মহানবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) :
উম্মাহর পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার

-ড. মো. কামরুজ্জামান*



পৃথিবীতে একটাই নাম, একটাই জীবনী, একটাই আদর্শ। যার কীর্তিগাঁথা ইতিহাস বিশ্বময় আলোচিত। যার চরিত্র-মাধুর্য সারা দুনিয়ায় আলোড়িত। যার কোমলতা ও বলিষ্ঠতা তামাম দুনিয়ায় নন্দিত। যার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত— গোটা জীবনী স্মরণ করে একজন পাঠক হয়ে পড়ে আপ্লুত। তাঁর জন্ম হয়েছিল সঊদী আরবের মরুময় পবিত্র নগরী মক্কায়। প্রসিদ্ধ কুরাইশ পরিবারে হয়েছিল তাঁর আগমন। তাঁর উপাধি ছিল আল-আমীন। তাঁর সততা ও বলিষ্ঠতায় মক্কাবাসী তাকে এ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। অল্প বয়সেই যার বিচরণ ঘটেছিল সিরিয়ায়। তাঁর সিরিয়া বিচরণের উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্য। তাঁর আগমনকালীন সময়টা ছিল বর্বরতায় ভরা। এ সময়টিকে ঐতিহাসিকগণ মধ্যযুগ বলে অভিহিত করেছেন। মধ্যযুগীয় বর্বরতা বিশ্বে সমধিক আলোচিত ও সমালোচিত। এ সময় গোটা বিশ্বের মতো আরব সমাজ ছিল অশান্তি ও অস্থিরতায় ভরা। সামাজিক এ অস্থিরতা তাঁকে ব্যাকুল করে তুলেছিল। এ অস্থিরতা দূরীকরণে তিনি নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। সারা দুনিয়ার অশান্তি দূর করতে তিনি চিন্তা-গবেষণা শুরু করলেন। আর এজন্য তিনি হেরাগুহাকে বেছে নিলেন। বিরামহীন ১৫ বছর যাবৎ তিনি এ গুহাতে ধ্যানে মগ্ন থাকলেন! অবশেষে গুহাতে তাঁর চিন্তার রাজ্য উন্মোচিত হলো। আল্লাহর পক্ষ থেকে পরিচ্ছন্ন এক সমাজদর্শনের গাইডলাইন নাযিল হলো। হেরার রশ্মি তাঁর চিন্তাজগতকে আলোকিত করল। হেরার এ রশ্মি নিয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন জনসম্মুখে। এ রশ্মির প্রকৃতি হলো আল্লাহর কথা তথা আল-কুরআন। এ কুরআন দিয়ে শুরু হলো তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়। এ রশ্মি বিচ্ছুরণে সর্বপ্রথম তিনি গোপন নীতি অবলম্বন করলেন। এ সময় তিনি নিকটাত্মীয়দেরকে আল-কুরআনের রশ্মি দ্বারা আলোকিত করলেন। এরপর তাঁর জীবনে শুরু হলো কঠিন অধ্যায়। এ অধ্যায়ে তিনি শুরু করলেন আল-কুরআনের প্রকাশ্য দাওয়াত। কিন্তু অধ্যায়টি মোটেই সুখকর ছিল না। এ অধ্যায়টি ছিল সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে পরিপূর্ণ। এ পর্যায়ে শুরু হলো প্রতিপক্ষের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতন। তাঁর এ অধ্যায়টি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ নিষ্ঠুরতায় পরিপূর্ণ। তায়েফের ময়দানে প্রতিপক্ষের আঘাত ছিল নির্মমতায় ভরা। চলমান নির্যাতনের মধ্যেই তিনি গমন করলেন বায়তুল মুক্বাদ্দাসে। সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ। আবার মক্কায় পুনঃগমন। এরপর মদীনার পানে হিজরত। মদীনার সনদ, আকাবার শপথ, হুদায়বিয়ার সন্ধি। মক্কা বিজয়, বিদায় হজ্জ এবং মৃত্যু। এসব কিছু শুধু একজন মানুষকে ঘিরেই। একজনকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের লেখা। একজন মানুষের ঘটনা বহু মানুষের মুখে। বহু শতাব্দী ধরে তাঁরই সুর আর তাঁরই মূর্ছনা। তারপরও যেন অসীম তাঁর জীবনী। বাতাসে তাঁর জীবনী অফুরান। ছন্দের জগতে তিনি অম্লান। এত লেখনি, এত বক্তব্য! তারপরও যেন বাকি রয়েছে ঢের। যেন সবই রয়েছে বাকি। রয়েছে না বলা অনেক কিছু। তিনি আর কেউ নন। তিনি হলেন মরুর দুলাল, আব্দুল্লাহ ও আমেনার ছেলে। আব্দুল মুত্তালিবের বংশ উজ্জ্বলকারী প্রিয় নাতি ও বিশ্বনবী। নাম তাঁর মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু—ধারাবাহিক ঘটনার বিবরণই সীরাত। তাঁর শারীরিক কাঠামোর বর্ণনা, দৈহিক গঠনের বর্ণনা, তাঁর কার্যক্রম ইত্যাদি হলো শামায়েল। তাঁর জীবনের সকল কাজই জগতবাসীর জন্য অনুসরণীয়-অনুকরণীয়।

মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুই জাহানের নেতা। অথচ সাধাসিধে জীবনযাপনে তিনি ছিলেন অতি সাধারণের মতো। তাঁর ব্যক্তি জীবনে ছিল না কোনো জৌলুস। গৃহস্থালির কাজ নিজ হাতে সম্পন্ন করতে তিনি কোনোরূপ লজ্জাবোধ করতেন না। নিজের কাজ নিজেই সম্পন্ন করতেন। নিজ হাতে উটকে ঘাস খাওয়াতেন। নিজের জুতা নিজে সেলাই করতেন। ভৃত্যদের সাথে একসঙ্গে খাবার খেতেন। নিজেই ছাগির দুধ দোহন করতেন। জাঁতায় নিজেই আটা মাড়াই করতেন। বাজারে গিয়ে নিজেই সদাই করতেন। এতে তিনি বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করতেন না। ধনী ও গরীব উভয়ের সাথে মুছাফাহা ও আলিঙ্গন করতেন। সর্বদা আগে সালাম দিতেন। যেকোনো ব্যক্তি দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করতেন। কাউকে তিনি তুচ্ছজ্ঞান করতেন না। তিনি দয়ার্দ্রচিত্তের অধিকারী ছিলেন। তিনি পরিছন্নতা পছন্দ করতেন। নিজেও পরিচ্ছন্ন থাকতেন। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। সবসময় মুচকি হাসি লেগে থাকত তাঁর মুখে। কখনো অট্টহাসি দিতেন না। নিষ্পাপ হয়েও পরকালের ভয়ে তিনি থাকতেন চিন্তিত। তাঁর কথায় বা আচরণে কোনোরূপ বিরক্তি প্রকাশ পেত না। তিনি রুক্ষতা ও বদমেজাজ পরিহার করতেন। তিনি ছিলেন নম্র স্বভাবের, তবে তার মধ্যে ভীরুতা ও কাপুরুষতা ছিল না। তিনি ছিলেন দানশীল, তবে অপচয় করতেন না। তিনি পেটভরে খেতেন না। তিনি ছিলেন নির্লোভ, অল্পে তুষ্ট ও ধৈর্যশীল এক মহামানব। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিছানা ছিল অতি সংক্ষিপ্ত ও সাদাসিধে। লতা-পাতা ছিল তার বিছানার উপাদান। ঘুম থেকে উঠলে তাই তাঁর গায়ে দাগ দেখা যেত। বিছানা তাঁর এতই ছোট ছিল যে, তিনি যখন রাতে ছালাত পড়তেন, আয়শা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তখন এক পাশে জড়ো হয়ে থাকতেন।[1] মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি জীবনে কখনো স্ত্রীদের প্রহার করেননি। এমনকি ভৃত্যদেরকেও নয়। অথচ শত্রুদের বিরুদ্ধে তিনি বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেছেন। কেউ তাকে কষ্ট দিলে তিনি তার প্রতিশোধ নেননি। শুধু আল্লাহর মর্যাদা ও সম্মানের ক্ষেত্রে প্রতিশোধ নিয়েছেন।[2] মূলত আল্লাহ তাকে বিশ্ববাসীর জন্য সর্বোত্তম আদর্শরূপে প্রেরণ করেছেন (আল-আহযাব, ৩৩/২১)। নিশ্চয়ই আমি সকল মানুষের জন্যই রাসূল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছি (আল-আ‘রাফ, ৭/১৫৮)। তাই তিনি শুধু নির্দিষ্ট কোনো এলাকার নবী নন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য প্রেরিত হননি। তিনি ছিলেন বিশ্বনবী; বিশ্বমানবতার কল্যাণকামী এক মহামানব। তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন (আল-আম্বিয়া, ২১/১০৭)। সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও গোত্রের জন্য তিনি এক অনুকরণীয় কালজয়ী আদর্শ। আর তিনি সকল প্রকার উত্তম চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত (আল-ক্বালাম, ৬৮/৪)। আর এ কারণেই তাঁকে ভালোবাসলে আল্লাহকে ভালোবাসা হবে; আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া যাবে (আলে ইমরান, ৩/৩১)। আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। সাগরসম মমতায় ভরা হৃদয় দিয়ে তিনি আরববাসীকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। কলুষিত মনকে পরিচ্ছন্ন করেছিলেন। তাদেরকে তিনি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিয়েছিলেন (আল-জুমআ, ৬২/২)। তাঁর প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা ছিল অতুলনীয়। তিনি ছিলেন মানবজাতির মহান শিক্ষক; ছিলেন আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত মহান পাঠক। আল্লাহ বলেন, ‘আপনি আপনার প্রভুর নামে পড়ুন! যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (আল-আলাক্ব, ৯৬/১-২)। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ২৩ বছরের জীবনে মদীনায় শিক্ষাবিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তার এ শিক্ষাবিপ্লব ছিল মসজিদকে কেন্দ্র করে। তিনি মক্কায় দারুল আরকাম নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছিলেন। এখানে ছাহাবীগণ নিয়মিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কাজে সময় ব্যয় করতেন। মদীনায় হিজরত করে সর্বপ্রথম তিনি কূবা নামক স্থানে মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর নির্মাণ করেন মসজিদে নববী। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আছর থেকে এ মসজিদে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এ সকল প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য পাঠদানের ব্যবস্থা ছিল। মদীনা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মানুষ দলে দলে এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে শিখতে আসত। শিশু, বালক-বালিকা, যুবক-যুবতিরা নিয়মিতভাবে এখানে লেখাপড়া করত। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী নির্বিশেষে সবাই এখানে পড়ার জন্য জমায়েত হতো। মহিলাদের জন্য দিন এবং সময় নির্ধারিত ছিল। মদীনার মসজিদে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এবং তার চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) লেকচার প্রদান করতেন। নবীজির শিক্ষাব্যবস্থা ছিল অবাধ, মুক্ত ও স্বাধীন। তাঁর শিক্ষা ছিল জীবনমুখী ও সার্বজনীন। এ ব্যবস্থায় কোনো সম্মানি ছিল না। শিক্ষাব্যবস্থা চলত মদীনা রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। তাঁর প্রণীত শিক্ষা দিয়েই তিনি আরববাসীকে আলোকিত করেছিলেন। এ শিক্ষার মাধ্যমে অন্ধকার যুগ আলোকিত যুগে পরিবর্তন হয়েছিল। মাত্র ২৩ বছরের ব্যবধানে একটি বর্বর, অসভ্য, নিষ্ঠুর ও শৃঙ্খলমুক্ত জাতিকে বশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। একটি কালেমার আওয়াজে সকলকে এক পতাকার ছায়াতলে একত্রিত করেছিলেন। ইতিহাসের গতিধারাকে তিনি পালটে দিয়েছিলেন। তিনি অসভ্য-বর্বর একটি পরিবেশকে জ্ঞানের আলো দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন। তিনি অশান্ত একটি জনপদকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিয়েছিলেন। ফলে আরব সমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিতে নৈতিকতার বিপ্লব ঘটেছিল। এ ব্যক্তিটির (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বাল্যকাল ও কৈশোরকাল ছিল সততা আর বিশ্বস্ততায় ভরা। ফলে তিনি আল-আমীন তথা বিশ্বস্ত উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। যৌবনকালে ছিলেন তিনি প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ সংগঠক। পূর্ব থেকে চলে আসা সমাজে বিরাজমান কলহ মিটাতে তিনি গঠন করেছিলেন সামাজিক শান্তিসংঘ। এ শান্তিসংঘের নাম ছিল হিলফুল ফুযূল। তিনি এ যুবক বয়সেই ধ্বংসোন্মুখ আরবজাতিকে বাঁচাতে উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন। যুবক মুহাম্মাদের (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ চেতনা গোটা বিশ্বের যুবকদের জন্য হয়ে আছে এক অনুপম আদর্শ।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)


* অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৯১৩, ৩৮২।

[2]. ছহীহ মুসিলম, হা/২৩২৮।