বাংলাদেশে বন্যার্তদের বেহাল দশা ও ইউরোপে বর্ণবাদের ভয়াবহ চিত্র
জুয়েল রানা*


.

দেশের অনেক ভাটি অঞ্চল যখন পুড়ছে তীব্র দাবদাহে, তখন সিলেট ভাসছে পানিতে। সেখানে বিরাজ করছে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। এর আগে গত এপ্রিলে বন্যায় তলিয়ে যায় সিলেটসহ আশপাশের হাওর এলাকার ফসল। এর মাস খানেক না যেতেই সিলেটে আবারও দেখা দিয়েছে বন্যা।

এবার বন্যা এসেছে আরও ভয়ংকর রূপে। তলিয়ে গেছে প্রায় পুরো সিলেট। সুনামগঞ্জেরও বেশিরভাগ এলাকা জলমগ্ন। সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেটে প্রধান নদীগুলো বিশেষত সুরমা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া, নগর ও এর আশপাশের এলাকার বিভিন্ন জলাশয় ভরাট, দখল হওয়া এবং সিলেটের উজানে মেঘালয়ে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণেই এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। সুনামগঞ্জের বাসিন্দারা বলছেন, বহু বছরের মধ্যে তারা এত মারাত্মক বন্যার মুখোমুখি হননি। সবমিলিয়ে ৩৫ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে বলে কর্তৃপক্ষ বলেছে।

চারদিকে অথৈ পানি। কোথাও লাশ দাফন করার শুকনো জায়গাটুকুও নেই। বাধ্য হয়ে মায়ের লাশ কলার ভেলায় ভাসিয়ে দিয়েছেন এক ছেলে। কিন্তু দাফন তো হতে হবে মায়ের। তাই লাশের সঙ্গে তিনি চিরকুট লিখে দেন। তাতে লেখা— ‘শুকনো জায়গায় মাকে কবর দিয়ো’। ভেলায় লাশ ভাসিয়ে মৃতের পরিবারের সদস্যরা নীরবে চোখের জল ফেলেন। তাদের আশা, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি লাশ পাওয়ার পর দাফনের ব্যবস্থা করবেন। বন্যাদুর্গত সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায়ও এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ‘নয় নগর’ গ্রামের রেণু মিয়ার দুই বছরের ছেলে বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায়। শুকনো জায়গায় কবর দিতে না পেরে মা-বাবা পানিতে ছেলের লাশ ভাসিয়ে দেন। গর্ভবতী স্ত্রীকে সিলেটের এক গ্ৰাম থেকে শহরে নেওয়ার জন্য নৌকা মালিককে ৪০ হাজার টাকা দিতে চাইলেও নৌকার মাঝি ৫০ হাজার টাকার নিচে যায়নি

করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বন্যার বড় ধাক্কা লেগেছে পাবলিক পরীক্ষাসহ গোটা শিক্ষাব্যবস্থায়। বন্যা পরিস্থিতির কারণে এসএসসি ও  সমমানের  পরীক্ষা  স্থগিত করা হয়। আর এসএসসি পেছানোর কারণে পেছাতে হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও। সেই সাথে স্থগিত করা হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলমান বি.এড পরীক্ষাও।

এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সিলেট অঞ্চল। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এই অঞ্চল থেকে ৯৩০টি স্কুলের ১ লাখ ১৬ হাজার ৪২৭ জন শিক্ষার্থীর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা। অনেক স্কুলে পানি উঠেছে। আর মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ১২২ বছরের মধ্যে এবার রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে। সেই পানি নেমে বাংলাদেশের সিলেট-সুনামগঞ্জে প্রবেশ করছে। কথা ছিল, পানি নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নেমে যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো— বাংলাদেশের নদীগুলোর তো নাব্যতা নেই। ফলে নদী উপচে সৃষ্টি হয়েছে বন্যা

ভারত থেকে প্রবাহিত ৫৪টি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। হিমালয় অববাহিকায় ভারতের যেসব রাজ্য রয়েছে, এ রাজ্যগুলোতে বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণ হলে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোতে পানির প্রবাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। উভয় দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর উপর ভারত একতরফা বেশ কয়েকটি বড় বাঁধ নির্মাণের কারণে বেশির ভাগ নদীর বাংলাদেশ অংশে পলি জমে এর নাব্য হ্রাস পেয়ে নদীগুলো পানি ধারণক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। উজানে বাঁধ নির্মাণ পরবর্তী শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন অনুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়, অপর দিকে বর্ষা মৌসুমে বাঁধের উপরের দিকে পানির চাপের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটলে ভারত বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দেয়। এতে মাত্রাতিরিক্ত পানির প্রবাহের কারণে নদীর দু’কূল উপচে ফসলের ক্ষেত, গ্রাম, জনপদ, রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়। অনেক সময় দেখা যায় সামুদ্রিক ঝড় থেকে সৃষ্ট জোয়ারে দেশের উপকূলবর্তী জেলাগুলো প্লাবিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করে। আবার অমাবস্যার সময় জোয়ারের পানির বৃদ্ধি ঘটলে বন্যা দেখা দেয়।

প্রতি বছরই বাংলাদেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে বন্যা হয়; তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী ব্যাপক বিধ্বংসী বন্যার কারণে পুরো দেশের বেশির ভাগ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন বন্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ১৯৭৪, ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৮ সালের সংগঠিত বন্যা। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ১৯৮৫, ১৯৯১, ২০০৭ ও ২০০৯ সালে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল প্লাবিত হয়ে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২.

ফিলিস্তীনিদের বিরুদ্ধে ইসরাঈলের কর্মকাণ্ডকে ‘বর্ণবাদী অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করে একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছে স্পেনের কাতালোনিয়ার আঞ্চলিক পার্লামেন্টে। ইউরোপের প্রথম কোনো পার্লামেন্টে ইসরাঈলবিরোধী এমন প্রস্তাব পাশ হলো। লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ তথ্য জানায়। ওই প্রস্তাবে ইসরাঈলকে এমন এক নীতি প্রয়োগের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে যা ‘আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি, ধারা ৭.২ (এইচ) অনুসারে বর্ণবাদের অপরাধের সমতুল্য’। এ প্রস্তাব পাশের পর এন কমু পোডেম পার্টি জানায়, ‘পার্লামেন্ট, প্রথম ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান যা স্বীকৃতি দিয়েছে, ইসরাঈল ফিলিস্তীনিদের ওপর বর্ণবাদী অপরাধ করছে’। এমপি সুসানা সেগোভিয়া সানচেজ বলেন, এটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

আমেরিকা ও ইউরোপীয় সরকারগুলো গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও নিজ শ্বেতাঙ্গ জনগণের জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পারলেও বর্ণবাদ ও বহিরাগতদের প্রতি ঘৃণার বিষয়টির সুরাহা এখনো করতে পারেনি। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলছে। আমেরিকায় শুধু গায়ের রং কালো বা তামাটে হওয়ায় প্রতি বছর বহু মানুষ হত্যার শিকার হয়। একইভাবে ইউরোপে কেবল গায়ের রং ও বিদেশী হওয়ায় ঘৃণার শিকার হয় অসংখ্য মানুষ। সেসব খবর খুব কমই জানে বাকি বিশ্বের জনগণ। আর এ ধরনের মানসিকতা থেকেই আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে উত্থান ঘটেছে শ্বেতাঙ্গ মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের স্লোগান।

অদ্ভুত এক দ্বৈতসত্তায় দ্বিখণ্ডিত শ্বেতাঙ্গ বিশ্ব। যেখানে বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধে বিপর্যস্ত আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইরাকের শরণার্থীদের জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। যেখানে এসব দেশের মানুষদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা হচ্ছে। যখন আমরা টিভি ফুটেজে দেখতে পাই পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির সীমান্ত থেকে এসব অসহায় মানুষকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, তখন ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের প্রতি ইউরোপের এমন ভালোবাসা বর্ণবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কী হতে পারে?


* খত্বীব, গছাহার বেগ পাড়া জামে মসজিদ (১২ নং আলোকডিহি ইউনিয়ন), গছাহার, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।