বিবাহের ব্যবস্থা করুন!
সুরাইয়া বিনতে মামূনুর রশীদ*


ভূমিকা :

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,﴿وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ﴾ ‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী’ (আন-নূর, ২৪/৩২)

‘বিবাহ’ একটি পবিত্র শব্দ। যা মানুষকে অশ্লীল ও হারাম কাজ থেকে হেফাযত করতে সাহায্য করে। আমার এই ছোট্ট জীবনে আমি কতক যুবক/যুবতীর গল্প জানি, যারা বিবাহ নামক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হতে ইচ্ছুক। চায় তারা ফেতনাযুক্ত পরিবেশে নিজের ঈমান রক্ষা করতে; চায় আত্মতৃপ্তি লাভ করতে; ভোগ করতে চায় আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামত; কিন্তু তাদের এই অতি চমৎকার সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন তাদের পিতা-মাতা বা অভিভাবক। ভুক্তভোগীদের ব্যথায় সমব্যথিত হয়ে আজকের এই লেখার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। 

প্রাপ্ত বয়সে যৌবনের চাহিদা :

প্রাপ্ত বয়সে যৌবনের চাহিদা দমন করা খুবই কষ্টকর। এই বয়সে যুবক/যুবতীরা বিবেকশূন্যে নিমজ্জিত হতে থাকে। আর তখনই ভুলে যেতে থাকে মান-সম্মানের কথা; জড়িয়ে পড়ে অশ্লীল ও পাপকর্মের সাথে। যা কেবল ভুক্ত-ভোগীরাই বুঝতে পারে।

সম্মানিত অভিভাবক! তবে কি জানেন? নিজেকে সংবরণ করে রাখতে পারে তারাই, যারা খুব আল্লাহভীরু। আল্লাহর ভয়ই তাদেরকে শান্ত শিশুর ন্যায় করে রাখে। আর তাদের কষ্ট আল্লাহ ব্যতীত আমরা বুঝার তেমন ক্ষমতা রাখি না। আরেকটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তা হলো— আদম e জান্নাতের এত সব নেয়ামত পেয়েও নিজেকে পরিপূর্ণ সুখী মনে করতে সঙ্গীর অনুভব করেছিলেন। একজন নবী যদি জান্নাতী পরিবেশে সঙ্গী ছাড়া জীবন শূন্যতা অনুভব করেন, তাহলে আপনি দুনিয়ায়…?

তাই আপনি আদম e-এর কথা স্মরণ করুন। আপনার সন্তানের জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। কেননা সন্তান আপনার, দায়িত্বও আপনার।

সন্তান বড় বা ছোটোর হিসাব করা নিষ্প্রয়োজন :

সম্মানিত অভিভাবক! বিবাহের ব্যাপারে ছোট কিংবা বড় এটা কোনো ব্যাপার না। ইসলাম এ বিষয়ে কিছু বলে না। বরং সন্তান বালেগ (প্রাপ্ত বয়স) হলে এবং তার সামর্থ্য ও প্রয়োজন থাকলে অভিভাবকের উচিত হবে, তাকে সেই পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হতে সমর্থন ও সাহায্য করা। তাছাড়া সবার চাহিদা সমান না। যৌবনকে দমিয়ে রাখার ক্ষমতা কারো বেশি, কারো বা কম। আবার কারো যৌবনের চাহিদা বেশি থাকে, কারো কম থাকে। সুতরাং সন্তানের উপর ব্যক্তি বা সমাজের বোঝা চাপানো উচিত হবে না।

সম্মানিত অভিভাবক! যে সন্তানকে আপনি ছোট বলছেন, তার সম্পর্কে একটু গভীরভাবে ভাবুন এবং তার সম্পর্কে নিবিড়ভাবে খোঁজ-খবর রাখুন। আর সম্ভব হলে নিজেকে নিয়ে তুলনা করুন কত বছর বয়সে আপনার মধ্যে যৌবন এসেছিল? কত বছর বয়সে আপনি বিবাহ করেছেন? নিশ্চয়ই ১৩-১৪ কিংবা ১৭-১৮ হবে হয়তো। আপনার যদি ফেতনামুক্ত পরিবেশে ১৩ কিংবা ১৭ বছর বয়সে বিবাহের প্রয়োজন হয়, তাহলে এই ফেতনাযুক্ত পরিবেশে এই বয়সের সন্তানদের আপনি ছোট বলেন কীভাবে?

বিদ্যা অর্জন ফ্যাক্ট :

অধিকাংশ পিতা-মাতাই সন্তানকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করানোর স্বপ্ন নিয়ে কোমরে গামছা বেঁধে নেমেছেন। না, আমি বিদ্যা অর্জন করার বিপক্ষে কলম ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চাচ্ছি না। আসলে বলতে চাচ্ছি, বিদ্যা আগে নাকি ঈমান? নিশ্চয়ই ‘ঈমান’ বলবেন, নয় কি? যদি তাই হয় তাহলে সন্তানের ঈমান রক্ষায় তার বিবাহ দিন। অতঃপর পড়ালেখা করান। এতে ঈমান, সাথে সাথে বিদ্যা দুটোই ঠিক থাকবে ইনশা-আল্লাহ।

সন্তান-হিতৈষী পিতা-মাতা :

প্রত্যেকটা পিতা-মাতাই চান সন্তানের কল্যাণ। তবে তাদের জ্ঞান অনুযায়ী। যেমন—একজন চিত্রনায়ক-নায়িকার পিতা-মাতা চান যে, তার ছেলে বা মেয়ে যেন বিশ্বের সেরা চিত্রনায়ক-নায়িকা হয়। তারাও কিন্তু তাদের জ্ঞান অনুযায়ী সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। যদিও তারা প্রকৃত কল্যাণ ধরতে পারেন না। আপনার বুঝটাও তো এমন হতে পারে।

একটা উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে— মনে করুন, এক ব্যক্তি কয়েকদিন ধরে কোনো কারণে অনাহারে আছেন। অবস্থা একেবারেই শোচনীয়; প্রাণ যায় যায় অবস্থা। খাদ্য গ্রহণ করা তার জন্য অতীব জরুরী। বিষয়টি তার স্ত্রী অবগত হলেন। তিনি স্বামীকে অত্যধিক ভালোবাসার কারণে যেনতেন খাবার অসুস্থ স্বামীর সামনে উপস্থিত করতে চান না। তাই তিনি কোরমা-পোলাও রান্না করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্ত্রীর এত ভালোবাসা দেখে, নিশ্চয়ই অনেক সন্তুষ্ট হবেন। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসা অনেক গুণ বেড়ে যাওয়ার কথা, তাই নয় কি? কিন্তু লোকটির রাগ হলো। আসলে তিনি কোরমা-পোলাও খাওয়ার অপেক্ষায় জীবন দিতে চাচ্ছেন না; চাচ্ছেন একটু জীবন বাঁচার জন্য খাবার। এক্ষেত্রে স্ত্রী তার স্বামীকে ভালোবাসেন না, বিষয়টি এমন না। আসলে তিনি জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে বুঝতে পারেননি যে, পেট খারাপের ওষুধ ‘নাপা’ না।

আপনার সন্তানের বিষয়টিও তো এরকম হতে পারে। হতে পারে আপনি তার মঙ্গলটা ধরতে পারছেন না। সন্তানকে অনুধাবন করার চেষ্টা করুন এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।

উলামায়ে কেরামের জন্য লক্ষণীয় :

বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ে বই এবং বিষয়ভিত্তিক আলোচনা পাওয়া গেলেও ‘বিবাহের ব্যবস্থা’ সম্পর্কে তা খুবই সীমিত। অথচ আজকের সমাজে যেনা-ব্যভিচার ও অশ্লীলতার যত কারণ আছে, তন্মধ্যে বিবাহ দেরিতে দেওয়া কোনো অংশে কম নয়। সুতরাং উলামায়ে কেরাম তথা যারা দ্বীনের দাওয়াত প্রচার নিয়োজিত আছেন তাদের উচিত হবে, মানুষের মাঝে বিবাহ সম্পর্কে যে ভ্রান্ত বিশ্বাস বিরাজ করছে তার মূলোৎপাটন করার চে ষ্টা করা। সাথে সাথে জাতির সামনে বিবাহের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং উৎসাহ প্রদান করা।

উপসংহার :

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেছেন। দিয়েছেন তাদের মাঝে যৌবন। আর এই যৌবন বিবাহ ব্যতীত নিবারণ করা হারাম। তাই আসুন! আমরা হারামকে বিবাহের মাধ্যমে হালাল করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি। আল্লাহ আমাদের সকলকে বিবাহের প্রতি যত্নশীল হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!


* কাটলাহাট, বিরামপুর, দিনাজপুর।