اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

বন্যা : কারণ ও প্রতিকার


মহান আল্লাহ মুমিনদের পরীক্ষা করেন ভয়-ভীতি, খাদ্যাভাব এবং জান, মাল ও শস্য-ফসলের সামান্য ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে (দ্র. আল-বাক্বারাহ, ২/১৫৫)। এই পরীক্ষাপদ্ধতি মহান আল্লাহর একটি চিরন্তন নীতি। এর মাধ্যমে তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে কে কোন পর্যায়ের তা পরখ করে দেখতে চান। এই পরীক্ষা বিভিন্নভাবে হতে পারে, যার অন্যতম হচ্ছে— প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বন্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা আমাদের দেশে প্রায় প্রতি বছরই আঘাত হানে। মূলত ১৯৫৪ সাল থেকে এদেশে বন্যার দাপট শুরু হয়। তখন থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩২টি বড় ধরনের বন্যা আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ১৭টিকে মহাপ্রলয়ংকরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হয় ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে। বিশেষভাবে সিলেট অঞ্চলে ১৯৯৯, ২০০৪, ২০০৭, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে উল্লেখযোগ্য বন্যা হয়। তবে ২০২২-এর বন্যা ব্যতিক্রম; ১২২ বছরের ইতিহাসে সিলেট ও সুনামগঞ্জে এমন বন্যা হয়নি। এতে সিলেটের সাথে সড়ক, রেল ও আকাশপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অতিরিক্ত দাবদাহে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা ভারতের চেরাপুঞ্জিতে এবার রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়। সেখানকার পানি সরাসরি বাংলাদেশের হাওড়ে এসে মিশে ভৈরব বা মেঘনা হয়ে সাগরে চলে যাওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয় এবং সিলেট বিভাগের সবকটি জেলায় প্রবেশ করে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে সিলেট বিভাগের ৮০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। প্লাবিত হয় উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা। এ বছর দেশের ১৮ জেলার প্রায় ৭৬ লাখ মানুষ বন্যার শিকার হয়েছে। এ বছরের বন্যায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। ২ লাখ ৭৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ঘর। বন্যায় মারা গেছে ১১৬ জন মানুষ। বহু গবাদি পশুও মারা গেছে এবং প্রায় ৮ লক্ষ গবাদি পশু আশ্রয় ও খাদ্য সংকটে ভুগছে। এ বছরের বন্যায় দেশে পৌনে ৬ লাখ শিক্ষার্থী বন্যাকবলিত, যাদের শিক্ষাকার্যক্রম দীর্ঘসময় ধরে বন্ধ রয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ সব সময় এমনি এমনি আসে না; রবং মানবসৃষ্ট নানা প্রেক্ষাপট ও কারণ তৈরি হওয়ার মাধ্যমে আসে। মানুষের কার্যকলাপের কারণে সংঘটিত জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ভারী বর্ষণ ঘটে চলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নগরায়ণের ফলে জলাভূমি ভরাট হওয়া, নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়া, নদ-নদী অপদখলে চলে যাওয়া, হাওড়ের মাঝখানে রাস্তা বানিয়ে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা, নদীগুলো ড্রেজিং না করা ইত্যাদি কারণে এসব অতিবৃষ্টির পানিপ্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে তা বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ফসল, সম্পদ, ঘরবাড়ির পাশাপাশি মানুষকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বন্যার জন্য ভারত মোটেও দায় এড়াতে পারে না। বরং দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার। আর্ন্তজাতিক আইন, প্রতিবেশির অধিকার সবকিছুকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশের ৫৪টি নদীর উৎসমুখে ফারাক্কা বাঁধ, টিপাইমুখ বাঁধসহ একাধিক বাঁধ ও ড্যাম নির্মাণ করে বাংলাদেশকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে ভারত। বর্ষাকালে আমাদেরকে পানিতে ভাসিয়ে মারছে আর খরায় পানি আটকে দিয়ে বাংলাদেশকে মরুভূমি বানিয়ে দিচ্ছে। একসময় এদেশে ১২০০ নদীর কথা শোনা যেত, কিন্তু এখন ২০০ নদীও সচল নেই। সব শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। অনেকগুলোর চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯৭১ সালের রেকর্ড অনুযায়ী ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ কমে এখন ৬ হাজার কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি ধ্বংস হয়েছে। সেচের পানির অভাবে কোটি কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে জমির উর্বরাশক্তি কমে গেছে এবং পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের প্রায় ১৭ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। ভারতের একপেশে নীতির কারণে আরো যে কত ক্ষতি আমাদের হয়েছে, তার হিসাব কয়জনে রাখে!

এক্ষণে— (১) আমাদেরকে আল্লাহর নিকট ফিরে আসতে হবে। যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং ঈমানের উপর টিকে থাকতে হবে। (২) বানভাসী মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং তাদের তড়িৎ পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া হাতে হবে। (৩) কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ করা যায়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তার যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। (৪) বাংলাদেশের নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি এবং তা ধরে রাখার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। (৫) ভারতের পানি আগ্রাসন বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসেবে উল্লেখযোগ্য নদীগুলোর উৎস দেশের ভূ-সীমানার বাইরে থাকায় অভিন্ন নদীগুলোর গতিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে প্রতিবেশি দেশ ভারতের সঙ্গে এমন গঠনমূলক উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে তা কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়। (৬) যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণ করে পানির প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করতে হবে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় বালা-মুছীবত থেকে হেফাযত করুন। আমীন!