মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার ১০টি উপায়

-আতাউর রহমান*



জীবনধারণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন আদানপ্রদান বা লেনদেনে অনেক কিছু না পাওয়ার আঘাতে হতাশ হই আমরা। হয়ে পড়ি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। শয়তানের প্ররোচনায় হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় অনেক মানুষ। ইসলাম মানুষকে হতাশ না হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট উৎসাহ প্রদান করেছে। এককথায় ইসলামে হতাশার কোনো স্থান নেই। নানাবিধ দুশ্চিন্তা ও হতাশার কারণে মানুষের মাঝে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। সাধারণত এটাকে মানসিক চাপ বলে। এসব মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে ইসলামে রয়েছে অনেক দিক-নির্দেশনা, যা মেনে চললে মানসিক চাপ দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। নিম্নে সে দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো :

(১) প্রতিদিন নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করা : কুরআন তেলাওয়াত মানুষের অন্তরকে প্রফুল্ল করে তোলে। কেননা কুরআন তেলাওয়াত মুমিনের মনের প্রফুল্লতার অনন্য উৎস। শুধু তাই নয়, কুরআন তেলাওয়াতে মুমিনের মনের প্রফুল্লতার সাথে সাথে মানসিক প্রশান্তি বাড়তে থাকে। কুরআনের আলোয় আলোকিত হয়ে মানুষ দুনিয়ার সব দুশ্চিন্তা ও হতাশা থেকে থাকে মুক্ত। কারণ যখন কেউ কুরআন তেলাওয়াত করে, তখন তার উপর শান্তি এবং রহমত বর্ষিত হয়। এই সম্পর্কে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ  قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ و مَا اجْتَمَعَ قوْم في بيتٍ من بُيُوْتِ اللهِ يَتْلُوْنَ كِتَابَ الله و يَتَدارَسُوْنَه بَيْنَهُمْ إلا نَزَلَتْ عليهم السَّكِيْنَةُ و غَشِيَتْهم الرَحْمة وحَفَّتْهُمُ المَلائِكَةُ و ذَكَرَهم اللَّهُ فِيْمَنْ عِنْدَهُ.

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর ঘরসমূহের মধ্যে কোনো এক ঘরে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং তা নিয়ে পরস্পরের মধ্যে অধ্যয়ন করে, তখন তাদের উপর (আল্লাহর পক্ষ থেকে) প্রশান্তি অবতীর্ণ হয় এবং তাদেরকে রহমত ঢেকে নেয়। আর ফেরেশতাগণ তাদেরকে ঘিরে ফেলেন। আর আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাঁর নিকটস্থ ফেরেশতামণ্ডলীর কাছে তাদের কথা আলোচনা করেন’।[1] অন্য হাদীছে এসেছে,

 عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَجُلٌ يَقْرَأُ سورةَ الكَهْفِ و عِنْدَهُ فَرَسٌ مَرْبُوْط بِشَطَنَيْنِ فَتَغَشَّتْه سَحَابَةٌ فَجَعَلَتْ تَدُوْرُ و تَدْنُوْ و جَعَلَ فَرَسُه يَنْفِرُ منها فلما أَصْبَحَ أَتَى النبي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ فَذَكَرَ ذلك له فقال تلك السَّكِيْنَة تَنَزَّلَتْ لِلْقُرْآن.

বারা ইবনু আযেব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা একটি লোক সূরা আল-কাহফ পাঠ করছিলেন। তার পাশেই দু’টি রশি দিয়ে একটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। এক খণ্ড মেঘ লোকটিকে ঢেকে নিল এবং নিকটবর্তী হতে থাকল। ঘোড়াটি তা দেখে ছুটে পালাচ্ছিল। অতঃপর যখন সকাল হলো, তখন লোকটি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট গিয়ে উক্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। তা শুনে তিনি বললেন, ঐটি প্রশান্তি ছিল, যা কুরআন তেলাওয়াতের কারণে অবতীর্ণ হয়েছে’।[2]

উক্ত হাদীছ দু’টি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কুরআন তেলাওয়াত করলে শান্তি ও রহমত বর্ষণ হয়। আর এই শান্তি ও রহমত বর্ষণের ফলে তেলাওয়াতকারীর পেরেশান ও মানসিক চাপ দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

(২) ছালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং বেশি বেশি নফল ছালাত আদায় করা : যে কোনো বিপদ-মুছীবত, পেরেশানির সময় ছালাতের মাধ্যমেই প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করা যায়। কেননা ছালাতের মাধ্যমেই বান্দা মহান আল্লাহর সাহায্য লাভ করে থাকে। তাই মানসিক প্রশান্তি লাভে ছালাতের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া খুবই জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন, وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ‘আর তোমরা ধৈর্য ও ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও’ (আল-বাক্বারা, ২/৪৫)

তাছাড়া মানুষ অনেক সময় অন্যায়, অশ্লীল পাপ কর্মে লিপ্ত হওয়ার কারণে হতাশ, চিন্তা ও পেরেশানিতে থাকে। আর এ কথা সত্য যে, ছালাতের মাধ্যমেই অন্যায়, অশ্লীল কাজ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿

أَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ

‘আপনি ছালাত ক্বায়েম করুন, নিশ্চয় ছালাত অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে’ (আল-আনকাবূত, ২৯/৪৫)

আর অবশ্যই এটা এক বিরাট সাহায্য। মানুষ যখন এসব অন্যায় থেকে বেঁচে থাকতে পারবে তখন তার দুশ্চিন্তা, পেরেশানি থাকবে না। ফলে অন্তরে প্রশান্তি আসবে এবং মানসিক চাপ দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

এছাড়া ছালাতের মাধ্যমে রিযিকের মধ্যে প্রশান্তি আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْأَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى

‘আর আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে ছালাত আদায়ের আদেশ করেন এবং নিজেও তার উপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিযিক চাই না। আমিই আপনাকে রিযিক দিব। আর শুভ পরিণাম তো তাক্বওয়াতেই নিহিত’ (ত্ব-হা, ২০/১৩২)। ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, إذا أَقَمْتَ الصلاةَ أتاك الرزقُ من حيث لا يَحْتَسِبْ ‘যখন আপনি ছালাত আদায় করবেন, তখন আপনার কাছে এমনভাবে রিযিক আসবে যে, আপনি বুঝতেই পারবেন না’।[3]

উপরে উল্লেখিত আয়াতে আলাদা আলাদা দুটি নির্দেশ রয়েছে: (ক) পরিবারবর্গকে ছালাতের আদেশ করা। (খ) নিজেও ছালাত অব্যাহত রাখা। এর এমন ফলাফল সামনে এসে যাবে, যাতে আপনার হৃদয় উৎফুল্ল হয়ে উঠবে। আপনি যদি ছালাত ক্বায়েম করেন, তবে আপনার রিযিকে কোনো ঘাটতি হবে না। কোথা থেকে রিযিক আসবে, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। আর এজন্যই রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন কোনো বিষয়ে সমস্যায় পড়তেন বা কোনো চিন্তাগ্রস্ত হতেন, তখনই তিনি ছালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন। হাদীছে এসেছে,

 عَنْ حُذَيْفَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ إِذَا حَزَبَهُ أَمْرٌ صَلَّى.

হুযায়ফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন কোনো বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখন ছালাত আদায় করতেন।[4] সুতরাং যেকোনো বিপদাপদ ও সমস্যায় ছালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তাজা করে নেওয়ার মাধ্যমে সাহায্য লাভ করা যেতে পারে। সালাফে ছালেহীন তথা ছাহাবী, তাবেঈ, তাবে তাবেঈ ও সত্যনিষ্ঠ ইমামগণ থেকে এ ব্যাপারে বহু ঘটনা বর্ণিত আছে।

(৩) বেশি বেশি ইস্তেগফার করা : মানসিক চাপ সামলাতে বেশি বেশি ইস্তেগফারের বিকল্প নেই। যেসব কারণে মানুষ মানসিক চাপে পড়ে, তন্মধ্যে অন্যায়-অপরাধ বেশি করা, অর্থকষ্টে থাকা, সন্তানসন্ততি ও জীবিকার অপ্রতুলতা ইত্যাদি। এসবের সমাধানে কুরআনের নির্দেশ হলো ইস্তেগফার করা। এ ইস্তেগফারেই মানুষ উল্লেখিত সমস্যা থেকে সামাধান খুঁজে পায় বলে আল্লাহ তাআলা নবী নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন। নবী নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর জাতিকে বললেন,

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا – يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا – وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا

‘অতঃপর আমি বললাম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। আর তোমাদেরকে ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দিবেন আর দিবেন নদীনালা’ (নূহ, ৭১/১০-১২)

আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে বলেন,

وَأَنِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَتَاعًا حَسَنًا إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِي فَضْلٍ فَضْلَهُ وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ كَبِيرٍ

‘আর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা চাও। অতঃপর তাঁর কাছে ফিরে যাও, তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দিবেন। আর প্রত্যেক আনুগত্যশীলকে তাঁর আনুগত্য মোতাবেক দান করবেন। আর যদি তারা ফিরে যায়, তবে আমি নিশ্চয় তোমাদের উপর বড় এক দিনের শাস্তির ভয় করছি’ (হূদ, ১১/৩)

অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে পূর্বের গুনাহ হতে ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। আর এতে তোমরা দুনিয়ায় তোমাদের অবস্থান করার জন্য যে সময় নির্ধারিত রয়েছে, সেই সময় পর্যন্ত তিনি তোমাদের খারাপভাবে নয়; বরং ভালোভাবেই রাখবেন। তাঁর নেয়ামতসমূহ তোমাদের উপর বর্ষিত হবে। তাঁর বরকত ও প্রাচুর্য লাভে তোমরা ধন্য হবে। তোমরা সচ্ছল ও সুখী-সমৃদ্ধ থাকবে। তোমাদের জীবন শান্তিময় ও নিরাপদ হবে। তোমরা লাঞ্ছনা, হীনতা ও দীনতার সাথে নয়; বরং সম্মান ও মর্যাদার সাথে জীবনযাপন করবে। এই হলো ইস্তেগফার ও তওবার ফল।

বেশি বেশি ইস্তেগফার করলে বিপদ, দুশ্চিন্তা দূর হয় এবং রিযিকের ব্যবস্থা হয়। এক হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ مَنْ لَزِمَ الاستغفار جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا و مِنْ كُلِّ ضَيْقٍ مَخْرَجًا و رَزَقَهُ مِنْ حَيْثِ لا يَحْتَسِبُ.

ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে প্রত্যেক বিপদ থেকে রক্ষা করবেন, সকল দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দিবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না’।[5] ইমাম ইবনুল মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীছটিকে হাসান বলেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মুহাদ্দিছ হাদীছটি দুর্বল বলেছেন। শায়েখ উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই হাদীছটি দুর্বল। কিন্তু তার অর্থ ছহীহ। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, আর তোমাদেরকে ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দিবেন আর দিবেন নদীনালা’ (নূহ, ৭১/১০-১২)। আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, ‘আর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা চাও। অতঃপর তাঁর কাছে ফিরে যাও, তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দিবেন। আর প্রত্যেক আনুগত্যশীলকে তাঁর আনুগত্য মোতাবেক দান করবেন। আর যদি তারা ফিরে যায়, তবে আমি নিশ্চয় তোমাদের উপর বড় এক দিনের শাস্তির ভয় করছি’ (হূদ, ১১/৩)। অতঃপর শায়খ উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইস্তেগফার করা পাপ মোচন হওয়ার একটি মাধ্যম। আর যখন পাপ মোচন করে দেওয়া হয়, তখন মানুষের রিযিক অর্জন হয় এবং তার থেকে সকল দুঃখ-কষ্ট ও সকল চিন্তা দূর হয়ে যায়। অতএব হাদীছটির সনদ দুর্বল হলেও হাদীছের অর্থ ছহীহ।[6] শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীছটি দুর্বল। কিন্তু ইস্তেগফারের ফযীলত ও এর প্রতি উৎসাহ প্রদান সম্পর্কে অনেক আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদীছ রয়েছে।[7]

(৪) বেশি বেশি দরূদ পাঠ করা : দুশ্চিন্তায় ও পেরেশানিতে বেশি বেশি দরূদ পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা রহমত বর্ষণ করেন। আর এই রহমত মানুষকে যাবতীয় মানসিক চাপ থেকে মুক্ত করে। এটি মানবাত্মা প্রশান্তি লাভের সহজ উপায়ও বটে। দরূদ পাঠের মাধ্যমে দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর হয়। আর এ বিষয়ে সুস্পষ্ট হাদীছ বর্ণিত হয়েছে,

 عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أُكْثِرُ الصَّلَاةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلَاتِي فَقَالَ مَا شِئْتَ قُلْتُ الرُّبُعَ قَالَ مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ قُلْتُ النِّصْفَ قَالَ مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ قُلْتُ فَالثُّلُثَيْنِ قَالَ مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ قُلْتُ أَجْعَلُ لَكَ صَلَاتِي كُلَّهَا قَالَ إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ وَيُكَفَّرُ لَكَ ذَنْبُكَ.

উবাই ইবনু কা‘ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি তো আপনার প্রতি খুব অধিকহারে দরূদ পাঠ করি। আপনার প্রতি দরূদ পাঠের জন্য আমি আমার সময়ের কতটুকু খরচ করব? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা কর। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা কর। তবে এর চেয়ে অধিক পরিমাণে পাঠ করতে পারলে এতে তোমারই মঙ্গল হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি কি অর্ধেক সময় দরূদ পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা কর। তবে এর চেয়ে বেশি পরিমাণে পাঠ করতে পারলে, সেটা তোমার জন্যই কল্যাণকর হবে। আমি বললাম, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা কর। তবে এর চেয়ে বেশি সময় পাঠ করলে তোমারই ভালো। আমি বললাম, তাহলে আমি আমার পুরো সময়টাই আপনার উপর দরূদ পাঠ করে কাটিয়ে দিব। তিনি বললেন, তাহলে তোমার চিন্তা ও দুঃখের জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে’।[8] অন্য এক হাদীছে এসেছে,

 عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ إنَّ جِبْرِيلَ جاءني فقال مَنْ صَلَّى عَلَيْكَ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا، وَرَفَعَ لَهُ عَشْرَ دَرَجَاتٍ.

আনাস ইবনু মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘নিশ্চয় জিবরীল (আলাইহিস সালাম) আমার নিকট এসে বললেন, যে ব্যক্তি আপনার উপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার উপর ১০ বার রহমত বর্ষণ করেন এবং ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন’।[9] অন্য হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

مَنْ صَلَّى عَلَىَّ صَلاَةً وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ وَحَطَّ عَنْهُ عَشْرَ خَطِيئَاتٍ

‘যে ব্যক্তি আমার উপর এক বার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার উপর দশ বার রহমত বর্ষণ করবেন এবং তার থেকে দশটি পাপ মোচন করে দিবেন’।[10] আরো একটি হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, مَنْ صَلَّى عَلَىَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا ‘যে ব্যক্তি আমার উপর এক বার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার উপর দশ বার রহমত বর্ষণ করেন’।[11]

সুধী পাঠক! উপরিউক্ত হাদীছগুলো দ্বারা চারটি বিষয় প্রমাণিত হয়। তা হলো— ১. দরূদ পাঠ করলে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট দূর হয়। ২. পাপ মোচন করা হয়। ৩. রহমত বর্ষণ হয়। ৪. মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়।

(চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৯৯; আবূ দাঊদ, হা/১৪৫৫; ইবনু মাজাহ, হা/২২৫।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০১১; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৯৫।

[3]. ইবনু কাছীর, ৫/৩২৭।

[4]. আবূ দাঊদ, হা/১৩১৯, হাদীছ হাসান; মিশকাত, হা/১৩২৫।

[5]. আবূ দাঊদ, হা/১৫১৮; ইবনু মাজাহ, হা/৩৮১৯।

[6]. ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব, ইবনু উছায়মীন, ক্যাসেট নং ২৩৮।

[7]. মাজমূ ফাতাওয়া ইবনে বায, ২৬/৯০।

[8]. তিরমিযী, হা/২৪৫৭, হাদীছ হাসান; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৬৭০; মিশকাত, হা/৯২৯।

[9]. সিলসিলা ছহীহা, ২/৩২৮; আদাবুল মুফরাদ, হা/৬৪২।

[10]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১২০১৭; আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/৬৪৩, হাদীছ ছহীহ।

[11]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪০৮; মিশকাত, হা/৯২১