اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

মহামারী করোনা ও মাহে রামাযান

সারাবিশ্ব করোনার প্রকোপে কাঁপছে। দেশে দেশে লম্বা হচ্ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে করোনায় মৃতের সংখ্যা ২ লাখ ছুঁই ছুঁই। আমাদের দেশেও লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে এ সংখ্যা। বাংলাদেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪ হাযারের উপরে, মৃতের সংখ্যা একশ’র বেশী। এদিকে সম্পাদকীয়টি লেখার সময় রামাযানের মাত্র ১/২ দিন বাকী। আজ/কাল সন্ধ্যালগ্নে পশ্চিম দিগন্ত ভেদ করে উদিত হতে যাচ্ছে এক ফালি চাঁদ। অবারিত বরকত, কল্যাণ আর শান্তির ধারা নিয়ে হাযির হচ্ছে রামাযান মোবারক।

কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে গোটা বিশ্ব পরিচিত হতে যাচ্ছে অপ্রত্যাশিত ব্যতিক্রমধর্মী এক রামাযানের সাথে। যেখানে থাকছে না রামাযানের নানান আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সব মুসলিমের মসজিদে তারাবীহর ছালাত পড়তে যাওয়া, অফুরন্ত নেকীর আশায় বিশেষ আমেজে মসজিদে মসজিদে ইফতারের আয়োজন করা, রামাযানের শেষ দশকে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে ই‘তিকাফে বসা-এসবের কোনো কিছুই এবারের রামাযানে দেখা যাওয়ার আশা ক্ষীণ। এমনকি রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জামা‘আতে ঈদুল ফিতরের ছালাত আদায়, ঈদের আনন্দ ভোগ, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সাক্ষাত কোনো কিছুই হয়তোবা সম্পন্ন হবে না এ বছরের রামাযানে।

ইতিমধ্যে করোনার সংক্রমণ রোধে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীতে এ বছর তারাবীহর জামা‘আতে গণজমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। খুবই সীমিত পরিসরে জামা‘আত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এমনকি বিগত বছরগুলোর তুলনায় তারাবীহর রাক‘আত সংখ্যাও কমিয়ে অর্ধেকে নিয়ে আসা হয়েছে। এ বছর হারামাইন শরীফাইনে ই‘তিকাফ বন্ধ থাকবে বলেও প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে। ইফতারের আয়োজনও বন্ধ থাকবে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীতে। মূলতঃ সারা দুনিয়াজুড়ে এবার তারাবীহ, ইফতার, ই‘তিকাফের অবস্থা এরকমই হওয়ার সম্ভাবনা। আমাদের বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘করোনার কারণে স্টাফ ছাড়া অর্থাৎ খতিব, ইমাম, মোয়াজ্জিন, খাদেমরা ছাড়া কেউ মসজিদে তারাবি নামাজ আদায় করতে পারবেন না’।

মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে একসাথে পৃথিবীর প্রায় সব মসজিদে ব্যাপক পরিসরে ছালাত বন্ধ হয়ে যাওয়া হয়তো এটাই প্রথম। আমরা দু‘আ করি, মহান আল্লাহ যেন দ্রুত এই মুছীবত থেকে মুক্তি দিয়ে প্রতিটি মসজিদে পুনরায় প্রাণ ফিরিয়ে দেন। আমীন!

তবে, মুমিন-মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ হচ্ছে, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে বাড়ীতে তারাবীহ পড়লেও আমরা মসজিদে জামা‘আতে তারাবীহ আদায়ের নেকী পেয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যখন কোনো বান্দা রোগাক্রান্ত হয় কিংবা সফর করে, তখন তার জন্য তা-ই লেখা হয়, যা সে মুক্বীম অবস্থায় বা সুস্থ অবস্থায় আমল করতো’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৯৯৬)।

করোনা আমাদের কিছু শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে; তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ক্বিয়ামতের ময়দানে সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোও পরস্পরকে দেখে পালাবে। এরই বাস্তবতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কিছু অমানুষের অমানবিক আচরণ। সামান্য করোনার কারণে আত্মীয়-স্বজনকে জীবিত কিংবা মৃত অবস্থায় ফেলে যাচ্ছে কেউ কেউ! যার মূল কারণ তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি আস্থা ও ভরসার চরম অভাব। অথচ এ পরিস্থিতিতে মানুষের আরো বেশী মানবিক হওয়া উচিত ছিলো।

জ্ঞাতব্য, করোনাকালীন ছিয়াম অন্যান্য রোগবালাইকালীন ছিয়ামের মতই। আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে ছিয়াম পালন সম্ভব না হলে তিনি পরবর্তীতে ক্বাযা আদায় করবেন। আর ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে ছিয়াম পালন করবেন। এক্ষেত্রে ডাক্তারী পরামর্শ গৃহীত হবে।

এবারের মাহে রামাযান উপলক্ষ্যে আমাদের আহ্বান: (১) মহান আল্লাহর অনুমতি ও ইচ্ছা ব্যতীত পৃথিবীতে কিছুই ঘটে না। তিনিই সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান। তিনি চাইলে সকল বালা-মুছীবত দূর করতে পারেন। আমরা তার উপরই ভরসা করি। তিনিই আমাদের উত্তম সাহায্যকারী ও উত্তম অভিভাবক। অতএব, তাওহীদ ও তাক্বদীরের প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে আরো মযবূত করতে হবে। (২) তাওহীদ, তাক্বদীর ও তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি সচেতনতা অবলম্বনও যরূরী। সচেনতনতার ক্ষেত্রে সরকার নির্দেশিত বিধি-বিধান মেনে চলা প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। (৩) রামাযানে অন্যান্য প্রার্থনার পাশাপাশি এই মহামারী থেকে পরিত্রাণের জন্য মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ প্রার্থনা করতে হবে। (৪) নিঃস্ব, অভাবী, অসহায় ও দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের পাশে অন্যবারের তুলনায় এবার আরো বেশী করে দাঁড়াতে হবে। কারণ করোনা পরিস্থিতির কারণে অভাবী মানুষের সংখ্যা এবার বেড়েছে। (৫) করোনা সমস্যায় সবাই একযোগে কাজ করতে হবে এবং পরস্পরের প্রতি মানবিক আচরণ করতে হবে। (৬) সরকার ঘোষিত ত্রাণ ও সাহায্য প্রাপ্যদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। এখানকার অসাধুদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। (৭) টেলিভিশন, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় নাটক, সিনেমাসহ নানা অনৈসলামিক সিরিয়াল বন্ধ করতে হবে। (৮) পর্ণগ্রাফী বন্ধ করতে হবে। অশ্লীল বিজ্ঞাপন, পোস্টার, দেওয়ালিকা বন্ধ করতে হবে। (৯) কালোবাজারি-মওজুদদারি করে অন্যায়ভাবে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে হবে। (১০) জনসম্মুখে ধূমপান বন্ধ করতে হবে। (১১) জুয়া, লটারি বন্ধ করতে হবে। (১২) প্রকাশ্যে হোটেল, রেস্তোরা, ক্যান্টিনে খাবার বিক্রয় ও পরিবেশন বন্ধ করতে হবে।

একটি সুন্দর স্বাভাবিক রামাযানের আগমন ঘটুক এবং করোনা সহ নানা বালা-মুছীবত বিদায় নিক- মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে এই প্রার্থনা। আল্লাহ! তুমি কবুল করো। আমীন!