বজ্র ও বিজলী

সাঈদুর রহমান

শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ,
বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

অনেক দিন ধরে মনে মনে ভাবছি বজ্র ও বিজলী নিয়ে কিছু লিখবো। কারণ বর্তমানে বজ্র ও বিজলীর আঘাতে অনেক মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। তাই বিষয়টি নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ। এ পৃথিবীতে আল্লাহ তা‘আলা অসংখ্য জিনিস সৃষ্টি করেছেন। তার মাঝে অন্যতম দু’টি সৃষ্টি হচ্ছে বজ্র ও বিজলী। পৃথিবীতে সমস্ত জিনিস যেভাবে  আল্লাহর  প্রশংসা করে, ঠিক সেভাবে বজ্র ও বিজলীও আল্লাহর  প্রশংসা করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَيُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ‘বজ্র তার সপ্রশংসা মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং তার ভয়ে ফেরেশতাগণও তাই করে’ (রা‘দ, ১৩)। কীভাবে তাসবীহ পাঠ করে তা আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন। আল্লাহ বলেন, تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ ‘সাত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সবকিছু তারই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। পৃথিবীতে এমন কিছু নেই, যা তার সপ্রশংসা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না; কিন্তু তোমরা তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করা বুঝতে পার না’ (বানী ইসরাঈল, ৪৪)।

বজ্র ও বিজলী পরিচিতি :

বজ্র ও বিজলী নিয়ে বিজ্ঞানীদের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। তারা এখন পর্যন্ত এক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। কিন্তু আমরা এর সঠিক সিদ্ধান্ত বিশুদ্ধ হাদীছ থেকে পেয়েছি। বজ্র ও বিজলী আসলে কী? এ ব্যাপারে হাদীছে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ أَقْبَلَتْ يَهُودُ إِلَى النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالُوا يَا أَبَا الْقَاسِمِ أَخْبِرْنَا عَنِ الرَّعْدِ مَا هُوَ قَالَ «مَلَكٌ مِنَ الْمَلاَئِكَةِ مُوَكَّلٌ بِالسَّحَابِ مَعَهُ مَخَارِيقُ مِنْ نَارٍ يَسُوقُ بِهَا السَّحَابَ حَيْثُ شَاءَ اللَّهُ ». فَقَالُوا فَمَا هَذَا الصَّوْتُ الَّذِى نَسْمَعُ قَالَ « زَجْرُهُ بِالسَّحَابِ إِذَا زَجَرَهُ حَتَّى يَنْتَهِىَ إِلَى حَيْثُ أُمِرَ ».

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়াহূদীরা নবী (ছা.)-এর নিকট এসে বলল, হে আবুল ক্বাসেম! আমাদেরকে বজ্র (মেঘের গর্জন) প্রসঙ্গে বলুন, এটা আসলে কী? তিনি বলেন, মেঘমালাকে হাঁকিয়ে নেওয়ার জন্য ফেরেশতাদের একজন নিয়োজিত আছেন। তার সাথে রয়েছে  আগুনের চাবুক। এর সাহায্যে তিনি মেঘমালাকে সেদিকে পরিচালনা করেন, যেদিকে আল্লাহ চান। তারা বলল, আমরা যে আওয়ায শুনতে পাই, তার তাৎপর্য কী? রাসূল (ছা.)  বললেন, এটা হচ্ছে ফেরেশতার হাঁকডাক। এভাবে হাঁকডাক দিয়ে তিনি মেঘমালাকে তার নির্দেশিত স্থানে নিয়ে যান।[1]  এ হাদীছ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, বজ্র হলো ফেরেশতার হাঁকডাক আর বিজলী হলো ফেরেশতা যে চাবুক দিয়ে মেঘমালাকে হাঁকিয়ে নিয়ে যায় ঐ চাবুকের ঝলক বা আঘাত।

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন,

إِنَّ الرَّعْدَ مَلَكٌ يَنْعِقُ بِالْغَيْثِ، كَمَا يَنْعِقُ الرَّاعِي بِغَنَمِهِ

বজ্রধ্বনিকারী হলেন একজন ফেরেশতা। তিনি মেঘমালাকে হাঁকিয়ে নিয়ে যান, যেমন রাখাল তার মেষপালকে হাঁকিয়ে নিয়ে যায়’।[2]

বিজলী ও বজ্রপাত কেন হয়? :

আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বজ্রপাত হওয়ার কারণ বর্ণনা করে বলেন , هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثِّقَالَ ‘তিনিই তোমারদেরকে বিজলী দেখান ভয় ও আশা-আকাঙ্ক্ষারূপে এবং তিনিই সৃষ্টি করেন ভারী মেঘ’ (রা‘দ, ১২)। এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বিজলী প্রেরণের দু’টি কারণ বর্ণনা করেন।

(১) ভয় দেখানোর জন্য। পৃথিবীতে যারা স্বৈরাচারী, আল্লাহর  বিধি-বিধানকে লঙ্ঘন করে, মানুষের উপর যুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন, অন্যায়, অবিচার ও অনাচার করে বেড়ায়, তাদেরকে ভয় দেখানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলা এই বিজলী প্রেরণ করেন। তিনি একথা বুঝাতে চান যে, হে পৃথিবীর অত্যাচারীরা! তোমরা সাবধান হও! অন্যথা তোমাদের উপর শাস্তি অবধারিত।

(২) আশা-আকাঙ্ক্ষারূপে। অর্থাৎ দুর্ভিক্ষ কবলিত এলাকার মানুষেরা বৃষ্টির আশা-আকাঙ্ক্ষা করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আল্লাহ তা‘আলা অন্য একটি আয়াতে বিজলী প্রেরণের কারণ বর্ণনা করেন, وَمِنْ آيَاتِهِ يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًاوَطَمَعًا ‘আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি হচ্ছে, তিনি তোমাদেরকে দেখান বিজলী ভয় ও আশারূপে’ (রূম, ২৪)। এ আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে, বিজলী প্রেরণের অন্যতম কারণ হচ্ছে মানুষদেরকে আল্লাহর  নিদর্শন দেখানো। অর্থাৎ এত শক্তিশালী বিদ্যুৎ বা বিজলী দেখে মানুষরা যেন আল্লাহ তা‘আলার দিকে ফিরে আসে।

কখন বজ্রপাত বেশি হবে :

বিভিন্ন হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বজ্রপাত সবচেয়ে বেশি পতিত হবে শেষ যুগে। অর্থাৎ ক্বিয়ামতের পূর্বে। যেমন এক হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِى سَعِيدٍ الْخُدْرِىِّ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ تَكْثُرُ الصَّوَاعِقُ عِنْدَ اقْتِرَابِ السَّاعَةِ حَتَّى يَأْتِىَ الرَّجُلُ الْقَوْمَ فَيَقُولُ مَنْ صَعِقَ قِبَلَكُمُ الْغَدَاةَ فَيَقُولُونَ صَعِقَ فُلاَنٌ وَفُلاَنٌ

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.) বলেন, ‘ক্বিয়ামতের নিকটবর্তী সময় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হবে। এমনকি এক ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের কাছে এসে বলবে, আগামীকাল তোমাদের মাঝে কার উপর বজ্রপাত হবে? তখন তারা বলবে, অমুক, অমুক ও অমুকের উপর’।[3]

কাদের উপর বজ্রপাত হবে :

পৃথিবীতে যারা পাপিষ্ঠ তাদের উপর বজ্রপাত হবে। একটি হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَنَسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ رَجُلًا مَرَّةً إِلَى رَجُلٍ مِنْ فَرَاعِنَةِ الْعَرَبِ، فَقَالَ: «اذْهَبْ فَادْعُهُ لِي» . قَالَ: فَذَهَبَ إِلَيْهِ فَقَالَ: يَدْعُوكَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ لَهُ: مَنْ رَسُولُ اللَّهِ، وَمَا اللَّهُ، أَمِنْ ذَهَبٍ هُوَ، أَمْ مِنْ فِضَّةٍ هُوَ، أَمْ مِنْ نُحَاسٍ هُوَ؟ قَالَ: فَرَجَعَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَهُ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَدْ أَخْبَرْتُكَ أَنَّهُ أَعْتَى مِنْ ذَلِكَ، قال لي كذا وكذا، فقال لي: «ارجع إليه الثانية» فَذَهَبَ فَقَالَ لَهُ مِثْلَهَا، فَرَجَعَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ أَخْبَرْتُكَ أَنَّهُ أَعْتَى مِنْ ذلك، فقال: «ارْجِعْ إِلَيْهِ فَادْعُهُ» فَرَجَعَ إِلَيْهِ الثَّالِثَةَ، قَالَ: فأعاد عليه ذلك الكلام، فبينما هُوَ يُكَلِّمُهُ إِذْ بَعَثَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ سَحَابَةً حِيَالَ رَأْسِهِ، فَرَعَدَتْ فَوَقَعَتْ مِنْهَا صَاعِقَةٌ، فذهب بقحف رأسه

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসূল (ছা.)  এক ব্যক্তিকে আরবের কোনো এক অহঙ্কারী লোকের কাছে একজনকেপ্রেরণ করেন। তিনি বললেন, রাসূল (ছা.)  তোমাকে ডেকেছেন। ঐ ব্যক্তি তাকে বলল, আল্লাহ ও রাসূল আবার কে? স্বর্ণের নাকি রূপার, নাকি তামার? তারপর তিনি রাসূল (ছা.)-এর নিকট ফিরে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছা.)! আমি আপনাকে সংবাদ দিচ্ছি যে, সে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে এই এই বলেছে। তখন তিনি তাকে বললেন, দ্বিতীয়বার যাও, আমি তাকে দেখবো। অতঃপর তিনি গেলেন এবং ঐ ব্যক্তি তাকে একই কথা বললেন। তিনি ফিরে এসে বললেন, হে আল্লাহর  রাসূল (ছা.)! আমি আপনাকে সংবাদ দিচ্ছি যে, সে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে। তারপর তিনি বলেন, তাকে আসতে বলো। তিনি তৃতীয়বার তার কাছে গিয়ে যেতে বললেন আর ঐ ব্যক্তিও ঐ একই কথা পুনরাবৃত্তি করলো। এভাবেই সে কথা বলছিল, এমন সময় আল্লাহ তা‘আলা তার মাথার উপর এক খণ্ড মেঘমালা প্রেরণ করেন। আর সেখান থেকে একটি বজ্র পড়ে তার মাথার খুলি উড়ে গেল।[4]  এ হাদীছ থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি যে, বজ্রপাত হবে ঐ সকল লোকের উপর, যারা পাপিষ্ঠ, অহঙ্কারী-দাম্ভিক ও আল্লাহ এবং তার রাসূলদ্রোহী। অতএব, হে পাপিষ্ঠের দলেরা! সাবধান হও! অন্যথা আল্লাহর  শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না।

বজ্রপাতের সময় করণীয় :

বজ্রপাতের সময় রাসূল (ছা.) কোনো দু‘আ পড়তেন কিনা এ ব্যাপারে তার থেকে কোনো বিশুদ্ধ হাদীছ পাওয়া যায় না; কিন্তু কতিপয় ছাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা বজ্রপাতের সময় একটি দু‘আ পড়তেন। আবু হুরায়রা, ইবনে আব্বাস ও আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) তারা নিম্বোক্ত দু‘আটি পড়তেন।

سُبْحَانَ الَّذِيْ يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلآئِكَةُ مِنْ خِيْفَتِهِ.

উচ্চারণ : সুবহানাল্লাযী ইউসাব্বিহুর রা‘দু বিহামদিহী ওয়াল মালাইকাতু মিন খীফাতিহি। অর্থ : মহা পবিত্র সেই সত্তা, যার গুণগান করে বজ্র ও ফেরেশতাম-লী সভয়ে’।[5]

ইমাম আওযাঈ (রহি.) বলেন, ইবনে যাকারিয়া (রহি.) বলতেন, যে ব্যক্তি বজ্রপাতের সময় এই দু‘আ পড়বে, তার উপর কখনো বজ্রপাত হবে না।[6]

পরিশেষে আল্লাহ তা‘আলার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন এই ভয়ঙ্কর শাস্তি থেকে আমাদের রক্ষা করেন- আমীন!

[1]. তিরমিযী, হা/৩১১৭, সনদ ছহীহ।

[2]. আদাবুল মুফরাদ, হা/৭২৭, সনদ হাসান।

[3]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৬৩৮।

[4]. তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরারা‘দ, আয়াত ১২।

[5]. রা‘দ ১৩; মুওয়াত্ত্বা, মিশকাতহা/১৫২২।

[6]. তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরারা‘দ, আয়াত ১২।