবে জমিতে উৎপাদিত ফসলও যদি নেসাব পূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে তাতেও যাকাত আদায় করতে হবে। আর ফসলের যাকাত হিসাব হলো- যদি তা সেচের মাধ্যমে হয় তাহলে ২০ ভাগের এক ভাগ দিতে হবে আর যদি বৃষ্টির মাধ্যমে হয় তাহলে ১০ ভাগের ১ ভাগ প্রদান করতে হবে।


প্রশ্ন (২২) : আমরা জানি যে, উৎপাদিত ফসল ১৮ মণ ৩০ কেজি হলে সেচ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলে বিশ ভাগের এক ভাগ এবং বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক পানির মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলে দশ ভাগের এক ভাগ যাকাত (ওশর) দিতে হয়। কিন্তু আমরা এই ভাগের ওশর সবাইকে সমানভাবে দিচ্ছি না। বরং কাউকে ৫ কেজি, কাউকে ৩ কেজি, বা কাউকে ১ কেজি করে দিচ্ছি। এই বণ্টন কি শরীয়ত সম্মত?

-দিলশাদ ইসলাম
পীরগঞ্জ, রংপুর।

উত্তর : ওশর এক প্রকারের যাকাত যা ফসল কর্তনের দিন বের বা প্রদান করতে হয়। মহান আল্লাহ বলেন,  وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ ‘তোমরা ফসল কাটার দিনে তার হক্ব (যাকাত) দিয়ে দাও’ (আল-আন’আম, ০৬/১৪১)। ওশর এবং অন্যান্য যাকাত বণ্টনের খাত একই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় ছাদাক্বা হচ্ছে ফকীর ও মিসকীনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য; (তা বণ্টন করা যায়) দাস আযাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়’ (আত-তওবা, ০৯/৬০)। এই আট খাতেই যাকাত বণ্টন করতে হবে। তবে বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও তার প্রয়োজনের ভিত্তিতে কম-বেশ হতে পারে।


ইবাদত-দু’আ



প্রশ্ন (২৩) : মোনাজাতে অনেক আলেমগণ বলতে শোনা যায়, ‘সবটুকু ছওয়াব সোনার মদিনা নবী পাকের রওজায় পৌঁছে দিন’ এ কথাটা কতুটুকু সঠিক? কুরআন হাদীছের আলোকে ব্যাখ্যা করবেন।

-এবাদুল হক হাওলাদার
গোপালগঞ্জ।

উত্তর : প্রথমত, এ ধরনের দু’আর কোনো ভিত্তি নেই। কেননা এই ধরনের দু’আর অস্তিত্ব ছাহাবী, তাবেঈ, তাবে’-তাবেঈদের যুগে ছিল না। বরং এটা পরবর্তী যুগের নব আবিষ্কৃত বিদ’আত। আর যে বিদ’আত করবে, আল্লাহ তার সেই আমল কবুল করবেন না।  রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল যার ব্যাপারে শরীয়তের কোনো নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮; মিশকাত, হা/৫৩১৫)। দ্বিতীয়ত, মানুষ যত ছওয়াবের কাজ করবে তা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর আমলনামার মধ্যে এমনিতেই যুক্ত হয়ে যাবে। কেননা কোনো ব্যক্তি যদি কাউকে কোনো কল্যাণময় কাজের পথ দেখায়, তাহলে তার এই প্রদর্শিত পথের উপর পরবর্তী যত মানুষ চলবে, তার সমপরিমাণ ছওয়াব তার আমল নামায় লিখে দেওয়া হয়। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হেদায়াতের দিকে আহ্বান জানায় তার জন্য সে পথের অনুসারীদের ছওয়াবের অনুরূপ ছওয়াব রয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৪; মিশকাত, হা/১৫৮)। তৃতীয়ত, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পূর্ব-পরের সকল পাপ আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাকে দিয়েছি স্পষ্ট বিজয়। যেন আল্লাহ তোমার পূর্বের ও পরের পাপ ক্ষমা করেন’ (আল-ফাতহ, ৪৮/১-২)। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে: قَدْ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ   ‘তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৩)। অত্র কুরআন ও হাদীছ থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর সকল পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং তিনি মানুষের ছওয়াবের প্রতি মুখোপেক্ষী নন।


বৈধ/অবৈধ



প্রশ্ন (২৪) : ইসলামে রূপচর্চা করার বিধান কী? কালো চেহারাকে ফর্সাকারী ক্রীম ব্যবহার করা যাবে কি?

-আসাদুল্লাহ
মহাদেবপুর, নওগাঁ।

উত্তর : রূপচর্চা মানুষের সহজাত ব্যাপার। ইসলাম এক্ষেত্রে বাধা প্রদান করে না। শুধু কিছু মূলনীতি বা শর্ত দিয়েছে। সেগুলো মেনে রূপচর্চা করাতে কোনো অসুবিধা নেই। ১. পুরুষের প্রসাধনী হবে রংমুক্ত ও ঘ্রাণযুক্ত। আর নারীর প্রসাধনী হবে রংযুক্ত ও ঘ্রাণমুক্ত (তিরমিযী, হা/২৭৮৭)। ২. যার মাধ্যমে সৃষ্টির আকৃতির পরিবর্তন হবে না। যেমন : ভ্রু প্লাক করা, দাঁত সরু করা, উল্কি আঁকা, নিজেকে লম্বা দেখানোর উদ্দেশ্যে উঁচু সেন্ডেল পরা ইত্যাদি (আন-নিসা, ৪/১১৯; ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৫)। ৩. রূপচর্চা করে গায়রে মাহরামের সামনে যাবে না (নাসাঈ, হা/৫১২৬)। ৪. নারী-পুরুষ একে অন্যের বেশ ধারণ করবে না (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৮৫)। ৫. অমুসলিম ও বেহায়া নারীদের অনুকরণ করবে না (আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১)। ৬. উক্ত প্রসাধনীতে ত্বক কিংবা স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি না হওয়া (আল-বাকারা, ২/১৯৫)। ফর্সাকারী ক্রীম ব্যবহারে যেহেতু আকৃতির মৌলিক পরিবর্তন হয় না, বরং তা স্বাভাবিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির অংশ, তাই তা ব্যবহারে শারঈ কোনো অসুবিধা নেই। তবে যদি তা ত্বক কিংবা শরীরের কোনো ক্ষতি করে, তাহলে তা থেকে অবশ্যই বিরত থাকা জরুরী। কারণ নিজের কিংবা অন্যের কোনো ক্ষতি ডেকে আনা নিষিদ্ধ (ইবনু মাজাহ, হা/২৩৪০)।


প্রশ্ন (২৫) : আমরা তিন ভাই। আমার বাবা-মায়ের কোনো কন্যা সন্তান না থাকায় ছোট অবস্থায় একটি মেয়েকে দতক নেয়। মেয়েটির প্রকৃত বাবা-মায়ের পরিচয় মেয়েটির নিকট গোপন করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো- মেয়ে দত্তক নেওয়া ইসলামি শরীয়াতে কতুটুকু জায়েয? আর এইভাবে তার প্রকৃত বাবা-মায়ের পরিচয় গোপন করা জায়েয হবে কি? না হলে এক্ষণে করণীয় কী?

-মুশফিক
গাইবান্ধা।

উত্তর : শরীয়তে (তাবান্না) অন্যের সন্তানকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করে লালন-পালন করা বৈধ রয়েছে। যেমন: যায়েদ ইবনু হারেছাকে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছেলে বানিয়ে ছিলেন। তবে, তার নিকট তার প্রকৃত বাবা-মায়ের পরিচয় গোপন করা যাবে না। বরং বিষয়টি তাকে অবগত করতে হবে। কোনো সন্তানকে দত্তক নিলেও সে তার নিজ পিতাকে বাদ দিয়ে পালনকারী ব্যক্তিকে পিতা বলে ডাকতে পারবে না। উল্লেখিত পদ্ধতিতে সন্তান দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে দুইটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এক. মেয়ের নিকট তার পিতা-মাতার পরিচয় গোপন করা। দুই. ইচ্ছাকৃতভাবে তার পরিচয় গোপন করার মাধ্যমে তার অধিকার কেড়ে নেওয়া। সা’দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–কে বলতে শুনেছি, مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهْوَ يَعْلَمُ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ ‘যে ব্যক্তি জেনে-শুনে নিজ পিতাকে বাদ দিয়ে অন্যকে পিতা হিসাবে সম্বোধন করল, তার উপর জান্নাত হারাম’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৬৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৩)। এখন করণীয় হলো তার নিকট তার আসল বাবা-মায়ের পরিচয় স্পষ্ট করা। তবে দত্তক নেওয়া মেয়েকে দুগ্ধ পান না করিয়ে থাকলে, পালক পিতা, তার সন্তানসহ সকল গায়রে মাহরাম থেকে তাকে পর্দা করতে হবে।


প্রশ্ন (২৬) : বাড়িতে কলিংবেল লাগানো যাবে কি?

-শফিকুল ইসলাম
ফরিদপুর।

উত্তর : বাড়িতে কলিংবেল লাগানো যায়। তবে কলিংবেলে টোন হিসাবে সালাম ব্যবহার করতে হবে। কেননা এই মর্মে মহান আল্লাহ আদেশ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, হে মুমিনগণ, ‘তোমরা নিজদের গৃহ ছাড়া অন্য কারও গৃহে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নেবে এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম দেবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর (আন-নূর, ২৪/২৭)।


প্রশ্ন (২৭) : গোরস্থানের জন্য মোট ৫ শতাংশ জমি নির্ধারণ করা আছে। এখন সেখানে শুধুমাত্র জমির মূল মালিক যিনি তাকে দাফন করা আছে অর্থাৎ একটি কবর। অনেক জায়গা খালি পড়ে আছে। তাই খালি জায়গায় বড় ছেলে পানের বরজ করেছে। এমন অবস্থায় কবরস্থানে পানের বরজ করা জায়েয হবে কি?

-রায়হান
রাজশাহী।

উত্তর : প্রথমত, গোরস্থানের বৃহৎ খালি জায়গায় ফসল উৎপাদন করা যায়। এক্ষেত্রে গোরস্থান কমিটি সেখানে ফসল উৎপাদন করতে পারে বা বর্গা দিতে পারে। চাইলে দাতার সন্তানরা কমিটির নিকট হতে বর্গা নিতে পারে। তবে তা হতে প্রাপ্ত অর্থ গোরস্থানের উন্নয়নের কাজেই ব্যবহার করতে হবে। দাতার ছেলে-সন্তানরা একাই ভোগ করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, যদি কবরস্থানে অধিক কবর থাকে এবং ফসল উৎপাদনের জন্য কবরের উপর দিয়ে যাতায়াত করতে হয়, সেখানে বসতে হয় তাহলে সে কবরস্থানে ফসল উৎপাদন করা যাবে না। কেননা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরের উপর এবং কবরের মাঝে বসতে, ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। এ মর্মে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, لَا تَجْلِسُوا عَلَى الْقُبُورِ، وَلَا تُصَلُّوا إِلَيْهَا ‘তোমরা কবরের উপর বসবে না এবং সেদিকে ফিরে ছালাত আদায় করবে না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭২; মিশকাত, হা/১৬৯৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, لاَ تَجْلِسُوا عَلِى الْقُبُورِ وَلاَ تُصَلُّوا عَلَيْهَا ‘তোমরা কবরের উপর বসবে না এবং এর উপর ছালাত আদায় করবে না’ (মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭২৫৫)। نَهَى أَنْ يُصَلِّىَ بَيْنَ الْقُبُوْرِ ‘রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবরের মাঝে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন’ (ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১৬৯৮)। তবে যদি জমিটা পারিবারিক কবরস্থান হিসাবে নির্ধারণ করা থাকে, তাহলে কবরের পূর্ণ হেফাযত করে তার সন্তানরা পানের বরজসহ চাষাবাদ করতে পারে।


বৈধ/অবৈধ-ভ্রমণ



প্রশ্ন (২৮) : ভ্রমণ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? আমি যদি আমার স্ত্রীকে নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে যাই এবং ২ রাত থেকে আসি তাহলে কি এটা আমাদের জন্য জায়েয হবে? না-কি অযথা টাকা অপচয় হিসাবে গণ্য হবে। কারণ সেখানে বেড়ানো ছাড়া আমাদের কোনো কাজ নেই ।

-মুমিনুজ্জামান
জামালপুর।

উত্তর : ইসলাম শিক্ষণীয় ভ্রমণের বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছে। যেই ভ্রমণে আল্লাহর সৃষ্টির মহিমা উপলব্ধি করা যায়, আল্লাহর অবাধ্য বান্দাদের পরিণাম দর্শনের মাধ্যমে মনের মধ্যে তাকওয়া বৃদ্ধি পায়, এমন ভ্রমণ প্রশংসনীয় (আল ফাতির, ৩৫/২৭ ও ২৮)। এমন ভ্রমণের বিষয়ে আল্লাহ আদেশ করেছেন (আল আন‘আম, ৬/১১)। দ্বিতীয়ত, যে ভ্রমণে নিছক আনন্দ হয়, আল্লাহভীতির পরিবর্তে শুধু দুনিয়াবী চাকচিক্য দেখা হয়, নারীদের নগ্ন-অর্ধ নগ্ন চলাফেরা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা দর্শন হয়, ঢোল-তবলা বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়, এমন ভ্রমণ আল্লাহ নির্দেশিত ভ্রমণ নয় এবং এসব ভ্রমণের পক্ষে আল্লাহর আয়াত দিয়ে দলীল পেশ করাও উচিত নয়। এমন স্থানে জরুরী প্রয়োজন ছাড়া সস্ত্রীক কিংবা একাকী ভ্রমণ করা অনুচিত। কারণ এতে চোখের যেনা হয়। দুনিয়ার মোহ, বেহায়াদের অনুকরণ ইত্যাদির প্রবণতা তৈরি হয়। সর্বোপরি এর মাধ্যমে অন্যায় ও পাপকর্মের আয়োজকদের সহযোগিতা করা হয়, যা শরীআতে নিষিদ্ধ (আল মায়েদা, ৫/২)। মনে হতে পারে, তাহলে কি ভালো মানুষেরা ঘরের ভিতরে বসে থাকবে? এর জবাব স্বয়ং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দিয়েছেন। উক্ববা ইবনু আমের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! নাজাত পাওয়ার উপায় কী? তিনি বললেন, ‘জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করো, বাড়িতে অবস্থান করো, আর ভুল হলে কান্না করো’ (তিরমিযী, হা/২৪০৬)।


বিদ’আত- কবর যিয়ারত, দরূদ



প্রশ্ন (২৯) : আমরা কবর যিয়ারতের সময় সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাছসহ আরো কিছু সূরা ও দরূদ পাঠ করি। শেষে মোনাজাত করি। এই পদ্ধতি কি শরীয়ত সম্মত? যদি না হয় তাহলে, ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী কবর যিয়ারতের নিয়ম জানালে উপকৃত হব।

-শামসুল আলম ভূঁইয়া
উত্তরখান, ঢাকা-১২৩০।

উত্তর : প্রশ্নোল্লেখিত পদ্ধতিতে কবর যিয়ারত যা বিভিন্ন মহলে প্রচলিত রয়েছে ইসলামি শরীয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই। বরং এটা সুস্পষ্ট বিদ’আত। আর যা বিদ’আত তা অবশ্য বর্জনীয় এবং আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা এর অন্তর্ভুক্ত নয় তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهْوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যার ব্যাপারে আমার কোনো নির্দেশনা নেই তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৭১৮)। কবর যিয়ারতের সঠিক পদ্ধতি: ক্বিবলার দিকে মুখ করে নিম্নের দু’আটি পাঠ করবে।

السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَلاَحِقُونَ أَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ.

‘হে কবরবাসী মু’মিন ও মুসলিমগণ! তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশা-আল্লাহ অবশ্যই আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি। আমরা আমাদের ও তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৪; মিশকাত, হা/১৭৬৪)।  তারপর নিম্নের দু’আটিও পড়তে পারে ।

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ وَأَهْلاً خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ أَوْ مِنْ عَذَابِ النَّارِ

». (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৭৬)। এছাড়াও চাইলে একাকী দাঁড়িয়ে বা হাত তুলে আল্লাহর নিকট দু’আ প্রার্থনা করতে পারে (তিরমিযী, হা/৩৫৫৬)।


প্রশ্ন (৩০) : “আল্লাহুমা ছল্লি ওয়া সাল্লিম আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ” এটা কি কোনো দরুদ?

-ফারজানা শেখ রিমকি
দিনাজপুর।

উত্তর : প্রশ্নোল্লিখিত দরূদটি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর শেখানো কোনো দরূদ নয়। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শেখানো উত্তম দরূদ হলো দরূদে ইবরাহীম যা আমরা ছালাতে পাঠ করে থাকি। আব্দুর রাহমান ইবনু আবূ লায়লা (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, একবার আমার সঙ্গে কা’ব ইবনু উজরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাক্ষাত হলো। তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে একটি হাদিয়া দেব না। তা হল এই যে, একদিন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিকট বেরিয়ে আসলেন, তখন আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনাকে কেমন করে সালাম দেব, আমরা আপনার উপর দরূদ কীভাবে পড়ব? তিনি বললেন, তোমরা বলবে,

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

(ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৭০; ছহীহ মুসলিম, হা/৪০৫)। অত্র দরূদটি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর শেখানো দরূদ। সুতরাং দরূদ হিসাবে এটি পড়াই উত্তম। হাদীছে ইহা ব্যতীত ভিন্ন শব্দ দ্বারাও দরূদ সাব্যস্ত হয়েছে- যেমন: السَّلاَمُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِىُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ (ছহীহ বুখারী, হা/৮৩১)। সুতরাং রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর শেখানো পদ্ধতিতে দরূদ পড়া উচিত। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৪০৮; মিশকাত, হা/৯২১)।


পারিবারিক বিধান- বিবাহ-তালাক



প্রশ্ন (৩১) : আমি ২০১৭ সালে স্থানীয় চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে আমার স্ত্রীকে খোলা তালাক দেই। তালাকের আগেই আমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলাম। বেশ কিছুদিন পর আমার দ্বিতীয় স্ত্রী শারিরিক অসুস্থতার কারণে সংসার ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তীতে আমি প্রথম স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য আলেমদের নিকট গেলে তারা বলেন, আগের স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে হলে তাকে অন্যত্র বিবাহ দিতে হবে। আমার চাচি শাশুড়ি তার মেয়ের জামাইয়ের সাথে তার বিয়ে দেন এবং সে একদিন পর তাকে তালাক দিয়ে দেয়। তিন মাস পর আমি আবার তাকে নতুনভাবে মোহরানা দিয়ে বিয়ে করি। আমার জানার বিষয় হলো- কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আমার বর্তমান সংসার বৈধ না-কি অবৈধ?

-শাহ আলমগীর শরীফ
শেরপুর, ময়মনসিংহ।

উত্তর : আপনার বর্তমান স্ত্রী বৈধ। তবে আলেমদের উক্ত ফতওয়া উদ্ভট ও ভিত্তিহীন। কারণ আপনি আপনার খোলাকৃত প্রথম স্ত্রীকে নতুন বিবাহ ও মোহরের মাধ্যমে সরাসরি ফেরিয়ে নেওয়াই শরীয়ত সম্মত ছিল। কেননা খোলা কোনো তালাক নয়। বরং তা বিবাহ বিচ্ছেদ। আর আলেমদের ফতওয়া অনুযায়ী চাচী শাশুড়ীর মেয়ের জামাইয়ের সাথে একদিনের চুক্তি বিবাহ দেওয়া হারাম হয়েছে। কেননা পূর্বের স্বামীর জন্য বৈধ করার চুক্তি বিবাহ (হিল্লা) প্রথা ইসলামে ঘৃণিত ও অভিশপ্ত কাজ। উক্ববা ইবনু আমের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের ভাড়াটে পাঁঠা সম্পর্কে জানাব না? সেই পাঁঠা হলো হিল্লাকারী। আর আল্লাহ হিল্লাকারী ও যার জন্য হিল্লা করা হয় উভয়কে অভিশাপ করেছেন’ (ইবনু মাজাহ, হা/১৯৩৬)।


প্রশ্ন (৩২) : স্বামী-স্ত্রীর মোবাইলে কথা বলার সময় ঝগড়া হয়। ফোন কেটে দিয়ে স্বামী মেসেজে লিখে পাঠান ‘তোমাকে এক, দুই, এবং তিন তালাক। প্রশ্ন হলো, এই তালাক কার্যকর হয়েছে কি? কার্যকর হয়ে থাকলে করণীয় কী? 

-ইকবাল হোসেন সুমন
চারঘাট, রাজশাহী।

উত্তর : রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তিনটি কাজ এমন যা বাস্তবে বা ঠাট্টাচ্ছলে করলেও তা বাস্তবিকই ধর্তব্য। আর তা হলো- বিবাহ, তালাক ও স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণ’ (আবূ দাউদ, হা/২১৯৪; তিরমিযী, হা/১১৮৪)। সুতরাং মোবাইলে মেসেজ করে হোক কিংবা সরাসরি; স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেয় তাহলে সে তালাক কার্যকর হবে। অতএব প্রশ্নোল্লেখিত পদ্ধতির তালাক নিঃসন্দেহে কার্যকর। তবে তা তিন তালাক নয় বরং এক তালাক হিসাবে গণ্য। কেননা স্বামী স্ত্রীকে এক সাথে তিন তালাক দিলে তা শরীয়তে এক তালাক হিসাবে বিবেচিত হয়।

 عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ أَبَا رُكَانَةَ طَلَّقَ امْرَأَتَهُ ثَلَاثًا فَحَزِنَ عَلَيْهَا فَرَدَّهَا عَلَيْهِ النبيُّ ﷺ وَقَالَ: إِنَّهَا وَاحِدةٌ.

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, আবু রুকানা নামে একজন লোক তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। তখন নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার স্ত্রীকে তার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, এটা এক তালাক হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৮৭ হাদীছ ছহীহ; বায়হাক্বী, হা/১৪৭৬৪)। তাই কেউ যদি একসাথে তিন তালাক দিয়ে দেয় তাহলে সেটা এক তালাক বলে গণ্য হবে। আর উক্ত স্বামী তার স্ত্রীকে তিন মাসের মধ্যে নতুনভাবে বিবাহ পড়ানো ছাড়াই ফিরিয়ে নিতে পারবে। যদি তিন মাস অতিক্রান্ত হয়ে যায় তাহলে নতুনভাবে মোহরানা ধার্য করে বিবাহ পড়ানোর মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারবে। সুতরাং আপনি চাইলে আপনার স্ত্রীকে উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে ফিরিয়ে নিতে পারেন।


প্রশ্ন (৩৩) : কিছুদিন আগেই ইউটিউবে শুনলাম- কেউ যদি স্ত্রীকে ছেড়ে দিলাম বা তোমাকে রাখব না বলে তাহলে তালাক হয়ে যাবে। চার বছর আগে আমার পরিবারের সদস্যদের সাথে আমার স্ত্রীর ঝগড়া হয়, সে আমাকে বলে তোমার পরিবার থেকে আমি মুক্তি চাই। তখন আমি বলছিলাম, তোমার বাবা-মাকে ডেকে এনে মুক্তি নিয়ে চলে যাও। তুমি আমাকে নিয়ে সুখী হতে না পারলে অন্য কাউকে বিয়ে করে সুখী হও। সেই স্বাধীনতা তোমাকে দিলাম। আমার স্ত্রী যাইনি। এটা কি তালাক বলে গণ্য হবে? আমি আগে জানতাম তালাক দিতে তালাক শব্দটা বলতে হয়।

-আব্দুল হান্নান
মক্কাপ্রবাসী।

উত্তর : প্রশ্নোল্লেখিত ক্ষেত্রে তালাক হয়নি। কেননা এখানে স্ত্রীকে বাবা-মাকে উপস্থিত করে পৃথক হওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্ত্রী সেই সুযোগ গ্রহণ করেনি। বিধায় এটা তালাক হয়নি। রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণ তার সামর্থ্যের বেশি খোরপোষের দাবি জানালে তিনি তাদের তার কাছে থাকার অথবা পৃথক হয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো স্ত্রী তা গ্রহণ করেনি। আর সেটাকে তালাক হিসাবে গণ্য করাও হয়নি (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৬৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৭৫)।


প্রশ্ন (৩৪) : কোনো নারী তার অভিভাবককে না জানিয়ে গোপনে কাজী অফিসে বিয়ে করে। তারপর নিজের ভুল বুঝতে পেরে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করে। তাহলে কি তার দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম স্বামী থেকে তালাক ও ইদ্দতের প্রয়োজন আছে?। উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের পূর্বে প্রথম স্বামীর সাথে তিন মাস আগে দাম্পত্য সম্পর্ক হয় ।

-রিজু আহমেদ
বিরল, দিনাজপুর।

উত্তর : অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে বিয়ে হবে না; বরং তাদের তিন মাসের পারস্পারিক সম্পর্ক ব্যভিচার বলে গণ্য হবে। যখন বিয়েই হয় নাই তখন তালাক আর ইদ্দতের কোনো প্রশ্নই হয় না। আবূ মূসা আল-আশআরী বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘ওয়ালি ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ হবে না’ (আবূ দাঊদ, হা/২০৮৫; তিরমিযী, হা/১১০১)। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে মহিলা তার ওয়ালির অনুমতি ব্যতীত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে, তার বিবাহ বাতিল বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল…’ (তিরমিযী, হা/১১০২; মিশকাত, হা/৩১৩১)। সুতরাং বর্তমানে যেহেতু যেনার হদ বাস্তবায়ন করার কোনো ব্যবস্থা নেই, সেহেতু পূর্বের অপকর্মের জন্য আল্লাহর নিকট খালেছ অন্তরে তওবা করে প্রথম স্বামী থেকে তালাক নেওয়া ও ইদ্দত পালন করা ছাড়াই পরের (মেয়ে অভিভাবকের সম্মতিতে হয়ে থাকলে) বৈধ স্বামীর সাথে ঘর সংসার করতে পারে। এতে পূর্বের স্বামী থেকে তালাক নেওয়া বা ইদ্দত পালন করার কোনো প্রয়োজন নেই।


ইবাদত- দাওয়াহ



প্রশ্ন (৩৫) : আল-ইতিছাম পত্রিকাটি অমুসলিম তথা হিন্দুদের পড়তে দেওয়া যাবে কি?

-মো. আব্দুল গফুর
জিপিও ৯০০০, খুলনা।

উত্তর : পড়তে দেওয়া যাবে (ছহীহ বুখারী, হা/৪৫৫৩)। এতে কোনো সমস্যা নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেহইয়া কালবী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) –র মাধ্যমে খ্রিস্টান বাদশা হেরাক্লিয়াসের নিকট দাওয়াত পত্র পাঠিয়ে ছিলেন। সে দাওয়াত পত্রে কুরআনের আয়াতও লেখা ছিল (ছহীহ বুখারী, হা/৪৫৫৩)। আল-ইতিছাম পত্রিকার উদ্দেশ্য শুধু মুসলিমের নিকট দ্বীন প্রচার নয় বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে- ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা, ইসলামের সৌন্দর্য, মুসলিম অমুসলিম, আস্তিক, নাস্তিকসহ সকল চিন্তাধারার মানুষের নিকট তুলে ধরা। যাতে তারা এর মাধ্যমে সঠিক ও মনোনীত র্ধম ইসলামকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং অমুসলিমকেও এই পত্রিকা পড়তে দেওয়া যায় এবং দেওয়া উচিত। এতে দ্বীন প্রচারে সহযোগিতার কারণে ছওয়াব পাওয়া যাবে। ইনশা-আল্লাহ!


হদ্দ/শাস্তি- যেনা-ব্যভিচার



প্রশ্ন (৩৬) : আমি অনেক বড় ভুল করেছি। ৫ বছর ধরে একটি মেয়ের সাথে আমার অবৈধ সম্পর্ক। আমি আপনার বক্তব্য শুনে তওবা করে নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করছি এবং মেয়েটির সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। কিন্তু বর্তমানে মেয়েটি আমায় বিয়ের জন্য প্রচুর পরিমাণে চাপ দিচ্ছে। অপর দিকে আমার অভিভাবকগণ ঐ মেয়ের সাথে কোনোভাবেই বিয়ে দিতে রাজি নয়। কিন্তু মেয়েটি আপনার একটি বক্তব্যের কিছু অংশ আমার কাছে পাঠিয়েছে। যেখানে বলা আছে- যার সাথে যেনা হয়েছে সে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ছেলে-মেয়ে যেনায় লিপ্ত হওয়ার পর যদি দুইজনের একজন বিবাহ করতে সম্মত না হয় তাহলেও কি পরস্পর বিবাহ করতে বাধ্য?

-আব্দুর রহমান
দূর্গাপুর, রাজশাহী।

উত্তর : বিবাহের পূর্বে নারী-পুরুষের সকল সম্পর্ক হারাম। সুতরাং তাদের উপর হদ্দ (যেনার নির্ধারিত শাস্তি) প্রয়োগ করতে হবে (আন-নূর, ২৪/২)। এই শাস্তি কার্যকরের দায়িত্ব সরকারের। অভিভাবকের সম্মতিতে তাদের মাঝে বিবাহ দেওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারী কেবল ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিকা নারীকে ছাড়া বিয়ে করবে না এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক ছাড়া বিয়ে করবে না। আর মু’মিনদের উপর এটা হারাম করা হয়েছে’ (আন-নূর, ২৪/৩)। তবে তাদের মাঝে জোরপূর্বক বিবাহ দেওয়া যাবে না। উবায়দুল্লাহ ইবনু ইয়াযিদ (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, একজন ছেলে একজন মেয়ের সাথে অপকর্ম করল। অতঃপর উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন মক্কায় আগমন করলেন তখন তার সামনে এই মামলাটি পেশ করা হলো। তিনি তাদের দুইজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, তারা দুইজন এই অপকর্মের স্বীকারক্তি প্রদান করল। তিনি তাদের দুইজনকে (যেনার শাস্তি) বেত্রাঘাত করলেন এবং তাদেরকে একত্রিত করার (বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার) আশা ব্যক্ত করলেন। ছেলেটি তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল (মুসনাদ আশ-শাফেঈ, হা/১৩৮৬; সুনানুল কুবরা, হা/১৩৬৫৩)।


প্রশ্ন (৩৭) : আমি একজন যেনাকারী অনেকবার যেনা করেছি। বর্তমানে আল্লাহর নিকট জবাবদিহীতার ভয় আমার অন্তরকে প্রকম্পিত করে। প্রশ্ন হলো- আমার ক্ষমা পাওয়ার উপায় কী? কী করলে আমি ক্ষমা পেতে পারি?

-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
নিলফামারী।

উত্তর : যেনা অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। তাই এই মর্মে ইসলামের চূড়ান্ত বিধান হচ্ছে, যদি কোনো অবিবাহিত পুরুষ বা মহিলা ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাহলে তাকে একশ’ বেত্রাঘাত করতে হবে এবং পুরোপুরি এক বছর দেশান্তর করতে হবে (আন-নূর, ২; ছহীহ বুখারী, হা/১৬৯০)। আর যদি কোনো বিবাহিত পুরুষ বা মহিলা ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাহলে তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে হবে (ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৭৬)। আর এই বিধান ক্বায়েম করবে ইসলামি রাষ্ট্রের শাসক। তবে উল্লেখিত ব্যক্তিকে এই অবস্থায় একনিষ্ঠ তওবা ও বেশি বেশি ইস্তেগফারের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে (আল-ফুরক্বান, ২৫/৬৮-৭১)। আর আল্লাহ তা‘আলা চাইলে তার এই তওবা কবুল করে ক্ষমা করে দিতে পারেন (ছহীহ বুখারী, হা/৪৮৯৪)।  মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু’ (আয-যুমার, ৩৯/৫৩)।


হালাল-হারাম



প্রশ্ন (৩৮) : জমি বন্ধক নিয়ে তাতে উৎপাদিত ফসল ভোগ করলে ইবাদত কবুল হবে কি?

-সৌরভ
লালমনিরহাট।

উত্তর : ঋণ দেওয়া সম্পদের নিরাপত্তার জন্য যে সম্পদ ঋণদাতার মালিকানায় সোপর্দ করা হয়, তাই বন্ধক (আল বাক্বারা, ২৮৩)। বন্ধকে রাখা সম্পদ ঋণদাতার ভোগের জন্য নয়। বরং তা শুধু তার সম্পদের নিরাপত্তার জন্য। তাই ঋণদাতা উক্ত সম্পদ ভোগ করতে পারবে না। কারণ ‘যে ঋণে লাভ নিয়ে আসে, সেটাই সূদ’ (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/২০৬৯০; সুনানে কুবরা, বায়হাক্বী, হা/১০৯৩৩)। উল্লেখ্য যে, বন্ধকের সম্পদ যদি এমন হয় যে, তার পিছনে খরচ করা লাগে, যেমন- গরু, ছাগল, উট ইত্যাদি, তাহলে যতটুকু খরচ করবে, ততটুকু তার থেকে উপকার গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ প্রাণীকে খড়-ঘাস খাওয়াবে, তার বিনিময়ে সে প্রাণীর দুধ খাবে বা তার পিঠে আরোহণ করবে (ছহীহ বুখারী, হা/২৫১২; মিশকাত, হা/২৮৮৬)। খরচের চেয়ে বেশি উপকার গ্রহণ করলে তা সূদ বলে গণ্য হবে। দুগ্ধদানকারী বকরী বন্ধক গ্রহণকারী সম্পর্কে ইবরাহীম নাখাঈ বলেন,

شَرِبَ الْمُرْتَهِنُ مِنْ لَبَنِهَا بِقَدْرِ ثَمَنِ عَلَفِهَا فَإِنِ اسْتَفْضَلَ مِنَ اللَّبَنِ بَعْدَ ثَمَنِ الْعَلَفِ فَهُوَ رَبًّا

‘সে তার খড়-ঘাসের খরচ সমপরিমাণ দুধ পান করবে। যদি খড়-ঘাসের মূল্যের চেয়ে বেশি দুধ গ্রহণ করে, তাহলে তা সূদ হবে’ (ফাতহুল বারী, ৫/১৪৪; নায়লুল আওত্বার, ৫/২৭৯; তুহফাতুল আহওয়াযী, ৪/৩৮৭)। তাই বন্ধকে নেওয়া জমিতে উৎপাদিত সম্পূর্ণ ফসল ভোগ করা হারাম। এই ফসল খেয়ে ইবাদত কবুল হবে না (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫)। তবে যদি চাষাবাদের খরচ হিসাবে সমাজে প্রচলিত আধি বা বর্গা হিসাবে ফসল নিয়ে অবশিষ্ট ফসল জমির মূল মালিককে ফেরত দেয় কিংবা সেই ফসলের মূল্য সমপরিমাণ টাকা ঋণ থেকে মওকূফ করে দেয়, তাহলে তা হালাল হবে এবং তাতে ইবাদত কবুলে কোনো বাধা থাকবে না।


প্রশ্ন (৩৯) : আমার স্ত্রী সরকারি নার্স, সে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত পড়ে, আমিও পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত পড়ি। এখন প্রশ্ন হলো তার নার্স এর চাকুরী করা ঠিক হচ্ছে কি?

-চান মিয়া
রংপুর।

উত্তর : ইসলামে পর-পুরুষের সাথে সহবস্থান করে নারীর জন্য চাকুরীসহ কোনো কাজ করা বৈধ নয় যদিও তা পূর্ণ হিজাবসহ হয়ে থাকে। কেননা আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নারী-পুরুষের সহবস্থানকে সরাসরি নাকচ করেছেন। উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কোনো (গায়রে মাহরাম) নারী-পুরুষ যেনো নির্জনবাস না করে। কেননা (এমন হলে) তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান’ (মিশকাত, হা/৩১১৮)। অত্র হাদীছ প্রমাণ করে যে, গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের সহবস্থান স্পষ্ট হারাম। তবে, নারীদের পৃথক অবস্থানের ব্যবস্থা থাকলে চাকুরী করতে পারে।


হালালহারামচাকুরী



প্রশ্ন (৪০) : বাজার থেকে যবেহ করে আনা মুরগি। বিসমিল্লাহ বলে যবেহ করা হয়েছে কি-না আমি নিশ্চিত জানি না। কিংবা জানার কোনো উপায়ও নেই। এক্ষেত্রে ঐ গোশত খাওয়ার বিধান কি?

-ইসরাত জাহান
করিবহাট, নোয়াখালী।

উত্তর : যদি স্পষ্ট জানা যায় যে, প্রাণীটি কোনো অমুসলিম যবেহ করেছে বা কোনো মুসলিম বিসমিল্লাহ না বলে যবেহ করেছে তাহলে ঐ প্রাণীটি খাওয়া যাবে না। আর যদি স্পষ্ট জানা না যায় তাহলে খাওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলে খেতে হবে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের ক্বওমের লোকেরা জাহিলিয়্যাতের যুগের খুবই নিকটবর্তী (অর্থাৎ তারা কেবলই ইসলাম কবুল করেছে)। তারা আমাদের কাছে গোশত নিয়ে আসে, অথচ আমরা জানি না, তারা যবেহের সময় ঐ পশুর উপর ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করেছে কি-না? আমরা কি এ গোশত থেকে ভক্ষণ করব? তখন রাসূলূল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তোমরা ‘বিসমিল্লাহ’ বলে তা ভক্ষণ কর। (আবূ দাঊদ, হা/২৮২৯)।


অর্থনৈতিক- ব্যবসা-বাণিজ্য



প্রশ্ন (৪১) : ফেসবুক অথবা ইউটিউব থেকে এডসেন্স এর মাধ্যমে ইনকাম করা যাবে কি-না? অনেক সময় অনলাইনে ব্রাউস করার সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও অশ্লীল ছবি চোখে পড়ে এক্ষণে করণীয় কী?

-মো. আবু জোহা
খিলক্ষেত, ঢাকা।

উত্তর : এডসেন্স হলো গুগল কর্তৃক পরিচালিত একটি সিস্টেম। যেখানে একজন ব্যক্তি বিভিন্ন রকম ছবিযুক্ত বিজ্ঞাপন আপলোড করে থাকে। এরপর যত মানুষ তা দেখে থাকে সে অনুযায়ী তার একাউন্টে ডলার যুক্ত হয়। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি যদিও শরীয়া সম্মত বিজ্ঞাপন আপলোড করতে চাই তবুও তার সামনে বিভিন্ন রকম খারাপ ছবি চলে আসে বিধায় তার কর্তব্য হবে এমন কাজ করা হতে বিরত থাকা। কারণ এর মাধ্যমে তার চোখের যেনা হয়ে থাকে। রাসূলের বাণী, ‘চোখ যেনা করে থাকে আর তার যেনা হলো দৃষ্টি দেওয়া, মুখ যেনা করে থাকে আর তার যেনা হলো কথা বলা, হাত যেনা করে থাকে আর তার যেনা হলো স্পর্শ করা, পা যেনা করে থাকে আর তার যেনা হলো চলা এবং লজ্জাস্থান তা সত্যায়ন করে বা মিথ্যায় পরিণত করে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬২৪৩; মিশকাত, হা/৮৬)। অনুরূপভাবে আল্লাহ সৎ আমল করার জন্য বলেছেন। আল্লাহর বাণী, ‘হে রাসূলগণ ! তোমরা পবিত্র জিনিস হতে খাও এবং সৎ আমল কর’ (আল-মুমিনূন, ২৩/৫১)।


প্রশ্ন (৪২) : Youtube -এর মত (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) pp বানালে কি গুনাহ হবে? কারণ এখানে ভালো খারাপ দুটোই থাকে। এর জন্য কি আমি দায়বদ্ধ থাকব?

-মুবাশ্বিরা বুশরা
পার্বতীপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : যে সফটওয়্যারের মধ্যে ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে, হুবহু তার মতোই অন্য সফটওয়্যার বানানো উচিত নয়। কারণ তাতে ভালোর সাথে সাথে মন্দেরও প্রচার হয়। তবে এমন অ্যাপ দিয়ে যদি প্রচলিত সফটওয়্যারের মন্দ দিকগুলো কমানোর ব্যবস্থা করা যায়, অথবা কোনো সফটওয়্যারের ইনকাম অমুসলিমদের হাতে চলে যাওয়া রোধ করা যায়, তাহলে মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে এমন সফটওয়্যার বা অ্যাপ বানানো যেতে পারে এবং ইহা সৎকর্মে সহযোগিতার শামিল হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর’ (আল-মায়েদা, ৫/২)।


প্রশ্ন (৪৩) : ১. মোবাইলে ব্যবহারের জন্য তাফসীরুল কুরআন, হাদীছ, ইসলামিক বই ইত্যাদির Apps তৈরি করা যাবে কি? ২. যদি যায় তাহলে এই Appsগুলোতে বিভিন্ন হালাল জিনিসের এ্যাড শো করা বৈধ হবে কি।

-মুবাশ্বিরা, বুশরা
পার্বতীপুর, দিনাজপুর।

উত্তর : হ্যাঁ, বানানো যাবে এবং হালাল জিনিসের অ্যাড শো করা যাবে। কেননা, মহান আল্লাহ তাঁর পথে মানুষকে ডাকার আদেশ করেছেন। আর এ দাওয়াত দানের মাধ্যম বিভিন্ন হতে পারে। যেমন, ১. দলীল ভিত্তিক সুন্দর বক্তব্য উপস্থানের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ঐ ব্যক্তির চেয়ে কে উত্তম বাচনিক বক্তা হতে পারে যে আল্লাহর পথে ডাকে এবং সৎ আমল করে’ (হা-মীম সাজদা, ৪১/৩৩)। ২. ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে ইসলামরে দাওয়াত সর্বত্র পৌঁছে দিতে হবে। চাই তা অনলাইনে হোক অথবা অফলাইনে হোক। সুলায়মান আ. রানী বিলকিসের শিরক মিশ্রিত রাজত্বের কথা হুদহুদ পাখির মাধ্যমে জানতে পেরে তাওহীদের দাওয়াত পত্র তার নিকট পাঠিয়ে ছিলেন (আন-নামল, ২৭/২৩-৩০)। নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাওহীদের দাওয়াত পত্র বাদশাহ হিরাক্লিয়াসের নিকট দিহইয়াতুল কালবী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) -এর মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৭)। এ থেকে বুঝা যায় দ্বীন প্রচারের জন্য অ্যাপ তৈরী করা যাবে। অপরপক্ষে, আল্লাহ তাআলা ব্যবসা হালাল এবং সূদ হারাম করেছেন (আল-বাক্বারা, ২/২৭৫)। আর যে জিনিস হারাম তার বেচা-কেনা বা বিনিময়ে মূল্য গ্রহন করাও হারাম। যেমন, যেনা করা হারাম এবং যেনা করে এর মূল্য গ্রহণ করা হারাম। আবূ মাসঊদ আল-আনছারী বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‍কুকুরের ব্যবসা করে, পতিতাবৃত্তি করে ও গণকী করে মূল্য খেতে নিষেধ করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/২২৩৭; মিশকাত, হা/২৩২)। সুতরাং হালাল ব্যবসায়ে হালাল মাধ্যম গ্রহণ করাতে কোনো বাধা নিষেধ নেই। যেমন, বর্তমানে ইসলামি পত্রিকাগুলোতে বিভিন্ন কোম্পানির অ্যাড শো বা প্রচার করা হয়।


মৃত্যু



প্রশ্ন (৪৪) : মৃত্যু শয্যায় শায়িত মুমূর্ষ ব্যক্তিকে কোন দিকে করে শুইয়ে রাখতে হবে।

-শাহজালাল মিয়া
মাহিগঞ্জ, রংপুর।

উত্তর : মৃত্যু শয্যায় সায়িত মুমূর্ষ ব্যক্তি তার সুবিধামত শুয়ে থাকবে। এই ব্যাপারে শরীয়তে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এমন মুমূর্ষ ব্যক্তিকে উপস্থিত ব্যক্তিগণ তাওহীদের কালিমা لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ পাঠের তালক্বীন করবে। আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে মুমূর্ষদের ‘লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহ’ এর তালকীন দাও (অর্থাৎ তার সামনে কালেমা পাঠ করতে থাক যেন সে শুনে আল্লাহকে স্মরণ করে) (ছহীহ মুসলিম, হা/৯১৬)।


পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য



প্রশ্ন (৪৫) : সৎ মায়ের প্রতি সৎ ছেলের কি কোনো দায়িত্ব আছে?

-মো. হামিদুর রহমান
গোদাগাড়ী, রাজশাহী।

উত্তর : হ্যাঁ, সৎমায়ের প্রতি সৎছেলের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তার সাথে সদাচণ করা, তার খোঁজ-খবর নেওয়া। আর তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে পারলে তো বড় ইহসান হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি বানী ইসরাঈলের নিকট থেকে পাক্কা ওয়াদা নিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না, পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে’ (আল-বাক্বারা, ২/৮৩)। আপন মা, সৎ মা এরা হলো পিতার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ও পিতা-মাতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভালো ব্যবহার প্রসঙ্গে একটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। আবূ উসাইয়্যিদ আস-সাঈদী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট ছিলাম এমন সময় হঠাৎ করে বনূ সালামা গোত্রের জনৈক ব্যক্তি আসলেন। এসে বললেন, আল্লাহর রাসূল! পিতা-মাতা মৃত্যুর পর কোনো ভালো আচরণ বাকি থাকে কি যার দ্বারা আমি তাদের সাথে ভালো আচরণ করতে পারব। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আছে! তুমি তাদের মৃত্যুর পর তাদের জন্য ক্ষমা চাইবে, তাদের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে, তাদের সূত্র ধরে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করবে’ (আবূ দাঊদ, হা/৫১৪২; মিশকতা, হা/৪৯৩৬)।


সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য- আক্বীকা



প্রশ্ন (৪৬) : কোনো সন্তান যদি বুধবারের দিন মাগরিবের পরে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে বুধবার তার আক্বীকার দিনের  হিসাবের মধ্যে গণ্য হবে না-কি বৃহস্পতিবার থেকে দিন গণনা শুরু হবে?

-আঞ্জারুল ইসলাম
উত্তর দিনাজপুর  , ওয়েস্ট বেঙ্গল, ভারত।

উত্তর : বৃহস্পতিবার থেকে দিন গণনা আরম্ভ হবে। কেননা আরবী তারিখ শুরু হয় সূর্য ডোবার পর থেকে। সুতরাং বৃহস্পতিবারে জন্ম ধরে ৭ম দিনে আক্বীকা করতে হবে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে ছিয়াম ধরো এবং চাঁদ দেখে ছিয়াম ছেড়ে দাও। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে, শা’বান মাসের ত্রিশ দিন পূর্ণ করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৮১)। উক্ত হাদীছ থেকে বুঝা যায় যে, আরবী তারিখের সম্পর্ক চাঁদের সাথে। আর চাঁদ যেহেতু মাগরিবের পর দেখা যায় সুতরাং আরবী তারিখের হিসাবও মাগরিবের পর থেকে আরম্ভ হবে।


অপসংস্কৃতি- দিবস উৎযাপন



প্রশ্ন (৪৭) : ইসলামে দিবস পালন করা হারাম। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে কেন আমরা ইদ উদযাপন করি?

-সাকিলা জাহান
সাপাহার, নওগাঁ।

উত্তর : ইসলাম যে সময় যে আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন তা সে সময় সে দিনে পালন করা ইবাদত। আর যে ব্যাপারে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করাও ইবাদত। ইসলাম আগের সকল দিবস উদযাপন করাকে হারাম করে দুইটি দিনে আনন্দ করার আদেশ করেছেন। তাই দুই ইদ ব্যতীত সকল ধরনের উৎসব, দিবস উদযাপন হারাম সে যেই নামেই হোক না কেন?। এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন বস্তু উদ্ভাবন করল যা তার মধ্যে নেই তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য’ (বুখারী, হা/২৬৯৭; মিশকাত, হা/১৪০)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهْوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার প্রতি আমার নির্দেশ নেই তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)।


প্রশ্ন (৪৮) : কারো জন্মদিনে ‘শুভ জন্মদিন’ বলে শুভেচ্ছা জানালে কি তা শিরক হবে?

-আসিফ খান কসবা
আড়াইবারি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

উত্তর : কারো জন্মদিনে ‘শুভ জন্মদিন’ বলা যাবে না। কেননা যত দিন, দিবস ও বার্ষিক আছে যার নযির ইসলামে নাই তার সবই বিজাতীয় অপসংস্কৃতি, যা মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে। আর মুসলিমরা নিজেদের অজান্তেই তা নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি হিসেবে লালন-পালন করে থাকে। আর ‘শুভ জন্মদিন’ শব্দগুচ্ছ হলো ইংরেজি ‘হ্যাপি বার্থ-ডে টু ইউ’-এর ভাবানুরূপ, যা ইউরোপ-আমেরিকার ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের থেকে মুসলিমদের মাঝে ঢুকে পড়েছে। মুসলিমদের জন্য এ বাক্য ব্যবহার করা বৈধ নয়। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদেরই দলভূক্ত’ (আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫১১৪; মিশকাত, হা/৪৩৪৭; )।


হাদীছ



প্রশ্ন (৪৯) : ‘মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পিতা-মাতার মাগফিরাতের জন্য মহান আল্লাহর নিকট অনুমতি চেয়েছিলেন। আল্লাহ অনুমতি দেননি’। মর্মে বর্ণিত হাদীছের আরবী ইবারত, বাংলা অনুবাদ, অনুচ্ছেদ ও হাদীছ নাম্বারসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

-মো. আব্দুল গফুর
জিপিও ৯০০০, খুলনা।

উত্তর : প্রশ্নে জানতে চাওয়া হাদীছটি আরবী ইবারত ও অনুবাদসহ উল্লেখ করা হলো:

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ زَارَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- قَبْرَ أُمِّهِ فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ فَقَالَ « اسْتَأْذَنْتُ رَبِّى فِى أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يُؤْذَنْ لِى وَاسْتَأْذَنْتُهُ فِى أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأُذِنَ لِى فَزُورُوا الْقُبُورَ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْمَوْتَ ».

 আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কর্তৃক বর্ণিত, একদা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন এবং তাঁর আশে-পাশে সকলকে কাঁদিয়ে তুললেন। (কারণ, জিজ্ঞাসা করা হলে) তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর নিকট আমার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চাইলাম। কিন্তু তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন না। অতঃপর আমি তাঁর নিকট তার কবর যিয়ারত করতে অনুমতি চাইলে তিনি তাতে অনুমতি দিলেন। সুতরাং তোমরা কবর যিয়ারত কর। কারণ, তা মরণকে স্মরণ করিয়ে দেয়’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৬৩৯; অধ্যায়-৪৮ মিশকাত, হা/১৭৬২; ‘ক্ববর যিয়ারত অধ্যায়’)।


প্রশ্ন (৫০) : জনৈক ইসলামিক স্কলার বলেছেন, কঠিন ফিতনার যুগে কোনো মুসলিম যদি কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী কোনো সুন্নাতের উপর আমল করে, তাহলে ৫০ জন শহীদের ছওয়াব পাবে। এ কথা কি ঠিক?

-রিজভী আহমেদ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

উত্তর : জি; ফিতনার যুগে ছহীহ সুন্নাহর উপর আমলকারী ব্যক্তি ছাহাবীদের মধ্য হতে ৫০ জন ব্যক্তির সমপরিমাণ ছওয়াব অর্জন করবে মর্মে বর্ণিত হাদীছটি ছহীহ (সিলসিলা ছহীহা, হা/৪৯৪; তিরমিযী, হা/৩০৫৮)। তবে ৫০ বা ১০০ জন শহীদের ছওয়াব পাবে মর্মে বর্ণিত হাদীছ নিতান্তই যঈফ (সিলসিলা যঈফা, হা/৩২৬)। কেননা এই বর্ণনার মাঝে মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উযরী নামক বর্ণনাকারী রয়েছে যিনি অপরিচিত এবং আব্দুল মজিদ ইবনু আব্দুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ নামক একক বর্ণনাকারী রয়েছে, যার একক বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য এবং হাসান ইবনু কুতায়বা নামক বর্ণনাকারী রয়েছে যিনি মাতরুকুল হাদীছ ‘তার হাদীছ প্রত্যাখ্যাত’ (মাজমা’উয যাওয়ায়েদ, ‘আল-হায়ছামী’, ১/১৭২ পৃ. লিসানুল মীযান, ২/২৪৬ পৃ.)।