মহান রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদা রক্ষা


[১৩ রবীউছ ছানী, ১৪৪২ হি. মোতাবেক ৩০ অক্টোবর, ২০২০ তারিখ। পবিত্র হারামে মাক্কীর (কা‘বা) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ আব্দুর রহমান আস-সুদাইস উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহীর সম্মানিত মুহাদ্দিছ ও ‘আল-ইতিছাম গবেষণা পর্ষদ’-এর গবেষণা সহকারী শায়খ আব্দুল গনি মাদানী খুৎবাটি মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। হে প্রতিপালক! আমরা তাই আপনার প্রশংসা করি, আপনার কাছেই সাহায্য চাই, আপনার কাছেই ক্ষমা চাই, আপনার কাছেই ফিরে যাই এবং সকল কল্যাণের জন্য আপনারই স্তুতি বর্ণনা করি।

“আল্লাহর জন্যই প্রশংসার ধারাবাহিকতা
যদিও নেয়ামতের গণনায় কৃতজ্ঞতার স্বল্পতা”

পাপে ভরা প্রতিটি অবহেলা-অবজ্ঞা ও ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য আমরা তার কাছে ক্ষমা চাই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বূদ নাই। তিনি এক-অদ্বিতীয়। তিনি আমাদেরকে অঢেল নেয়ামত প্রদান করেছেন এবং অজস্র অনুগ্রহে ধন্য করেছেন। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী ও সর্দার মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, যিনি সকল সৃষ্টিজগতের মধ্যে বংশ ও জাতিগত দিক দিয়ে পবিত্র, চরিত্র ও স্বভাবগত দিক দিয়ে পুষ্পতুল্য, জীবন-কর্মের দিক থেকে দুনিয়াকে আলোয় আচ্ছাদনকারী দীপ্তিময়। তার মহান অধিকারের সম্মানে প্রতিপালকের দরূদ ও শান্তি বর্ষিত হোক তার উপর, তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাকারী তার পরিবার-পরিজন ও সহচরবর্গের উপর এবং তাদেরকে আগ্রহভরে অনুসরণকারী তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈনের উপর।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন স্বীকৃতি প্রদান, মহিমা ঘোষণা এবং যিম্মাদারীর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ভালোবাসার দ্বারা। কেননা, তাক্বওয়াশীলরাই তো অমলিন শুভ্র গন্তব্যের যাত্রী এবং তাদের মর্যাদা ঊর্ধ্বগামী। আর যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুসরণ করে এবং একমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে, তারাই তো সফলকাম।

“যখন ব্যক্তির আছে আল্লাহর অনুসরণ ও ভয়
তখন তার হস্তদ্বয় উত্তম কাজে ও মহৎ গুণে রয়,
আল্লাহভীরু আল্লাহর ভয়ে দুটি মুকুট পায়
একটি হলো প্রশান্তির আর অপরটি মর্যাদায়”

হে মুসলিমগণ! জীবন ও জগতের নানামুখী ব্যস্ততা, বিপদ ও কষ্টের মাঝে আবারও অতিস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হচ্ছে আমাদের গৌরবময় শরীআত তার উজ্জ্বল নির্দেশনা ও বিস্ময়কর গন্তব্যের মাধ্যমে নৈতিক, চারিত্রিক, মানসিক এবং আত্মিক উন্নয়ন সাধন করে, উৎকৃষ্ট অর্থ ও ভিত বাস্তবায়ন করে ঈমানের প্রবল উৎকর্ষতা, অনুকম্পায় শ্রেষ্ঠত্ব ও কোমল অনুভূতিকে শাণিত করছে। আর এসব কিছুই রূপায়িত হয়েছে আমাদের অনুকরণীয়, প্রিয়, সর্বশেষ নবী, নবীকুলের সর্দার, মনোনীত ব্যক্তিদের সর্দার হযরত মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যে।

হে মুমিন ভ্রাতৃমণ্ডলী! রাসূলকুলের সর্দারের নবুঅত লাভের পর থেকে প্রায় ১৪শ বছরের বেশি সময় ধরে তার গৌরবোজ্জ্বল চরিত্র দিক-বিদিক সুবাসিত করছে, কেননা তার কথায় ও কর্মে বিচক্ষণতার বাহক এবং সৌন্দর্য, মর্যাদা, সম্মান, মহিমা দ্বারা পূর্ণ।

“মর্যাদা যখন তার স্বীয় উচ্চতায় সমুন্নত
আমাদের প্রিয় নবী তখন তার সংমিশ্রণে উদ্ভাসিত,
গৌরবের ধ্বনিতে যখন আমরা লজ্জিত
মানবকুলের অতি উন্নত ব্যক্তিত্ব তখন সজ্জিত”

আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে যে সমস্ত মহৎ স্বভাব, শ্রেষ্ঠত্ব, পদমর্যাদা, দৃষ্টান্তহীন মনোনয়ন দ্বারা ধন্য করেছেন, তা শুধু কাগজ কলমের লিখনীতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অবিরাম ধারায় তা মিনারে মিনারে ধ্বনিত হয় এবং মসজিদের মিম্বারসমূহ তাতে প্রকম্পিত হয়। আর আমাদের রবের এ কথাই যথেষ্ট। তিনি বলেন, وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَك ‘আর আমরা আপনার (মর্যাদা বৃদ্ধির) জন্য আপনার স্মরণকে সমুন্নত করেছি’ (শারহ, ৯৪/৪০)।  

“আত্মা জীবিত হয় যখন তার চরিত্র হয় পঠিত
ভূমির পুনর্জীবনের ন্যায়, যখন বৃষ্টি হয় পতিত,
চরিত্র তার সুমিষ্ট, শ্রেষ্ঠত্ব তার অতি স্বচ্ছ
অল্পকথা তার সেরা অর্থবহ, যেন তা এক গুচ্ছ মুক্তো”

তিনি ছিলেন সমস্ত প্রকার কল্যাণ, পুণ্য, হেদায়াত এবং ন্যায়বিচারের গুণে গুণান্বিত। তার চরিত্র ও গঠন ছিল সুন্দর। চেহারা ছিল অতিউজ্জ্বল, দ্যুতিময়, সুদর্শন, সুগঠিত। ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট, ঘন ভ্রুবিশিষ্ট, মসৃণ কণ্ঠস্বর, লম্বা গ্রীবা, ঘন কালো চুলবিশিষ্ট। চুপ থাকলে চেহারায় তার ফুটে উঠত প্রশান্তি, কথা বললে ফুটে উঠত দীপ্তি। দূর থেকে সুন্দর ও উজ্জ্বল মানুষ এবং কাছ থেকে অতিসুন্দর ও অতিউজ্জ্বল। মিষ্টভাষী, মর্যাদাবান। ছিলেন না নগণ্য কিংবা বুদ্ধিহীন। তার কথাগুলো ছিল হারে বিন্যস্ত মুক্তার মতো। মাঝারি গড়নের, খর্বতা ও অতিলম্বার ত্রুটি থেকে মুক্ত। ঘন দাড়ি, প্রশস্ত কাঁধবিশিষ্ট, হাতের তালু ও পদদ্বয় ছিল প্রশস্ত ও সুগঠিত, খুব লম্বাও নয় এবং খুব বেঁটেও নয়। কথা বললে মনে হতো মুখ দীপ্তি নির্গত হচ্ছে।

এখানে আমরা হাদীছের আলোকে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দৈহিক এবং মানসিক কতিপয় গুণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে চাই।

. নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত সুদর্শন পুরুষ : আবূ ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বারা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর চেহারা কি তলোয়ারের মতো ছিল? তিনি বললেন না, বরং চাঁদের ন্যায় ছিল।[1] বারা ইবনু ‘আযিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাঝারি গড়নের ছিলেন। তার উভয়ে কাঁধের মধ্যস্থল প্রশস্ত ছিল। তার মাথার চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আমি তাকে লাল ডোরাকাটা চাদর পরা অবস্থায় দেখেছি। তার চেয়ে বেশি সুন্দর আমি কখনো কাউকে দেখিনি।[2] আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) না অতি লম্বা ছিলেন আর না (অতি) বেঁটে ছিলেন। তার দু’হাত ও দু’পা ছিল পেশীবহুল, মাথা ছিল আকারে বৃহৎ এবং হাড়ের গ্রন্থিসমূহ ছিল স্থূল ও শক্তিশালী। তার বুক হতে নাভি অবধি প্রলম্বিত ফুরফুরে পশমের একটি রেখা ছিল। চলার সময় তিনি সম্মুখের দিকে ঝুঁকে হাঁটতেন, যেন তিনি ঢালু জায়গা দিয়ে হাঁটছেন। আমি তার পূর্বে কিংবা তার পরে আর কাউকে তার মতো দেখিনি।[3] জাবের ইবনু সামুরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি চাঁদনি রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে লাল ডোরাকাটা চাদর পরা অবস্থায় দেখে একবার রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দিকে, আরেকবার চাঁদের দিকে দেখতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ই অধিক সুন্দর মনে হলো।[4]  

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কবি হাসসান ইবনু ছাতিব কত চমৎকারভাবে তার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন,

“আমার চক্ষু কখনও দেখেনি তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর
কোনো নারী জন্ম দেয়নি তোমার চেয়ে সুন্দরতর,
সকল দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত অবস্থায় তুমি সৃষ্ট
মনে হয় তুমি তোমার ইচ্ছা মতো সৃষ্ট”

২. নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিটি শব্দ পৃথকভাবে উচ্চারণ করে কথা বলতেন : আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদের মতো দ্রুত গতিতে কথা বলতেন না, বরং তিনি ধীরেসুস্থে প্রতিটি শব্দ পৃথকভাবে উচ্চারণ করে কথা বলতেন, ফলে তার কাছে বসা লোক খুব সহজেই তা আয়ত্ত করে নিতে পারত।[5]  

৩. নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন স্বীয় ছাহাবী এবং সাথীদের জন্য সদা হাস্যোজ্জ্বল : আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর চেয়ে বেশি মুচকি হাসি দিতে আমি আর কাউকে দেখিনি।[6]  আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধুমাত্র মুচকি হাসিই দিতেন।[7] জারীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার গৃহে প্রবেশ করতে কোনোদিন আমাকে বাধা প্রদান করেননি এবং যখনই আমাকে দেখেছেন, মুচকি হাসি দিয়েছেন।[8] আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের সাথে কৌতুকপূর্ণ কথাবার্তা বলছেন? রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমি (এ কৌতুকপূর্ণ কথাবার্তার মধ্যেও) সত্য কথাই বলি।[9]

. নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন অতিশয় বিনয়ী মানুষ : আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক মহিলা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার নিকট একটি প্রয়োজনে এসেছি। তিনি বললেন, হে অমুকের মা! তোমার সুবিধা মতো রাস্তার যে কোনো গলিপথে বসো এবং আমি তোমার নিকট বসে তোমার দরকার পূরণ করব। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর মহিলাটি বসল এবং নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বসে থাকলেন যতক্ষণ না তার প্রয়োজন পূরণ হলো।[10] আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থকে দেখতে যেতেন, জানাযায় উপস্থিত হতেন, গাধার পিঠে সওয়ার হতেন এবং কেনা গোলামের দাওয়াতও কবুল করতেন। বানু কুরাইযার (যুদ্ধের) দিন তিনি একটি গাধার পিঠে সওয়ার ছিলেন; এর লাগাম ও গদি ছিল খেজুর গাছের বাকলের তৈরি।[11]

“হে আগ্রহী মুহাম্মাদের শ্রেষ্ঠত্ব গণনার
নিবৃত হও তুমি, কারণ তার শ্রেষ্ঠত্ব নয় গণনার,
যদি তুমি বলো বালুকণা কিংবা নুড়ির মতো
অথবা বৃষ্টির ফোঁটার মতো, আমি বলব আরো”

হে মুসলিমগণ! আর এগুলো খুবই সামান্য পবিত্র রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উৎকৃষ্ট চরিত্র ও কালজয়ী চমৎকার হেদায়াত সম্পর্কে। যার উত্তম গুণ ও উন্নত মর্যাদা উল্লেখ করে আল্লাহ সম্বোধন করেছেন এবং তাকে দান করেছেন উজ্জ্বল চরিত্র এবং মহান শ্রেষ্ঠত্ব। আর এই জীবনী ও চরিত্র এমন একটি প্রবহমান নিষ্কলুষ ঝরনা, যার দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপত্তা সন্ধানকারী সকলেই সিঞ্চিত হয়। বরং সেটা এমন একটি উদ্দীপ্ত ছন্দ, উজ্জ্বল নক্ষত্র, উদ্ভাসিত সূর্য, দীপ্তিময় ঝলক, প্রদীপ্ত প্রদীপ, যা চোখ দিয়ে দর্শন করা অনেকের জন্য সম্ভব হয়নি, তবুও তার চরিত্র নিয়ে চিন্তা করার মধ্যে রয়েছে সান্ত্বনা ও সহমর্মিতা। আর তার চরিত্রের বাস্তবায়নকারীগণ যদিও চোখের দর্শনের মাধ্যমে তার সাথী হতে পারেনি, তবুও তার চরিত্রের বিবরণ তাদের মুখে শোভা পায়।

“চরিত্র, গঠন ও গুণাবলিতে পূর্ণ সত্তা
তার মর্যাদা ও ফযীলতের নাই ইয়ত্তা”

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং আপনারা আপনাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চরিত্রের অনুসরণ করুন। কেননা তার অনুসরণই হচ্ছে তার ভালোবাসা, মহত্ব এবং মহান লক্ষ্যের প্রমাণ। সমাবেশ, অনুষ্ঠান, মিছিল-মিটিং উদযাপন এবং কিচ্ছা-কাহিনী, হামদ-নাত, ছন্দ-স্তুতি বর্ণনা নয়, কেননা এই ধরনের ভালোবাসা অতিসস্তা এবং ঠুনকো।

“তাদের জিজ্ঞেস করো প্রকৃত প্রেম ও তার বর্ণনা
তাহলে অচিরেই শুনবে সত্য-সঠিক বার্তা,
মহান শরীআত পালনই রাসূলের ভালোবাসা
গোপনে-প্রকাশ্যে দেখাও তার বাস্তবতা,
রাসূলের ভালোবাসার অর্থ তার বৈশিষ্টকে ধারণ করা
এবং তার পবিত্র চরিত্রে চরিত্রবান হওয়া”
এর চেয়েও সুন্দর ও অর্থবহ বাণী হলো,

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ

‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (আল-ইমরান, ৩/৩১)

কুরআন ও সুন্নাহের মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে এবং আপনাদেরকে কল্যাণ দিন এবং আয়াত ও হাদীছ দ্বারা উপকৃত করুন। আমি এই কথা বলে আল্লাহর কাছে আমার জন্য এবং আপনাদের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি, আপনারাও তার কাছে ক্ষমা চান এবং ফিরে যান, তিনি তো ধৈর্যশীল ও ক্ষমাকরী।

ছানী বা দ্বিতীয় খুৎবা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যার অনুগ্রহ সকল সৃষ্টিকে বেষ্টিত করেছে। সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বূদ নাই, তিনি এক-অদ্বিতীয়, যাঁর একত্বের কীর্তন সকল অস্তিত্বের মুখে। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আমাদের নবী ও সর্দার মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, যাকে দেওয়া হয়েছে মহাশাফাআত, হাওযে কাওছার, ঝাণ্ডা বহনের অধিকার। হে আল্লাহ! তুমি তার ও তার সঙ্গীগণ, পরিবার-পরিজন এবং তাবেঈনের প্রতি দরূদ, শান্তি এবং বরকত বর্ষণ করো, যারা তাঁর সহযোগিতায় সমস্ত প্রকার চেষ্টা-প্রচেষ্টা করেছেন জান্নাত লাভের আশায়।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির আদর্শে আদর্শিত হোন, তাহলে মর্যাদা, বিজয় ও দৃঢ়তা অর্জন করবেন।   

হে মুমিন ভ্রাতৃমণ্ডলী! মুসলিম উম্মাহর সম্পর্ক ও ভালোবাসা তার জন্য সুপারিশকারী প্রিয় রাসূলের সাথে এবং তার জীবনী ও চরিত্রের সাথে বিশেষ কোনো সময় ও উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে নয়; বরং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সকল বিষয়ে, সকল সময়ের একটি শাশ্বত, অবিনশ্বর সম্পর্ক।

আমরা এই কল্যাণ, সত্য ও শান্তির মিম্বার থেকে বলতে চাই, নবী-রাসূলগণের চরিত্রে চরিত্রবান হোন, বিশেষ করে শেষ নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর চরিত্রে, যিনি ছিলেন বিভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য সার্বজনীন শান্তি, ঐক্য ও ভালোবাসার ঘোষক। তাই আসুন! কোনো প্রকার অন্যায়, বিবাদ, তিরস্কার এবং ধর্মীয় ব্যক্তি ও প্রতীকের বিদ্রুপাত্মক প্রতিচ্ছবি অঙ্কন ত্যাগ করি। আল্লাহ বলেন,

لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ

‘আমরা তার রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না’ (আল-বাক্বারা, ২/২৮৫)

আমরা বিশ্বব্যাপী এক হাজার ৮০০ মিলিয়ন মুসলিম কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ করে বলতে চাই, এই ধরনের অসম্মানজনক ছবি, কার্টুন তৈরি করা ও ন্যক্কারজনক পদক্ষেপ এক প্রকার সন্ত্রাসী কর্ম ও চরম পন্থা, যা ঘৃণা ও ঘৃণিত উগ্রবাদকে উস্কে দেয়। বাকস্বাধীনতার মানে এই নয় যে, ধর্মীয় পবিত্র নিদর্শনসমূহ ও প্রতীককে অবমাননা করা। বরং এহেন কর্ম ভদ্রতা ও সম্মানের গণ্ডি অতিক্রমকারী ব্যক্তির কুরুচির পরিচায়ক।

কেননা বাকস্বাধীনতা হতে হবে অপরের মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। আর যখনই মানবিক মূল্যবোধের গণ্ডি পার হয়ে যাবে, তখনই তা ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং স্বাধীনতার মানবিক অর্থের প্রতি দুর্ব্যবহার করা হবে। আর এই ধরনের অসম্মানজনক প্রতিকৃতি তৈরি চরমপন্থিদের উৎসাহিত করে, যারা মানব সমাজে ঘৃণার বীজ বপন করতে চায়। ইসলাম এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কেননা এটি পারস্পারিক দয়া, ভালোবাসা এবং ঐক্য স্থাপনের ধর্ম, সেখানে কোনো প্রকার সন্ত্রাস, চরমপন্থা, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড, উপহাস-বিদ্রুপ, নবী-রাসূলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কোনো স্থান নাই। আর এই পরিস্থিতিতে সকলের নিকট দাবি আবেগ, উত্তেজনা ও প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং লাগামহীনতা ও অপরিণামদর্শিতার পরিচয় না দেওয়া। কেননা নবুঅত ও রিসালাতের মর্যাদার কোনো ঘাটতি তারা করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ ‘আর আল্লাহ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন (আল-মায়েদা, ৫/৬৭)

“সৃষ্টিকর্তার প্রশংসাই যথেষ্ট সকল প্রশংসা হতে
যদি পড় সূরাতুল ক্বালামের শুরু থেকে,
তিনি আল্লাহ যিনি পূর্ণ করেছেন তাঁর গুণমালা
আহমাদ নামে নাম দিয়েছেন সৃষ্টিকুলের মাঝে সেরা;
উপহাসকারীর উপহাস মানে নয়তো মর্যাদার অস্বীকার
আলো যখন হয় উদ্ভাসিত বাধা দেওয়ার সাধ্য কার,
তার জন্য উৎসর্গীকৃত আমাদের রক্ত ও পিতৃকুল
তাছাড়াও আছে আজ অনেক উৎসর্গীকৃত মানবকুল”

 মুসলিমদের উচিত লোক দেখানো মিছিল-মিটিং ও বিশৃঙ্খলায় না করে শান্ত থাকা। কেননা এতে মূলত তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আল্লাহ বলেন, إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِئِينَ ‘নিশ্চয় আমরা বিদ্রুপকারীদের বিরুদ্ধে আপনার জন্য যথেষ্ট’ (আল-হিজর, ১৫/৯৫০)। তিনি আরো বলেন, إِلَّا تَنْصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ ‘যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাঁকে সাহায্য করেছিলেন (তাওবা ৯/৪০)। তিনি আরো বলেন, وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ  ‘আর আল্লাহ তাঁর কাজ সম্পাদনে অপ্রতিহত, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না (ইউসুফ ১২/২১)

তাই আমরা তাঁর উপর দরূদ ও শান্তি পাঠ করবো, যিনি স্বীয় মর্যাদার চূড়ায় পৌঁছিয়েছিলেন, সৌন্দর্য দ্বারা তমশাকে দূর করেছিলেন এবং যিনি সমস্ত মহৎ গুণের অধিকারী হয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

‘নিশ্চয় আল্লাহ নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দো‘আ ও ইসতেগফার করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর উপর ছালাত এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও (আল-আহযাব ৩৩/৫৬)

আর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরূদ পাঠের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘যে আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন’।[12]   

পরিশেষে, আসুন আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাতের পরিপূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে তাঁকে ভালোবাসি এবং বিদ্রুপকারীর বিদ্রুপের শান্তিপূর্ণ জবাব দান করি এবং জবাব দানের ক্ষেত্রে অমুসলিমদের দেখানো পথ ও পদ্ধতির অনুসরণ করা থেকে বেঁচে থাকি।   


[1]. বুখারী, হা/৩৫৫২; মুসলিম, হা/৬২৩০।

[2]. মুসলিম, হা/৬২১০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৭১।

[3]. তিরমিযী, হা/৩৯৯৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৪৬।

[4]. তিরমিযী, হা/৩০৪১; মিশকাত, হা/৫৭৯৪।

[5]. বুখারী, হা/৩৫৬৮; মুসলিম, হা/৬৫৫৪।

[6]. তিরমিযী, হা/৪০০২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮১৭৩; মিশকাত, হা/৫৮২৯।

[7]. তিরমিযী, হা/৪০০৩ ।

[8].  বুখারী, হা/৩৮২২; মুসলিম, হা/৬৫১৯ ।

[9]. তিরমিযী, হা/২১২১; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৭০৫; মিশকাত, হা/৪৮৮৫ ।

[10]. আবূ দাঊদ, হা/৪৮২০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২৫২৬ ।

[11]. তিরমিযী, হা/১০৩৩; ইবনু মাজাহ, হা/৪৩১৮ ।

[12]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৪; মিশকাত, হা/৯২২ ।