বাংলা বানানে ইসলাম বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িকতা

মুতাছিম বিল্লাহ
শিক্ষক (বাংলা), আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ,
বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম ও প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে ওঠে ভাষার প্রশ্নে। সর্বশেষ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিল বাংলাকে উর্দূ হরফে লিখতে। এজন্য তারা একটি কমিশন গঠন করেছিল কিন্তু তাদের সে চেষ্টা সফল হয়নি। বর্তমান বাংলা একাডেমি যে প্রমিত বানান রীতি নিয়ে এসেছে, তা দেখে মনে হতে পারে যেন ঔপনিবেশিক কেউ বানান সংশোধন করে দিয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা  আন্দোলনের পর ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমি। প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে বাংলা একাডেমির অনেক পরিচালক এসেছেন, মোহাম্মদ এনামুল হক সহ অনেকেই এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। সে সময় থেকে শুরু করে বাংলা একাডেমি কর্তৃক ছাপানো বইগুলোতে যে বানান রীতি প্রচলন করা আছে, সেই বানান রীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাম্প্রতিক বাংলা একাডেমি নতুন প্রমিত বানান রীতি নিয়ে এসেছে। যা দেখলে আপনি এই বানান রীতিকে সাম্প্রদায়িক বানান রীতি না বলে পারবেন না। কারণ এই বানান রীতিতে মোটামুটি আনন্দবাজার পত্রিকার বানান রীতিকে অনুসরণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পঠিত বাংলা পত্রিকা ‘প্রথম আলো’কে এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। এদেশের বাংলা বানানে ইসলাম বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িকতাকে অনুসরণ করা হয়েছে বলে অনেকেই মনে করে। ইসলাম বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক বানান রীতিকে অনুসরণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা হলো বিদেশি ভাষায়

ঈ-কার দেওয়া হবে না, সব বিদেশি শব্দে ই-কার দেওয়া হবে।  হ্রস্ব ই ও দীর্ঘ ই এবং হ্রস্ব ই-কার ( ি) ও দীর্ঘ ই-কার  ( -ী)-এর ব্যবহারে বাংলা একাডেমি যে রীতি প্রণয়ন করেছে, তা অনেকটাই হাস্যকর, উদ্ভট ও ইসলাম বিদ্বেষী। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলামী শব্দগুলো। মুসলিমদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত  শব্দগুলোর বানান দেখে আপনার চোখ কপালে উঠতে পারে।

যেমন- আরবি, ইদ, ইমান, ইমাম, ইমামতি, ইরানি, ইসলামি, এতিমখানা, এবতেদায়ি, কাজি, কান্ডারি, কেতাব, কোরআনি, কোরবানি, গাজি, জিহাদ, তাবিজ, তাবলিগ, তারাবি, নবাবি, নবি, নবিজি, নাজিম, নামাজি, পির, ফারসি, বাদশাহি, ভান্ডারি, মদিনা, মহানবি, মুয়াজ্জিন, মুরিদ, মিলাদ, মৌলবি, রুজি, শরিফ, শরিয়ত, শহিদ, হিজরি, হাজি ইত্যাদি। এই শব্দগুলো বিদেশি (আরবী ও ফারসী) শব্দ। এগুলো বর্তমানে বাংলা শব্দ ভাণ্ডারের নিজস্ব শব্দ হিসাবে স্বীকৃত। তাই এসব শব্দের বানানে প্রমিত বানানবিধি অনুসারে ঈ বা ঈ-কার দেওয়া হয় না। বাংলা একাডেমি একবার বলছে, এগুলো বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে নিজস্ব শব্দ হিসাবে স্বীকৃত, অথচ আবার তারাই একে বিদেশি শব্দ বলে তাতে উচ্চারণের দিকে লক্ষ না করে তাকে অনেকটা বিকৃতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

‘বিদেশি’ বলে ভাষাকে বর্ণদোষে আক্রান্ত করা হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। এটা কোনো বিজ্ঞানমনষ্ক নীতি হতে পারে না। এসব নতুন নীতিমালা সাম্প্রদায়িকতায় আক্রান্ত তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ সংস্কৃত শব্দ এই বানান রীতির বাইরে থাকবে। ঈশ্বর বানানে কিন্তু দীর্ঘ-ই কারই বহাল থাকবে, তা না হলে পণ্ডিত মশাই যে পিঠের চামড়া তুলে নিবেন। এক্ষেত্রে ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধানের কথা বলতে পারেন। কিন্তু সেই নিয়ম শুধু তৎসম শব্দে সীমাবদ্ধ। অন্য শব্দের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি সেটা। দন্ত্য-ন আর মূর্ধন্য এর উচ্চারণ পার্থক্য ইংরেজি বা আরবীতে নেই বললেই চলে।

শব্দ তার ধ্বনিকে ধারণ করে উচ্চারিত হয়। সে হিসাবে দীর্ঘস্বর দ্বারা এই শব্দগুলো উচ্চারিত হলে তার সৌন্দর্য ও সঠিক শব্দগুঞ্জন আমরা উপলব্ধি করতে পারি। শব্দকে চিহ্নিত করতেও সহায়ক হয়। যেমন ইংরেজিতে যদি Shit শিট লিখি, তাহলে গু বা বিষ্ঠা বুঝায়। আবার যদি sheet শীট লিখি, তাহলে চাদর বা আস্তর বুঝায়। এখন কেউ যদি শিট সকল ক্ষেত্রে একই বানানে লিখে, তাহলে সবকিছু গু বা বিষ্ঠা অর্থে ব্যবহৃত হবে। বাচ্চারাও ভুল উচ্চারণ শিখবে। ইংরেজি বা আরবী ভাষার মতো উচ্চারণের প্রলম্ব সেনসিটিভ ভাষায় তো এরকম সীমাবদ্ধতার কারণে শব্দের অর্থই বদলে যাবে। যেমন Bean বা শিম হয়ে যাবে Bin বা ময়লা ফেলার পাত্র। আরবীতে তো মাখরাজ, মাদ্দ, গুন্নাহ অনেক কিছু আছে। আবার ইংরেজি অক্ষর S এর জন্য যদি ‘স’ এবং –sh, -sion, -tion , -ssion এর জন্য ‘শ’ ব্যবহার করা হয় তবে ঈ-কার কী দোষ করেছে আরবী ও ইংরেজি বানানে। যদিও বাংলা লিখে শুদ্ধ আরবী উচ্চারণ সম্ভব নয়, তবুও যতটুকু আছে তাও বাংলা একাডেমি বিলুপ্ত করেছে। শব্দ লেখা হয় তার অর্থ বোঝাতে। যদি সেটা অর্থ বোঝাতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই লিখন ও উচ্চারণ নীতিকে আমরা বিজ্ঞানসম্মত বলব কী করে?!

এ তো গেলো শুধু ই-কার ও ঈ-কার নিয়ে ভণ্ডামি! বাংলা একাডেমি নিজের নামের বানান নিয়ে কত ভণ্ডামি করেছে তার সাক্ষী আমি নিজে। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী নিজেদের একাডেমির বানানে ই-কার না দিয়ে ঈ-কার দিয়ে সাইনবোর্ড দেখেছি প্রায় দুই বছর ২০১২-১৩ খ্রিস্টাব্দে। এতে বোঝা যায় এর পূর্বে যারা মহাপরিচালক ছিলেন তারা এই ভণ্ডামি মেনে নেননি। এই বানান রীতি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া।

তাই বলতে চাই বাংলা ভাষার মেরুদণ্ড ভাঙবেন না। পাকিস্তানের উর্দূভাষীরা চেয়েছিল উর্দূ হরফে বাংলা লেখার জন্য। পাকিস্তানিরা যেটা করতে পারেনি, এখন বাঙালিরা সেটা করছে। দেখা যাচ্ছে গায়ের জোরে একটা নিয়ম বানিয়ে বানান রীতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেটা আদতে বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দের ভুল উচ্চারণ বিস্তারে সহায়তা করবে মাত্র।

তাহলে যারা সাধারণ মানুষ তারা কী বানান লিখবে? সত্যি কথা বলতে কি দেশের যত সাইনবোর্ড আছে এমনকি এদেশের সরকারি সাইনবোর্ড যেমন রেল স্টেশনে গেলে দেখবেন টিকিট মাস্টার লেখা বানান ভুল। এর কারণ অনেক আগে থেকেই এই বানানগুলো চলে আসা। বাংলা একাডেমির যেখানে দায়িত্ব ছিল বানানকে সহজ, সাবলীল ও সুন্দর করা সেখানে তারাই বাংলা বানানকে একটা জটিল অবস্থার দিকে নিয়ে গেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ মনে হয় না তাদের নির্দেশিত বানান মানবে। তারা তাদের মতোই লিখে যাবে তাই সারা দেশে মানুষের সংশোধন না করে বাংলা একাডেমি আরও যৌক্তিকভাবে ও নির্ভুলভাবে বানানগুলো নির্ধারণ করুক এটাই আমাদের কাম্য। যে বানান এর উপর আস্থা রেখে যুগের পর যুগ বাংলা ভাষার তরি বেয়ে যাবে কালের প্রবাহমান স্রোতে।