اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
বর্ণবৈষম্যের শেষ কোথায়?

২৫ মে ২০২০ সোমবার, খোঁড়া অজুহাতে পিঠ মোড়া দিয়ে বেঁধে রাস্তায় উপুড় করে ফেলে টানা ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড গলায় হাঁটুচাপা দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসম্মুখে শ্বাসরোধে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ৪৬ বছর বয়সী টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনের বাসিন্দা কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে। বিশ্ববাসী অপলক নেত্রে দেখে নৃশংসতা ও পাশবিকতার আরেকটি নির্মম চিত্র। এরই মধ্য দিয়ে রচিত হয় বর্ণবৈষম্যের আরেকটি ঘৃণ্য ইতিহাস। ঘটনাটি ঘটে আমেরিকার মিনোসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসের শিকাগো এভিনিউয়ে, সেখানকার শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেক চাওভিন ও তার তিনজন সহকর্মী কর্তৃক। কৃষ্ণাঙ্গ ফ্লয়েডের আর্তনাদ ‘আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না’।(can’t breathe)- শ্বেতাঙ্গ পুলিশগুলোর হৃদয় গলাতে পারেনি! হৃদয় গলাবেই বা কীভাবে! কালোরা কি ঐসব সাদা নরপশুদের কাছে মানুষ?! এ কী নিষ্ঠুরতা! এ কী বর্বরতা! সভ্যতার নামে এ কী অসভ্যতা! এ কী অদ্ভুত আধুনিকতা! এ কোন উন্নত বিশ্ব! কী তাদের দশা! এ কোন মানবতা! আসলে সভ্যতা ও আধুনিকতার মুখোশধারীরা যুগ যুগ ধরে এসব বৈষম্য লালন করে আসছে। তাদের এ ইতিহাস বহু পুরনো। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে শুধু আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে মারা যায় ১০১৪ জন আর ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স নামে একটি বেসরকারি সংস্থার দাবী অনুযায়ী, আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় তিনগুণ বেশি মারা যায় কৃষ্ণাঙ্গরা। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১২-তে ট্রেইভন মার্টিন, ১৭ জুলাই ২০১৪-তে এরিক গার্নার, ৯ আগস্ট ২০১৪-তে মাইকেল ব্রাউন, ৪ এপ্রিল ২০১৫-তে ওয়াল্টার স্কট, ১২ এপ্রিল ২০১৫-তে ফ্রেডি গ্রে, ১৩ জুলাই ২০১৫-তে সান্ড্রা ব্ল্যান্ড, ১৩ অক্টোবর ২০১৯-এ আতাতিয়ানা জেফারসন এবং ১৩ মার্চ ২০২০ সালে ব্রেওনা টেলরকে হত্যা কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার নিকট অতীতের ইতিহাস। ১৯৬৭ সালে এই মিনিয়াপোলিসে পুলিশের সাথে কৃষ্ণাঙ্গদের সংঘর্ষে বহু কৃষ্ণাঙ্গের বাড়ি-ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেওয়া এবং ১৯৬৪ সালে নোবেল জয়ী আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে ১৯৬৮ সালে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনা আমাদেরকে আমেরিকার বর্ণবৈষম্যের অতীত ইতিহাসের ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, উন্নত বিশ্বে (!) ‘করোনা’র ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেও বর্ণবৈষম্যের ভ্যাকসিন কখনই আবিষ্কার হবে কি? বা তারা ইসলামের আবিষ্কৃত বর্ণবৈষম্যের ভ্যাকসিন গ্রহণ করবে কি?
জী, ইসলামে বর্ণবৈষম্যের ভ্যাকসিন শুরু থেকেই আছে। ইসলামের চোখে মানুষ হিসাবে সবাই সমান। এখানে দেশ, জাতি, গোত্র, বংশ ও বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। সাদা-কালো, আরব-অনারবের কোনো পার্থক্য নেই। মানুষ হিসাবে চিরুনির দাঁতের মতো সবাই সমান। ইসলামে এ সকল বৈষম্যের কবর রচনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাক্বওয়াবান’ (আল-হুজুরাত, ৪৯/১৩)। মানুষের বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণকে মহান আল্লাহ তার সৃষ্টির নিদর্শন হিসাবে চিত্রায়িত করেছেন (আর-রূম, ৩০/২২)। সুতরাং সাদা-কালো সবই এক আল্লাহর সৃষ্টি ও নিদর্শন, এখানে মানুষের কোনো হাত নেই। তাহলে এতো গর্ব কীসের? রাসূল (ছা.) বর্ণবৈষম্যের মূলোৎপাটন করে বলেন, ‘হে লোক সকল! শোনো, তোমাদের রব এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবের উপর অনারবের ও অনারবের উপর আরবের এবং কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের ও শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব তো কেবল তাক্বওয়ার কারণেই’ (আহমাদ, হা/২৩৪৮৯)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা আদম সন্তান আর আদম মাটি থেকে সৃষ্ট’ (আবু দাঊদ, হা/৫১১৬)। যত বৈষম্য ও জাহিলিয়াতের অমানিশা ছিলো, সবগুলোকে পদদলিত করে সাদা-কালো সকলের জান-মালের হিফাযত নিশ্চিত করে রাসূল (ছাঃ) বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত ও সম্পদ (পরস্পরের জন্য) আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহরের মতোই সম্মানিত। জেনে রেখো! জাহিলী যুগের সমস্ত কাজ ও প্রথা আমার এই দুই পায়ের নিচে পতিত হলো’ (মুসলিম, হা/১২১৮)। যারা জাতি, বংশ ও বর্ণের বড়াই করে, তাদের ভয়াবহ পরিণতি ও নিকৃষ্টতা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূল (ছা.) বলেন, ‘লোকেরা যেন তাদের গোত্র নিয়ে গর্ব করা অবশ্যই ত্যাগ করে। তারা তো জাহান্নামের কয়লা মাত্র। তা ত্যাগ না করলে তারা সেই গোবুরে পোকার চেয়েও নিকৃষ্ট হবে, যে নিজ নাক দ্বারা মল ঠেলে নিয়ে যায়’ (আহমাদ, হা/১০৭৮১)। প্রতিদিন পাঁচবার, প্রতি সপ্তাহে জুম‘আয়, প্রতি বছর দুই ঈদে সাদা-কালো, আরব-অনারব, ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা পায়ে পা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছালাত আদায়ের মধ্য দিয়ে ইসলাম গুঁড়িয়ে দিয়েছে এসব বৈষম্যের দেয়াল। প্রতিদিন ত্বওয়াফ ও সাঈতে লক্ষ লক্ষ সাদা-কালোর একসঙ্গে অংশগ্রহণ বৈষম্যহীন ইসলামের সৌন্দর্যই ফুটিয়ে তোলে। আবিসিনীয় কালো দাস বেলাল পকে রাসূল (ছা.)-এর বিশেষ মুআযযিনের মর্যাদা দিয়ে ইসলাম মুছে দিয়েছে সাদা-কালোর পার্থক্য। মসজিদের সামান্য একজন সেবিকা কালো নারী (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার খোঁজখবর নিয়ে রাসূল (ছা.) মানবাধিকারের ঝাণ্ডা উড়িয়েছিলেন। আদম সন্তান হিসাবে আল্লাহ সবাইকে সমান মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আর আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি’ (আল-ইসরা, ১৭/৭০)। ইসলাম মানুষকে দাসত্বের জিঞ্জিরে বন্দী করতে আসেনি। সেজন্যই তো বিভিন্ন অপরাধের কাফফারা হিসাবে দাসমুক্তির প্রতি ইসলাম উৎসাহিত করেছে। শুধু তাই নয়, বরং ইসলাম মানবতার গণ্ডি পেরিয়ে আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টি পশু-পাখি ইত্যাদির প্রতিও ইহসান করতে বলেছে (মুসলিম, হা/১৯৫৫)।
জর্জ ফ্লয়েড হত্যায় আমেরিকাসহ সারা পৃথিবী ক্ষোভে ফেটে পড়ে। করোনাভীতি, লকডাউন, কারফিউ সবকিছু উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে পড়ে প্রতিবাদ জানায় লক্ষ লক্ষ মানুষ। তারা যেসব শ্লোগান সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন বহন করে, সেসবের মধ্যে এটাও ছিলো, ‘কালোদের জীবনও মূল্যবান’ (Black lives matter)। কিন্তু এত আন্দোলন, সংগ্রাম, মিছিল, হরতাল দিয়ে কী হবে?! কিছুই হবে না। বরং এসব বৈষম্যের শেকড় চিরতরে উৎপাটন করতে হলে ফিরে আসতে হবে ইসলামের ছায়াতলে, ধারণ করতে হবে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শের অধিকারী নবী মুহাম্মাদ (ছা.)-এর আদর্শ; এর বিকল্প কোনো পথ নেই। তিনিই যাবতীয় বৈষম্য, ভেদাভেদ ও জাহিলিয়াত দূর করে ঈমান ও তাক্বওয়ার আলোয় উদ্ভাসিত একটি বন্ধুপ্রতিম শান্তি ও সমৃদ্ধির সমাজ উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বিশ্ব মানবতাকে ইসলামের ছায়াতলে এসে নববী আদর্শ ধারণ করে একটি শান্তির সমাজ উপহার দেওয়ার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!