মনীষী পরিচিতি-৪ : সাইয়্যেদ মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভী p

আল-ইতিছাম ডেস্ক


ভূমিকা : ইসলাম ও মুসলিমদের খেদমতে যারা নিরলসভাবে পাঠদান করে গেছেন, তাদের মধ্যে ভারতের আলেম, বিশ্ববিখ্যাত উস্তায আল্লামা নাযীর হুসাইন দেহলবী p বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি হাজারো বড় মাপের আলেমের উস্তায ছিলেন। পাক-ভারতের আহলেহাদীছ আলেমদের তালিকায় তার নাম শীর্ষে উল্লেখ করা হয়। আজকের নিবন্ধে তার জীবনী হতে সামান্য কয়েকটি তথ্য উপস্থাপিত হলো—

নাম : সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নাযীর হুসাইন দেহলবী p। তিনি ১২২০ হিজরী মোতাবেক ১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতের বিহার প্রদেশের সুরুজগড়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ছিল সাইয়্যেদ জাওয়াদ আলী।

শিক্ষাজীবন : তিনি ১৬ বছর বয়সে শিক্ষাজীবনে পদার্পণ করেন। পিতার কাছেই প্রাথমিক পাঠের হাতেখড়ি। পরবর্তীতে তিনি পাটনা শহরে ৬ মাস জ্ঞানার্জনে লিপ্ত থাকেন। এরপর তিনি পাটনা থেকে দিল্লীতে গমন করেন। তিনি অসংখ্য দক্ষ আলেমের কাছে ইলম হাছিল করেছিলেন।

উস্তাযগণ : তার উস্তাযগণের মধ্যে কয়েকজনের নাম উল্লেখযোগ্য— ১. শাহ আব্দুল আযীয দেহলবী p-এর নাতী শাহ মুহাম্মাদ ইসহাক্ব দেহলবী p। ২. মাওলানা আব্দুল খালেক দেহলবী p। ৩. মাওলানা জালালুদ্দীন হারবী p। ৪. মাওলানা কারামাত আলী ইসরাঈলী p প্রমুখ। তিনি শাহ মুহাম্মাদ ইসহাক্ব দেহলবী p-এর কাছে কুতুবে সিত্তাহ, জামে ছাগীর, হেদায়া, কানযুল উম্মাল-সহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ কলেবরের গ্রন্থাবলি অধ্যয়ন করেন।

পাঠদান : উল্লিখিত গ্রন্থাবলি যোগ্যতার সাথে আয়ত্ত করার কারণে শাহ মুহাম্মাদ ইসহাক্ব দেহলবী p তাকে স্বীয় হাদীছের দারসের মসনদে বসার ইজাযাত দান করেন। তিনি মক্কায় হিজরত করে চলে যাওয়ার পর আল্লামা নাযীর হুসাইন দেহলবী p ১২৫৮ হিজরীতে ইলমের সবগুলো বিষয়ে পাঠদান শুরু করেন ১২৭৯ হিজরী পর্যন্ত। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি কেবল হাদীছ, তাফসীর, ফিক্বহের গ্রন্থাবলি পাঠদানে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন। তিনি দিল্লীতে ৬২ বছর যাবত একটানা পাঠদান চালিয়ে যান।

ছাত্রগণ : দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে তার ছাত্র লক্ষাধিক পেরিয়ে যায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছাত্র হলেন— ১. মাওলানা হাফেয আব্দুল মান্নান উযীরাবাদী p, ২. মাওলানা হাফেয আব্দুল্লাহ গাযীপূরী p, ৩. মাওলানা মুহাম্মাদ বাশীর সাহসোয়ানী p, ৪. মাওলানা আব্দুর রহমান মুবারকপূরী p, ৫. মাওলানা শাসমুল হক আযীমাবাদী p, ৬. মাওলানা ওয়াহীদুয যামান হায়দারাবাদী p, ৭. মাওলানা ছানাউল্লাহ অমৃতসরী p।

গ্রন্থ প্রণয়ন : পাঠদানে তিনি সারা জীবন এত বেশি সময় ব্যয় করেছেন যে, লেখনীর জগতে তিনি সেভাবে সময় দিতে পারেননি। সেকারণে তার গ্রন্থ সংখ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে নেহায়াতই কম। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘মি‘ইয়ারুল হক্ব’ একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ। এছাড়াও ফতওয়া নাযীরিয়া হলো তার কালজয়ী ফাতাওয়া গ্রন্থ। তিনি জীবদ্দশায় অসংখ্য ফতওয়া প্রদান করেছেন এবং লিখেও গিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো গ্রন্থাকারে পাওয়া যায়নি। তবে তার মৃত্যুর পর তার দু’জন ছাত্র আব্দুর রহমান মুবারকপূরী এবং শামসুল হক্ব আযীমাবাদী q কিছু ফতওয়া সংগ্রহ করে সেগুলো দু’টি খণ্ডে সংকলন ও মুদ্রণ করেন।

মনীষীদের প্রশংসাবাণী : ১. আবূ দাঊদের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ব্যাখ্যাগ্রন্থ আওনুল মা‘বূদের লেখক আল্লামা শামসুল হক্ব p বলেছেন,شَيْخُنَا الْعَلَّامَةُ الْأَجَلُّ الْأَكْمَلُ السَّيِّدُ مُحَمَّدُ نَذِيرُ حُسَيْنٌ الْمُحَدِّثُ الدّهْلَوِيُّ ‘আমাদের শায়েখ, আল্লামা, আজাল্ল, আকমাল, সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ নাযীর হুসাইন মুহাদ্দিছ দেহলবী’।[1] ২. তিরমিযীর বিশুদ্ধতম ব্যাখ্যাগ্রন্থ তুহফাতুল আহওয়াযী প্রণেতা আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপূরী p বলেছেন,شَيْخنَا الْعَلَّامَة السَّيِّد مُحَمَّد نَذِير حُسَيْن، الْمُحَدِّث الدّهْلَوِيّ ‘আমাদের শায়েখ, আল্লামা, মুহাদ্দিছ নাযীর হুসাইন, মুহাদ্দিছ দেহলবী’।[2] ৩. মিশকাতের বিশুদ্ধতম ব্যাখ্যা গ্রন্থ মির‘আতুল মাফাতীহ-এর মধ্যে আল্লামা আতাউল্লাহ হানীফ ভূজিয়ানী p বলেছেন,المحدث الكبير شيخ الكل السيد نذير حسين الدهلوي ‘মুহাদ্দিছে কাবীর, শায়খুল কুল্ল, সাইয়্যেদ নাযীর হুসাইন দেহলবী’।[3] ৪. আল্লামা আলবানী p বলেছেন, شيخنا العلامة السيد محمد نذير حسين الدهلوي ‘আমাদের শায়েখ, আল্লামা, সাইয়্যেদ, মুহাদ্দিছ নাযীর হুসাইন দেহলবী’।[4]

মৃত্যু : হাজারো আলেমের উস্তায আল্লামা নাযীর হুসাইন দেহলবী p ১৩২০ হিজরী মোতাবেক ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে এ দুনিয়া হতে বিদায় গ্রহণ করেন। তিনি দিল্লীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাকে শীদীপুরা কবরস্থানে দাফন করা হয়। আল্লাহ তার কবরকে আলোকিত করুন। তাকে জান্নাতবাসী করুন। তার ইলমকে কিয়ামত পর্যন্ত জারী রাখুন।

উপসংহার : তুহফাতুল আহওয়াযীর লেখক আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপূরী, আউনুল মা‘বূদের লেখক আল্লামা শামসুল হক্ব আযীমাবাদী o-এর মতো ছাত্রদের উস্তায ছিলেন আল্লামা নাযীর হুসাইন দেহলবী p। তার মৃত্যুর পর থেকে অদ্যাবধি এমন কোনো উস্তায জগৎ আর দেখেনি। আমাদের উচিত ইলম, দারস-তাদরীসে অগ্রবতী হওয়া। যেন ইলম শেখা ও শেখানোতে আমরা তার মতো সামনে অগ্রসর হতে পারি। আল্লাহ তওফীক্ব দান করুন- আমীন!

তথ্যসূত্র :

১. আল-হায়াত বা‘দাল মামাত।

২. তাযকিরা ওলামায়ে হিন্দ, পৃ. ১৯৩।

৩. নুযহাতুল খাওয়াতির, ৮/৪৯৮।

৪. তুহফাতুল আহওয়াযী, ‘ভূমিকা’, পৃ. ৫৬।

৫. তারাজুমে ওলামায়ে হাদীছে হিন্দ, পৃ. ১৩৮।

৬. আব্দুর রশীদ ইরাকী, চালীস ওলামায়ে হাদীছ, পৃ. ৩০-৪১।

৭. আহলে হাদীছ আওর সিয়াসাত ইত্যাদি গ্রন্থাবলি দ্রষ্টব্য।


[1]. আওনুল মা‘বূদ, ১/৭৪।

2. তুহফাতুল আহওয়াযী, ১/৩, ‘ভূমিকা’ দ্রষ্টব্য।

3. মিরআতুল মাফাতীহ, ১/৩৬৬।

4. আত-তাওয়াসসুল, ১/১২৬।