ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায় ও বাবরি মাসজিদ

আবু তাসনীম

কামিল ২য় বর্ষ, (আদব বিভাগ) তা‘মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা
মির হাজিরবাগ, ঢাকা- ১২০৪

 

৯ নভেম্বর ২০১৯। মানবতার ইতিহাসের একটি কলঙ্কিত রায়ের দিন। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং অযোধ্যাতেই অন্যত্র একটি মসজিদ গড়ার জন্যও সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে পাঁচ একর জমি বরাদ্দ করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিম্বে বাবরি মাসজিদ ও ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায় সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হলো:

বাবরি মসজিদের ইতিহাস :

প্রথম মুঘল সম্রাট জহির উদ্দিন শাহ্ বাবরের শাসনামলে ১৫২৮ সালে বর্তমান ফৈজাবাদ জেলার অন্তর্গত অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। বাবরের সেনাপতি মীর বাকি বানিয়েছিলেন এই মসজিদ। মসজিদ নির্মাণের সময় অথবা অব্যবহিত পরে এ সম্পর্কে স্থানীয় হিন্দুদের মধ্যে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল না। বরং সম্রাট বাবরের শাসনের অসাম্প্রদায়িক নীতি, ধর্ম নির্বিশেষে সব ঐতিহাসিক কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু মুঘল সম্ররাটদের উদারতা সত্ত্বেও বারবার হামলা চালানো হয়েছে। অযোধ্যাকে রামের জন্মভূমি হিসাবে চিহ্নিত করে মসজিদ ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছে। ইতিহাসে পাওয়া যায় হুমায়ুনের আমলে ১০ বার ও আকবরের আমলে ২০ বার হামলা চালানো হয়েছে। সম্রাট আকবর ছিলেন ধর্মীয় ব্যাপারে অত্যন্ত উদার। তিনি একটি সমঝোতায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পরও কয়েকবার হামলা হয়েছে, হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ হয়েছে। ১৮৮৫ সালে মহন্ত রঘুবর দাস নামে একজন ব্যক্তি ফৈজাবাদ সাব জজ আদালতের কাছে বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি মন্দির নির্মাণের অনুমতি চান। তার আবেদনে দাবি করা হয়েছিল, স্থানটি রামচন্দ্রের জন্মভূমি। এ ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। সংঘর্ষও হয়েছিল। সংঘর্ষের শেষে হিন্দুরা বাবরি মসজিদ দখল করে নিয়েছিল। হত্যা করা হয়েছিল ৭৫ জন মুসলিমকে।

বাবরি মসজিদ ভাঙা ও দাঙ্গা :

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের অযোধ্যা শহরে সপ্তদশ শতকে তৈরি এক ঐতিহাসিক স্থাপনা বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলেছিল উন্মত্ত হিন্দু জনতা। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি রাজনৈতিক সমাবেশের উদ্যোক্তারা, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ১৫০,০০০ জনের একটি রাজনৈতিক সমাবেশ শুরু হয়, যা বিশৃঙ্খলার রূপ নেয় এবং বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তার পরবর্তী সময়ে দাঙ্গায় অন্তত ২ হাজার জনের মৃত্যু হয় এবং ভারতের ইতিহাসে এত বড় দাঙ্গা আর কখনো হয়নি।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায় :

৯ নভেম্বর ২০১৯ ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির গড়ার জন্যই রায় দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। মন্দির গড়ার জন্য সরকারকে একটি ট্রাস্ট গঠন করতেও বলা হয়েছে। তবে অযোধ্যাতেই অন্যত্র একটি মসজিদ গড়ার জন্যও সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে পাঁচ একর জমি বরাদ্দ করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অযোধ্যার যে ২.৭৭ একর জমিকে বিরোধের মূল কেন্দ্র বলে গণ্য করা হয়, তা বরাদ্দ করা হয়েছে ‘রামলালা বিরাজমান’ বা হিন্দুদের ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের বিগ্রহকে। যার অর্থ সেখানে রাম মন্দিরই তৈরি হবে। ভারতের শীর্ষ আদালতে পাঁচ সদস্যের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে এই রায় দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক আদালত এই রায় দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এটিই ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টে একটানা ৪০ দিন শুনানি হওয়ার পরে রায় লেখার জন্য মাসখানেক সময় নেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি ছাড়া বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন এস এ বোডবে, ওয়াই ভি চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ ও এস আব্দুল নাযীর।

রায়কে কেন্দ্র করে অযোধ্যার অবস্থা :

রায়কে কেন্দ্র করে অযোধ্যায় নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত ১২ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অযোধ্যায় কারফিউ জারি রয়েছে রায়ের দুই সপ্তাহ আগ থেকে। রায় ঘোষণার আগের দিন শুক্রবার প্রধান বিচারপতি গগৈ রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উত্তরপ্রদেশের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক ও রাজস্থানসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখা হয়েছে। শনিবার হওয়ার কারণে বেশির ভাগ সরকারি অফিসেও ছুটি।

অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণে সংঘ পরিবারের হুমকি :

অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণে সংঘ পরিবার আগ থেকেই  হুমকি দিয়ে আসছিল। সংঘ পরিবার সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে শুধু রাম মন্দিরই নির্মাণ করা হবে। অন্য কোনো নির্মাণ নয় এবং সেই নির্মাণকার্য শুরু হচ্ছে আগামী বছর থেকে। আদালতের বাইরে আপোস-মীমাংসায় তারা আগ্রহী নয়। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙার ২৫তম বর্ষপূর্তির ঠিক মুখে মৌলবাদী বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কর্নাটকের উড়–পিতে সংঘ পরিবার আয়োজিত ধর্ম সংসদ থেকে ঘোষণা করে, আগামী বছর থেকে অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতেই শুরু হবে রাম মন্দির নির্মাণ। ঐ জমিতে অন্য কোনো নির্মাণ নয়। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর হিন্দু কর সেবকরা বাবরি মসজিদ ভাঙার পর কেটে যায় ২৫ বছর। মামলা মোকদ্দমা চলে বহু বছর। এলাহাবাদ হাই কোর্টে এক প্রস্থ রায় ঘোষণার পরেও তার চূড়ান্ত মীমাংসা হয়নি। ঐ রায়ে বিতর্কিত জমিকে বিবাদমান তিন পক্ষের মধ্যে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। তখন অযোধ্যার বিতর্কিত জমির মামলা চলে যায় শীর্ষ আদালতে। সম্প্রতি আর্ট অফ লিভিং-এর ধর্মগুরু শ্রী শ্রী রবিশংকর আদালতের বাইরে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এক মীমাংসাসূত্র বের করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু সংঘ পরিবার তাতে আমল দেয়নি। তাদের মতে, ধর্ম সংসদই বলবে শেষকথা। এই আবহে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে দেন, অযোধ্যার রামজন্মভূমিতে রাম মন্দিরই আমাদের বানাতে হবে, সেখানকার পাথর দিয়েই। অন্য কোনো নির্মাণ নয়। আর সেই নির্মাণ শুরু হতে আর দেরি নেই। আগামী বছর থেকেই শুরু হবে সেই নির্মাণকার্য। এটা হাততালি কুড়াবার ঘোষণা নয়। গভীর ধর্মবিশ্বাস থেকেই করা হয়েছে, যেটা নড়চড় হবার প্রশ্ন নেই।

মুসলিম লবোর্ডের  প্রতিক্রিয়া :

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যার বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় দেয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে দেশটির মুসলিম কমিউনিটি নেতারা। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পারসোনাল ল’ বোর্ডের (মুসলিম আইন বোর্ড) পক্ষ থেকে রায়ের পর বলা হয়েছে, এই রায়ে সাম্য ও ন্যায় বিচার হয়নি। তারা এই রায়ের রিভিও আবেদন করার কথাও ঘোষণা করেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, রায়ের পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে সংস্থাটির সেক্রেটারি জাফারিয়াব জিলানি বলেছেন, রায়ে সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। (তথাপি) রায়ে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। কারণ ১৪২ ধারা আপনাকে এটি করার অনুমতি দেয় না। জাফারিয়াব জিলানি এই মামলায় সুন্নী ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী ছিলেন। রায়ের বেশ কিছু অংশের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে জিলানি বলেছেন, ভেতরের যে মাঠে ছালাত পড়া হত সেটিকেও দিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্য পক্ষকে। এখানে সাম্য ও ন্যায় বিচারের কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, শরী‘আহ আইন অনুযায়ী আমরা কোনো মসজিদের দাবি ছেড়ে দিতে পারি না; কিন্তু আদালত আমাদের সেটিতে বাধ্য করছে। ১২ শতক থেকে ১৫২৮ সাল পর্যন্ত এই জমিতে কী হয়েছে তার কোনো প্রমাণ নেই। হিন্দুরা বলছে, বিক্রমাদিত্য যুগে এখানে মন্দির ছিল। যার কোনো প্রমাণ নেই। আদালত মসজিদ নির্মাণের জন্য আলাদা জমি দিতে নির্দেশ দিয়েছে। সে বিষয়ে তিনি বলেছেন, এখানে বিরোধ মসজিদ নিয়ে। জমিটি নিয়ে নয়। মসজিদের জন্য জমি বিনিময় করা যায় না। এখানে বিরোধটা মসজিদ নিয়েই, জমি নিয়ে নয়। তিনি আশঙ্কা করেছেন, এই রায় ভবিষ্যতে সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে।