মসজিদে জামা‘আতে ছালাত আদায় : একটি বিশ্লেষণ

– আব্দুল্লাহিল কাফী আল-মাদানী*

পিএইচডি, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

 

মহান আল্লাহ বান্দার উপর যে সমস্ত ইবাদত ফরয করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো ছালাত। ছালাত এমন একটি ইবাদত, যা একজন মুসলিম ব্যক্তিকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচবার আদায় করতে হয়। এমনকি অসুস্থ অবস্থায় বসে বা শুয়ে হলেও আদায় করতে হয়, তবুও মাফ নেই। সাথে সাথে ইসলামে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের খুবই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ ‘তোমরা রুকূ‘কারীদের সাথে রুকূ‘ কর’ (বাক্বারাহ, ৪৩)। অর্থাৎ ছালাত আদায়কারীগণের সাথে ছালাত আদায় কর।

আমরা আলোচ্য প্রবন্ধে নিম্নোক্ত তিনটি পয়েন্টে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।

১. জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের ফযীলত।

২. জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের অপরিহার্যতা।

৩. মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব।

১. জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের ফযীলত :

(১) রাসূল (ছাঃ) বলেন,صَلاَةُ الجَمَاعَةِ تَفْضُلُ صَلاَةَ الفَذِّ بِسَبْعٍ وَعِشْرِينَ دَرَجَةً ‘জামা‘আতের সঙ্গে আদায়কৃত ছালাতের ফযীলত একাকী আদায়কৃত ছালাত অপেক্ষা সাতাশ’ গুণ বেশী’।[1] অন্য বর্ণনায় এসেছে, صَلاَةُ الجَمَاعَةِ تَفْضُلُ صَلاَةَ الفَذِّ بِخَمْسٍ وَعِشْرِينَ دَرَجَةً ‘জামা‘আতের সঙ্গে আদায়কৃত ছালাতের ফযীলত একাকী আদায়কৃত ছালাত অপেক্ষা পঁচিশ গুণ বেশী’।[2]

(২) মুছল্লীদের সংখ্যা যত বেশী হবে, জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের ফযীলত তত বেশী হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِنَّ صَلَاةَ الرَّجُلِ مَعَ الرَّجُلِ أَزْكَى مِنْ صَلَاتِهِ وَحْدَهُ، وَصَلَاتُهُ مَعَ الرَّجُلَيْنِ أَزْكَى مِنْ صَلَاتِهِ مَعَ الرَّجُلِ، وَمَا كَثُرَ فَهُوَ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى ‘একজন ব্যক্তির একাকী ছালাত আদায় অপেক্ষা দু’জনের একত্রে ছালাত আদায় করা অধিক উত্তম এবং দু’জনের একত্রে ছালাত অপেক্ষা তিনজনের একত্রে ছালাত আদায় করা আরও অধিক উত্তম। এর অধিক জামা‘আতে যতই লোক বেশী হবে, ততই তা মহান আল্লাহর নিকট অধিক পসন্দনীয়’।[3]

(৩) জামা‘আতের সঙ্গে একাধারে চল্লিশ দিন ছালাত আদায় করার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ صَلَّى لِلَّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا فِي جَمَاعَةٍ يُدْرِكُ التَّكْبِيرَةَ الأُولَى كُتِبَ لَهُ بَرَاءَتَانِ: بَرَاءَةٌ مِنَ النَّارِ، وَبَرَاءَةٌ مِنَ النِّفَاقِ ‘কোন ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে একাধারে চল্লিশ দিন তাকবীরে তাহরীমাসহ জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করতে পারলে তাকে দু’টি নাজাতের ছাড়পত্র দেওয়া হয়- জাহান্নাম হতে নাজাত এবং মুনাফিক্বী হতে নাজাত’।[4]

(৪) বিশেষ বিশেষ ওয়াক্তের ছালাত জামা‘আতের সঙ্গে আদায় করার বিভিন্ন ফযীলত হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, এশা ও ফজরের ছালাত জামা‘আতের সঙ্গে আদায় করার বিষয়ে রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا قَامَ نِصْفَ اللَّيْلِ، وَمَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا صَلَّى اللَّيْلَ كُلَّهُ ‘যে ব্যক্তি জামা‘আতের সঙ্গে এশার ছালাত আদায় করল, সে যেন অর্ধরাত পর্যন্ত ছালাত আদায় করল। আর যে ব্যক্তি জামা‘আতের সঙ্গে ফজরের ছালাত আদায় করল, সে যেন সারা রাত ছালাত আদায় করল’।[5]

(৫) মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের জন্য অপেক্ষাকারী ব্যক্তি ছালাতে রত বলে গণ্য করা হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ يَزَالُ العَبْدُ فِي صَلاَةٍ مَا كَانَ فِي المَسْجِدِ يَنْتَظِرُ الصَّلاَةَ مَا لَمْ يُحْدِثْ ‘বান্দা যে সময়টা মসজিদে ছালাতের অপেক্ষায় থাকে, তার পুরো সময়টাই ছালাতের মধ্যে গণ্য হয়, যতক্ষণ না তার ওযূ ভঙ্গ হয়’।[6]

(৬) মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করতে দেখে খুবই খুশী হন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِنَّ اللهَ لَيَعْجَبُ مِنَ الصَّلَاةِ فِي الْجَمِيعِ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা সকলের সাথে (জামা‘আতে) ছালাত আদায়ে খুশী হন’।[7]

(৭) জামা‘আতে ছালাত আদায়ের সময় ইমাম যখন সূরা ফাতিহা শেষে ‘আমীন’ বলেন, তখন মুক্তাদিও যদি ‘আমীন’ বলেন এবং তার ‘আমীন’ ফেরেশতাদের ‘আমীন’-এর সাথে মিলে যায়, তাহলে মহান আল্লাহ তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِذَا أَمَّنَ الإِمَامُ، فَأَمِّنُوا، فَإِنَّهُ مَنْ وَافَقَ تَأْمِينُهُ تَأْمِينَ المَلاَئِكَةِ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‘ইমাম যখন ‘আমীন’ বলেন তখন তোমরাও ‘আমীন’ বলো। কেননা যার ‘আমীন’ বলা ফেরেশতাদের ‘আমীন’ বলার সাথে একই সময় হয়, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়’।[8]

২. জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের অপরিহার্যতা :

দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতের সঙ্গে আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ওয়াজিব বা আবশ্যকীয়। এটি পবিত্র কুরআন, ছহীহ সুন্নাহ ও ছাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন আছার দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। যেমন :

(১) ভয়-ভীতি অবস্থায়ও মহান আল্লাহ জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,وَإِذَا كُنْتَ فِيهِمْ فَأَقَمْتَ لَهُمُ الصَّلَاةَ فَلْتَقُمْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ مَعَكَ وَلْيَأْخُذُوا أَسْلِحَتَهُمْ فَإِذَا سَجَدُوا فَلْيَكُونُوا مِنْ وَرَائِكُمْ وَلْتَأْتِ طَائِفَةٌ أُخْرَى لَمْ يُصَلُّوا فَلْيُصَلُّوا مَعَكَ وَلْيَأْخُذُوا حِذْرَهُمْ وَأَسْلِحَتَهُمْ ‘আর আপনি যখন তাদের মধ্যে অবস্থান করবেন, তারপর তাদের সাথে ছালাত আদায় করবেন, তখন তাদের একদল আপনার সাথে যেন দাঁড়ায় এবং তারা যেন সশস্ত্র থাকে। তাদের সিজদাহ করা হলে তারা যেন তোমাদের পিছনে অবস্থান করে; আর অপর একদল যারা ছালাতে শরীক হয়নি তারা আপনার সাথে যেন ছালাতে শরীক হয় এবং তারা যেন সতর্ক ও সশস্ত্র থাকে’ (নিসা, ১০২)

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা প্রচন্ড ভয়-ভীতিকালীন সময়েও জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করা যদি সুন্নাত হত, তাহলে এরকম অবস্থায় একাকী ছালাত আদায়ে ছাড় থাকাই স্বাভাবিক ছিল।

(২) দুনিয়ায় যারা জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের জন্য আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেয়নি, ক্বিয়ামতের দিন তারা মহান আল্লাহর সামনে সিজদাহ করতে সক্ষম হবে না। তারা সিজদাহ করতে যাবে কিন্তু তাদের পিঠ বাঁকা হবে না। মহান আল্লাহ বলেন,يَوْمَ يُكْشَفُ عَنْ سَاقٍ وَيُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ -خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ وَقَدْ كَانُوا يُدْعَوْنَ إِلَى السُّجُودِ وَهُمْ سَالِمُونَ ‘স্মরণ করুন সে দিনের কথা, যেদিন পায়ের গোছা উন্মোচিত করা হবে, সেদিন তাদেরকে ডাকা হবে সিজদাহ করার জন্য, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না; তাদের দৃষ্টি অবনত, হীনতা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে অথচ যখন তারা নিরাপদ ছিল তখন তাদেরকে ডাকা হত সিজদাহ করতে’ (ক্বালাম, ৪২-৪৩)

(৩) রাসূল (ছাঃ) জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন। মালিক ইবনু হুওয়াইরিছ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার গোত্রের কয়েকজন লোকের সঙ্গে নবী (ছাঃ)-এর নিকট এলাম এবং আমরা তাঁর নিকট বিশ দিন অবস্থান করলাম। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) অত্যন্ত দয়ালু ও বন্ধু বৎসল ছিলেন। তিনি যখন আমাদের মধ্যে নিজ পরিজনের নিকট ফিরে যাওয়ার আগ্রহ লক্ষ্য করলেন, তখন তিনি আমাদের বললেন, ارْجِعُوا فَكُونُوا فِيهِمْ، وَعَلِّمُوهُمْ، فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلاَةُ فَلْيُؤَذِّنْ لَكُمْ أَحَدُكُمْ، وَلْيَؤُمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ  ‘তোমরা পরিজনের নিকট ফিরে যাও এবং তাদের মধ্যে বসবাস কর। তাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দিবে এবং ছালাত আদায় করবে। যখন ছালাতের সময় হবে, তখন তোমাদের কেউ আযান দিবে এবং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বড় সে ইমামতি করবে’।[9]

(৪) আবুদ্দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,مَا مِنْ ثَلَاثَةٍ فِي قَرْيَةٍ وَلَا بَدْوٍ لَا تُقَامُ فِيهِمُ الصَّلَاةُ إِلَّا قَدِ اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ، فَعَلَيْكَ بِالْجَمَاعَةِ فَإِنَّمَا يَأْكُلُ الذِّئْبُ الْقَاصِيَةَ ‘যখন কোন গ্রামে বা মরুভূমিতে তিনজন লোক একত্রিত হয় এবং জামা‘আতে ছালাত আদায় না করে, তখন শয়তান তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। অতএব তোমরা অবশ্যই জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় কর। কেননা দলচ্যুত বকরীকে নেকড়ে বাঘে ভক্ষণ করে থাকে’।[10]

(৫) রাসূল (ছাঃ) বলেন,لَيَنْتَهِيَنَّ أَقْوَامٌ عَنْ وَدْعِهِمُ الْجَمَاعَاتِ، أَوْ لَيَخْتِمَنَّ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ، ثُمَّ لَيَكُونُنَّ مِنَ الْغَافِلِينَ ‘লোকেরা অবশ্যই যেন জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত ত্যাগ করা থেকে বিরত থাকে। অন্যথা আল্লাহ অবশ্যই তাদের অন্তরে সীলমোহর মেরে দিবেন, অতঃপর তারা বিস্মৃতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বে’।[11] বলা বাহুল্য, এরকম সতর্কবাণী শুধুমাত্র ওয়াজিব পরিত্যাগের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে।

(৬) রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ فَلَمْ يَأْتِهِ، فَلَا صَلَاةَ لَهُ، إِلَّا مِنْ عُذْرٍ ‘যে ব্যক্তি আযান শুনলো এবং তার কোন ওযর না থাকা সত্ত্বেও জামা‘আতে উপস্থিত হলো না, তার ছালাত কবূল হবে না’।[12]

(৭) ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলো, সে দিনভর ছিয়াম রাখে এবং রাতভর ছালাত আদায় করে, কিন্তু জুমু‘আয় ও জামা‘আতের সঙ্গে ছালাতে উপস্থিত হয় না। তিনি বললেন, هُوَ فِي النَّار ‘সে জাহান্নামী’।[13]

(৮) জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় ওয়াজিব মর্মে ছাহাবায়ে কেরামের ইজমা’ সংঘটিত হয়েছে। কারণ, এ বিষয়ে অনেক বিজ্ঞ ছাহাবীর বক্তব্য পাওয়া যায় এবং তাদের বক্তব্যের কেউ বিরোধিতা করেছেন বলে প্রমাণ নেই।[14]

৩. মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব :

পূর্বের আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে, জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ে একজন মুসলিমের জন্য যেমন রয়েছে অফুরন্ত ছওয়াব, তেমনি পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতের সঙ্গেই আদায় করার রয়েছে বাধ্যবাধকতা। অর্থাৎ বিষয়টি তার ইচ্ছাধীন নয় যে, ইচ্ছা হলে জামা‘আতে পড়বে, আর না হলে একাকী পড়বে; বরং কোন প্রকার ওযর না থাকলে একজন মুসলিম জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ে বাধ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে কোন স্থানে জামা‘আত করলেই কি এ ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে, নাকি মসজিদে গিয়েই জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করতে হবে? কারণ, বর্তমানে বিভিন্ন অফিস-আদালত, সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, আবাসিক হল প্রভৃতি স্থানে মুছল্লা (ছালাত আদায়ের স্থান) বানিয়ে জামা‘আত আদায়ের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়; বরং অনেক সময় একটি ভবনের প্রতি তলায় একটি করে মুছল্লা দেখা যায়। যদিও এ সমস্ত মুছল্লার কারণে সঠিক সময়ে ছালাত আদায় করা সহজ হয়, তদুপরি ইসলামী শরী‘আতে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের যে বিধান, সেটি কি পুরোপুরিভাবে পালিত হচ্ছে? মসজিদে গিয়ে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করলে যে ছওয়াব হয়, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কল্যাণ সাধিত হয়, সাময়িকভাবে গ্রহণ করা এসব মুছল্লায় তা কি সম্ভব? বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলতে আরো কয়েকটি দিক আলোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছি।

মসজিদ ও মুছল্লার মধ্যে পার্থক্য :

(১) মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতের সঙ্গে নিয়মিত আদায় করা হয় এবং দারসসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। পক্ষান্তরে মুছল্লায় প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করা হয় না; বরং নির্দিষ্ট কিছু ওয়াক্তের ছালাত আদায় করা হয়, তবুও প্রতিদিন নয়। যেমন, বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছুটির দিনে স্বাভাবিকভাবে কোন ছালাতই  আদায় করা হয় না।

(২) মসজিদের জমি নির্দিষ্টভাবে মসজিদের নামেই রেজিষ্ট্রিকৃত হওয়া শর্ত। পক্ষান্তরে মুছল্লার ক্ষেত্রে এমনটি হওয়া শর্ত নয়।

(৩) পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে মসজিদের যেসব হুকুম-আহকাম সাব্যস্ত হয়েছে সেগুলো শুধু মসজিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। যেমন, দুই রাক‘আত তাহিয়্যাতুল মসজিদ। পক্ষান্তরে মুছল্লায় মুসজিদের সকল বিধান প্রযোজ্য হবে না। যেমন, ঋতুগ্রস্ত মহিলাদের মসজিদে অবস্থানের বিধান।

শায়খ ইবনে উছায়মীন (রাহঃ)-কে মসজিদ ও মুছল্লার পার্থক্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমভাবে পৃথিবীর সকল স্থানকে মসজিদ বলা হয়। কেননা রাসূল  বলেছেন, جُعِلَتْ لِي الأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا ‘সমস্ত যমীন আমার জন্য মসজিদ ও পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম করা হয়েছে’।[15] তবে খাছভাবে মসজিদ বলতে যে স্থানে নিয়মিত ছালাত আদায় করা হয় সে স্থানকে বুঝায়, চাই সেটি মাটির তৈরি হোক বা পাথরের তৈরি হোক অথবা ইটের তৈরি হোক। পক্ষান্তরে মুছল্লা হল, যে স্থানে ছালাত আদায় করা হয়, কিন্তু নিয়মিতভাবে ছালাতের জন্য সে স্থানকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। তার প্রমাণ হলো, রাসূল (ছাঃ) বাড়ীতে নফল ছালাত আদায় করতেন, কিন্তু তার বাড়ী মসজিদ নয়।[16]

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

*পিএইচডি, মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৫।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৬।

[3]. আবুদাঊদ, হা/৫৫৪, শায়খ আলবানী হাদীছটিকে ‘হাসান’ বলেছেন।

[4]. তিরমিযী, হা/২৪১, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৬৫২।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৬।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১৭৬।

[7]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৬৫২।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৮০।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৮।

[10]. আবুদাঊদ, হা/৫৪৭, হাদীছটিকে ইমাম হাকেম, ইমাম যাহাবী এবং শাইখ আলবানী ছহীহ বলেছেন।

[11]. ইবনে মাজাহ, হা/৭৯৪, হাদীছটি ছহীহ মুসলিমেও বর্ণিত হয়েছে, তবে সেখানে الْجَمَاعَاتِ শব্দের পরিবর্তে الْجُمُعَاتِ এসেছে।

[12]. ইবনে মাজাহ, হা/৭৯৩; আবুদাঊদ, হা/৫৫১, শায়খ আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।

[13]. তিরমিযী, হা/২১৮, আলস্নামা আহমাদ শাকের হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। তিনি আরো বলেন, হাদীছটি বাহ্যত মাওকূফ হলেও এটি মারফূ‘র হুকুমে। কেননা এমন মতামত ইজতিহাদ তথা গবেষণাপ্রসূত হওয়ার কথা না।

[14]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আছ-ছালাতু ওয়া তারিকু আহকামিহা, পৃঃ ১১১।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৩৮।

[16]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে উছায়মীন, ১৫/৩৫।

3 মন্তব্য

  1. আলহামদুলিল্লাহ, অনেক কিছু জানলাম শিখলাম। মহান আল্লাহ আপনাদের এই প্রচেষ্টার জন্যে উত্তম কিছু দান করুক। আমিন

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে