বাংলাদেশে হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক : তুলনামূলক পর্যালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাবনা

জুয়েল রানা
খত্বীব, গছাহার বেগপাড়া জামে মসজিদ, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।
সহকারী শিক্ষক, আলহাজ্ব মাহ্তাব-রওশন ব্রাইট স্টার স্কুল,
উত্তর পলাশবাড়ী, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।

মায়ের দুধ সংরক্ষণের জন্য গত ১ ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে দেশে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’। বেনামি এনজিও সংস্থার অর্থায়নে এই মিল্ক ব্যাংকটি স্থাপন করেছে রাজধানীর মাতুয়াইলে অবস্থিত শিশু মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যেসব মায়ের সন্তান জন্মের পর মারা গেছে বা নিজের সন্তানকে খাওয়ানোর পরও যেসব মায়ের বুকে অতিরিক্ত দুধ থাকে, সেইসব মা হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকে দুধ সংরক্ষণ করে রাখতে পারবেন। আর যে নবজাতকের জন্মের পরই মা মারা গেছেন বা যাদের মা অসুস্থতার জন্য দুধ খাওয়াতে পারছেন না, সেই নবজাতকেরা এই দুধ খেতে পারবে। দত্তক নেয়া সন্তানের অভিভাবকেরাও এখান থেকে দুধ নিয়ে খাওয়াতে পারবেন। বিভিন্ন সময় নবজাতককে ফেলে দেওয়ার খবরও পাওয়া যায়। এই পরিত্যক্ত নবজাতকদের বাঁচাতেও মিল্ক ব্যাংক কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। দেশের পোশাক শিল্প কারখানার নারী শ্রমিকসহ যে নারীরা দীর্ঘক্ষণ বাইরে কাজ করেন, এমন কর্মজীবী মায়েরাও নিজের সন্তানের জন্য ব্যাংকে দুধ সংরক্ষণ করে রাখতে পারবেন। পরে বাসায় ফিরে ঐ দুধ সন্তানকে খাওয়াতে পারবেন। তবে মায়েদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ ও বিতরণে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা নেওয়া হবে না বলে মিল্ক ব্যাংক সমন্বয়কারীরা জানান।

এই প্রক্রিয়াটা বাংলাদেশে নতুন হলেও এটি বহির্বিশ্বে বেশ পুরনো একটি ইস্যু। এই উদ্যোগ নবজাতক অনেক শিশুর জন্য আপাতদৃষ্টিতে উপকারী মনে হলেও মুসলিম সমাজের আত্মীয়তার বন্ধনে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করবে। কারণ হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক থেকে দুগ্ধ পানকারী শিশুরা কোন মায়ের দুধ পান করছে, তা অজানা থাকবে। যেহেতু মিল্ক ব্যাংকে একসাথে অনেক মায়ের দুধ একত্রিত থাকবে, তাই কার দুধ তাকে দেওয়া হচ্ছে তা নির্ণয় করাও অসম্ভব হয়ে যাবে। আবার হিন্দু, খ্রীস্টান, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ এদেশে বসবাস করে। এই ব্যাংক চালু হলে অনেক সময় কোনো অমুসলিম মহিলার দুধও মুসলিম নবজাতক পান করার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তাই এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ। প্রায় এক কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে সব প্রস্তুতি শেষ হলেও এবং সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি আনা হলেও কবে নাগাদ যাত্রা শুরু হতে পারে আমার এই অধমের লেখা প্রস্তুত হওয়ার শেষদিন পর্যন্তও তা জানা যায়নি।

বর্তমান পৃথিবীতে ৩৫টি দেশে ৩০০-এর বেশি হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক চালু আছে। তবে কোনো মুসলিম দেশে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠিত মিল্ক ব্যাংক নেই। তুর্কিতে পরীক্ষামূলক একটি পাইলট প্রোজেক্ট চালু হয়েছিল, কিন্তু তা ধর্মীয় দিক বিবেচনায় পরবর্তীতে বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র মালয়েশিয়া ও কুয়েতে পরীক্ষামূলক ‘মিল্ক এক্সচেইঞ্জ প্রোগ্রাম’ চালু আছে, কিন্তু তা এখনো ব্যাংক হিসাবে চালু হয়নি। বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র হলেও বাস্তবে তা কতখানি ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ আশা করি তা বিজ্ঞ মহলের জানা আছে। তাই এই উদ্যোগে অনেক ইসলামপন্থী ব্যক্তি আশান্বিত হলেও আদতে এটা একটা নতুন ফিতনার দুয়ার উন্মোচন ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না।

আমরা কিন্তু শিশুকে কোনোভাবেই অন্য মায়ের দুধ পান করানো নিষেধ বলছি না। কেননা, রাসূল (ছাঃ) তো নিজেই হালীমার দুধ পান করেছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ইসলামে দুধ-মা সম্পর্কটা অনেকটা রক্ত সম্পর্কের মতোই, এর মাধ্যমে ‘হুরমাতে রযা‘আত’ প্রতিষ্ঠিত হয়। দুধ-মা এবং সেই মায়ের ছেলে-মেয়েরাও ঐ সন্তানের জন্য মাহরাম। ফলে এই পরিবারের সন্তানদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন হারাম। এক্ষেত্রে যেটা হয়, তা হলো: দুই পরিবারের মধ্যে ছোট থেকেই জানা-শোনা থাকে, ফলে বৈবাহিক ক্ষেত্রে সন্দেহ সৃষ্টির অবকাশ আর থাকে না। অন্যদিকে মিল্ক ব্যাংকিং চালু হলে যেটা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা হলো: এক বাচ্চা ব্যাংক থেকে কোন মায়ের মিল্ক ব্যাংক কতবার পান করল, কতজন মহিলার কাছ থেকে পান করল- এগুলো হিসাব রাখা সাধারণ অসচেতন মানুষের জন্য খুব কঠিন হবে। ফলশ্রুতিতে বাচ্চারা জানবে না, কে কে তার দুধ-মা, কারা কারা তার দুধ ভাই-বোন। ফলে পরিণত বয়সে বিয়ে-শাদীর ক্ষেত্রে বিরাট এক হারাম-হালালের সন্দেহ সৃষ্টি হবে, কেউ হয়তো অজান্তেই তার দুধ ভাই-বোনকে বিয়ে করে ফেলবে। সচেতন মুসলিমদের জন্য এই সমস্যা এড়ানো সম্ভব হলেও বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীকে সচেতন ভাবাটা নিতান্তই বোকামি হবে, সেক্ষেত্রে বিরাট একটি জনশক্তি অজান্তেই ফিতনায় পড়ে যাবে।

কতবার অন্য মায়ের দুধ পান করলে সেই মা ‘দুধ-মা’ বলে বিবেচিত হবে? এ বিষয়ে ৩টি মত পাওয়া যায়ঃ

প্রথম মত: মাহরাম সম্পর্ক স্থাপনের জন্য মায়ের দুধ কতবার পান করেছে, কি পরিমাণ পান করেছে-সেটা বিবেচ্য নয়। সেটা একবার হলেও মাহরাম সম্পর্ক হয়ে যাবে। এই মতের পক্ষে আছেন হানাফী ও মালিকী মাযহাবের ইমামগণ, ইমাম আওযায়ী, সুফিয়ান আছ-ছাওরী (রহিঃ)। ছাহাবীদের মধ্যে ইবনে মাসঊদ, ইবনে আব্বাস, ইবনে ওমর (রাঃ)।

দ্বিতীয় মত: দুধ মা বিবেচিত হওয়ার জন্য ঐ মায়ের দুধ কমপক্ষে পূর্ণ ৫ বার পান করতে হবে। এর কম হলে হবে না। এটি শাফেঈ ও হাম্বলী মাযহাবের মত। এই মতের পক্ষে আছেন ছাহাবীদের মধ্যে আয়েশা, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), তাবেঈদের মধ্যে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহিঃ)।

তৃতীয় মত: দুধ-মা হতে হলে অন্তত ৩ বার খাওয়াতে হবে। এর স্বপক্ষে মত দিয়েছেন আবু ছাওর, দাঊদ যাহিরী, যায়েদ ইবনে ছাবিত (রাঃ) ও হাম্বলী মাযহাবের কিছু আলেম।

দ্বিতীয় মতটিই অধিক অগ্রাধিকারযোগ্য।

যাহোক, এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়েছেন অল্প সংখ্যক আলেম। তাদের পক্ষের যুক্তিগুলো নিম্নরূপ: যেসব নবজাতক শিশু বিশেষ কারণে মাতৃদুগ্ধ বঞ্চিত হয়, তাদের বাঁচাতে কিংবা নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে হলে মিল্ক ব্যাংকের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সামাজিক প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব দেওয়াটা যরূরী। ইবনে হাযম (রহিঃ) বলেছেন, ‘দুধ-মা সম্পর্ক তখনই স্থাপিত হবে, যখন শিশু সরাসরি স্তন্যদাত্রী মায়ের স্তন্য পান করবে’। এই প্রেক্ষিতে কিছু বিদ্বান বলেছেন, মিল্ক ব্যাংক থেকে মিল্ক নিয়ে শিশুকে খাওয়ানো হলে যেহেতু সেই বিষয়টি আর থাকছে না, তাই বৈবাহিক জটিলতার সম্ভাবনাও থাকে না।

১৯৬০ সালে ‘আল-আযহার’ এর ফৎওয়া কমিটি মিল্ক ব্যাংক তৈরির পক্ষে ইবনে আবিদীন এর ‘দুররুল মুখতার’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, কোনো শিশুর ‘দুধ-মা’র পরিচয় যদি অজানা থাকে এবং বিবাহের সময় পাত্র-পাত্রী দুধ ভাই-বোন কিনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ না থাকে এবং কোনো সাক্ষীও না থাকে, সেক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, তারা দুধ ভাই-বোন নয় এবং তাদের মধ্যে বিয়েও জায়েয।

হানাফী মাযহাবের অন্যতম ফক্বীহ ইমাম কারখি (রহিঃ)-এর উক্তি মতে শরী‘আতে ‘হুরমাতে রযা‘আত’  (দুধ সম্পর্কীয় আত্মীয়তা) সাব্যস্ত হবার জন্য শর্ত হলো শিশুকে সরাসরি মায়ের স্তন থেকে দুধ পান করতে হবে। মায়ের স্তন থেকে দুধ বের করে আলাদাভাবে পান করালে এর দ্বারা হুরমতে রযা‘আত সাব্যস্ত হবে না। আর মিল্ক ব্যাংকে দুধ পান করানো হয় আলাদাভাবে, সরাসরি মায়ের স্তন থেকে না। এই আপত্তি আসার পর বিশ্ববরেণ্য ফক্বীহগণ এই উক্তির ওপর আবার গবেষণায় বসেন। অনেক গবেষণা ও পর্যালোচনার পর তারা জানান, ইমাম কারখির এ মত অত্যন্ত দুর্বল সূত্রে বর্ণিত, দলীল হিসাবে তা গ্রহণ করার মতো না। এরপর পুনরায় আবার সকল ফক্বীহ এই ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছান যে, মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং ব্যবহার উভয়টি নাজায়েয।

যে আলেমগণ মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে মত দিয়েছেন তাদের যুক্তি: এই পক্ষেই মত দিয়েছেন চার মাযহাবের অধিকাংশ আলেম। তাদের মতে, এক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য ক্ষতি প্রতিহত করতে গিয়ে আরেকটি সুস্পষ্ট বড় ক্ষতির দুয়ার উন্মোচিত হবে। কেননা, যে শিশুকে মায়ের দুধ দেওয়া সম্ভব না, সেই শিশুর জন্য দুধ-মা ভাড়া করা খুব কঠিন বিষয় নয়। তাছাড়া অনেক মা স্বেচ্ছায়ও নবজাতকদের দুধ পান করিয়ে থাকেন। তাছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ফর্মুলা দুধ (কৌটার দুধ) সহজলভ্য, এটি দিয়ে সহজেই শিশুকে প্রতিপালন সম্ভব, যদিও তা মায়ের দুধের বিকল্প হয় না। যেখানে এতগুলো সুযোগ রয়েছে নবজাতকের সমস্যা সমাধানের জন্য, সেখানে কেবল সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য বড় ও সুস্পষ্ট ক্ষতি বেছে নেয়ার সুযোগ নেই। ইসলামে মানুষের বংশধারা সংরক্ষণ অত্যন্ত যরূরী একটি বিষয়।

ইবনে কুদামাহ (রহিঃ) বলেন, মায়ের দুধ শিশুকে মুখ অথবা নাক দিয়ে ফোটায় ফোটায় পান করানো হলেও তা শিশুর হাড় ও মাংসে পরিণত হবে। কেননা, মাতৃদুগ্ধ পান অবশ্যই শিশু সন্তানের হাড়ের শক্তি বাড়ায় ও মাংস তৈরি করে। তাই দুধ সম্পর্ক ইসলামে অনেকটা রক্তের সম্পর্কের মতই। এই মতামতটি শাফেঈ ও হাম্বলী মাযহাবের মতামতেরও অনুকূলে (মায়ের দুধ কেবল বাচ্চার ক্ষুধা মেটায় না, এটা বাচ্চার জেনেটিক কোডেও প্রভাব ফেলে)।

এই মতের আলোকে ১৯৮৫ সালের ২২-২৮ ডিসেম্বর জেদ্দায় অনুষ্ঠিত OIC এর ধর্মীয় বিধান বিষয়ক বোর্ড মাজমাউল ফিক্বহিল ইসলামী আদ-দুওয়ালিএর বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা নিষিদ্ধ এবং এই ব্যাংক থেকে শিশুকে দুধ খাওয়ানো হারাম। কেননা, যদিও এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বেশ কিছু উপকারী দিক বিদ্যমান, তথাপি ক্ষতিকর দিক তাকে ছাড়িয়ে গেছে। আর হালাল ও হারামের দুটোই যেখানে উপস্থিত, সেখানে হারাম বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে।

একইভাবে ২০১১ সালের ১৫-১৭ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার জাতীয় ফাতাওয়া কমিটির ৯৭তম বৈঠকেও একই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়- যেহেতু ইসলামে বংশধারা সংরক্ষণ একটি যরূরী বিষয়, আর মিল্ক ব্যাংকের মাধ্যমে বংশধারা সংমিশ্রণ এবং সন্দেহজনক ও হারাম বিষয়ে জড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হবে, তাই মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা নিষিদ্ধ। আর যেসব অপূরণ বাচ্চা মায়ের দুধ পাচ্ছে না কিংবা সংক্রমণজনিত রোগের কারণে মায়েরা শিশুদের স্তন্যপান করাতে পারছেন না, অন্য মায়েরা স্বেচ্ছায় এসব বাচ্চাকে দুধ পান করাতে পারবেন এবং উভয়ের পরিবারের মাঝে যোগাযোগ থাকতে হবে।

২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি জার্নালে মালয়েশিয়ার একদল গবেষক শাফেঈ মাযহাবের আলোকে এবং ওলামায়ে কেরামের মতামত নিয়ে একটি শরী‘আভিত্তিক মিল্ক ব্যাংক চালু করার প্রস্তাবনা দেন। তাদের মতে কঠোর আইনের আওতায় ৫টি শর্ত পূরণ করে মিল্ক ব্যাংক চালু করা হলে তা শরী‘আ মোতাবেক হবে- (১) এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হবে কেবল সেইসব যরূরী অবস্থার জন্য, যখন নবজাতক মায়ের দুধ না পেয়ে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন এমন অবস্থায়। (২) এই ব্যাংক কোনো ব্যবসায়ী লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হবে না। (৩) এখান থেকে যে কেউ ইচ্ছে মতো দুধ নিতে পারবে না। কেবলমাত্র বিশেষজ্ঞ মুসলিম ডাক্তারের পরামর্শে যেসব শিশুর জন্য দুধ পান খুব যরূরী, তাদের জন্যই ব্যাংক থেকে দুধ নেওয়া যাবে। (৪) ব্যাংকের সকল কার্যক্রম মুসলিমদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। যদি অমুসলিম কেউ পরিচালনা পরিষদে থাকে, তাহলে তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইসলামী শরী‘আহর মূলনীতির উপর উপযুক্ত ট্রেনিং দিতে হবে। (৫) কোনো শিশুকে একই মায়ের দুধ ৪ বারের বেশি দেওয়া যাবে না।

তবে উপর্যুক্ত প্রস্তাবনা এখনো জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত হয়নি এবং মালয়েশিয়ার কোথাও এখনো মিল্ক ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সারাবিশ্বের মূলধারার আলেমগণ যেখানে এখন পর্যন্ত ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি, পৃথিবীর প্রতিষ্ঠিত মুসলিম দেশগুলো এখন পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠার সাহস করেনি, সেখানে বাংলাদেশের মতো নামে মাত্র মুসলিম দেশে কীভাবে শারঈ আইন মেনে মিল্ক ব্যাংক পরিচালনা করবে, এটি একটি বড় প্রশ্ন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহল ও আলেম সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যরূরী বলে মনে করছি।

অনেকে বলেছেন, একজন সন্তানের জন্য একজন ডোনার হলে সেই সন্তানের জন্য এবং মায়ের জন্যও আইডেন্টিটি ট্রেস করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সিঙ্গেল চাইল্ড সিঙ্গেল ডোনার সবসময়ই মেইনটেইন করা সম্ভব নাও হতে পারে। তখন চলে আসবে সবচেয়ে কমপ্লেক্স ইস্যু সিঙ্গেল চাইল্ড মাল্টিপল ডোনার। সেক্ষেত্রে মাল্টিপল ডোনার মিক্স আপের ক্ষেত্রে খুব স্ট্রিকটলি ডোনার প্যাক আলাদা করে লেবেল করা লাগবে, যেন প্রত্যেক ডোনারের আইডেন্টিটি ট্রেস করা যায়। এখানে আবারও প্রশ্ন আসে, স্ট্রিকটলি মেইনটেইন করার যে জটিল প্রক্রিয়ার কথা আমরা বলছি, বিড়ালের গলায় সেই ঘণ্টা বাঁধবে কে? কথাগুলো বলা যতটা সহজ, প্রয়োগ করা ততটাই কঠিন। যেখানে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো অদ্যাবধি পারেনি এবং কিছু দেশ পাইলট প্রোজেক্ট চালু করেও তা আবার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে মাতৃদুগ্ধ সংরক্ষণে ‘মিল্ক ব্যাংক’ স্থাপনের বিরোধিতা করে এবং এ ব্যাপারে যথাযথ শর্তারোপ চেয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে ধর্ম মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নবজাতক আইসিইউ এবং ঢাকা জেলা প্রশাসককে বিবাদী করা হয়েছে। জনস্বার্থে নোটিশটি পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোঃ মাহমুদুল হাসান। আইনজীবীর পাঠানো নোটিশে ‘মিল্ক ব্যাংক’ ইস্যুতে আইনগত ও ধর্মীয় সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, ইসলাম ধর্মমতে কোনো শিশু কোনো মহিলার দুধ পান করলে ঐ মহিলা ঐ শিশুর দুধ মাতা হয়ে যায় এবং উক্ত মহিলার সন্তানরা উক্ত শিশুর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হয়। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে উক্ত মিল্ক ব্যাংক স্থাপনের ফলে একই মায়ের দুধ পানের কারণে ভবিষ্যতে ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা চরমভাবে সামাজিক অরাজকতা সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, ভাই ও বোনের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ এবং তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইন ‘মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরী‘আত) প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭’ এর সরাসরি লঙ্ঘন।”

যদিও হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক-এর সমন্বয়ক ডা. মুজিবুর রহমান বলেছেন, ধর্মীয় বিধান মাথায় রেখেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  মিল্ক ব্যাংক থেকে দুধ মাতা ও গ্রহীতা পরস্পর সম্পর্কে বিস্তারিত জানবেন এবং তাদের নিজস্ব পরিচয়পত্রও থাকবে। এমনকি তাদের তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রতি বছর প্রকাশও করা হবে যাতে করে দাতা ও গ্রহীতার সব প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যায়। প্রতিটি মায়ের দুধ আলাদা বিশেষ পাত্রে নেওয়া হবে এবং আলাদা লেবেলিং থাকবে যা কখনো নষ্ট হবে না। যিনি দুধ দেবেন তার অনুমতি নেওয়া হবে। তিনি নিজেও নিজের দুধ প্রয়োজনে নিতে পারবেন বা অন্য কেউ নিলে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে আইডি কার্ড থাকবে। দাতা ও গ্রহীতা এ বিষয়ে একে অন্যের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে পারবেন। এই ব্যাংক সাধারণভাবে সবার জন্য নয়, এটি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর জন্য যেখানে জীবন বাঁচানোর চেষ্টাই প্রধান কর্তব্য।

বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এই উদ্যোগ ব্যাপকতা লাভ করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। কেননা, হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের মাধ্যমে বহু অজানা দুধ ভাই-বোন হবে, যাদের মধ্যে বিয়ে হারাম। এভাবে অজ্ঞাতেই বহু হারাম বিবাহ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে এবং অসংখ্য হারাম বিয়ে অনুষ্ঠিত হবে সকলের অজান্তেই। আর এটা পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনার পাশাপাশি ইসলামী পরিবার প্রথাকেও নিদারুণ হুমকির মুখে ফেলবে। তাই এই বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সাধারণ মানুষকে জানিয়ে দিতে হবে মিল্ক ব্যাংক ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠা উভয়টিই ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে নাজায়েয।

তবে এর সঠিক শারঈ সমাধান কী? একটি উত্তম সমাধান হতে পারে ‘মিল্ক এক্সচেইঞ্জ প্রোগ্রাম’। মালয়েশিয়ায় এই কাজটি করা হচ্ছে ‘Human Milk 4 Human Babies-Malaysia’ নামে একটি ফেইসবুক পেইজের মাধ্যমে। এখানে আগ্রহী দুধ-মায়েরা ফর্ম পূরণ করে রেজিস্ট্রেশন করেন এবং যে মায়েরা শিশুদের স্তন্য পান করাতে পারছেন না, তারা দুধ-শিশুদের নাম রেজিস্ট্রেশন করেন। এভাবে নিজেরাই নিজেদের সন্তানদের জন্য দুধ মা খুঁজে নেন। এরকম একটি উদ্যোগ যদি বাংলাদেশেও নেওয়া হতো, এই ফিতনামূলক ব্যাংকের চেয়ে তা অনেক বেশি কার্যকরী ও শরী‘আহসম্মত হবে বলে আমরা মনে করছি। তাছাড়া এমন ব্যাংক বানানোর বিশেষ প্রয়োজনও সমাজে নেই। মায়ের দুধ ছাড়াও হাজার হাজার শিশু বিকল্প খাদ্য খেয়ে বেঁচে আছে। একান্তই যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে সুনির্দিষ্ট দুধ মাতাই সবচেয়ে ভালো সমাধান। এতে দাতা ও গ্রহীতার মাঝে একটা আত্মিক সম্পর্কও গড়ে উঠে।