ফেতনা : একটি পর্যালোচনা
-সাজ্জাদ সালাদীন*


ফেতনার সময় শয়তান এসে মানুষকে প্ররোচনা দিয়ে বলতে থাকে, ‘দেখো! আজ ইসলাম ধর্মের কারণেই পৃথিবীতে এতো সমস্যা। ধর্মের কারণেই এতো বিভেদ, মানুষে মানুষে এতো মারামারি। আর আল্লাহ তাআলা যদি সত্যিই থেকে থাকেন, তাহলে এখন তিনি মুসলিমদেরকে সাহায্য করছেন না কেন?’

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাহায্য আসবেই। কিন্তু তার আগে আল্লাহ তাআলা ফেতনার মাধ্যমে মানুষের ঈমান পরীক্ষা করবেন, যেভাবে তিনি অত্যাচারী ফেরাউনের মাধ্যমে বনূ ইসরাঈলের ঈমান পরীক্ষা করেছিলেন, অত্যাচারী কুরাইশবাসীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আর ছাহাবীগণের ঈমান পরীক্ষা করেছিলেন। ফেতনার সময়ে মুমিনগণ ইসলামের আদর্শকে আরও শক্ত করে ধারণ করে এবং বিপদ যতো কঠিনতর হয়, মুমিনগণের ঈমানী শক্তি আরও শক্ত হয়। আর মুনাফেকরা ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে কাফেরদের সাথে মিতালি জমায়। এমনকি ফেতনাগুলো কঠিন হতে কঠিনতর রূপ ধারণ করবে এবং মানুষ দ্বীনহারা হয়ে যাবে।

ফেতনা কাকে বলে :

اَلْفِتْنَةُ শব্দটি একবচন, এর বহুবচন اَلْفِتَنُ। এর অর্থ হলো, পরীক্ষা বা পরিশুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পরীক্ষা করা (to examine with the intent of purifying)। ফেতনা ‘(فتنة)’ শব্দটি পবিত্র কুরআন ও হাদীছে বহু স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষকে আল্লাহ বিভিন্ন পরীক্ষায় নিপতিত করেন, যাতে কারা সত্যিকার ঈমানদার আর কারা মুনাফেক, তা স্পষ্ট হয়।

এই পরীক্ষা আমাদের প্রিয় কোনো কিছু (যেমন- অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা, পুরুষের জন্য নারী, নারীর জন্য পুরুষ) দিয়ে হতে পারে। আবার হতে পারে আমাদের অপছন্দনীয় কিছু দিয়ে (যেমন অকস্মাৎ বিপদ, গৃহযুদ্ধ, বিশৃঙ্খলা, অত্যাচারী শাসক ইত্যাদি)।

ইবনুল আরাবী ফেতনার পরিচয়ে বলেন, ফেতনা মানে পরীক্ষা, ফেতনা মানে দুর্যোগ, ফেতনা মানে সম্পদ, ফেতনা মানে সন্তান, ফেতনা মানে কুফর, ফেতনা মানে মতপার্থক্য, ফেতনা মানে আগুনে জ্বলা।[1]

পবিত্র কুরআনের আলোকে ফেতনা :

সাধারণ মানুষ ফেতনা বলতে মারামারি, হানাহানি, হত্যা ইত্যাদি বুঝে থাকেন। তাদের উক্ত ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং ফেতনা একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। আল্লাহ তাআলা ফেতনার মাধ্যমে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে অকৃতজ্ঞ মানুষ থেকে পৃথক করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা বিশেষ’ (আত-তাগাবুন, ৬৪/১৫)। তিনি আরো বলেন,

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهِ وَلَئِنْ جَاءَ نَصْرٌ مِنْ رَبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمْ أَوَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ الْعَالَمِينَ.

‘আর কিছু লোক আছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। অতঃপর যখন আল্লাহর ব্যাপারে তাদের কষ্ট দেওয়া হয়, তখন তারা মানুষের নিপীড়ন-পরীক্ষাকে আল্লাহর আযাবের মতো গণ্য করে। আর যদি তোমার রবের পক্ষ থেকে কোনো বিজয় আসে, তখন অবশ্যই তারা বলে, ‘নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে ছিলাম’। সৃষ্টিকুলের অন্তরসমূহে যা কিছু আছে, আল্লাহ কি তা সম্পর্কে সম্যক অবগত নন?’ (আল-আনকাবূত, ২৯/১০)। মহান আল্লাহ বলেন,وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ  ‘আর ফেতনা হত্যার চেয়েও কঠিনতর’ (আল-বাক্বারা, ২/১৯১)। তিনি আরো বলেন, وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ ‘আর ফেতনা হত্যার চেয়েও বড়’ (আল-বাক্বারা, ২/২১৭)। তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেন,وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ ‘তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকো, যতক্ষণ না ফেতনা দূরীভূত হয়’ (আল-বাক্বারা, ২/১৯৩)। এই আয়াতে ফেতনা বলতে শিরক বুঝানো হয়েছে।

মহান আল্লাহ আরও বলেছেন,

وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْكُمْ خَاصَّةً

‘আর তোমরা ভয় করো ফেতনাকে, যা তোমাদের মধ্য থেকে বিশেষভাবে শুধু যালেমদের উপরই আপতিত হবে না’ (আল-আনফাল, ৮/২৫)

হাদীছের আলোকে ফেতনা :

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ قَالَ بَادِرُوا بِالأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا‏.

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন, ‘অন্ধকার রাতের মতো ফেতনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের প্রতি অগ্রসর হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন হলে বিকালে কাফের হয়ে যাবে। বিকালে মুমিন হলে সকালে কাফের হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে দিবে’।[2]

ফেতনা বলতে অনেক সময় নিদর্শনকেও বুঝানো হয়ে থাকে। যেমন : ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে ক্বিয়ামতের আলামত অধ্যায়কে كتاب الفتن বলা হয়েছে। আবার খারাপ অর্থ বুঝাতেও ফেতনা ব্যবহৃত হয়। ক্বিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে অনেক ফেতনা-ফাসাদ দেখা দেবে। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন। হাদীছে এসেছে,

হুযায়ফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ক্বিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে সবকিছু বর্ণনা করলেন। তারপর যে স্মরণ রাখার, সে স্মরণ রাখল আর যে ভুলে যাওয়ার, সে ভুলে গেল। আমার এ সঙ্গীগণ জানে যে, তন্মধ্যে কতক বিষয় এমন আছে, যা আমি ভুলে গেছি। কিন্তু সেটা সংঘটিত হতে দেখে তা আবার মনে পড়ে যায়। যেরূপ কোনো লোক দূরে চলে গেলে তার চেহারা মানুষ ভুলে যায়। অতঃপর সে তাকে দেখামাত্রই চিনে ফেলে।[3] হাদীছে আরও এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ قَالَ وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ، أَفْلَحَ مَنْ كَفَّ يَدَهُ.

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সূত্রে বর্ণিত, নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘আরববাসীদের জন্য আফসোস! কেননা তাদের উপর অকল্যাণ ঘনিয়ে এসেছে। যে ব্যক্তি তা থেকে হাত গুটিয়ে রাখবে, সে সফল হবে’।[4]

উপরে বর্ণিত এসব আয়াত ও হাদীছগুলো দ্বারা বুঝা যায় যে, অবস্থাভেদে ফেতনার অর্থের মধ্যে ভিন্নতা আসে।

সুতরাং প্রত্যেক মুমিনের জন্য সেসব বিষয় জানা জরুরী, যেসব বিষয় মানুষকে ইসলাম হতে বিমুখ করে দেয়; যেসব বিষয় মুমিনের ঈমানী চেতনাকে হ্রাস করে দেয়। বিষেশত ইসলামের পথের বাধাগুলোকে চিহ্নিত করা অতীব জরুরী। কেননা কেউ যদি ক্ষতিকর বস্তু, গোমরাহির বিষয়গুলো হতে অজ্ঞ থাকে, তাহলে তা তাকে অজান্তে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে ফেলবে এবং আল্লাহর শাস্তির সম্মুখীন হবে। মহান আল্লাহ বলেন,نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ‘আমি তাকে ফিরাব সেদিকে, যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসাবে তা খুবই মন্দ’ (আন-নিসা, ৪/১১৫)

মুমিনগণ শত বাধা, যুলুম-নির্যাতন ও আল্লাহর পক্ষ হতে সকল পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করে ঈমানের উপর অটুট থাকে। আর মুনাফেকরা সাময়িক যুলুম-নির্যাতনের ভয়ে দ্বীনের পথ হতে পলায়ন করে এবং তারা ধারণা করে যে, তারা মুক্তি পাবে। পক্ষান্তরে তারা নিজেদের উপর বিপদ ডেকে আনে এবং আল্লাহর নাজাত হতে দূরে সরে যায়। যেমন কোনো মানুষ কয়লার ভয়ে ভীত হয়ে পলায়ন করে আগুনে ঝাঁপ দেয়। বস্তুত দুনিয়ার যুলুম-নির্যাতন, দুঃখ-কষ্ট ক্ষণস্থায়ী আর আখেরাতের শাস্তি অসহনীয় এবং চিরস্থায়ী।

ফেতনার বৈশিষ্ট্যসমূহ :

কুরআন ও হাদীছ পর্যালোচনা করলে আমরা ফেতনার কিছু বৈশিষ্ট্য পাই। ফেতনার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো :

(১) ফেতনা প্রচণ্ড আকর্ষণের সৃষ্টি করে :

যে কোনো ফেতনাই মানুষকে চুম্বকের মতো টানে। যে লোক কোনো দিন খবরের কাগজ পড়ে না, ফেতনার সময় সেও সবাইকে জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা এরপর কী হয়েছিল?

(২) ফেতনা মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয় :

কিছু কিছু ফেতনা আছে, যেগুলোর উপস্থিতিতে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মানুষের পক্ষে আল্লাহর ইবাদত করা কঠিন হয়ে পড়ে (যেমন- যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি)।

(৩) অন্যদিকে কিছু কিছু ফেতনা আছে (যেমন- বিশ্বকাপ খেলা) যেগুলোতে মানুষ এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে যায় যে, সে ভুলে যায় তার উপর তার প্রতিপালকের দেওয়া দায়িত্ব। ছালাতী ব্যক্তি ফেতনার আকর্ষণে সময় মতো ছালাত পড়তে পারে না। মা-বাবা ও পরিবারের উপর দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ফেতনার আপডেট জানার জন্য। ফেতনার সময় গীবত বেড়ে যায়, বেড়ে যায় মিথ্যাবাদিতা, চোগলখোরি আর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি।

পর্যায়ক্রমে ফেতনার উদ্ভব :

ফেতনাগুলো একটি অপরটির চেয়ে ভয়াবহ হবে। এমনকি ফেতনায় পড়ে মানুষ দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

إِنَّ بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ فِتَنًا كَأَنَّهَا قِطَعُ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ فِيهَا مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا وَيَبِيعُ فِيهَا أَقْوَامٌ خَلَاقَهُمْ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا

‘নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের পূর্বে অন্ধকার রাত্রির মতো ঘন কালো অনেক ফেতনার আবির্ভাব হবে। সকালে একজন লোক মুমিন অবস্থায় ঘুম থেকে জাগ্রত হবে, বিকালে সে কাফেরে পরিণত হবে। বহু সংখ্যক লোক ফেতনায় পড়ে দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের বিনিময়ে তাদের চরিত্র ও আদর্শ বিক্রি করে দিবে। অপর বর্ণনায় এসেছে, তোমাদের একজন দুনিয়ার সামান্য সম্পদের বিনিময়ে তার দ্বীন বিক্রি করে দিবে।[5] 

أَيُّهَا النَّاسُ أَظَلَّتْكُمُ الْفِتَنُ كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ، أَيُّهَا النَّاسُ لَوْ تَعْلَمُوْنَ مَا أَعْلَمُ بَكَيْتُمْ كَثِيْرًا وَضَحِكْتُمْ قَلِيْلًا.

‘হে লোক সকল! অন্ধকার রাতের টুকরার ন্যায় ফেতনা তোমাদের আচ্ছাদিত করবে। হে লোক সকল! আমি যা জানি, তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে অধিকহারে কাঁদতে ও অল্প হাসতে।[6] ছাহাবী আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,

أَظَلَّتْكُمَ الْفِتَنُ كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ أَنْجَى النَّاس فِيهَا صَاحِبُ شَاهِقَةٍ، يَأْكُلُ مِنْ رِسْلِ غَنَمِهِ، أَوْ رَجُلٌ مِنْ وَرَاءِ الدَّرْبِ آخِذٌ بِعَنَانِ فَرَسِهِ، يَأْكُلُ مِنْ فِيء سَيْفِهِ.

‘অন্ধকার রাতের টুকরার ন্যায় ফেতনা তোমাদের আচ্ছাদিত করবে। লোকদের মাঝে উঁচু পাহাড়ে আরোহণকারীই কেবল সেই ফেতনা থেকে রক্ষা পাবে। যে তার ছাগলের দুধ পান করে দিনাতিপাত করবে। অথবা এমন লোক রক্ষা পাবে, যে তার ঘোড়ার লাগাম ধরে সর্বদা রাস্তায় প্রস্তুত থাকবে। তার তরবারী যা উপার্জন করে দিবে, তা থেকে সে খাবে’।[7] অর্থাৎ ক্বিয়ামতের পূর্বে ফেতনার ছড়াছড়ি শুরু হবে এবং বৃষ্টিপাতের ন্যায় ফেতনার আবির্ভাব ঘটবে।[8] প্রত্যেক পরবর্তী যুগ পূর্বের যুগের চেয়ে খারাপ হবে।[9] এমনকি ক্বিয়ামতের পূর্বে ফেতনার ভয়ে মানুষ মৃত্যু কামনা করবে।[10]

উল্লেখ্য, সাধারণভাবে বিপদ-আপদের কারণে মৃত্যু কামনা করা যাবে না।[11] 

ফেতনাই শাস্তি :

আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

أُمَّتِىْ هَذِهِ أُمَّةٌ مَرْحُوْمَةٌ لَيْسَ عَلَيْهَا عَذَابٌ فِى الآخِرَةِ عَذَابُهَا فِى الدُّنْيَا الْفِتَنُ وَالزَّلاَزِلُ وَالْقَتْلُ

‘আমার এ উম্মত দয়াপ্রাপ্ত, পরকালে এদের কোনো শাস্তি হবে না, আর ইহকালে তাদের শাস্তি হলো ফেতনাসমূহ, ভূমিকম্প ও যুদ্ধ বিগ্রহ’।[12]

ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ قَامَ عِنْدَ بَابِ حَفْصَةَ رَضِيَ اللهُ عَنهَا فَقَالَ بِيَدِهِ نَحْوَ الْمَشْرِقِ الْفِتْنَةُ هَا هُنَا مِنْ حَيْثُ يَطْلُعُ قَرْنُ الشَّيْطَانِ قَالَهَا مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا.

‘একদা রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাফছা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর  দরজার নিকট দণ্ডায়মান ছিলেন। এ সময় তিনি তাঁর আঙ্গুল দ্বারা পূর্বদিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ফেতনা এ দিক থেকে আসবে, যেদিক থেকে শয়তানের শিং উদিত হবে। এ কথাটি তিনি দুই বা তিনবার বলেছেন’।[13]  

রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্বের দিকে ইঙ্গিত করে ইরাকসহ পুরো প্রাচ্যকে বুঝিয়েছেন। কারণ ইরাক থেকেই খারেজী, শী‘আ, মু‘তাযিলা, জাহমিয়া, মাজূসী, মানুবিয়া, মুযদাকিয়াসহ বহু ভ্রান্ত দলের আবির্ভাব ঘটেছে। অপরদিকে চিন ও ভারত থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, কাদিয়ানী, বাহাইয়া ও তাতারদের আবির্ভাব ঘটেছে এবং পরবর্তীতে দাজ্জাল ও ইয়াজূজ-মাজূজের ফেতনার আবির্ভাব ঘটবে।

সালিম ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে বর্ণিত তিনি বলতেন, হে ইরাকবাসী! আশ্চর্য! ছগীরা (গুনাহ) সম্পর্কে তোমাদের কতই না প্রশ্ন। অথচ কবীরা (গুনাহ) করতে তোমাদের দ্বিধা নেই। আমি আমার পিতা ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে শুনেছি, তিনি বলতেন, আমি রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তার হাত দ্বারা পূর্ব দিকে ইঙ্গিত করে বলতে শুনেছি, ফেতনা এদিক থেকে আসবে, যেদিক থেকে শয়তানের দুই শিং উদিত হয়। অথচ তোমরা পরস্পর হানাহানি করছ’।[14]    

ফেতনার সময় মুসলিমদের করণীয় :

আমাদের প্রিয় নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফেতনার সময় মুমিনদের করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়ে গেছেন। ফেতনার সময় যেহেতু যুদ্ধরত ও বিবাদমান দলগুলোর কোনটির দাবী সত্য তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীছ উল্লেখ করা যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

بَادِرُوا بِالأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِى كَافِرًا أَوْ يُمْسِى مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا.

‘আধার রাতের ন্যায় ফেতনা আসার পূর্বেই তোমরা নেক আমলের দিকে ধাবিত হও। (কেননা এমন এক সময় আসবে) যে সময় সকালে একজন মুমিন হলে সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে। সন্ধ্যায় মুমিন হলে সকালে কাফের হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে দিবে’।[15]

সর্বোপরি ফেতনার সময় আমাদরেকে সর্বাধিক দু‘আ করতে হবে। আর তাই নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছালাতের মধ্যে আল্লাহর কাছে ফেতনা থেকে আশ্রয় চেয়েছেন এবং বেশি বেশি দু‘আ করেছেন। তন্মধ্যে একটি দু‘আ হলো-

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেভাবে এ দু‘আটি শিক্ষা দিতেন, যেভাবে কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন,

قُولُوا اللَّهُمَّ إِنَّا نَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ.

‘তোমরা বলো, হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, মাসীহ দাজ্জালের সম্মোহিত বিপর্যয় থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং জীবন-মরণের পরীক্ষা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’।[16]

ফেতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদেরকে কতিপয় কাজ করতে হবে। সেগুলো হলো-

ক. ফেতনা সম্পর্কে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ভবিষ্যৎ বাণী বাস্তবায়ন করতে হবে।

খ. নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের পথকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে।

গ. ফেতনার সময় ধৈর্যধারণ করতে হবে।

ঘ. বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ফেতনার সময় ইবাদতের মর্যাদা হিজরতের সমান।

ঙ. ফেতনার সময় বেশি বেশি দু‘আ করতে হবে।

চ. নিজেকে সংশোধন করার জন্য বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ইত্যাদি।

আমাদের দায়িত্ব :

আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাত ও আলেম-উলামার দ্বারস্থ হওয়া। আমাদের কোনো কিছু বুঝে না আসলে যারা সত্যিকার অর্থে কুরআন ও সুন্নাহের ইলম রাখেন, তাদের কাছ থেকে সমাধান খুঁজে বের করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ ‘যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস করো’ (আন-নাহল, ১৬/৪৩)

আল্লাহ তাআলার নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, তিনি যেন আমাদের সঠিক পথের হেদায়াত দেন এবং আমাদের অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্টদের পথ অবলম্বন করা হতে হিফাযত করেন। اَلْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ অভিশপ্ত হলো তারা, যারা তাদের ইলম অনুযায়ী আমল করে না। আর الضَالُّوْنَ পথভ্রষ্ট হলো, যারা ইলম ছাড়া আমল করে। আর পুরস্কারপ্রাপ্ত হলো তারা, যারা আহলে ইলম ও ইলম অনুযায়ী আমলকারী। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا .

‘আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, তারা তাদের সাথে থাকবে, আল্লাহ যাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, ছিদ্দীক্ব, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসাবে তারা হবে উত্তম’ (আন-নিসা, ৪/৬৯)। যাকে আল্লাহ তাআলা তার পথের তাওফীক্ব দেন, সেসব লোকই তাদের সাথী হবে। আর যারা আল্লাহর রাস্তা থেকে দূরে সরে যায়, তাদের সাথী হবে গোমরাহ-পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত লোকেরা। আমরা আল্লাহর নিকট তা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করি।

সুতরাং উপরিউক্ত কাজগুলো করার মাধ্যমে আমরা ফেতনা থেকে বাঁচতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ফেতনা থেকে বাঁচার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!


* এম. এ., ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

[1]. ইবনে মানযূর, লিসানুল আরব।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১৪, তিরমিযী, ছহীহুল জামে‘ আছ-ছগীর, হা/৫১২৫।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭৪৪৫; আবূ দাঊদ, হা/৪২৪২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৩৫৭; মিশকাত, হা/৫৩৭৯।

[4]. মুসনাদে আহমাদ, আবূ দাঊদ, হা/৪২৪৯।

[5]. তিরমিযী, ছহীহুল জামে‘ আছ-ছগীর, হা/৫১২৫।

[6]. আহমাদ, হা/২৪৫৬৪, সনদ ছহীহ।

[7]. হাকেম, হা/২৪৬০; ছহীহাহ, হা/১৪১৮; ছহীহুল জামে‘, হা/১০৩৫।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৪২৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৭৯৬; মুসনাদুল বাযযার, হা/২৫৬৫; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮৫৪৯; শারহুস সুন্নাহ, হা/৪২১৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হা/১৪৫; মুসনাদে হুমাইদী, হা/৪৭০; জামেঊছ ছগীর, হা/১২৯৮৬; মিশকাত, হা/৫৩৮৭।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৭০৬৮; তিরমিযী, হা/২৩৬৬; মিশকাত, হা/৫৩৯২।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৫৭; মিশকাত, হা/৫৪১০।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬৭১।

[12]. আবূ দাঊদ, হা/৪২৭৮; মিশকাত, হা/৫৩৭৪; সিলসিলা ছহীহা, হা/৯৫৯।

[13]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২৭৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯০৫।

[14]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯০৫।

[15]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৮; হাকেম, হা/২৪৬০; মিশকাত, হা/৫৩৮৩।

[16]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৬১।