বন্ধু আমার! কেন ছালাত পড়ো না?
-জাবির হোসেন

বন্ধু আমার! তুমি কেন ছালাত আদায় করো না? তুমি কি সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসী নও? তাহলে কেন সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে নাফরমানী করছ? তুমি কি জানো না যে, তোমার প্রতিপালক তোমার উপর পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করেছেন? না কি তুমি জেনেও না জানার ভান করে থাকছ? অন্যকে অজুহাত পেশ করে ধোঁকা দিতে পারলেও তুমি কি নিজেকে ধোঁকা দিতে পারবে? পারবে কি তুমি সৃষ্টিকর্তাকে ধোঁকা দিতে? তবে কেন…?

বন্ধু আমার! এই বয়স তোমার আমোদ-ফুর্তি করার বয়স নয়। এই বয়স সম্পর্কে তোমাকে ক্বিয়ামতের দিন জিজ্ঞেস করা হবে। তবে কেন তুমি…? রক্ত গরম আছে বলে…? তুমি কি দেখোনি, তোমার কত বন্ধু ছালাতহীন অবস্থায় মারা গেছে? তারপরও তুমি মত্ত আছো দুনিয়াবী ভোগ বিলাসিতায়? 

বন্ধু আমার! মুআযযিন তোমাকে পাঁচ ওয়াক্ত ডাকে ছালাতের জন্য। কল্যাণের পথে আসার জন্য। সফলতার পথে আসার জন্য। দুনিয়াতে তুমি তো সাকসেস হতে চাও, তাই না? তাইতো তুমি উচ্চ শিক্ষিত হয়ে চাকরির জন্য প্রিপারেশন নাও। তুমি তো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হতে চাও? তাইতো তুমি সময় ব্যয় করো ব্যবসাতে সফলতার জন্য। কিন্তু তুমি কি জানো, ছালাতহীন অবস্থায় দুনিয়াতে সফল হলেও আখিরাতে কখনই তুমি সফল হতে পারবে না? তবে কেন…?

বন্ধু আমার! আমি জানি তুমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করো, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের তুমি প্রশংসা করো। কিন্তু তুমি যদি তোমার কর্তব্য পালন না করো অথবা তোমার ডিউটিতে গাফলতি করো, তাহলে কি তোমাকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জবাবদিহি করতে হবে না? অনুরূপ তুমি সৃষ্টিকর্তার ভৃত্য। তোমার উপর দায়িত্ব হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করা। কিন্তু তুমি তবুও মুখ ফিরিয়ে থাকছ? তোমাকে কি প্রতিপালকের নিকট জবাবদিহি করতে হবে না? এ বিষয়ে কি কোনো সার্টিফিকেট পেয়েছ? নিশ্চয় না। তাহলে…?

বন্ধু আমার! তুমি তোমার শরীর সুস্থ রাখার জন্য, দৈনিক তিন বার বা তার বেশি আহার করো। তাতে তোমার দেহ সুস্থ থাকে। কই তুমি তো কোনো দিন খেতে অবহেলা বা উদাসীনতা দেখাও না? তবে তোমার কি আত্মার খোরাক নেই? হ্যাঁ, আছে! আত্মাকে সুস্থ রাখতে হলে তোমাকে অবশ্যই পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করতেই হবে। নতুবা তোমার সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়বে।

বন্ধু আমার! তুমি যে বাহানা পেশ করছ, তা শয়তানের ওয়াসওয়াসা, তা কি তুমি জানো না? তোমার প্রতিপালক শয়তানকে তোমার শত্রু বলেছেন (বাক্বারাহ, ২০৮)। তারপরও তুমি শয়তানকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করছ? কীভাবে করতে পারো? তবে কি সৃষ্টিকর্তার বাণী তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?

বন্ধু আমার! তুমি বলছ ছালাত আদায় না করলেও আমার ঈমান ঠিক আছে। কিন্তু যেখানে ঈমান থাকার লক্ষণ হচ্ছে ছালাত, তখন তুমি কীভাবে এই কথা বলতে পারো? তুমি কী প্রিয় নবী (ছা.)-এর হাদীছ শোনোনি? যেখানে তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো (মুমিন) ব্যক্তি আর মুশরিক ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য হলো ছালাত পরিত্যাগ করা’।[1]  যে ঈমান তোমাকে তোমার প্রতিপালকের ডাকে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করাতে পারে না, সেই ঈমান নিয়ে তুমি কীভাবে জান্নাতে যেতে পারো?

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘আমি পরে ছালাত আদায় করব’। তুমি কি গ্যারান্টি দিতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বেঁচে থাকার? যেখানে নিঃশ্বাসকে বিশ্বাস করা যায় না, সেখানে তুমি কীভাবে এ কথা বলতে পারো?

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘ছালাত পড়ে কে কত বড়লোক হয়েছে’? কিন্তু বন্ধু! ছালাত তো কেউ দুনিয়াতে বড়লোক হওয়ার জন্য পড়ে না। অবশ্যই সে বড়লোক হবে পরকালে। যখন তোমাকে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করা হবে, তখন তুমি নিজেই বলবে যে, ‘আমরা ছালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না’ (মুদ্দাছছির, ৪৩)।

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘এখন কাজের খুব চাপ, ঝামেলা শেষ হলেই শুরু করব’। বন্ধু আমার! পৃথিবীতে তুমি মানুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ করেছ। তোমার প্রয়োজনীয় মৌলিক উপাদান সংগ্রহের জন্য তোমাকে কাজ করতেই হবে। এই পৃথিবীতে ঝামেলা বা কাজ নেই এমন মানুষ নেই। যে যার জায়গায় সবাই ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মাঝে তোমাকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছা.)-এর ডাকে সাড়া দিতে হবে। তোমার ঝামেলা আছে, তাই তুমি সৃষ্টিকর্তার বিধানকে উপেক্ষা করবে, এমন তো হতে পারে না। এই ঝামেলা বা কাজের ফাঁকে নির্ধারিত সময়ে তোমার জন্য তোমার প্রতিপালক যে ছালাতের বিধান দিয়েছেন, তা যেভাবেই হোক তোমাকে আদায় করতেই হবে। দুনিয়াবী কাজ কখনো আল্লাহর কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তুমি একটু গভীরভাবে চিন্তা করো, তাহলেই উপলব্ধি করতে পারবে! তুমি সবসময় কাজকে বলবে, ছালাত আছে। তুমি কখনোই ছালাতকে বলবে না যে, এখন কাজ আছে।

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘এখন পড়াশোনা চলছে’। চাকরি পেলে তারপর ছালাত আদায় করব’। বন্ধু আমার! সামান্য চাকরির বা পড়াশোনার অজুহাতে তুমি এখন ছালাত আদায় করছ না। কিন্তু তুমি কি গ্যারেন্টি দিতে পারবে যে, তুমি চাকরি পাবেই? জীবনে যদি কোনো দিন চাকরি না পাও, তাহলে কি তুমি কোনো দিনই ছালাত আদায় করবে না? তোমাকে যেমন ছাত্রাবস্থায় ছালাত আদায় করতে হবে, ঠিক তেমনই চাকরিরত অবস্থায়ও ছালাত আদায় করতে হবে। এই অজুহাত শয়তানের ওয়াসওয়াসা মাত্র। কত চাকরিজীবীকে দেখেছি, যারা চাকরির আগে বলেছিল, চাকরি পেলে তবেই ছালাত আদায় করবে; কিন্তু না, তারা এখনো পর্যন্ত মাসজিদমুখী হতে পারেনি।

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘কত লোক আছে কত গুনাহ করে, আমি তো শুধু ছালাত আদায় করি না মাত্র’। কিন্তু বন্ধু! অন্যের গুনাহের জন্য তোমাকেও গুনাহ করতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। যে যেই পাপ করছে, সে সেই পাপের জন্য পরকালে শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিন্তু তাদের জন্য তোমার শাস্তি মাফ হবে না। তুমি আল্লাহকে এই অজুহাত দেখাতে পারবে না। তুমি কি জানো না, ছালাত ছেড়ে দেওয়া কাবীরা গুনাহ? [2]  তবে কেন তুমি ছালাত ছেড়ে দিয়ে শাস্তির সম্মুখীন হতে যাচ্ছ? তুমি তাওবা করে এখনই ছালাত আদায় করতে আরম্ভ করো।

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘যখন মুসলিম হয়ে জন্মেছি, একদিন না একদিন জান্নাতে তো যাবই’। বন্ধু আমার! তাওহীদপন্থী হলে তো একদিন সবাই জান্নাতে যাবে, কিন্তু যে যতটুকু অপরাধ করেছে, সেই অপরাধের শাস্তি পাওয়ার পর। তুমি দুনিয়ার আগুনে কয়েক মিনিট থাকতে পারবে? না। তাহলে তুমি কীভাবে ভাবতে পারলে যে, জাহান্নামের আগুনে তুমি থাকতে পারবে? যে জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুনের তুলনায় ঊনসত্তর গুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন।[3] তুমি জাহান্নামকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারোনি। জাহান্নামের আগুনে আমাদের এক মাইক্রো সেকেন্ড থাকার ক্ষমতা নেই। তুমি যদি জাহান্নামকে চিনতে, তাহলে এ ধরনের কথা কখনই বলতে পারতে না।

আর মুসলিম ঘরে জন্ম নিলে কোনো ব্যক্তি চিরকাল মুসলিম থাকবে এমন কোনো কথা নেই। তাহলে আদম (আ.), যিনি তোমার-আমার আদিপিতা, তিনি তো মুসলিম ছিলেন। তাহলে তার ঘর থেকে অবিশ্বাসীরা এলো কীভাবে? তুমি ছালাত আদায় না করলে তোমার বিশ্বাসও দুর্বল হয়ে পড়বে, একসময় তুমি অবিশ্বাসী হয়ে পড়তে পারো। সেই ভয় কি তুমি করবে না?

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘ও তো ছালাত আদায় করে, তবুও কত অন্যায় করে? আর আমি ছালাত আদায় না করেও সেই অন্যায়গুলো করি না। আমি তো ওর চেয়ে ভালো’। বন্ধু আমার! সে যদি গুনাহ করে, তার জন্য সে দায়ী। সে যদি ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে তাওবা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু তাকে উদাহরণ পেশ করে তুমি যদি ছালাত আদায় না করো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে কি ক্ষমা করবেন? ছালাত আদায় করেও গুনাহ হতে পারে। ছালাতের মাধ্যমে তো আল্লাহ অনেক গুনাহ ক্ষমা করেন। তুমি যদি ছালাত আদায়কারী ও ছালাত অনাদায়কারীদের মধ্যে অপরাধের পরিসংখ্যান দেখ, তাহলে ছালাত আদায়কারীদের তুলনায় ছালাত অনাদায়কারীদের অপরাধের মাত্রা বেশি দেখতে পাবে। তাছাড়া মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মুমিনরা সফলকাম হয়ে গেছে। যারা নিজেদের ছালাতে বিনয় নম্রতা অবলম্বন করে’ (মুমিনূন, ১-২)। তাছাড়া কিছু মানুষ ছালাত আদায় করেও জাহান্নামে যাবে, যারা লৌকিকতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় করে।[4]

তুমি তো নিজেই বলছ, অন্য কোনো অন্যায় করো না; ভালো কথা, খুব ভালো কথা। কিন্তু ছালাত আদায় না করাটা যে মহা অন্যায়, এটা কি তুমি জানো না? তাহলে এই মহা অন্যায়টি কেন করছ? আর অন্য অন্যায়গুলো যেমন করো না, ঠিক তেমনি এই অন্যায়টিও তুমি বাদ দাও। তুমি ছালাত আদায় করে দেখিয়ে দাও যে, কীভাবে ছালাত আদায় করে সব অন্যায় থেকে বিরত থাকা যায়। তুমি উদাহরণ হও। তোমাকে দেখে যেন আরও পাঁচজন বলতে পারে, দেখো! তার মতো হও। সে ছালাত পড়ে, কিন্তু কোনো অন্যায় করে না। আর তোমরা ছালাত পড়েও কেন অন্যায় করো? তুমি মন্দ দৃষ্টান্তের অনুসরণ না করে নিজেই ভালো দৃষ্টান্ত হওয়ার চেষ্টা করো।

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ হলে সবাই একদিন জান্নাতে যাবে’। কিন্তু বন্ধু আমার! জেনে রেখো, মহান আল্লাহ ঢালাওভাবে সবার প্রতি অনুগ্রহ করবেন না। কাদের প্রতি তিনি অনুগ্রহ করবেন, সেই তালিকা পবিত্র কুরআনে আছে। ‘আর তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর এবং রাসূলের, যাতে তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়’ (আলে ইমরান, ১৩২)। ‘তোমরা ছালাত ক্বায়েম করো, যাকাত প্রদান করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো, যেন তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও’ (নূর, ৫৬)। তাহলে বুঝতে পারছ যে, কাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ ও দয়া বর্ষিত হবে। তাই অলীক স্বপ্ন দেখা ছেড়ে কুরআন ও হাদীছের অনুসরণে আমল করে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করো।

বন্ধু আমার! তোমাকে যখন বলি আযান হয়েছে, ছালাতের জন্য চলো। তখন তুমি বলো যে, ‘কাপড় ঠিক নেই, তুমি যাও; এখন আমি যাব না’। বন্ধু আমার! তুমি বলছ, কাপড় ঠিক নেই। তার মানে তুমি বুঝাতে চাচ্ছ যে, তুমি অপবিত্র আছো। তুমি মুসলিম, তোমার শরীর ও পোশাক সারাদিন অপবিত্র থাকবে… ভাবতে পারা যায়! একজন মুসলিম সারাদিন অপবিত্র থাকতেই পারে না। তার মন থাকবে পবিত্র, তার শরীর থাকবে পবিত্র, তার পোশাক থাকবে পবিত্র। এটাই তো নবী (ছা.)-এর শিক্ষা।

তোমার কাপড় ঠিক না থাকলেও, তোমার শরীর অপবিত্র থাকলেও তোমাকে পবিত্রতা অর্জন করে ছালাত আদায় করতে হবে। এই অজুহাতে ছালাত বাদ দেওয়া তোমার জন্য বৈধ নয়।

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘ছালাত পড়ার সময় পাচ্ছি না’। বন্ধু আমার! ছালাত দিনে পাঁচবার আদায় করতে হয়। আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুব বেশি হলে এক ঘণ্টা ব্যয় হবে প্রতিপালকের স্মরণে। তোমার হাতে ২৩ ঘণ্টা থাকবে বিভিন্ন কাজের জন্য। তোমার হাতে এত সময় থাকার পরও বলছ যে, সময় নেই’। এটা কি যৌক্তিক কথা কখনো হতে পারে? নাকি ছালাত না পড়ার জন্য তুমি বাহানা পেশ করছ মাত্র। ভেবে দেখো, তুমি যে অবস্থাতেই থাকো না কেন, তোমাকে ছালাত আদায় করতেই হবে। জিহাদের ময়দানে, অসুস্থ থাকলে, সফরে থাকলেও ছালাত আদায় করতে হয়। কোনো পরিস্থিতির জন্য ছালাত মাফ নেই।[5]  আর তুমি বলছ, সময় পাচ্ছি না।

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘ছালাত পড়তে গিয়ে কোমরে ব্যথা করে, উঠা-বসা করতে পারো না। তাই কীভাবে ছালাত আদায় করি’। বন্ধু আমার! তোমার যেভাবে সুবিধা, তোমাকে সেভাবেই ছালাত আদায় করতে হবে। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, কাত হয়ে, ইশারায়; যেভাবে পারবে সেভাবেই তোমাকে ছালাত আদায় করতে হবে। এমন অসুবিধা দেখিয়েও তোমার ছালাতে মুক্তি নেই।[6]   

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘আমি তো গুনাহগার। আমার ছালাত আদায় করে লাভ কী’? বন্ধু আমার! আমরা গুনাহগার, এই জন্যই তো আমাদের ছালাত আদায় করা দরকার। পৃথিবীতে গুনাহমুক্ত মানুষ আছে কি? ছালাত আমাদেরকে গুনাহ থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করবে। ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের গুনাহ মাফ করবেন। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে বলেছেন, ‘তুমি তোমার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব আবৃতি করো এবং ছালাত প্রতিষ্ঠা করো। নিশ্চয়ই ছালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা জানেন’ (আনকাবূত, ৪৫)।

আর জেনে রেখো, এটিও একটি অজুহাত মাত্র। গুনাহের কারণে যদি তুমি ছালাত আদায় না করো, তাহলে দু’দিন পর তুমি বলতেও পারো, আমি মুসলিম থাকব না। কারণ আমি তো গুনাহগার। তখন কি এই যুক্তি মানা যাবে? তোমার অসুখ হলে তুমি কি বলবে আগে সুস্থ হই তারপর ওষুধ খাব? নাকি তুমি আগে ওষুধ খেয়ে তারপর সুস্থ হওয়ার আশা করবে? একইভাবে গুনাহ থাকলেও আগে ছালাত আদায় করে তোমাকে গুনাহমুক্ত হবার ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই তুমি সফলতা লাভ করতে পারবে।

বন্ধু আমার! তুমি বলছ, ‘শুধু ছালাত আদায় করে কি জান্নাতে যাওয়া যায়?’ বন্ধু আমার! শুধু ছালাত দিয়ে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব না। কিন্তু এটাও তুমি জেনে রেখো যে, ছালাত বাদ দিয়েও জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়। যেমনভাবে বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় যে কম্পলসারি পেপারগুলো থাকে, সেগুলো যদি তুমি পাশ না করতে পারো, তাহলে অন্য পেপারগুলোতে শতভাগ নাম্বার পেলেও তুমি উত্তীর্ণ হতে পারবে না। একইভাবে ছালাতে তুমি যদি উত্তীর্ণ না হতে পারো, তাহলে তোমার অন্য কোনো আমল কাজে আসবে না।[7]

বন্ধু আমার! এগুলো তো তোমার কথার কথা। এই কথাগুলো বলে আমাদের মুখ স্তব্ধ করে দিতে পারো। কিন্তু তুমি কি কখনো সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে পেরে উঠতে পারবে?

বন্ধু আমার! এটা তোমার বোকামি। এখনো সময় আছে। ফিরে এসো তোমার প্রতিপালকের পথে। ছালাতের মধ্য দিয়ে গুনাহ থেকে নিজের শরীর পবিত্র করো। দমবন্ধ হয়ে গেলেই কিন্তু সব শেষ!

বন্ধু আমার! তোমাকে ছালাতের কয়েকটি ফযীলতসংক্রান্ত হাদীছ শোনাই-

(১) আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.) এরশাদ করেন, ‘বান্দা যখন ছালাতে দণ্ডায়মান হয়, তখন তার গুনাহসমূহ হাযির করা হয়। অতঃপর তা তার মাথায় ও দুই স্কন্ধে রেখে দেওয়া হয়। এরপর সে ব্যক্তি যখন রুকূ‘ বা সিজদায় গমন করে, তখন গুনাহসমূহ ঝরে পড়ে’।[8]

(২) আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ছা.) -কে এ কথা বলতে শুনেছেন, ‘আচ্ছা তোমরা বলো তো, যদি কারোর বাড়ির দরজার সামনে একটি নদী থাকে, যাতে সে প্রতিদিন পাঁচবার করে গোসল করে, তাহলে তার শরীরে কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকবে কি? ছাহাবীগণ বললেন, না, কোনো ময়লা অবশিষ্ট থাকবে না। তিনি বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের উদাহরণও সেইরূপ। এর দ্বারা আল্লাহ পাপরাশি নিশ্চিহ্ন করে দেন।[9]

(৩) আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত, এক জুম‘আহ থেকে পরবর্তী জুম‘আহ পর্যন্ত এর মধ্যবর্তী সময়ে যেসব পাপ সংঘটিত হয়, সেসবের মোচনকারী হয়। এই শর্তে যে, যদি কাবীরা গুনাহে লিপ্ত না হয়।[10]

(৪) উবাদাহ ইবনে ছামেত (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত যেগুলোকে আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের উপরে ফরয করেছেন, যে ব্যক্তি এগুলোর জন্য সুন্দরভাবে ওযূ করবে, ওয়াক্ত মোতাবেক ছালাত আদায় করবে, রুকূ ও খুশূ‘-খুযূ‘ পূর্ণ করবে, তাকে ক্ষমা করার জন্য আল্লাহর অঙ্গীকার রয়েছে। আর যে ব্যক্তি এগুলো করবে না, তার জন্য আল্লাহর কোনো অঙ্গীকার নেই। তিনি ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন, ইচ্ছা করলে আযাব দিতে পারেন’।[11]

বন্ধু আমার! তোমার জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি যে, কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করার পরই ইসলামে ছালাতের স্থান। ছালাত একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা সাত বছর বয়স থেকেই আদায়ের অভ্যাস করতে হয়। মুমিনের জন্য সর্বাবস্থায় পালনীয় ফরয হলো ছালাত, যা অন্য ইবাদতের বেলায় হয়নি। ক্বিয়ামতের দিন বান্দার সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে তার ছালাতের। ছালাতের হিসাব সঠিক হলে, তার সমস্ত আমল সঠিক হবে। আর ছালাতের হিসাবে বেঠিক হলে, তার সমস্ত আমল বরবাদ হবে। মৃত্যুকালে রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর সর্বশেষ অছিয়ত ছিল ছালাত ও নারী জাতি সম্পর্কে। জাহান্নামী ব্যক্তির লক্ষণ এই যে, সে ছালাত বিনষ্ট করে এবং প্রবৃত্তির পূজারী হয়। মুমিন ও কাফের-মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হলো ছালাত।[12]

বন্ধু আমার! সবশেষে তোমাকে আহ্বান করি, তুমি পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আজ থেকে শুরু করে দাও। এটাই তোমার জন্য সফলতার মানদণ্ড। তুমি ছালাতহীন অবস্থায় মারা গেলে তোমার জন্য জাহান্নাম অপেক্ষা করছে। যে জাহান্নামে তুমি থাকতে পারবে না। আল্লাহ তোমাকে জাহান্নাম থেকে হিফাযত করুন। ছালাত আদায় করে তুমি মুত্তাক্বীদের দলভুক্ত হও। আর মুত্তাক্বীদের জন্যই তো রয়েছে প্রতিপালকের পক্ষ থেকে জান্নাতের সুসংবাদ (হিজর, ৪৫)।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৯।

[2]. আব্দুল্লাহিল হাদী, একশত কাবীরা গুনাহ (প্রকাশনায়: মাকতাবাতুস সুন্নাহ), পৃ. ৫।

[3]. মুহাম্মাদ ইকবাল কীলানী, জাহান্নামের বর্ণনা (অনুবাদ: এইচ. এম আবু আকীব, প্রকাশনায়: আতিফা পাবলিকেশন্স), পৃ. ৮৭।

[4]. সূরা মাঊন, ৪-৭; সূরা নিসা, ১৪২।

[5]. আবু তাহের মিছবাহ, ইসলামকে জানতে হলে (প্রকাশনায়: দারুল কলম), পৃ. ৯৮-৯৯।

[6]. আব্দুল হামীদ মাদানী, স্বলাতে মুবাশশির (প্রকাশনায়: তাওহীদ প্রকাশনী- বর্ধমান), পৃ. ১০।

[7]. প্রাগুক্ত।

[8]. সিলসিলা ছাহীহা, হা/১৩৯৮।

[9].  ছহীহ বুখারী, হা/৫২৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৬৭; মিশকাত, হা/৫৬৫।

[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৩; মিশকাত, হা/৫৬৪।

[11]. আহমাদ, হা/২২৭০৪; আবুদাঊদ, হা/৪২৫; মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/১৪; নাসাঈ, হা/৪৬১; মিশকাত, হা/৫৭০।

[12]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) (প্রকাশনায়: হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), পৃ. ৩০-৩২।