মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার ১০টি উপায়!


-আতাউর রহমান*
(শেষ পর্ব)


(৯) বেশি বেশি দু‘আ করা : মানসিক চাপ দূর করতে বেশি বেশি দু‘আ করাও অন্যতম মাধ্যম। দু‘আ সম্পর্কে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, নু‘মান ইবনু বাশীর c হতে বর্ণিত, রাসূল a বলেছেন,

الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ ثُمَّ قَرَأَ وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِى أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِى سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ

‘দু‘আই হলো ইবাদত। তারপর তিনি পাঠ করেন, (অনুবাদ) ‘তোমাদের রব বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে বিমুখ হয়, নিশ্চিত তারা অচিরেই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[1] অন্য আরেকটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,مَنْ لَمْ يَسْأَلِ اللَّهَ يَغْضَبْ عَلَيْهِ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দু‘আ করে না, আল্লাহ তার উপর রাগান্বিত হন’।[2]

আসুন, আমরা এখন যেনে নিই কীভাবে এবং কোন সময়ে দু‘আ করলে দু‘আ কবুল হয় বলে রাসূলুল্লাহ a ঘোষণা করেছেন।

দু‘আ ইউনুস পাঠ করে দু‘আ করলে দু‘আ কবুল হয়। এ সম্পর্কে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

 عَنْ سَعْدٍ t قَالَ رَسُولُ اللَّهِ دَعْوَةُ ذِي النُّونِ إِذْ دَعَا رَبَّهُ وَهُوَ فِي بَطْنِ الْحُوتِ {لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ} لَمْ يَدْعُ بِهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ فِي شَيْءٍ إِلَّا اسْتُجِيبَ لَهُ.

সা‘দ c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যুননুন (মাছওয়ালা) ইউনুস e যখন মাছের পেটে ছিলেন, তখন তিনি তাঁর রবের নিকট দু‘আ করেছিলেন। তা হলো “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যলিমিন”। তারপর রাসূলুল্লাহ a বলেন, ‘যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তি যে কোনো বিষয়ে উক্ত দু‘আর মাধ্যমে দু‘আ করে, আল্লাহ অবশ্যই তার দু‘আ কবুল করেন’।[3] অন্য আরেকটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, যে কোনো ধরনের বিপদাপদে ও দুশ্চিন্তায় দু‘আ ইউনুস পাঠ করলে বিপদাপদ ও দুশ্চিন্তা দূর করে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,

أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِشَيْءٍ إِذَا نَزَلَ بِرَجُلٍ مِنْكُمْ كُرَبٌ أَوْ بَلَاءٌ مِنْ بَلَايَا الدُّنْيَا دَعَا بِهِ يُفْرَجُ عَنْهُ ؟ فَقِيْلَ لَهُ : بِلَى فَقَالَ : دُعَاءُ ذِي النُّوْنِ : لَاإلهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّيْ كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِيْنَ

‘আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় সম্পর্কে সংবাদ দিব না? তোমাদের কারো উপর যখন কোনো দুঃখ-কষ্ট অথবা দুনিয়ার কোনো বিপদ আসবে, তখন সে যদি সেই বিষয়ের মাধ্যমে দু‘আ করে, তাহলে তার থেকে বিপদ দূর করে দেওয়া হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ a-কে বলা হলো, হ্যাঁ বলুন। তখন তিনি বললেন, তা হলো যুননূন (মাছওয়ালা) ইউনুস e-এর দু‘আ। তা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যলিমীন’।[4]

নবী a বিপদের সম্মুখীন হলে যে দু‘আটি পাঠ করতেন,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ كَانَ يَقُولُ عِنْدَ الْكَرْبِ «لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ، وَرَبُّ الأَرْضِ، وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ».

ইবনু আব্বাস h থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী a বিপদের সময় বলতেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযীমুল হালীম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুল আরশিল আযীম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রব্বুল আরযি ওয়া রব্বুল আরশিল কারীম’[5] অন্য আরেকটি হাদীছে এসেছে, আনাস ইবনু মালেক c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বেশি বেশি এই দু‘আ পাঠ করতেন,

اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি ওয়াল আজযী ওয়াল কাছালি ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি ওয়া যলাইদ দায়নি ওয়া গালাবাতির রিজাল। অর্থ : হে আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও পেরশানী থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণভার ও লোকজনের প্রাধান্য থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি’।[6]

সুতরাং যেকোনো বিপদাপদে, মানসিক চাপের সময় দু‘আ ইউনুসসহ নবী a যে দু‘আগুলো পড়তেন, তা আমাদের পড়া উচিত। একটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, আনাস c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a কোনো বিষয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লে বলতেন, يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ উচ্চারণ : ইয়া হাইয়্যু, ইয়া ক্বইয়্যূমু বিরহমাতিকা আসতাগীছ। অর্থ : হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী! আমি তোমার রহমতের অসীলায় সাহায্য প্রার্থনা করছি’।[7] আর কিছু সময় রয়েছে, যে সময় দু‘আ কবুল হয়। যেমন- রাতের শেষ ভাগের দু‘আ। কারণ এসময় মহান আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন,

منْ يَدْعُونِى فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِى فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِى فَأَغْفِرَ لَهُ

‘কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? তাহলে আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন, যে আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দান করব। কে আছে এমন, যে আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব’।[8]

শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ p বলেন, যদি কোনো বান্দা শেষ রাতে সাহরীর সময় তার রবের কাছে মুনাজাত করে এবং তাঁর কাছে সাহায্য চায় এ বলে,يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ لَا إلَهَ إلَّا أَنْتَ بِرَحْمَتِك أَسْتَغِيثُ তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে এমন শক্তি দান করবেন, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না’।[9]

(১০) অল্পে তুষ্ট থাকা : অল্পে তুষ্টি মুমিন চরিত্রের ভূষণ, সুখী জীবন লাভের অন্যতম হাতিয়ার। অল্পে তুষ্টির এই অনন্য গুণটি যে অর্জন করতে পারে, জীবনের শত দুঃখ-কষ্ট ও অপূর্ণতায় তার কোনো আক্ষেপ থাকে না। আল্লাহ প্রদত্ত নির্ধারিত জীবন-জীবিকায় তিনি পরিতৃপ্ত থাকেন। অল্পে তুষ্ট থাকার মধ্যেই কল্যাণ ও সফলতার ভিত্তি প্রোথিত থাকে। কারণ অতিভোগী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও মাত্রাতিরিক্ত বিলাসী জীবন মুমিনের অন্তর থেকে আল্লাহভীতি দূর করে দেয়, ইবাদতের আগ্রহ নষ্ট করে ফেলে। মানুষকে চরম হতাশাগ্রস্ত ও অস্থির করে তোলে। তাই সুখী ও প্রশান্ত জীবন লাভের জন্য অল্পে তুষ্টির গুণ অর্জন করা অপরিহার্য। অল্পে তুষ্টির আলোচনা করা অনেকটা সহজ হলেও এই মহান গুণ অর্জন করা ততটা সহজ নয়। তবে প্রকৃত ঈমানদার ও পরহেযগার বান্দাদের জন্য এই গুণ অর্জন করা কঠিন নয়। আর অল্পতেই পরিতৃপ্ত ও সন্তুষ্ট হওয়া এ মহৎ গুণটি যার অর্জিত হবে, জীবনে শত দুঃখ-কষ্ট, হতাশা ও অপূর্ণতায় তার কোনো আক্ষেপ থাকবে না। আল্লাহ প্রদত্ত নির্ধারিত জীবন-জীবিকায় তিনি তুষ্ট থাকবেন।

অল্পে তুষ্টি অর্জনের অনেক পন্থা রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি পন্থা হলো, সবসময় নিজের চেয়ে নিম্নমানের লোকের দিকে লক্ষ করা। আর এ নিম্নমান কয়েক দিক থেকে হতে পারে। যেমন- অর্থসম্পদে, সুস্থতায়, শারীরিক গঠনে, সুখ-শান্তিতে ইত্যাদি। এতে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত হবে। লোভ-লালসা ও হতাশা দূর হয়ে যাবে। এজন্যই রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,

إِذَا نَظَرَ أَحَدُكُمْ إِلَى مَنْ فُضِّلَ عَلَيْهِ فِى الْمَالِ وَالْخَلْقِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْهُ

‘তোমাদের কারো নযর যদি এমন লোকের উপর পড়ে, যাকে ধনসম্পদ ও দৈহিক গঠনে অধিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তবে সে যেন এমন লোকের দিকে নযর দেয়, যে তার চেয়ে নিম্নস্তরে রয়েছে’।[10] অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,

انْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ

‘তোমরা নিজেদের অপেক্ষা নিম্ন অবস্থার লোকের প্রতি তাকাও। এমন ব্যক্তির দিকে তাকিয়ো না, যে তোমাদের চাইতে উচ্চ পর্যায়ের। তাহলে এ পন্থা অবলম্বনই হবে আল্লাহর নেয়ামতকে অবজ্ঞা না করার এক উপযোগী মাধ্যম’।[11]

মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল aকে অল্পে তুষ্টির নির্দেশ দিয়ে বলেন,

﴿لَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِنْهُمْ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ﴾

‘আমি তাদের কিছু শ্রেণিকে যে ভোগ-উপকরণ দিয়েছি, তার প্রতি তুমি দুই চোখ প্রসারিত করো না। আর তাদের জন্য দুঃখিত হয়ো না এবং মুমিনদের জন্য তোমার বাহু অবনত করো’ (আল-হিজর, ১৫/৮৮)। ইবনু আব্বাস h বলেন, এ আয়াতে মানুষকে অন্যের ধনসম্পদের প্রতি লোভ করতে নিষেধ করা হয়েছে’।[12]

সুধী পাঠক! পরিশেষে বলতে চাই, আমরা সকলেই কোনো না কোনোভাবে বালা-মুছীবত, দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা বা পেরেশানীর কারণে মানসিক চাপে আক্রান্ত। আর এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের উপরে উল্লেখিত আমলগুলো করা উচিত। আমাদের উচিত হতাশ না হয়ে ধৈর্যধারণ করে উক্ত আমলগুলো করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সার্বিক জীবনে অল্পে তুষ্ট থাকা এবং উপরিউক্ত আমলগুলো করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

 

[1]. আবূ দাঊদ, হা/১৪৭৯; সূরা আল-মুমিন, ৪০/৬০।

[2]. তিরমিযী, হা/৩৩৭৩, হাদীছ ছহীহ; মিশকাত, হা/২২৩৮।

[3]. তিরমিযী, হা/৩৫০৫; আহমাদ, হা/১৪৬২, হাদীছ ছহীহ।

[4]. সিলসিলা ছহীহা, হা/১৭৪৪।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩৪৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৩০।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/২৮৯৩।

[7]. তিরমিযী, হা/৩৫২৪, হাদীছ ছহীহ।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩২১; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৫৮।

[9]. মাজমূআ ফাতাওয়া, ২৮/২৪২।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৯০।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৯০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৬৩; মিশকাত, হা/৫২৪২।

[12]. তাফসীরে ত্ববারী, ১৭/১৪১।