বন্ধু আমার! পাপ করো না, পাপ হয়ে গেলে তওবা করতে ভুলো না


জাবির হোসেন*


বন্ধু আমার! পাপ করো না। তোমার প্রতিপালক তোমাকে পাপ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি তোমাকে মানুষরূপে এই ধরাতে পাঠিয়েছেন। তুমি তাঁর ইবাদত করবে— এটাই তোমার প্রতিপালকের চাওয়া। তোমার জন্য বাধ্যতামূলক হচ্ছে যে, তুমি সৃষ্টি হিসাবে স্রষ্টার আনুগত্য করবে। তুমি কি জানো, মহান আল্লাহ তোমাকে কেন সৃষ্টি করেছেন? তোমার সৃষ্টিকর্তা জানিয়েছেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে এজন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমারই ইবাদত করবে’ (আয-যারিয়াত, ৫১/৫৬)। তুমি মহান আল্লাহর প্রেরিত বিধান অনুযায়ী বিভিন্ন আদেশ ও নিষেধ মেনে চলবে— এটিই ইবাদত। পক্ষান্তরে, আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে, তুমি যদি তাঁর অবাধ্য হও— তাই হলো পাপ।

বন্ধু আমার! তুমি কি জানো, পাপ কী? পাপ হলো, মহান প্রতিপালকের নিয়ম লঙ্ঘন করলে যা হয়, শরীআত ও সুস্থ বিবেক অনুযায়ী যা বর্জন করা আবশ্যক, তা সম্পাদন করার নাম পাপ। শরীআতে যে কাজের শাস্তি ইহকালে ও পরকালে নির্ধারিত হয়েছে, তা করাই পাপ। যে কাজ মহান প্রতিপালক করতে নিষেধ করেছেন, তা করা এবং যা করতে আদেশ করেছেন, তা না করাই পাপ। যে কাজ করলে জাহান্নাম যেতে হবে অথবা আল্লাহর গযব ও শাস্তি নেমে আসে অথবা তার অভিশাপ আসে অথবা তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা মানুষের অভিশাপ দেয়, তাই পাপ বা গুনাহের কাজ। শরীআতে যা হারাম করা হয়েছে, তা সংঘটিত করাই পাপ। এমনকি যে কাজ করতে গেলে মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয় বা অপরাধবোধ জগ্রত হয় বা গোপনীয়তা অবলম্বন করতে মন চায়, করা উচিত হচ্ছে না এরূপ ভাবনা মনে খটকা দেয়, তাই পাপ।[1]

বন্ধু আমার! গুনাহ বা পাপগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা : (১) ছাগীরা গুনাহ, যাকে সায়্যেয়াতও বলা হয় (২) কাবীরা গুনাহ, যাকে মুবিকাত তথা ধ্বংসকারীও বলা হয়।[2]

আবার কেউ কেউ কাবীরা গুনাহকে দুটি উপভাগে বিভক্ত করেছেন। তারা মোট তিন প্রকার পাপের কথা বলেছেন। যেমন : (১) অতি মহাপাপ (আকবারুল কাবায়ের), যেমন : শিরক, তাওহীদবাদী না হওয়া, কুফরী, মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নবী বলে অস্বীকার করা, কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে স্বীকার না করা, ফেরেশতাকে অবিশ্বাস করা, ভাগ্য অস্বীকার করা ইত্যাদি। (২) মহাপাপ (কাবীরা গুনাহ), যেমন : ব্যভিচার করা, হত্যা করা, চুরি করা, মিথ্যা বলা ইত্যাদি। (৩) উপপাপ বা লঘুপাপ (ছাগীরা গুনাহ), যেমন: বিবাহ হারাম নয় এমন নারীর প্রতি কামনার দৃষ্টিতে তাকানো বা মুছাফাহ বা স্পর্শ করা ইত্যাদি।[3]

বন্ধু আমার! পাপ আমাদের জীবনের বড় অভিশাপ। পাপ থেকে দূরে থাকতে আদেশ করেছেন আমাদের প্রভু। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপনীয় পাপকার্য পরিত্যাগ করো, যারা পাপের কাজ করে, তাদেরকে অতিসত্বরই নিজেদের কৃতকার্যের প্রতিফল দেওয়া হবে’ (আন-আনআম, ৬/১২০)। হাদীছেও এসেছে, ‘তোমরা ছোট ছোট তুচ্ছ পাপ থেকেও দূরে থাকো’।[4]

বন্ধু আমার! পাপ করলে তার শাস্তি পেতে হবে। তুমি কি জানো, পাপের পরিণতি কী? পাপের আসল শাস্তি হবে পরকালে। ইহকালেও কিছু অপরাধের শাস্তির বিধান আছে, কিন্তু সকলকে তা দেওয়া হয় না। দেশীয় আইনের ফাঁক-ফোকর তাদের শাস্তি থেকে রক্ষা করে। কিন্তু, মনে রেখো— পরকালে অপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে মন্দ কাজ করবে, সে তার প্রতিফল পাবে’ (আন-নিসা, ৪/১২৩)। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, ‘অবশ্যই যে ব্যক্তি পাপ করেছে এবং যার পাপরাশি তাকে পরিবেষ্টন করেছে, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে’ (আল-বাক্বারা, ২/৮১)

হ্যাঁ— বন্ধু! পাপের পরিণতি হলো ‘জাহান্নাম’। জাহান্নাম পরকালের এক নিকৃষ্টতম বাসস্থান। যা আল্লাহ তাআলা ধর্মদ্রোহী, সত্য প্রত্যাখ্যানকারী, অবিশ্বাসী, কাফের, মুশরিক, মুনাফিক্ব এবং পাপীদের জন্য সৃষ্টি করে রেখেছেন। যেখানে তারা স্ব স্ব কৃতকর্মের শাস্তিস্বরূপ প্রতিফল ভোগ করবে।[5]

বন্ধু আমার! তুমি তো পাপ সম্পর্কে এবং পাপের প্রকারভেদ ও তার পরিণতি সম্পর্কেও জানলে। তাই তোমার কাছে অনুরোধ, কোনো পাপকে হালকা বা তুচ্ছ মনে করো না! এ ব্যাপারে কয়েকটি হাদীছ শোনো— 

(১) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও! নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলোর উদাহরণ হলো ঐ লোকদের মতো যারা কোনো মাঠে বা প্রান্তরে গিয়ে অবস্থান করল এবং তাদের প্রত্যেকেই কিছু কিছু করে লাকড়ি (জ্বালানি কাঠ) সংগ্রহ করে নিয়ে এলো। শেষ পর্যন্ত এতটা লাকড়ি তারা সংগ্রহ করল যা দিয়ে তাদের খাবার পাকানো হলো। নিশ্চয় নগণ্য ছোট ছোট গুনাহতে লিপ্ত থাকা ব্যক্তিদের যখন সেই নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলো গ্রাস করবে (পাকড়াও করবে) তখন তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে’। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, ‘তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও; কেননা সেগুলো মানুষের কাঁধে জমা হতে থাকে, অতঃপর তাকে ধ্বংস করে দেয়’।[6]

(২) ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ঈমানদার ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে এত বিরাট মনে করে, যেন সে একটা পর্বতের নিচে উপবিষ্ট আছে, আর সে আশঙ্কা করছে যে, সম্ভবত পর্বতটা তার উপর ধ্বসে পড়বে। আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে মাছির মতো মনে করে, যা তার নাকে বসে, আবার চলে যায়’।[7]

(৩) আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘তোমরা এমন সব কাজ করে থাকো, যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুল থেকেও চিকন। কিন্তু নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সময়ে আমরা এগুলোকে ধ্বংসকারী মনে করতাম’।[8]

বন্ধু আমার! তুমি তো জেনেছ যে, পাপ বা গুনাহ দুই প্রকার। যথা : কাবীরা গুনাহ ও ছাগীরা গুনাহ। কিন্তু তুমি কি জানো, কাবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার মর্যাদা কী? হ্যাঁ— মর্যাদা আছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি সে সব কাবীরা গুনাহ পরিহার কর, যা থেকে তোমাদের বারণ করা হয়েছে, তাহলে আমি তোমাদের (ছাগীরা বা ছোট) গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাবো’ (আন-নিসা, ৪/৩১)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যারা ছোটখাটো অপরাধ ছাড়া কাবীরা গুনাহ ও অশ্লীল কাজ হতে বিরত থাকে, নিশ্চয় তোমার রব অপরিসীম ক্ষমাশীল’ (আন-নাজম, ৫৩/৩২)। হাদীছেও এসেছে, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত এবং জুমআর ছালাত হতে পরবর্তী জুমআর ছালাতে তার মাঝখানে সংঘটিত (ছোটখাটো) গুনাহসমূহের কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) হয়ে যায়; তবে শর্ত হলো কাবীরা গুনাহ হতে বেঁচে থাকতে হবে’।[9]

তাহলে বন্ধু, তুমি জানতে পারলে কাবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার কী মর্যাদা। এখন প্রশ্ন করতে পার, কাবীরা গুনাহ কী বা কোনগুলো কাবীরা গুনাহ? বন্ধু আমার! কাবীরা গুনাহ হলো, যে সকল গুনাহের ব্যাপারে ইসলামী শরীআতে জাহান্নামের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যে সকল গুনাহের ব্যাপারে দুনিয়াতে নির্ধারিত দণ্ড প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। যে সকল কাজে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রাগ করেন। যে সকল কাজে আল্লাহর নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও ফেরেশতামণ্ডলী লা‘নত বা অভিসম্পাত দেন। যে কাজের ব্যাপারে বলা হয়েছে, যে এমনটি করবে সে মুসলিমদের দলভুক্ত নয়। কিংবা যে কাজের ব্যাপারে আল্লাহ ও রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে সম্পর্কহীনতার ঘোষণা করা হয়েছে। যে কাজে দ্বীন নেই, ঈমান নেই ইত্যাদি বলা হয়েছে। অথবা যে কাজকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[10]

বন্ধু আমার! কাবীরা গুনাহের কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা কুরআন ও হাদীছে একই জায়গায় ধারাবাহিকভাবে আসেনি। বিভিন্ন আয়াত ও হাদীছ গবেষণা করে ‘আলেমগণ’ কাবীরা গুনাহের তালিকা প্রণয়ন করেছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছেন ইমাম হাফেয শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ)। তিনি তার কিতাব ‘আল-কাবায়ের’-এর মধ্যে অর্ধশতাধিক কবীরা গুনাহের তালিকা দিয়েছেন। সম্প্রতি সঊদী আরবের বিখ্যাত আলেম ‘শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম ইবনু আব্দুল্লাহ আত-তুয়ায়জিরী’ একটি তালিকা প্রণয়ন করেছেন, যা তাঁর রচিত ইসলামী ফিক্বহ বিশ্বকোষের ১৬তম পর্বে ‘কিতাবুল কাবায়ের’ নামে উল্লেখিত হয়েছে।[11]

বন্ধু আমার! এতক্ষণ তো আমরা পাপ নিয়ে আলোচনা করলাম। কিন্তু আমরা তো মানুষ। মহান আল্লাহ আমাদের মানুষ হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন। স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। যার সাহায্যে আমরা ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারি। সেই ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে স্রষ্টার বাধ্য হয়ে জান্নাত যেতে পারি; আবার স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে জাহান্নামে যেতে পারি। এখন নিজেকে ঠিক করতে হবে, আমরা নিজেকে কোথায় দেখতে চাই। —জান্নাতে না-কি জাহান্নামে?

বন্ধু আমার! আমরা মানুষ। তাই আমাদের দ্বারা ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। মানুষ মাত্রই তো ভুল হয়— একথা তুমি আমি সবাই জানি। ফেরেশতারা কিন্তু ভুল করেন না। সেই শক্তি মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাদের দেননি। দিয়েছেন মানুষকে। তাই মানুষ পাপ করবে না মনে করলেও, নানা কারণে মনের অবচেতনে পা পিছলে পাপে গিয়ে পড়ে। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাই ছিল মানুষ পাপ করবে। এজন্যই রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তান ত্রুটিশীল ও অপরাধী, আর অপরাধীদের মধ্যে উত্তম লোক তারা, যারা তওবা করে’।[12]

তার সকল সৃষ্টি তাঁর গুণগান গায়। ফেরেশতাকুল তার ইবাদতে সদা মশগূল। তবুও তিনি চেয়েছেন এমন এক সৃষ্টি, যারা ভুল করবে, অতঃপর তারা তার কাছে বিনয় সহকারে ভুল স্বীকার করবে এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। ক্ষমা প্রার্থনাও এক মহান ইবাদত। তাই পাপ করা মানব স্বভাবের অংশ। মানুষ পাপ না করলে সে সৃষ্টি তাঁর পছন্দনীয় ছিল না। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা যদি গুনাহ না কর, তাহলে আল্লাহ তাআলা এমন জাতি সৃষ্টি করবেন, যারা গুনাহ করবে তারপর তারা (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা চাইবে। আর তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন’।[13] তিনি আরও বলেছেন, ‘সেই মহান সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! যদি তোমরা পাপ না কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে অপসারিত করবেন এবং এমন জাতির আবির্ভাব ঘটাবেন যারা পাপ করবে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইবে। আর তিনি তাদের ক্ষমা করে দেবেন’।[14]

তার মানে এই নয় যে, পাপ করার অনুমতি আছে। সৃষ্টির শুরুতেই মহান স্রষ্টা পাপ-পুণ্য সৃষ্টি করেছেন। পাপ-পুণ্য সম্পাদন করা মানব প্রকৃতির অংশ করেছেন। পুণ্যের পুরস্কারস্বরূপ সৃষ্টি করেছেন জান্নাত আর পাপের শাস্তিস্বরূপ প্রস্তুত করেছেন জাহান্নাম।[15]

বন্ধু আমার! তুমি তো এবার বলতে পার, মহান আল্লাহ তাহলে বারবার পাপ করতে উৎসাহিত করেছেন। অথবা বলতে পার, তিনি পাপের ওপেন লাইসেন্স দিয়েছেন। —না। তুমি বলতে পার না যে আমি পাপ করব অতঃপর ক্ষমা চাইব। —না, এটা করা যাবে না। তুমি পাপে জড়িয়ে পড়তে পার। এটা ঘটবে কিন্তু ইচ্ছা করে নয়। তুমি পাপ করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হতে পার না; কিন্তু বাড়ি থেকে বের হয়ে তুমি নানা কারণে পাপে জড়িয়ে যেতে পার। তখন তুমি তওবা করবে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে।

জেনে রাখো— এই হাদীছের উদ্দেশ্য কখনোই পাপের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা বা উৎসাহ দেওয়া নয়; বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর অসীম ক্ষমার ইচ্ছা ও অপার দয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো এবং আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করার অভ্যাস গড়ে তোলার তাগিদ দেওয়া। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, বান্দার গুনাহ হয়ে গেলে সে যেন অহংকার করে বা লজ্জায় পড়ে কিংবা হীনমন্যতায় ভুগে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া থেকে বিরত না থাকে; বরং সাথে সাথে যেন আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।[16]

বন্ধু আমার! একটি উদাহরণ দিলে তোমার বুঝতে সুবিধা হবে। মনে কর, তুমি কোনো কোম্পানিতে জব করছ। তোমার বস তোমাকে একটি খাতা, একটি পেন্সিল ও একটি রাবার দিয়ে বলল, এক ঘণ্টার মধ্যে এই হিসাবটা করে তুমি জমা দাও। হিসাব করতে গিয়ে কোথাও ভুল হলে রাবার ব্যবহার করবে। ধরো, এখন তুমি হিসাব করতে বসেছ। তোমার হাতে পেন্সিল আর রাবার আছে। তাই তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করছ আর রাবার দিয়ে মুছে ফেলছ। এইভাবে তুমি সময় অতিবাহিত করলে। এবার ভাবো তো, এই দৃশ্য যদি তোমার বস দেখে, তাহলে কী তোমায় প্রমোশন দেবে, না-কি তিরস্কৃত করবে? 

অনুরূপভাবে, মহান আল্লাহ আমাদের ভুল হলে তা মুছে ফেলার জন্য ‘তওবা’ নামক রাবার দিয়েছেন। আমাদের জীবনের এই নির্ধারিত সময়ে চলার পথে পাপ হয়ে যেতে পারে। তাই এরকম ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে নেওয়াটা আবশ্যক। তবে, তওবার কিছু শর্ত রয়েছে। —হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ। তওবার কিছু শর্ত রয়েছে। আমি বারবার পাপ করব আর বলব তওবা করলাম। আমি একদিকে চুরি করব, আর বলব, তওবা-তওবা। এইভাবে কিন্তু তওবা হয় না।

তাহলে কীভাবে তওবা হয়? তওবা কী? আর তওবার শর্তই-বা কী?

বন্ধু আমার! তওবা আরবী শব্দ। এর অর্থ ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। মানুষ শয়তানের কুমন্ত্রণায় আল্লাহর পথ থেকে বিপথে চলে গেলে তার জন্য আবার আল্লাহর পথে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগের নামই তওবা। সঊদী আরবের বিখ্যাত আলেম ‘শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতে তওবা হলা, ‘আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা থেকে তাঁর আনুগত্যে ফিরে আসা’।

সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ তওবা হলো কুফর ও শিরক থেকে তওবা করে ইসলামের ছায়াতলে ফিরে আসা। তারপর গুরুত্বপূর্ণ তওবা হলো কাবীরা গুনাহ থেকে তওবা করা। আর সর্বশেষ তওবা হলো ছাগীরা গুনাহ থেকে তওবা করা।[17]

বিশুদ্ধ তওবার কিছু শর্ত আছে। আর তা হলো : (১) তওবা একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। (২) যে গুনাহ হতে তওবা করা হচ্ছে, তা সত্বর ত্যাগ করতে হবে। (৩) এই গুনাহ করে ফেলার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে। (৪) আগামীতে এই গুনাহ আর করব না বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে। (৫) যদি এই গুনাহের সম্পর্ক কোনো বান্দার অধিকারের সাথে হয়, তবে যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার সাথে মিটমাট করে নিতে হবে। অথবা যার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।[18]

উপরিউক্ত শর্তগুলো পূরণ করে তওবা করলে মুমিন সকল পাপের ক্ষমার নিশ্চিত আশা করতে পারেন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া তওবার একটি প্রকাশ। তবে অন্যান্য শর্তগুলো পূরণ ছাড়া শুধু ইসতিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াতে পরিপূর্ণ তওবা হয় না। কেউ যদি শর্তগুলো পূরণ না করে বলেন, ‘আমি তওবা করছি’ তাহলে তা অতিরিক্ত একটি মিথ্যাচার বলে গণ্য হয় এবং পাপের বোঝা বাড়ে। কারণ বান্দা বলছেন যে, আমি আল্লাহর কাছে ফিরে আসছি, অথচ কার্যত তিনি ফিরে আসছেন না। তিনি আল্লাহর নির্দেশমতো বান্দার হক্ব ফিরিয়ে দেননি এবং পুনরায় পাপ না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেননি। কাজেই ফিরে আসার বিষয়ে তার ঘোষণাটি মিথ্যা ও পাপ বলে গণ্য।[19]

বন্ধু আমার! জেনে রাখো, মানুষের কর্তব্য হলো, সে ভুল করলে সকল প্রকার পাপ থেকে তওবা করবে। যত বারই পাপ করুক না কেন, তত বারই মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইবে। তবে ক্ষমা চাইতে হবে তওবার শর্তাবলি পূরণ করে। যদি তওবা করার পর তুমি আবার পাপে লিপ্ত হয়ে পড়, তাহলে পুনরায় তওবা করো। বন্ধু! তুমি এখানে শয়তানের পক্ষ থেকে ওয়াসওয়াসা পেতে পার। শয়তান তোমাকে কুমন্ত্রণা দিতে পারে, এই বলে— ‘তুমি তো তওবা রক্ষা করতে পার না’ অথবা ‘তোমার তওবা বারবার ভেঙে যায়’ অথবা ‘তোমাকে কি আল্লাহ ক্ষমা করবে’ ইত্যাদি; তাই, তুমি তওবা করো না।

কিন্তু জেনে রাখো, এটা শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। শয়তান তোমাকে তওবা থেকে বিরত রাখতে চায়। কুরআন ও হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত তওবা করা ওয়াজিব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার’ (আন-নূর, ২৪/৩১)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, বিশুদ্ধ তওবা’ (আত-তাহরীম, ৬৬/০৮)

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)


* এম. এ. (অধ্যয়নরত), বাংলা বিভাগ, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, মুর্শিদাবাদ, ভারত।

 

[1]. আব্দুল হামীদ মাদানী, পাপ, তার শাস্তি ও মুক্তির উপায় (তাওহীদ প্রকাশনী-বর্ধমান), পৃ. ১-২।

[2]. মূল : হাফেয ইবনু আহমাদ আল-হাকামী, অনুবাদ : আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী, নাজাতপ্রাপ্ত দলের আকীদাহ (তাওহীদ পাবলিকেশন্স), পৃ. ২৩৬।

[3]. আবদুল হামীদ মাদানী, তাওহীদ (তাওহীদ প্রকাশনী-বর্ধমান), পৃ. ৮৮।

[4]. আহমাদ, হা/২২৮০৮, হাদীছ ছহীহ; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/২৪৭১।

[5]. তাওহীদ, পৃ. ৬৭।

[6]. আহমাদ, হা/৩৮১৮, ‘হাসান লি-গায়রিহি’।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩০৮।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৯২।

[9]. সুনানে তিরমিযী, হা/২১৪, হাদীছ ছহীহ।

[10]. একশত কাবীরা গুনাহ, পৃ. ৩।

[11]. শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল, কুরআন-হাদীসের আলোকে গুনাহ মাফের উপায় (মাকতাবাতুশ শাহাদাহ্), পৃ. ২৮।

[12]. সুনানে তিরমিযী, হা/২৪৯৯, হাদীছ হাসান; ইবনু মাজাহ, হা/৪২৫১।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮৫৬।

[14]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮৫৮।

[15]. পাপ, তার শাস্তি ও মুক্তির উপায়, পৃ. ৮-৯।

[16]. কুরআন-হাদীসের আলোকে গুনাহ মাফের উপায়, পৃ. ২৫।

[17]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৯।

[18]. তাফসীর আহসানুল বায়ান (বাংলা অনুবাদ), সূরা আত-তাহরীম, ৬৬/৮ এর তাফসীর দ্রষ্টব্য।

[19]. ডঃ খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, রাহে বেলায়াত (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, সপ্তম সংস্করণ), পৃ. ৯৮।