মনীষীদের জীবনী

আল্লামা হাফেয ছালাহুদ্দীন ইউসুফ (রহি.)

-আল-ইতিছাম ডেস্ক

আলেমের চলে যাওয়ার দ্বারা আল্লাহ ইলমকে উঠিয়ে নিবেন।[1]  মৃত্যু সকলকেই গ্রাস করবে। কারও কারও মৃত্যু হৃদয়কে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত করে। আধুনিক বিশ্বের একজন প্রথিতযশা সালাফী আলেম, লেখক, গবেষক শায়খ ছালাহুদ্দীন ইউসুফ গত ১১ জুলাই ২০২০, শনিবার সন্ধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। তাঁর জানাযা লাহোরের লরেন্স রোডে অবস্থিত আহলেহাদীছ সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। আল্লামা ছালাহুদ্দীন ইউসুফের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমরা হারালাম আমাদের একজন প্রবীণ অভিভাবককে। যিনি সুখে-দুঃখে সর্বদা হক্বপন্থী আলেমদের সাথে ছিলেন। সামনে এগিয়ে যেতে সর্বদা উৎসাহ দিয়েছেন। পাকিস্তানে কুরআন-সুন্নাহর প্রসারে তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। আলোচ্য লেখাটিতে শায়খের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলো:

জন্ম : তিনি ১৯৪৫ সালে ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে জন্মগ্রহণ করেন। দেশ বিভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে আসেন। এখানে এসে তিনি চরম অর্থকষ্টে পতিত হন। প্রথমে তিনি ভারতের হায়দারাবাদে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে সিন্ধু ও করাচীতে বসবাস করেন।

শিক্ষা জীবন : শিক্ষা জীবনের শুরুতে তিনি কুরআন হিফয করেন দারুল হাদীছ রাহমানিয়া থেকে। দিল্লীর বিখ্যাত দারুল হাদীছ রাহমানিয়ার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন শায়খ আতাউর রহমান (রহি.)। যখন তার পরিবার দিল্লী থেকে হিজরত করে পাকিস্তান চলে আসে তখন তার সন্তান আব্দুল ওয়াহাব দিল্লীতে ফেলে আসা তার পিতার মাদরাসার স্মরণে পাকিস্তানেও একই নামে মাদরাসা করেন। সেই মাদরাসাতেই হাফেয ছালাহুদ্দীন ইউসুফের প্রাথমিক জ্ঞানের হাতেখড়ি শুরু হয়। ১৪ বছর বয়সে তিনি মাদরাসা তাক্ববিয়াতুল ইসলাম লাহোরে চলে আসেন। যেখানে প্রধান শিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত আহলেহাদীছ আলেম দাঊদ গজনভী (রহি.)। এই মাদরাসার পাশেই অবস্থিত ছিল শায়খ আতাউল্লাহ হানীফ ভুজিয়ানী (রহি.)-এর মাকতাবা সালাফিয়্যাহ ও আল-ইতিছাম-এর অফিস। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি আতাউল্লাহ হানীফ ভুজিয়ানী (রহি.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ফলত দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকা ও বিভিন্ন স্কুল অফ থটের লেখকদের বই-পুস্তক অধ্যয়ন করা তার এক প্রকার নেশায় পরিণত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তিনিও লেখালেখির জগতে পদার্পণ করেন। তার প্রতিভা দেখে শায়খ আতাউল্লাহ হানীফ ভুজিয়ানীও তাকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এভাবে এক পর্যায়ে তিনি নিজেকে আতাউল্লাহ হানীফ ভুজিয়ানী (রহি.)-এর জ্ঞানের উত্তসূরীতে পরিণত করে ফেলেন।

কর্মজীবন : আতাউল্লাহ হানীফ ভুজিয়ানী (রহি.)-এর সান্নিধ্যে আল-ইতিছামের গবেষণা বিভাগে কাজ করার মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু হয়। আতাউল্লাহ হানীফ ভুজিয়ানী (রহি.)-এর ইন্তিকালের পর তিনি আল-ইতিছামের সম্পাদক হন। সুদীর্ঘ ২৪ বছর তিনি আল-ইতিছামের সম্পাদনা করেছেন। এই দীর্ঘ ২৪ বছরে তার হাত দিয়ে আল-ইতিছামে অগণিত প্রবন্ধ ও লেখনী প্রকাশ পায়। যার অনেকগুলো পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আল-ইতিছামের সম্পাদনা ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি দারুস সালাম প্রকাশনীর প্রধান গবেষক হিসাবে কাজ শুরু করেন। এখানেই সর্বপ্রথম তিনি তার বিখ্যাত লেখনী আহসানুল বায়ানের কাজ শুরু করেছিলেন। এছাড়াও তিনি ‘ফেডারেল শরী‘আত কোর্ট অফ পাকিস্তান’-এর একজন লিগাল কনসাল্টেন্টও ছিলেন। তিনি পায়গাম টিভি ও পিস টিভির বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতেন। অত্যন্ত বিনম্র এই মহান ব্যক্তির মুখে সর্বদা এক টুকরো মিষ্টি হাসি লেগেই থাকতো। তার সুন্দর ব্যবহার ও কথা-বার্তায় অনেকেই আকৃষ্ট হতেন। এত দায়িত্ব পালনের পরও তিনি লাহোরের একটি বিখ্যাত আহলেহাদীছ মসজিদের নিয়মিত খত্বীব ছিলেন।

লেখনীসমূহ : তিনি অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার রচিত তাফসীর আহসানুল বায়ান (উর্দূ) খুব অল্প সময়েই সারা পৃথিবীতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। মুহাম্মাদ জুনাগড়ী (রহি.)-এর কুরআনের তরজমা ও তার উন্নত উর্দূ সাহিত্য দিয়ে লেখা এই তাফসীরটি সঊদী সরকারের অর্থায়নে অনূদিত হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আরবী, ইংরেজি, বাংলাসহ অসংখ্য ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। আল-হামদুলিল্লাহ। ড. তাক্বীউদ্দীন হেলালী ইংরেজি ভাষায় ৫টি খণ্ডে এই তাফসীরের অনুবাদ করেন। অত্যন্ত সহজ-সরল ও সুখপাঠ্য এই সংক্ষিপ্ত তাফসীরটি যে কোনো পাঠককে আকর্ষণ করতে সক্ষম। তাফসীর আহসানুল বায়ান ছাড়াও তার অন্যান্য লিখিত বিখ্যাত কিছু গ্রন্থের নাম নিম্নে দেয়া হলো-

(১) ‘এক মজলিস মেঁ তিন তালাকা আউর উসকা শারঈ হাল’। এখানে তিনি হানাফী আলেমদের লেখনী দ্বারা প্রমাণ করেন যে, এক মজলিসে তিন তালাক দিলে তিন তালাক পতিত হয় না।

(২) ‘যাকাত, ওশর কে আহকাম ওয়া মাসায়েল ওয়া ফাযায়েল’। যাকাত ওশরের হুকুম-আহকাম নিয়ে লিখিত একটি অনবদ্য গ্রন্থ।

(৩) রিয়াযুছ ছালেহীনের উর্দূ অনুবাদ।

(৪) ‘মি‘রাজের ঘটনা’।

(৫) ‘রুসূমাত মুহাররাম আল-হারাম ওয়া সানিহা কারবালা’। মুহাররম ও কারবালা নিয়ে লিখিত এই গ্রন্থে তিনি শী‘আ মতবাদের খণ্ডন করেছেন।

(৬) ‘কিয়া আওরাতো কা তারীকায়ে নামায মারদো সে মুখতালিফ হ্যায়’। নারী-পুরুষের ছালাতের পার্থক্য নিয়ে লিখিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। যেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নারী-পুরুষের ছালাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই।

(৭) ‘হানাফী আহলেহাদীছ ঐক্য: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ নামে তার একটি গ্রন্থ আব্দুল্লাহ মাহমূদ কর্তৃক বাংলায় অনূদিত হয়েছে।

(৬) ‘খেলাফাত ওয়া মুলুকিয়াত কি তারিখী ওয়া শারঈ হায়ছিয়্যাত’। শায়খ মাওদূদী (রহি.)-এর লিখিত খিলাফত ও মুলুকিয়াত বইয়ের জবাবে তিনি এই বই লিখেছিলেন।

এ ধরনের প্রায় ৫০ এর অধিক ইলমী ও গবেষণাধর্মী বই তার প্রকাশ হয়েছে। মহান আাল্লাহ তাকে রহম করুন। তার কবরকে আলোকিত করুন। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ছবর করার তওফীক্ব দান করুন এবং তার সকল দ্বীনী খিদমতকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত কবুল করে নিন- আমীন!

(পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী সালাফী পত্রিকা আল-ইতিছামের নামকরণেই আমাদের পত্রিকার নামকরণ করা হয়েছে ‘আল-ইতিছাম’। সেই ঐতিহাসিক পত্রিকার ২৪ বছর খিদমত করেছেন যে মহান মানুষটি তার মৃত্যুতে আমরা যার পর নাই শোকাতুর। আমরা আমাদের পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে আল-ইতিছামের ২৪ বছরের খাদেম এই মহান মানুষটির জন্য দু‘আ করার অনুরোধ জানাই। (প্র.স.)

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১০০।