ভার্চুয়ালে যেভাবে আপনি গুনাহগার হচ্ছেন
সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী*


বর্তমানে মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব ইত্যাদি আধুনিক জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। ডিজিটাল বিশ্বে দৈনন্দিন জীবনযাপনে এসবের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রাত্যহিক জীবন আজ এসব ছাড়া যেন একেবারেই অচল। এসব ডিভাইস দ্বারা আমরা প্রতিনিয়তই যুক্ত থাকি ভার্চুয়াল বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে।

আজ আমাদের জীবনযাপন এমন হয়ে গেছে যে, টাকা-পয়সা ছাড়া একদিন চলতে পারলেও ইলেকট্রনিকস ডিভাইস ছাড়া এক মুহূর্তও কল্পনা করতে পারি না। যার ফলে ভার্চুয়াল জগতের প্রতি আমাদের এই আসক্তি ক্রমান্বয়ে দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা আমাদেরকে অনেক সময় ধীরে ধীরে দুনিয়া এবং আখেরাতের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।

এসব ডিভাইস শুধু একটি শ্রেণি নয়, বরং সমাজের প্রতিটি শ্রেণি ও বয়সের মানুষকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে নিয়েছে। ভার্চুয়াল জগৎ আমাদের এমনই আসক্ত করেছে যে, তা আমাদের দ্বীন-দুনিয়ার জ্ঞানকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি না আমরা কী দেখছি, কী করছি, কী দেখাচ্ছি? ভার্চুয়াল বিশ্ব আজ আমাদের তাদের গোলামে পরিণত করেছে। বিশেষ করে মুসলিমদের।

মুসলিমরা একটি নির্দিষ্ট দ্বীনে জীবনযাপনে বাধ্য। আমরা সেই জীবনযাপনই করতে পারব, যা আমাদের দ্বীন অনুমতি দেয়। যার ফলে সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত ইসলাম একটি নির্দিষ্ট বলয়ে সুরক্ষিত ছিল। যেখানে সকল মুসলিম দ্বীন ইসলাম পালনে আন্তরিক এবং বাধ্য ছিল।

কিন্তু আধুনিক বিশ্বে বর্তমান অশ্লীলতার যুগে অনেক মুসলিম তাদের স্বকীয়তা ধরে রাখতে পারছে না। আজ আমরা নিজেরই অজান্তে প্রতিনিয়তই দ্বীন ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। বর্তমান ফেতনার যুগে ভার্চুয়াল জগৎ এমনই একটি মাধ্যম, যে মাধ্যমে মুসলিমরা তাদের ঈমান ও আমল আর ধরে রাখতে পারছে না।

বিশ্বে আজ এমন কেউ নেই যারা ইন্টারনেটসহ ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটক, লাইকিসহ অন্যান্য আরও সামাজিক ও অসামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে না। আর এসবের মাধ্যমেই আজ মুসলিমরা ধোঁকায় পড়ে যাচ্ছে। এই শুভংকরের ফাঁকি মুসলিমদের বুঝা বড় দায় হয়ে গেছে।

ইসলাম তার প্রাত্যহিক জীবনে যা যা করতে আদেশ দেয় এবং যা যা করতে নিষেধ করে, তার সবই বিপরীত করতে বাধ্য করছে এই ভার্চুয়াল মাধ্যমগুলো। ফলে মুসলিমরা দ্বীন ইসলামের বিপরীতে আমল করে গুনাহগার হচ্ছে। আর আমরা অধিকাংশই জানি না কীভাবে আমাদের গুনাহের ভাগ দিনদিন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আমরা যা যা করি তার সবই এই জগৎ সংরক্ষণ করে এবং অন্যদের নিকট তা প্রচার করে। ফলে কোনো ভালো কাজ করলে তার সুফল আমরা যেমন পাব। ঠিক তেমনি খারাপ কাজের ফলাফলও আমাদের আমলে যুক্ত হবে।

আজ ভার্চুয়াল জগতে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, লাইকিসহ অসংখ্য মাধ্যম রয়েছে। যেসব মাধ্যমে ভালোর চাইতে খারাপের কাজই হচ্ছে বেশি। দ্বীন ইসলামবিরোধী এসব কাজ যে মুসলিম তৈরি করে তার পাপের মাত্রা সবচাইতে বেশি। কেননা সে অন্যকেও পাপের কাজে সহযোগিতা ও উৎসাহিত করছে।

এখন এই পাপের কাজে যত মানুষ জড়িত হবে, তত জনের পাপের সমান ভাগীদার ঐ ব্যক্তি হবে, যে এই পাপ সৃষ্টি বা তৈরি করেছে। একইসাথে আমরা যখন নিজেরা এসব দেখি, তখন শুধু ব্যক্তি একক পাপের ভাগীদার হচ্ছি। কিন্তু যখন আমরা শেয়ার, লাইক, কমেন্ট ইত্যাদি করার মাধ্যমে এসব আরও দশজনকে দেখার এবং পাপ করার সুযোগ দিচ্ছি, তখন তাদের পাপও আমাদের আমলনামায় যুক্ত হচ্ছে।

আর ভার্চুয়াল জগৎ এমন একটি মাধ্যম, যেখানে কোনো কিছু একবার প্রকাশ করলে তা আজীবন থেকে যায়। তাই কেউ কোনো খারাপ কিছু একবার প্রকাশ করলে, তা আজীবন সবার কাছে প্রকাশিতই হতে থাকবে। আর ইসলামে খারাপ কিছু যতই প্রকাশিত হবে, ততই তার প্রাপ্য ঐ ব্যক্তির আমলে যুক্ত হবে। যা আমাদের অধিকাংশ মুসলিমই চিন্তা করে না।

ইসলামে গান-বাজনা, অশ্লীলতা এবং দুনিয়ামুখী খারাপ চিন্তাভাবনাকে পাপ হিসেবে চিহ্নিত করে। তাই যারাই এসব ছবি, ভিডিও কিংবা কন্টেন্ট তৈরি করে, দেখে এবং অন্যকে দেখার জন্য উৎসাহিত কিংবা বাধ্য করে, তারা উভয়ই পাপের ভাগীদার। সুতরাং ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে ঐসব মুসলিম পাপের ভাগী হচ্ছে, যারা এসব তৈরি করে, যারা শুধুই দেখে, আর যারা এসব নিজেও দেখে এবং শেয়ার করার মাধ্যমে অন্যকেও দেখার সুযোগ কিংবা বাধ্য করে।

আজ আমরা দ্বীন ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে এসব বিষয় ঘুর্ণাক্ষরেও চিন্তা করি না। অথচ এসব নীরব পাপে প্রায় প্রতিটি মুসলিম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। দ্বীনের সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে আমরা বুঝতেই পারছি না আমরা কীভাবে নিজে অংশ না নিয়েও পাপ কামাই করছি।

একইসাথে আমাদের প্রতিটি বয়সের অধিকাংশ মানুষ পাবলিক প্লেসে এমনভাবে মোবাইল ব্যবহার করে, যা অন্যের বিরক্তের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন যানবাহনে কিংবা ওপেন প্লেসে আমরা ইয়ারফোন ছাড়াই উচ্চ শব্দে নাচ-গানসহ বিভিন্ন ভিডিও দেখি। যা অনেকেই পছন্দ করে না। একইসাথে তা শালীনতা বিবর্জিত কাজও বটে।

এভাবে প্রকাশ্যে অশ্লীল ছবি বা ভিডিও দেখার কারণে, অনেকেই এর সাথে বাধ্যতামূলকভাবে সম্পৃক্ত হয়। যা ঐ ব্যক্তির জন্য পাপ। এখন প্রকাশ্যে এসব অশ্লীলতার কারণে অন্যের পাপের ভাগও তাকে বহন করতে হবে।

তাই আজ থেকেই আমাদের সাবধান হওয়া উচিত এই নীরব পাপ থেকে। যেসব সামাজিক মাধ্যমের কারণে দ্বীন ইসলাম সঠিকভাবে পালন করা যায় না। কিংবা যেসব মাধ্যমে আমরা পাপ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না, সেসব মাধ্যম কিংবা এ্যাপস ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।

একই সাথে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত, যাতে সেখান থেকে আমরা পাপের ভাগীদার না হই।

সেই সাথে অনৈসলামিক ছবি, ভিডিও কিংবা কন্টেন্ট থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে। এমন কোনো কিছু কখনোই প্রকাশ কিংবা প্রচার করা উচিত হবে না, যে কারণে তা আমাদের পাপের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।

বিশেষ করে ফেইসবুকে আমরা হাসি-তামাশার ছলে এমন এমন কিছু শেয়ার কিংবা প্রকাশ করি, যা দ্বীনের মানদণ্ডে পাপ বলে সাব্যস্ত হয়। তাই অনৈসলামিক কোনো কিছু শেয়ার করা থেকে বিরত থাকি। একই সাথে সামাজিক মাধ্যমে এমন কোনো কিছু লাইক, কমেন্ট করা উচিত নয়, যা করলে অন্যরাও তা দেখতে পেয়ে পাপের ভাগীদার হয়।

একইভাবে প্রকাশ্যে কোনো ছবি বা ভিডিও দেখা থেকে বিরত থাকি, যা অন্যের জন্য বিরক্তিকর ও পাপের কারণ। সেইসাথে মুমিন নারীদের উচিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো নারীর ছবি কিংবা ভিডিও আপলোড না করা। কেননা যত জন পরপুরুষ এই ছবি ভিডিও দেখে পাপ অর্জন করবে, ঠিক একই পরিমাণ পাপ ঐ নারীর জন্যও লেখা হবে।

সুতরাং আসুন! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা ইন্টারনেট কিংবা ভার্যচুয়াল জগৎ ব্যবহারে সাবধান এবং সংযত হই। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক্ব দান করুন।

   * পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।