মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার ১০টি উপায়


-আতাউর রহমান*
(পর্ব-২)


(৫) তাক্বদীরের উপর বিশ্বাস রাখা : সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ সবকিছুর ক্ষেত্রেই মুমিন বান্দা তাক্বদীরের উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। আর দুঃখ-হতাশা, অভাব-অনটন, বিপদ-আপদে তাক্বদীরের উপর বিশ্বাস থাকলে কোনো মানুষই মানসিক চাপে ভোগে না। তাই মানসিক চাপের সময় মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে তাক্বদীরের উপর ছেড়ে দেওয়ায় রয়েছে মানসিক প্রশান্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ﴾

‘যমীনে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপদই আসে, তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই কিতাবে (তাক্বদীরে) লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ’ (আল-হাদীদ, ৫৭/২২)। আলোচ্য আয়াতে বলা হচ্ছে, যমীনের বুকে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপদাপদ আসে, তা সবই আমি কিতাবে তথা লওহে মাহফূযে জগৎ সৃষ্টির পূর্বেই লিখে দিয়েছিলাম। যমীনের বুকে সংঘটিত বিপদাপদ বলতে দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, ফসলের ক্ষতি, ব্যবসায় ক্ষতি, ধনসম্পদ বিনষ্ট হওয়া, ক্ষুধা ও আত্মীয়স্বজনের মৃত্যু ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। আর ব্যক্তিগত বিপদাপদ বলতে সর্বপ্রকার রোগ-ব্যাধি, ক্ষত, আঘাত ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে।[1] আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন,

﴿وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ﴾

‘আর যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো ক্ষতির স্পর্শ করান, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী আর কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমার মঙ্গল চান, তবে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তার কাছে সেটা পৌঁছে দেন। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু’ (ইউনুস, ১০/১০৭)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

﴿وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ﴾

‘আর যদি আল্লাহ তাআলা তোমাকে কোনো দুর্দশা দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূরকারী আর কেউ নেই। আর যদি তিনি তোমাকে কোনো কল্যাণ দ্বারা স্পর্শ করেন, তবে তিনি তো সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’ (আল-আনআম, ৬/১৭)। উল্লেখিত আয়াতে ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস বর্ণনা করা হয়েছে। তা হলো, প্রতিটি লাভ-ক্ষতির মালিক প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলা। সত্যিকারভাবে কোনো ব্যক্তি কারো সামান্য উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না। আল্লাহ যদি কারো লাভ করতে চান, তবে তা বন্ধ করার ক্ষমতা কারও নেই।

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উটে সওয়ার হয়ে আমাকে পিছনে বসিয়ে নিলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হে বৎস! আমি বললাম, আদেশ করুন, আমি হাযির আছি। তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর বিধিবিধানকে হেফাযত করবে, আল্লাহ তোমাকে হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহর বিধিবিধানকে হেফাযত করো, তাহলে আল্লাহকে সাহায্যের সাথে তোমার সামনে পাবে। তুমি শান্তি ও সুখস্বাচ্ছন্দের সময় আল্লাহকে স্মরণ রাখলে বিপদের সময় তিনি তোমাকে স্মরণ রাখবেন। কোনো কিছু চাইতে হলে তুমি আল্লাহর কাছেই চাও এবং সাহায্য চাইতে হলে আল্লাহর কাছেই চাও। জগতে যা কিছু হবে, ভাগ্যের লেখনী তা লিখে ফেলেছে। সমগ্র সৃষ্টজীব সম্মিলিতভাবে তোমার কোনো উপকার করতে চাইলে যা তোমার তাক্বদীরে লেখা নেই, তারা তা কখনো করতে পারবে না। পক্ষান্তরে যদি তারা সবাই মিলে তোমার এমন কোনো ক্ষতি করতে চায়, যা তোমার তাক্বদীরে লেখা নেই, তবে কখনোই তারা তা করতে সক্ষম হবে না। যদি তুমি বিশ্বাস সহকারে ধৈর্যধারণের মাধ্যমে আমল করতে পার, তবে অবশ্যই তা করো। সক্ষম না হলে ধৈর্য ধরো। কেননা তুমি যা অপছন্দ কর, তার বিপক্ষে ধৈর্যধারণ করায় অনেক কল্যাণ রয়েছে। মনে রাখবে, আল্লাহর সাহায্য ধৈর্যের সাথে জড়িত, কষ্টের সাথে সুখ, এবং অভাবের সাথে স্বাচ্ছন্দ্য জড়িত।[2]

সুধী পাঠক! অতি পরিতাপের বিষয় হলো, কুরআনের এ সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আজীবনের শিক্ষা সত্ত্বেও আমরা এই ব্যাপারে পথভ্রান্ত। আমরা সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ সবকিছুর ক্ষেত্রেই তাক্বদীরের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে চাই না। অথচ দুঃখ-হতাশা, অভাব-অনটন, বিপদ-আপদ এই সবই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এবং এটিই তাক্বদীর। আর তাক্বদীরের উপর বিশ্বাস থাকলে কোনো মানুষই মানসিক চাপে থাকবে না। তাই মানসিক চাপের সময় মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করে তাক্বদীরের উপর ছেড়ে দেওয়ার মাঝেই রয়েছে মানসিক প্রশান্তি।

(৬)  হতাশ না হওয়া : অনেক ক্ষেত্রেই হতাশা থেকে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। তাই দুনিয়ার জীবনে, বিপদ-আপদে হতাশ না হওয়াই ঈমানদারদের কাজ। যে কোনো সময় যে কোনো ধরনের বিপদাপদ আসতে পারে- এ মানসিকতা সবসময় পোষণ করতে হবে। ফলে, তা মানুষকে বিপদাপদে হতাশা থেকে রক্ষা করে মানসিক চাপমুক্ত রাখবে।

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে এসব বিপদ-আপদ দিয়ে বান্দাকে পরীক্ষার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ – الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ – أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ﴾

‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জানমাল ও ফল-ফলাদি ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। তাদেরকে যখন বিপদ-আপদ আক্রান্ত করে তখন তারা বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁর দিকেই ফিরে যাব। তাদের উপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও রহমত এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত’ (আল-বাক্বারা, ২/১৫৫-১৫৭)

উপরিউক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা সমগ্র উম্মতকে লক্ষ্য করে পরীক্ষার কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা এখানে বিপদাপদ আসার আগেই সকলকে সংবাদ দিয়েছেন। কারণ কোনো বিপদে পতিত হওয়ার পূর্বেই যদি সে সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই বিপদে ধৈর্যধারণ সহজতর হয়ে যায়। কেননা হঠাৎ করে কোনো বিপদ এসে পড়লে পেরেশানী অনেক বেশি হয়। ফলে হতাশার সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা সমগ্র উম্মতকে লক্ষ্য করেই পরীক্ষার কথা বলেছেন, সেহেতু সবারই অনুধাবন করা উচিত যে, এই দুনিয়া দুঃখ-কষ্ট সহ্য করারই স্থান। সুতরাং এখানে যেসব সম্ভাব্য বিপদ-আপদের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে অপ্রত্যাশিত কিছু মনে না করলেই ধৈর্যধারণ করা সহজ হতে পারে। এর ফলে হতাশা নামক ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। মূলত মানুষের ঈমান অনুসারেই আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করেন। একটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা, বিপদাপদ, বালা-মুছীবত নবীদেরকে প্রদান করেন। তারপর যারা তাদের পরের লোক, তারপর যারা এদের পরের লোক, তারপর যারা এর পরের লোক’।[3] অর্থাৎ প্রত্যেকের ঈমান অনুসারেই তাদের পরীক্ষা হয়ে থাকে। অন্য একটি হাদীছে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

لَا يَنْبَغِي لِلْمُؤْمِنِ أَنْ يُذِلَّ نَفْسَهُ قَالُوا وَكَيْفَ يُذِلُّ نَفْسَهُ قَالَ يَتَعَرَّضُ مِنَ الْبَلَاءِ لِمَا لَا يُطِيقُ

‘মুমিনের উচিত নয় নিজেকে অপমানিত করা। ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, কীভাবে নিজেকে অপমানিত করে? রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এমন কোনো বালা-মুছীবতের সম্মুখীন হয়, যা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই’।[4]

সুতরাং যে কোনো ধরনের বিপদাপদের সম্মুখীন হলে হতাশ না হয়ে ধৈর্যধারণ করতে হবে। আর উক্ত আয়াতে ধৈর্যশীলদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও বলা হয়েছে যে, তারা বিপদের সম্মুখীন হলে, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ উচ্চারণ : ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন পাঠ করে। এর দ্বারা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে যে, কেউ বিপদে পতিত হলে যেন এ দু‘আটি পাঠ করে। কেননা, এরূপ বলাতে যেমন অনেক নেকী লাভ করা যায়, ঠিক তেমনি যদি এ বাক্যের অর্থের দিকে যথার্থ লক্ষ্য রেখে পাঠ করা হয়, তবে বিপদে আন্তরিক শান্তি লাভ এবং তা থেকে উত্তরণের পথ সহজতর হয়ে যায়। দু‘আটির অর্থ হলো, ‘নিশ্চয় আমরা তো আল্লাহরই, আর আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করব’। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যদি আমাদের কোনো কষ্ট দেন তবে তাতে কোনো না কোনো মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তাঁর উদ্দেশ্যকে সম্মান করতে পারা একটি মহৎ কাজ। আর এটিই হচ্ছে ছবর তথা ধৈর্য।

একটি হাদীছে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে কেউ বিপদে পতিত হলে যদি এ দু‘আ পড়ে, إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ এবং বলে, اللَّهُمَّ أْجُرْنِى فِى مُصِيبَتِى وَأَخْلِفْ لِى خَيْرًا مِنْهَا উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা আজুরনি ফি মুছীবাতি ওয়া আখলিফ লি খাইরাম মিনহা’ তাহলে তাকে উত্তম বস্তু ফিরিয়ে দিবেন’।[5]  

সুধী পাঠক! উক্ত বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনা এবং রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী এটা সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, হতাশা থেকে মুক্তি পেতে হলে ধৈর্যধারণ করার বিকল্প নেই। তাই আমাদের উচিত, যে কোনো ধরনের বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা।

(৭) আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা : মানসিক অশান্তি থেকে রক্ষা পেতে মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের বিকল্প নেই। কেননা মহান আল্লাহ নিজেই বলেছেন,﴿وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾ ‘আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট’ (আত-তালাক, ৬৫/৩)। অপর এক হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ  لَرُزِقْتُمْ كَمَا تُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا

‘যদি তোমরা আল্লাহর উপর যথাযথ ভরসা করতে পার, তাহলে তোমাদের এমনভাবে রিযিক্ব দেওয়া হবে, যেভাবে পাখিকে রিযিক্ব দেওয়া হয়। পাখি সকাল বেলায় খালি পেটে (ক্ষুধার্ত অবস্থায়) বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় পেটভরে বাসায় ফিরে আসে’।[6]

আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ﴾

‘আর যমীনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিযিক্বের দায়িত্ব আল্লাহরই। আর তিনি জানেন তাদের আবাসস্থল ও সমাধিস্থল। সবকিছু আছে স্পষ্ট কিতাবে’ (হূদ, ১১/৬)। আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন,

﴿قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ – تُولِجُ اللَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَتُولِجُ النَّهَارَ فِي اللَّيْلِ وَتُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَتُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَتَرْزُقُ مَنْ تَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ﴾

‘বলুন, হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নেন। যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা আপনি হীন করেন। সমস্ত কল্যাণ আপনারই হাতে। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। আপনি রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে প্রবিষ্ট করান। আপনি মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন। আর আপনি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক্ব দান করেন’ (আলে ইমরান, ৩/২৬-২৭)। অপর এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِى بِى وَأَنَا مَعَهُ إِذَا ذَكَرَنِى ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি সে রকমই, যে রকম বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি বান্দার সঙ্গে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে’।[7]

উপরে উল্লেখিত আয়াত ও হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয়, যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে আল্লাহ তাআলা তার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং আমরা যদি সকল ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের বিপদাপদে হতাশা না হয়ে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করি যে, তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, তিনি যা চান তাই করতে পারেন, তিনিই একমাত্র সাহায্যকারী, রিযিক্বদাতা, মুছীবত থেকে উদ্ধারকারী, তিনি যাকে ইচ্ছে তাকে সম্মান দান করেন, যাকে ইচ্ছে তাকে অপমানিত করেন, এই বিশ্বাস স্থাপন করে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করতে পারি, তাহলে অবশ্যই মহান আল্লাহ আমাদের সকল বিষয় সমাধান করে দিবেন ইনশাআল্লাহ। কেননা আল্লাহর প্রতি আমরা যেরকম ধারণা পোষণ করব, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথে সেরকম আচরণ করবেন, যা উপরে উল্লেখিত হাদীছ দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়।

(৮) বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা : মৃত্যুর স্মরণ মানসিক চাপকে একেবারেই মিটিয়ে দেয়। মৃত্যুর স্মরণ মানুষের দুনিয়া ও পরকালের অনেক উপকারে আসে। যারা চরম সংকটে, পেরেশানীতে ও মানসিক চাপে ভোগে, মৃত্যুর কথা স্মরণে তাদের বিষয়গুলো সহজ হয়ে যাবে এবং এগুলো দূর হয়ে যাবে। আর যারা অতি সুখে, আরামে আছে মৃত্যুর কথা স্মরণে তাদের কাছে আরাম, সুখ সবকিছুকে তিক্ত করে তুলবে, দুনিয়ার সুখকে নগণ্য করে তুলবে।

আর পরকালের উপকারের দুটি বড় দিক রয়েছে। তা হলো, প্রথমত, মৃত্যুর কথা স্মরণে পাপকর্ম থেকে বিরত থাকবে। দ্বিতীয়ত, বান্দা যখন মৃত্যুর কথা স্মরণ করবে, তখন সে পরকালের পাথেয় সংগ্রহে তৎপর হবে। আর এজন্যই রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করতে নছীহত করেছেন। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

اسْتَكْثِرُوا مِنْ ذِكْرِ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ، فَإِنَّهُ مَا ذَكَرُهُ أَحَدٌ فِي ضِيقٍ إِلَّا وَسَّعَهُ اللَّهُ، وَلَا ذَكَرُهُ فِي سَعَةٍ إِلَّا ضَيَّقَهَا عَلَيْهِ

‘তোমরা স্বাদ কর্তনকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো। কারণ, যে ব্যক্তি কোনো সংকটে বা কষ্টের সময় তা স্মরণ করবে, সে ব্যক্তির জন্য সে সংকট বা কষ্ট সহজ হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি তা কোনো সুখের সময় স্মরণ করবে, সে ব্যক্তির নিকট সুখ তিক্ত হয়ে উঠবে’।[8]

উপরে উল্লেখিত হাদীছ দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, আমরা যখন কোনো দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা, পেরেশানীতে ও মানসিক চাপে থাকি, তখন আমরা যদি মৃত্যুর কথা স্মরণ করি, তাহলে আমাদের এ বিষয়গুলো দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

(চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. কুরতুবী, ১৭/২২০।

[2]. আহমাদ, হা/২৮০৪, ১/৩০৭; তিরমিযী, হা/২৫১৬, হাদীছ ছহীহ।

[3]. আহমাদ, ৬/৩৬৯, হাদীছ ছহীহ।

[4]. তিরমিযী, হা/২২৫৪, হাদীছ ছহীহ; ইবনু মাজাহ, হা/৪০১৬।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯১৮।

[6]. তিরমিযী, হা/২৩৪৪, হাদীছ ছহীহ; ইবনু মাজাহ, হা/৪১৬৪।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪০৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৫।

[8]. ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/২৯৯৩; হাসান ছহীহ।