বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার অতীত ও বর্তমান

   -ড. মো. কামরুজ্জামান*


‘আমাদের এই উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল মাদ্রাসা শিক্ষা দিয়ে। অনেকেই অনেক কিছু মনে করতে পারেন। তবে আমি মনে করি, ধর্মীয় অনুভূতির বাইরে আমরা কেউ না। আমরা ধর্মকে অস্বীকার করতে পারি না। আবার ধর্মের অপব্যবহার হোক এটাও আমরা চাই না। জীবন-জীবিকার শিক্ষার পাশাপাশি যখনই আমরা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি তখনই শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ হয়। আমি মাদরাসা শিক্ষার বিষয়ে বলব, এখানে লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়ে লেখাপড়া করে। দেশের অনেক গরীব ও এতিম সন্তানের ঠাঁই এখানেই হয়। কিন্তু তাদের শিক্ষার কোন সরকারি স্বীকৃতি ছিল না। তাদের শিক্ষা কার‌্যক্রম তাদের মতো করেই চলত । আমি চেষ্টা করেছি এর একটা সমাধান করতে। তাদের জন্য আজকে এর (কওমি মাদরাসার) স্বীকৃতি দিয়েছি। এখন কেউ যদি আমার জন্য দোয়া করে বা আমাকে ভালো বলে তাহলে তো দেশের মানুষের খুশি হওয়ার কথা। যারা আমার সত্যিকারের ভালো চায় না, যারা আমাকে খুন করার চেষ্টা করছে, তারা হয়তো মনে কষ্ট পাবে, অখুশি হবে। কিন্তু দেশের মানুষ এর (কওমি মাদরাসার স্বীকৃতির) কারণে খুশি হয়েছে। এখন আমার অনুভূতি এতোটুকুই; যারা কওমি মাদরাসার শিক্ষা গ্রহণ করতো তাদের ভবিষ্যতের একটা ঠিকানা করে দিতে পেরেছি সেটাই আমার বড় সেটিসফেকশন (তৃপ্তি)’।

উল্লেখিত বক্তব্যটি বাংলাদেশের চারবারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।[1] মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ অক্টোবর ২০১৮ সালে গণভবনে আয়োজিত ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে উল্লেখিত বক্তব্যটি প্রদান করেন। অসংখ্য ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। ‘এই উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা হয়েছে মাদরাসা শিক্ষা দিয়ে’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ ও বিশ্লেষণাত্মক। কারণ বিষয়টি ধর্মপ্রাণ অনেক বাঙালিরই অজানা। অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জানার জন্য প্রাচীন বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা প্রয়োজন বোধ করছি। বিষয়টির নিরপেক্ষ অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করলে জানা যায় যে, প্রাচীন বাংলায় শিক্ষাব্যবস্থা খুব একটা সংগঠিত ছিল না। আজ থেকে ৩০০০ বছর আগের যুগটি ছিল বৈদিক যুগ। ঐতিহাসিকদের মতে, এ সময় লেখাপড়ার কোনো সংগঠিত রূপ ছিল না। এ যুগে আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের নিমিত্তে শুধু মন্দিরকেন্দ্রিক লেখাপড়া চালু ছিল। আর এ যুগের ঠিক ৫০০ বছর পরে শুরু হয় ব্রহ্মণ যুগ। আদি মানুষের আত্মা, জন্ম আর মৃত্যু পরিচালননিয়ম জানাই ছিল এ শিক্ষার উদ্দেশ্য। কিন্তু এ শিক্ষা সার্বজনীন ছিল না। শুধু ব্রাহ্মণ পরিবারের শিশুরাই এ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারত। এর বাইরে নিম্নবর্ণের কোনো গোত্র লেখাপড়া করার অধিকার রাখত না। এ যুগ শেষ হলে শুরু হয় বৌদ্ধশিক্ষার যুগ। এ যুগের সূচনা খ্রিষ্টপূর্ব ৬ শতকে। এ শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল মঠকেন্দ্রিক। শুধু মাঠকেন্দ্রিক থাকার কারণে এ শিক্ষাব্যবস্থার সার্বজনীনতাও ছিল না। এভাবেই মন্দিরকেন্দ্রিক, মাঠকেন্দ্রিক এবং পরিবার ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক লেখাপড়া ছিল প্রাচীন বাংলার বাস্তব চিত্র। ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে আরবে আগমন ঘটে মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর। এ যুগকে মধ্যযুগ বলা হয়। এ যুগে মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আনীত ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার এক মহাবিপ্লব ঘটে।

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ছাহাবীগণ শিক্ষা প্রচার ও প্রসারের নিমিত্তে ছড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন দেশে। ৭১১ সালে ভারতবর্ষে আগমন ঘটে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের। তিনি রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারের দিকে বিশেষ নযর দেন। মক্তব ও মসজিদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে শিশু শিক্ষার প্রবর্তন করেন। এ মক্তব ও মসজিদে মুসলিম শিশুর পাশাপাশি হিন্দু শিশুরাও শিক্ষাগ্রহণ করতো। এ সময় থেকেই এ দেশে শিক্ষাব্যবস্থার একটি ধারা সৃষ্টি হয়। আর এ শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তব সুগঠিত রূপ পায় সুলতানি আমলে (১২১০-১২৭৬)। fateh24.com সূত্রমতে, এ আমলে প্রতিটি ধনী বাড়ির সামনে মক্তব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এসব মক্তবে আরবী ও ফার্সি পাঠদানের পাশাপাশি হস্তলিপিও শেখানো হতো। হিন্দু শিশুরাও এসব মক্তবে পড়াশোনা করতো। বাংলার শাসকগণ প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি মাধ্যমিক শিক্ষার বিষয়েও অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। এ উপলক্ষ্যে শাসকগণ প্রচুর লা খেরাজ (নিষ্কর) জমি দান করে দিতেন। নওগাঁর মহিসন্তোষ তকিউদ্দিন আরাবী প্রতিষ্ঠিত মাদরাসার জন্য বরাদ্দকৃত জমিই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ প্রতিষ্ঠানের জন্য দানকৃত জমির পরিমাণ ছিল ২৭০০ একর। রাজশাহী জেলার বাঘাতে মাদরাসার জন্য দান করা জমির পরিমাণ ছিল ৪২টি গ্রাম। এসব মাদরাসায় শিক্ষার্থীরা বিনা খরচে লেখাপড়া করতো। ১২৭৮ সালে শারফুদ্দীন আবূ তাওয়ামা কর্তৃক সোনারগাঁয়ে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটি ছিল বাংলার সবচেয়ে বড় মাদরাসা। এ সময় মাদরাসার পাঠ্যসূচিতে ছিল আরবী, নাহু, ছরফ, বালাগাত, মানতিক, কালাম, তাছাউফ, সাহিত্য, ফিক্বহ, দর্শন ইত্যাদি। মোগল আমলে (১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ সালে) বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার এ পাঠ্যসূচির সাথে সংযুক্তি ঘটে। জীববিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, কৃষি, লোকপ্রশাসন, চারুকলা ইত্যাদি জ্ঞানের এ শাখাগুলো মাদরাসাশিক্ষার সাথে সংযুক্ত হয়। এভাবেই প্রাচীনকালে মাদরাসাশিক্ষার মাধ্যমে উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার সোনালি অধ্যয়ের যাত্রা শুরু হয়।

কিন্তু ইংরেজ আমলে (১৭৫৭-১৯৪৭) পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাদরাসাশিক্ষার পথ সংকুচিত হতে থাকে। শুরু হয় ইংরেজ শাসন। এ সময় ইংরেজরা মাদরাসার নামে বরাদ্দকৃত জমি বাজেয়াপ্ত করতে থাকে। তাদের প্রায় ২০০ বছরের শাসনামলে ৮০,০০০ মাদরাসার মধ্যে ৭৮,০০০ মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার গতি রুদ্ধ হতে থাকে। কিন্তু বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলিমগণ নিজের বাড়িতে, পাড়ায় ও মহল্লায় মক্তব, মসজিদ নির্মাণপূর্বক মাদরাসাশিক্ষার ধারা অব্যাহত রাখেন। দেশের ধর্মপ্রাণ জনতা ও আলেম সমাজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণে ইংরেজ শাসকদের ষড়যন্ত্র শতভাগ সফল হয়নি। ইংরেজগণ অবশ্য কিছু মুসলিম আইন অফিসার তৈরির জন্য ১৭৮০ সালে উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠা করেন কলকাতা আলিয়া মাদরাসা। আর আলেম সমাজের উদ্যোগে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দেওবন্দের সুবিখ্যাত ক্বওমী মাদরাসা। এ দুই ধারার মাদরাসা উপমহাদেশে সফল ও সমান্তরালভাবে চলতে থাকে । এ দুই ধারার বাইরে আরেকটি শিক্ষা ব্যবস্থার ধারণা জন্ম নেয় ১৯১৪ সালে। এ সালে মোহামেডান এডুকেশন এ্যাডভাইজারি কমিটি কর্তৃক বাংলাদেশে নিউ স্কিম ও ওল্ড স্কিম নামে দু’ধরনের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ধারণা জন্মে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশে মুসলিমদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল ও কলেজের যাত্রা শুরু হয়। এসব স্কুল ও কলেজে আরবী শিক্ষা, ইসলামী শিক্ষা ও ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। বাংলাদেশের বিশিষ্ট মুসলিম নেতাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তিনটি অনুষদ আর বারোটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে এ বিশ্ববিদ্যালয়। এ বারোটি বিভাগের মধ্যে ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবী ছিল স্বতন্ত্র দুটি বিভাগ। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলায় শিক্ষাব্যবস্থার যাত্রা দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক (তৎকালীন খণ্ডকালীন) শিক্ষামন্ত্রী মুসলিম শিক্ষার্থীদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার স্বার্থে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ও বরিশালের চাখার কলেজসহ অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। আর এসব প্রতিষ্ঠানে ইসলামী শিক্ষা পড়া ছিল বাধ্যতামূলক। মূলত মুসলিম নেতারা মুসলিমদের অতীত ধর্মীয় শিক্ষার স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও জ্ঞানপিপাসার তৃপ্তি মেটাতে মসজিদ-মাদরাসার বাইরে ইসলামী শিক্ষার শুভ সূচনা ঘটান। এতে ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে ইসলাম শিক্ষিত আলেম-ওলামার কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হয়। ১৯৪৭ সালে কলিকাতা আলিয়া মাদরাসা ঢাকায় স্থানান্তির হয়। ১৯৫৮ সালে ১১ই মার্চ তদানীন্তন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান মাদরাসার জন্য ঢাকার বকশীবাজারে চারতলাবিশিষ্ট ভবন ও ছাত্রাবাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পাকিস্তান আমলে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে এ মাদরাসার ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। এ মাদরাসার বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন নওয়াব আব্দুল লতীফ ও সৈয়দ আমীর আলী। ১৯৬৩ সালে Islamic Arabic University commettee  এবং ১৯৭৩ সালে মাদরাসা শিক্ষা সংস্কার ও উন্নয়নের সুপারিশ গৃহীত হয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর আমলে তার সুযোগ্য নির্দেশনায় মাদরাসাসমূহে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও বহুমুখী পাঠ্যসূচি প্রবর্তিত হয়। তার নির্দেশনায় কুরআন-হাদীছের উন্নত গবেষণা লিখন, পঠন ও অধ্যয়নের নিমিত্তে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। মাদরাসা ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার ব্যবধান দূর করতে ১৯৮৫ সাল থেকে দাখিলকে এসএসসি এবং ১৯৮৭ থেকে আলিমকে এইচএসসির সমমানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ জনতার দাবির মুখে মাদরাসা শিক্ষার সার্বিক মান উন্নয়নে ২০০৬ সালে তৎকালীন সরকার ফাজিলকে ডিগ্রি এবং কামিলকে মাস্টার্স মান প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া-এর অধীনে ফাজিলকে ডিগ্রি এবং কামিলকে মাস্টার্সের মান ঘোষণা করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে গণভবনে আয়োজিত ক্বওমী মাদরাসার আলেম-ওলামার সঙ্গে এক বৈঠকে ক্বওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদীছকে মাস্টার্সের সমমান ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ঘোষণা দিচ্ছি- ‘কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স ইন ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবি-এর মান দেওয়া হলো’।[2]

উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা এটাই বোঝা যায় যে, বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার ইতিহাস অতি প্রাচীন। এ শিক্ষার ইতিহাস একটি সোনালী আবরণে রচিত। এটি ধর্মপ্রাণ বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষা ও আত্মিক উন্নয়নের শিক্ষা। এ শিক্ষার রয়েছে গৌরবগাঁথা তেজোদীপ্ত একটি অধ্যায়। মুসলিমদের জাতীয় চেতনা এবং স্বাধীন পরিচিতির অপরিহার্যতা বিবেচনায় ইসলামী শিক্ষা তাই হাজার বছরব্যাপী তার গৌরব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল সমগ্র বাংলায়। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছিল এ শিক্ষা। প্রচণ্ড ইসলামবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশরা এ শিক্ষা ধ্বংস করতে পারেনি। তখন স্কুল-কলেজে এ শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক। পাকিস্তান আমলেও ইসলামী শিক্ষা ছিল ধারাবাহিকভাবে বাধ্যতামূলক বিষয়ের একটি। বাংলাদেশ আমলেও এ শিক্ষা স্বগতিতে এগিয়ে চলে। ইসলামী শিক্ষার সম্প্রসারণে, কুরআন-হাদীছের উন্নত গবেষণা এবং বাংলার মুসলিম মানসে ধর্মীয় চেতনা প্রোথিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২২শে মার্চ প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। ইসলামী শিক্ষার বিস্তার ও প্রসারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন করেন। (পূর্বে স্বায়ত্বশাসিত মাদরাসা বোর্ড ছিল না)। তিনি আরব-ইসরাইল যুদ্ধে আরব বিশ্বের পক্ষ অবলম্বন ও সাহায্য প্রেরণ করেন এবং ওআইসি সম্মেলনে যোগদান করে মুসলিম বিশ্বের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। মূলত বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন একটি ভঙ্গুর বাংলার অবকাঠামোর উপরে দাঁড়িয়ে মাত্র সাড়ে তিন বছরে মুসলিম উম্মাহর জন্য যে ভূমিকা রেখেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রশংসাযোগ্য।

উপরিউক্ত আলোচনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের ব্যাখ্যামূলক বর্ণনা মাত্র। গত দুই দশকে তাই তিনি ইসলামী শিক্ষা এবং মাদরাসার জন্য যে উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন, তা সত্যিই ইসলামপ্রিয় বাঙালির কাছে প্রশংসিত এবং নন্দিত হয়েছে। তিনি ২০১৩ সালে মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র একটি আরবী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি স্মরণীয় ঘটনা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে সারাদেশের কলেজগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে; অনুরূপভাবে সারা বাংলাদেশের ফাজিল এবং কামিল মাদরাসাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। তিনি দাওরায়ে হাদীছকে মাস্টার্সের মান দিয়ে বাংলাদেশে একটি অসম্ভভ সাহসী ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। তার এ কাজগুলো ধর্মপ্রাণ বাঙালি তৌহিদী জনতার কাছে অত্যন্ত প্রশংসনীয় হয়েছে। কিন্তু যত সমস্যা হয়েছে স্কুল-কলেজের ১০০ নম্বরের ইসলামী শিক্ষা নিয়ে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে যে, ২০২২ সালের শিক্ষা কারিকুলামে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শ্রেণিতে দশটি বিষয় পড়ানো হবে। সেগুলো হলো: ১. ভাষা ও যোগাযোগ, ২. গণিত ও যুক্তি, ৩. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ৪. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ৫. সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব, ৬. জীবন ও জীবিকা, ৭. পরিবেশ ও জলবায়ু, ৮. মূল্যবোধ ও নৈতিকতা, ৯. শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা এবং ১০. শিল্প ও সংষ্কৃতি। আর দশম শ্রেণিতে বোর্ড পরীক্ষা হবে মাত্র পাঁচটি বিষয়ে। সেগুলো হলো: ১. বাংলা, ২. ইংরেজি, ৩. গণিত, ৪. বিজ্ঞান ও ৫. সামাজিক বিজ্ঞান। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ইসলামী শিক্ষা থাকবে না। তবে বোর্ড পরীক্ষায় ইসলাম শিক্ষা না থাকলেও পাঠ্যসূচিতে ইসলামী শিক্ষা থাকবে বলে বিবিসি সূত্রে এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা নিশ্চিত করেছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘পরীক্ষা না হলেই যে শিখবে না, এমনটা ঠিক না। ধর্ম ও নৈতিকতা শিক্ষাতো অনুশীলন ও অনুধাবনের বিষয়। মুখস্থ করে পরীক্ষায় কেউ লিখল কিন্তু হৃদয়ে ধারণ করল না। তাহলে তো হবে না। এখন শিক্ষার্থীদের এই চর্চার বিষয়টি যেন সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়, আমরা সেটাতেই গুরুত্ব দিচ্ছি’।

মূলত ইসলামী শিক্ষার প্রতি একটি মহলের কুদৃষ্টি সৃষ্টি হয় ২০০১ সাল থেকে। এ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১০০ নম্বরের ইসলামী শিক্ষাকে ৫০ নম্বরে সংকুচিত করার হীন প্রয়াস শুরু করেন। তিন মাসের জন্য ক্ষমতায় থাকা সরকারের এ বিষয়টি চিন্তা করার কথাই ছিল না। অথচ তাদের ভিতর ঘাপটি মেরে থাকা চরম ইসলাম বিদ্বেষী কিছু ব্যক্তির ১০০ নম্বরের ইসলামী শিক্ষার প্রতি গাত্রদাহ শুরু হয়। পরবর্তীতে ধর্মীয় বাঙালি জাতির প্রতিবাদের মুখে তারা সেটা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এরপর ২০১৩ সালে শুরু হয় স্কুলের ইসলামী শিক্ষা নিয়ে নতুন কারসাজি। এ সময় ‘ইসলাম শিক্ষা’ বইয়ের নাম পরিবর্তন করা হয়। নতুন নাম দেওয়া হয় ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’। অথচ হিন্দুধর্ম শিক্ষা ও খ্রিষ্টান ধর্ম শিক্ষা বইতে এ রকম নাম দেওয়া হলো না। এখানে প্রচ্ছন্নভাবে ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ দুটো নামের মাঝখানে ‘ও’ অব্যয় দ্বারা দুটো ভিন্ন জিনিস বুঝানো হয়েছে। আর উভয়ের মাঝে বিরোধ আছে মর্মে সূক্ষ্ম একটি কারসাজিরও বীজ বপন করা হয়েছে। কারসাজির এ সূত্র ধরে দুষ্টচক্রটির পরবর্তী পদক্ষেপ হবে এ শিক্ষাটিকে পাঠ্যসূচি থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া। একই সূত্রের ফলস্বরূপ কলেজে এ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইসলামী শিক্ষা বিষয়টি একটি ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে রূপ পেয়েছে। এতে কলেজের ইসলামী শিক্ষার শিক্ষকগণ ঐচ্ছিক বিষয়ের একজন গুরুত্বহীন শিক্ষকে পরিণত হয়েছেন। অন্যদিকে এ বিষয়ের ছাত্রসংখ্যাও আস্তে আস্তে লোপ পেতে পেতে তলানীতে গিয়ে থেমেছে। অথচ ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষেও কলেজগুলোতে মানবিক, বিজ্ঞান এবং ব্যবসা- সকল শাখার শিক্ষার্থীগণ ইসলামী শিক্ষাকে আবশ্যিক সাবজেক্ট হিসাবে গ্রহণ করতো। এমতাবস্থায় মাধ্যমিকের বোর্ড পরীক্ষায় যদি ইসলামী শিক্ষা না থাকে, তাহলে এটা পাঠ্যক্রম থেকে স্থায়ীভাবে বাদ হয়ে যাওয়ার সকল বাঁধা দূর হয়ে গেল বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন।

অথচ পৃথিবীতে এখনো ইসলাম ধর্ম ও ইসলাম শিক্ষার প্রভাব বিদ্যমান। আধুনিক ধর্মহীন মতবাদগুলো পৃথিবীতে যে প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে, ইসলামী শিক্ষা ও সংষ্কৃতির প্রভাব পৃথিবীতে তার চেয়ে মোটেই কম নয়; বরং অনেকগুণ বেশি। সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ আর উত্তরের নরওয়ে থেকে দক্ষিণের চিলি- এ বিশাল পৃথিবীর দিকে একটু চোখ মেলে তাকালে দেখা যাবে যে, যুগ যুগ ধরে মানুষ একটু শান্তি, একটু স্বস্তি আর নির্মল জীবন যাপনের জন্য ইসলাম ধর্ম, ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামী সংষ্কৃতির সম্মোহনী শক্তির অনুসন্ধান করেই চলছে। আর বর্তমান বিজ্ঞানের চরম উন্নতির যুগেও এই শিক্ষার অনুসন্ধান ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলছে। জনগণ এখনো মনে করে যে, আধুনিক মতাদর্শী নেতাদের তুলনায় প্রকৃত ধর্মীয় নেতারা অধিক নৈতিকতাবোধসম্পন্ন মানুষ। তারা আরো মনে করে যে, দেশ থেকে রাজাকার, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ তাড়ানোর নামে ইসলামী শিক্ষা উচ্ছেদের অপতৎপরতা দেশের জন্য কখনো শুভ হবে না। তারা মনে করে, স্কুল-কলেজে ইসলামী শিক্ষা শেখানোর মাধ্যমে ধর্মান্ধতা জন্ম নেয় না। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম বেকারত্ব, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আয়-বৈষম্য ও পর্নোগ্রাফির বিষাক্ত ছোবলে দিশেহারা। এমতাবস্থায় তাদেরকে ন্যূনতম একটু ধর্মের শিক্ষা যদি না দেওয়া হয়, তাহলে তারাই বরং ধর্মান্ধ হবে। কতৃপক্ষের বুঝা উচিত যে, কোমলমতি শিশুদের কাছ থেকে কোনোক্রমেই ধর্ম সরানো উচিত হবে না। তাদেরকে ধর্ম থেকে দূরে সরাতে চাইলে, জাতিকে ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ রাখতে চাইলে তারাই হয়তো একসময় ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়বে। ইসলামী শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষের মাঝে নীতিবোধ, রুচিবোধ ও নৈতিকতাবোধ সৃষ্টি হয়েছে। তারা কখনোই জঙ্গিবাদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করেননি। তারা ধর্মান্ধ ছিলেন না। তারা ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তাদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে দলে দলে লোক সেই শিক্ষা গ্রহণ করেছে। সুতরাং আমরা চাই সেই শিক্ষা স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ুক। ধর্মপ্রাণ বাঙালির প্রাণের দাবি হলো, স্কুল এবং কলেজে আগের মতো ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকুক। বাংলাদেশের শুধু পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী বিভাগ এবং ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ আছে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও এই দুটি বিভাগ খোলা হোক। দাওরা মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু করে দাওরা মাস্টার্সধারী পোস্ট গ্রাজুয়েটদের মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হোক। দেশপ্রেমিক ধর্মপ্রাণ বাঙালি মনে করেন যে, বাংলাদেশ সবেমাত্র মধ্যম আয়ের দেশে পা রেখেছে। সরকারের এখন টার্গেট ধাপে ধাপে সেটাকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করা। আর মাদরাসায় পড়ুয়া লক্ষ লক্ষ তরুণকে বেকার রেখে এই লক্ষে পৌঁছা সম্ভব হবে না। সুতরাং ইসলামী শিক্ষা বন্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে তার আরো ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হোক। লোকবল নিয়োগপূর্বক প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার ও প্রসার বৃদ্ধি করে দেশ থেকে বেকারত্ব লাঘব করা হোক। উন্নত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথকে বেগবান করা হোক- এটাই ধর্মপ্রাণ বাঙালি জাতির কামনা।


* অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

[1]. দৈনিক যুগান্তর, ৪ অক্টোবর, ২০১৮।

[2]. bangladesh.gov.bd.