মনীষী পরিচিতি-১ : আল্লামা নাযীর আহমাদ রহমানী আযমগড়ী (রাহিমাহুল্লাহ)


আল-ইতিছাম ডেস্ক


ভূমিকা : ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখসহ নানা ধর্মের নামে প্রচলিত যাবতীয় শিরক-বিদআত ও কুসংস্কারের আঁতুড়ঘর হলো এই ভারত উপমহাদেশ। পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল এগুলো কাছাকাছি দেশ হওয়ায় এতে বিদ্যমান সমস্যাগুলোও প্রায় একই রকম। দ্বীন প্রচারে এখানকার ছহীহ দ্বীন প্রচারকারীগণ যে কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি হন, তা বাস্তবে না দেখলে কল্পনা করা কষ্টসাধ্য। অর্থনৈতিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিভিন্ন বিদআতী দল-সংগঠনের আস্ফালন, অন্যান্য ধর্মের কথিত অনুসারীদের অত্যাচার-নির্যাতন সয়ে সঠিক দ্বীন প্রচার করা যে কী পরিমাণ কঠিন কাজ তা সহজে অনুমেয়। পাক-ভারতে এমন অনেক সালাফী আলেম গত হয়েছেন এবং এখনো জীবিত রয়েছেন, যাদের জীবনের পুরো সময়টাই সংগ্রামমুখর। আজকের আলোচনায় আমরা তাদেরই একজন— শায়েখ নাযীর আহমাদ রহমানী (রাহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ।

নাম-বংশজন্ম: নাযীর আহমাদ ইবনু আব্দুশ শাকূর ইবনে জা‘ফর আলী (রাহিমাহুল্লাহ)। ১০ যুলহিজ্জাহ ১৩২৩ হিজরী তারিখে (ফেব্রুয়ারি ১৯০৬ খৃ.) ভারতের উত্তর প্রদেশের আযমগড় জেলার অন্তর্গত ‘আমলূ’ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। এটা প্রসিদ্ধ শহর মোবারকপুর থেকে এক মাইল পূর্ব দিকে এবং আযমগড় শহর থেকে ৬-৭ মাইলের দূরত্বে অবস্থিত।

শিক্ষা ও প্রতিপালন : প্রাথমিক শিক্ষা মোবারকপুরে। এরপর মাওলানা ছাহেব সরাইমীরে অবস্থিত হামীদুদ্দীন ফারাহী প্রতিষ্ঠিত ‘মাদরাসাতুল ইছলাহ’-তে কিছুদিন পড়েছেন। অতঃপর ‘মউ’ (জেলা- আযমগড়)-এর মাদরাসা ‘ফয়যে আম’-এ চলে যান। একই মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মাদ আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর শিক্ষা-দীক্ষা পেয়ে উপকৃত হওয়ার অত্যন্ত ভালো সুযোগ লাভ করেন।

দারুল হাদীছ রহমানিয়া (দিল্লী) : শাওয়াল ১৩৩৯ হিজরী (১৯২১ খৃ.) যখন দিল্লীতে ‘মাদরাসা দারুল হাদীছ রহমানিয়া’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হয়েছিল, তখন তিনি ১৫ বছর বয়সে (যুলহিজ্জাহ ১৩৩৯ হি./১৯২১ খৃ.) এখানে এসে ভর্তি হন। এমনকি শা‘বান ১৩৪৬ হিজরীতে এখান থেকেই আরবী ও ইসলামী শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তিনি সকল পরীক্ষাতেই সর্বদা চমৎকার ফলাফল অর্জন করতেন।

শিক্ষকমণ্ডলী : তিনি অনেক বড় ওলামায়ে কেরাম হতে শিক্ষা অর্জন করেছেন। ‘তুহফাতুল আহওয়াযী’-এর লেখক মাওলানা আব্দুর রহমান মোবারকপূরী (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম বুখারীর জীবনী লেখক মাওলানা আব্দুস সালাম মোবারকপূরী (রাহিমাহুল্লাহ), মাওলানা আহমাদুল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলবী (রাহিমাহুল্লাহ) (শায়খুল হাদীছ, দারুল হাদীছ রহমানিয়াহ), মাওলানা আবূ তাহের বিহারী (রাহিমাহুল্লাহ), মাওলানা গোলাম ইয়াহইয়া পাঞ্জাবী কানপূরী (রাহিমাহুল্লাহ), মাওলানা হাফেয মুহাম্মাদ গোন্দালবী এবং মাওলানা আব্দুর রহমান ছাহেবদের ন্যায় কিংবদন্তিদের থেকে জ্ঞান অর্জন করেন।

শিক্ষক পদে আসীন ও শিক্ষাসফর : সনদ অর্জনের পরে (শা‘বান ১৩৪৬ হি.) দারুল হাদীছ রহমানিয়াতেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। তখন তার বয়স মাত্র ২৩ বছর। যে বিষয়গুলোকে আমাদের দারসে নিযামীতে মাকূলাত বলা হয়, সেগুলো সম্পর্কে নাযীর আহমাদ রহমানীর প্রবল আগ্রহ ছিল। তিনি সেই বিষয়গুলোতে আরও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এবং অন্তরকে পরিতৃপ্ত করার জন্য একই বছরে মাদরাসার মুহতামিম শায়েখ আতাউর রহমান, মাদরাসা রহমানিয়ার মুহতামিম-এর অনুমতিক্রমে ‘বাদাউ’-এর প্রসিদ্ধ মাদরাসায়ে মাকূলাত ‘শামসুল উলূম’-এ গিয়ে ভর্তি হন। এক বছর অবস্থান করে সেখানকার মাকূল এবং রিয়াযীতে দক্ষ আলেম মাওলানা আব্দুস সালাম কান্ধাহারী আফগানীর নিকটে অনেকগুলো দারসী ও গায়ের দারসী গ্রন্থ সমাপ্ত করেন। এরপর দিল্লী ফিরে আসেন এবং স্বতন্ত্রভাবে ‘দারুল হাদীছ রহমানিয়া’-তে আত্মনিয়োগ করেন। ইতোমধ্যে অক্টোবর ১৯৪৭ সনের খুন-খারাবির ঘটনাসমূহ ঘটতে লাগল এবং হিন্দুস্তান খণ্ডিত হয়ে ছোট উপমহাদেশটি বিভক্ত হয়ে হিন্দ ও পাকিস্তান-এর আকার ধারণ করল।

১৯৪৭ (১৩৬৬ হি.)-এর পর : এমন প্রতিকূল সময়ে তিনি এক বছর ঘরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৪৮ সনে দারুল উলূম আহমাদিয়া সালাফিয়া দারভাঙ্গাতে (বিহার প্রদেশ, ভারত) পুনরায় শিক্ষাদানের শুভ কাজের সুযোগ পান। সেখানে কম-বেশি এক বছর অতিক্রম হয়ে যায়। তারপর জানুয়ারি ১৯৫০ সনে বানারসের জামে‘আহ রহমানিয়াতে আগমন করেন এবং আমৃত্যু সেখানে সংস্কারমূলক দাওয়াতী এবং লেখনী খেদমতসমূহ আঞ্জাম দিতে থাকেন।

মৃত্যু : তিনি ২৮ মুহাররম ১৩৮৫ হিজরী মোতাবেক ১৯৬৫ সনে ৩০শে মে রবিবারে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন এবং স্বীয় রহমতের বারিধারায় তাকে সিক্ত করুন- আমীন।

সন্তানসন্ততি : তিন পুত্র ও দুই কন্যা যারা স্ব স্ব কর্মে নিয়োজিত। তাছাড়াও এক ছেলে শায়খ হেলাল আহমাদের ইলমী (খেদমতের) বিষয়টি স্মরণযোগ্য। যিনি ‘জামে‘আহ ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারা’ হতে ফারেগ হওয়ার পরে উল্লিখিত জামেআর পক্ষ হতে নাইজেরিয়াতে (আফ্রিকা) তাবলীগী এবং তাদরীসী খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন।

ছাত্রগণ : প্রায় ৪০ বছরব্যাপী পাঠদানের ফলে হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে থাকা ছাত্রদের বিস্তারিত তালিকা প্রণয়ন করা খুবই মুশকিল কাজ। তা সত্ত্বেও কতিপয় বড় ছাত্রের নাম নিম্নে উল্লেখ করছি—

(১) শায়খ আব্দুল গাফফার হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) (শিক্ষক, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)। (২) শায়খ হাফেয ক্বারী আব্দুল খালেক রহমানী (রাহিমাহুল্লাহ) (করাচী)। (৩) শায়খ আব্দুর রঊফ ঝান্ডানগরী (রাহিমাহুল্লাহ) (হিন্দ)। (৪) শায়খ আব্দুর রহীম হুসাইনবী (রাহিমাহুল্লাহ) (লাহোরী)। (৫) শায়খ আব্দুর রহীম ভূজিয়ানী অমৃতসরী (রাহিমাহুল্লাহ)।[1] (৬) শায়খ ইকবাল বুদ্ধিয়াল (রাহিমাহুল্লাহ) (হিন্দ)। (৭) শায়খ আযাদ রহমানী (রাহিমাহুল্লাহ)। (৮) শায়খ মাজায আযমী রহমানী (রাহিমাহুল্লাহ)। (৯) শায়খ আব্দুল জলীল রহমানী (হাফিযাহুল্লাহ)। (১০) শায়খ আব্দুল হামিদ রহমানী (হাফিযাহুল্লাহ) (তরজুমানে দিল্লীর বর্তমান পরিচালক) প্রমুখ।

জামা‘আতী ও সামাজিক খেদমতসমূহ : একদিকে ইন্ডিয়ার ‘অল-ইন্ডিয়া কনফারেস হিন্দ’-এর নতুন নতুন কার্যক্রম অব্যাহতধারায় চলছিল; অন্যদিকে হিন্দুস্তানের ‘দ্বীনী তা‘লীম’-এর মধ্যেও তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।

পাঠদানের পাশাপাশি রচনা : সম্ভবত ১৯৩৩ সনে ‘দারুল হাদীছ রহমানিয়া দিল্লী’-এর পক্ষ হতে ‘মুহাদ্দিছ’ নামক একটি মাসিক পত্রিকা চালু ছিল। যার সম্পাদক ছিলেন মাওলানা আব্দুল হালীম নাযেম ছিদ্দীক্বী দারভাঙ্গী (রাহিমাহুল্লাহ)। সহকারী সম্পাদক ছিলেন মাওলানা নাযীর আহমাদ রহমানী (রাহিমাহুল্লাহ)। অতঃপর যখন আগস্ট ১৯৩৫ সনে নাযেম ছিদ্দীক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) ইন্তিকাল করেন, তখন ‘মুহাদ্দিছ’-এর সম্পূর্ণ যিম্মাদারী তার উপর বর্তায়। সে সময় তার অসংখ্য লেখনী প্রকাশিত হয়। তন্মধ্যে—

(১) রদ্দে আক্বায়েদে বিদ‘ইয়াহ (প্রথম খণ্ড) : এটি ব্রেলভীদের সৃষ্ট মাসায়েল-এর উপর তাৎপর্যপূর্ণ ও ইলমী প্রবন্ধসমূহের সমাহার। যা পরবতীর্তে আগ্রহী পাঠকদের ব্যাপক চাহিদার ভিত্তিতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে জনসমাদৃত হয়েছে। এর দ্বিতীয় খণ্ডটি সম্পর্কে জানা যায়নি যে, তা গ্রন্থাকারে বিন্যস্ত হয়েছে, না-কি হয়নি।

(২) অন্যান্য প্রবন্ধ : এ ব্যতীত দেশ ভাগের পর পত্রিকা ও পুস্তিকার মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ের উপর মূল্যবান প্রবন্ধসমূহ লিখা অব্যাহত রেখেছিলেন। যেমন লাহোরের ‘আল-ই‘তিছাম’ পত্রিকাতেও তার কতিপয় লেখনী প্রকাশিত হয়েছিল।

(৩) আহলেহাদীছ আওর সিয়াসাত (আহলেহাদীছ এবং রাজনীতি) : এ বিষয়ে ‘তারজুমান’ দিল্লীর অনেকগুলো কিস্তিতে তার খুবই জ্ঞানগর্ভমূলক ও বিস্তারিত একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। যেটা বর্তমানে সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার মাঝারি আকারের গ্রন্থে মলাটবদ্ধ হয়ে বানারস হতে প্রকাশিত হয়েছে। আলেমদের মাঝে গ্রন্থটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

(৪) চামানে ইসলাম : দেশ ভাগের পর ‘অল ইন্ডিয়া আহলেহাদীছ কনফারেন্স’-এর অনুমতিক্রমে তিনি বাচ্চাদের জন্য ছোট ছোট চারটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেটা ‘চামানে ইসলাম’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও তার নাম গ্রন্থটির উপর নেই, এটা হিন্দুস্তানে আহলেহাদীছ মাদরাসাসমূহের সিলেবাসভুক্ত। পাকিস্তানেও আল্লামা আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানীর[2] প্রচেষ্টায় ‘আহলেহাদীছ একাডেমি লাহোর’ সেগুলোকে ‘ইসলাম কী কিতাব’ শিরোনামে প্রকাশ করেছেন।

(৬) আনওয়ারে মাছাবীহ : এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি গ্রন্থ। অত্যন্ত বিস্তারিত, প্রমাণপুষ্ট, লা-জবাব এই বইতে তারাবীহর মাসআলা আলোচিত হয়েছে। যেভাবে সূরায়ে ফাতেহার মাসআলার উপর ‘তাহক্বীকুল কালাম’ একটি সারগর্ভ গ্রন্থ। এটিই সেই গ্রন্থ, যেটি আপনাদের সম্মুখে রয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে এ গ্রন্থটির বঙ্গানুবাদ নেটে বিদ্যমান। এটি দেওবন্দীদের বড় মুহাদ্দিছ হাবীবুর রহমান আযমী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ‘রাকআতে তারাবীহ’ গ্রন্থের জবাব। যার কোনো পাল্টা জবাব আজও সম্মুখে আসেনি। বাংলা ভাষায় রচিত তারাবীহ বিষয়ক যাবতীয় বই মূলত হাবীবুর রহমানের বইটির উপর ভিত্তি করেই রচিত।

বাস্তবতা এই যে, মাওলানা নাযীর আহমাদ রহমানী (রাহিমাহুল্লাহ) বহু গুণে গুণান্বিত ছিলেন। তিনি পাকিস্তানের সাপ্তাহিক ‘আল-ই‘তিছাম’-এর সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রাখতেন। শায়খুল হাদীছ মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সাথে তার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল।

আমরা দু‘আ করি, আল্লাহ তাআলা এই ইসলামের প্রচারক, সুন্নাতের মহব্বতকারীকে স্বীয় খাছ রহমত দ্বারা ঢেকে দিন এবং ছালেহীনের সাথে জান্নাতের উচ্চস্থান দান করুন— আমীন।[3]


[1]. তিনি অমৃতসরে মাদরাসা তাকবিয়াতুল ইসলাম-এ কয়েক বছর সফলতার সাথে পাঠদান করেছেন। ১৯৪৭ সালের দাঙ্গায় ভূজিয়ান জেলার অমৃতসরে শিখদের হাতে শহীদ হন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩০-৩২ এর কোঠায়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন।

[2]. মাওলানা মুহাম্মাদ আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী (রাহিমাহুল্লাহ)-ও অত্যন্ত বড় মাপের আলেম। তিনি বিশ্ব বিখ্যাত রিজালবিদ শায়খ যুবায়ের আলী যাঈ(রাহিমাহুল্লাহ)-এর উস্তায। মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগ পাওয়ার পরও তিনি নিজ দেশ পাকিস্তানেই আমৃত্যু দরস-তাদরীস ও ইসলাম প্রচারে রত ছিলেন।

[3]. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : ‘আনওয়ারে মাছাবীহ’ এবং ‘আহলেহাদীছ আওর সিয়াসাত’ (৭-৩৫) গ্রন্থদ্বয়ের ভূমিকা।