মাহে রজব ও মিরাজ

মুহাম্মাদ গিয়াসুদ্দীন

নিষিদ্ধ ও সম্মানিত মাসগুলোর মধ্যে রজব একটি। এ মাসেই মি‘রাজ সংঘঠিত হয়েছিল। মি‘রাজ বিশ্বনবী (ছাঃ)-এর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ মি‘রাজ রজনীতেই মানব জাতির শ্রেষ্ঠ ইবাদত পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয হয়। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলেন, سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ‘মহাপবিত্র মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি আপন বান্দাকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আক্বছা পর্যন্ত, যার চারদিক আমি বরকত দিয়ে ভরে রেখেছি। যাতে আমি তাঁকে আমার কিছু নির্দশন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয় তিনি সবকিছু শোনেন এবং সবকিছু দেখেন’ (বনী ইসরাঈল,  ১)।

রজব হারাম মাসের একটি :

আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলেন, إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন হতেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর নিকট মাস গণনায় বারোটি মাস, তন্মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এটার মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না এবং তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করবে, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে এবং জেনে রাখো, আল্লাহতো মুত্তাক্বীদের সঙ্গে আছেন’ (তওবাহ, ৩৬)।

চার হারাম মাস হচ্ছে মুহাররাম, রজব, যিলক্ব‘দ ও যিলহজ্জ। আবু বাকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করেন, إِنَّ الزَّمَانَ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللَّهُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا مِنْهَا، أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاَثٌ مُتَوَالِيَاتٌ، ذُو الْقَعْدَةِ وَذُو الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ‏‏ ‘আল্লাহ তা‘আলা যেদিন আসমান-যমীন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন যামানা যেরূপ ছিল, তা চক্রাকারে ঘুরে আবার সেস্থানে এসে পৌঁছেছে। বছরে বারো মাস। এর মধ্যে চার মাস হারাম (পবিত্র), তন্মধ্যে পর পর তিন মাস হলো, যুলক্ব‘দ, যুলহজ্জ ও মুহাররম, আর মুযার গোত্রের রজব মাস, যা জুমাদাছ ছানী ও শা‘বানের মাঝখানে অবস্থিত।[1]

রজবকে হারাম নামে নামকরণের কারণ :

রজবকে হারাম নামে নামকরণের কারণ হলো, তাতে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ। তবে শত্রু প্রথমে আক্রমণ করলে প্রতিরোধ করা বৈধ। এ কারণেই তাকে বলা হত বধির রজব, তাতে হাক দেওয়া হত না যোদ্ধাদের সমবেত হওয়ার জন্য কিংবা তাতে শোনা যেত না অস্ত্রের ঝনঝনানি।

কিংবা তাকে হারাম বলা হয় এ কারণে যে, অন্যান্য মাসের নিষিদ্ধ কর্মের তুলনায় এ মাসের নিষিদ্ধ কর্ম অধিক দূষণীয়।

মিরাজের সঠিক সন ও তারিখ :

মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছিল রজব মাসে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মি‘রাজ যখন হয়েছিল, তখন সাল ও তারিখ লিখার চর্চা ছিল না বলে মি‘রাজ সংঘটনের সঠিক সাল ও তারিখ নিয়ে বহু মতভেদ হয়েছে। হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহিঃ) বলেন, এ ব্যাপারে ১০টিরও বেশি অভিমত আছে।[2]

(১) কারও মতে, হিজরতের ছয় মাস আগে।

(২) ইমাম ইবনুল জাওযী (রহিঃ)-এর মতে, নবুঅতের ১২ সনের ২৭ রজবের রাতে।[3]

(৩) ইবনে সা‘দ (রহিঃ)-এর বর্ণনায় আছে, হিজরতের এক বছর আগে ১৭ রবীউল আউয়ালে।

(৪) তার অন্য বর্ণনায়- মি‘রাজ সংঘটিত হয় মদীনায় হিজরতের আঠারো মাস আগে ১৭ রামাযান, শনিবার রাতে।[4]

(৫) আল্লামা সুদ্দী (রহিঃ) বলেন, সতের মাস আগে।

(৬) ইবনে কুতাইবা (রহিঃ)-এর বর্ণনায়- আঠারো মাস আগে।

(৭) ইবনুল আছীর (রহিঃ)-এর মতে, হিজরতের তিন বছর আগে।

(৮) আল্লামা ইবনু আব্দিল বার্র (রহিঃ) প্রমুখ বলেন, মি‘রাজ ও হিজরতের মাঝে চৌদ্দ মাসের ব্যবধান ছিল।[5]

(৯) ইবরাহীম হারবী (রহিঃ)-এর মতে, হিজরতের এগারো মাস আগে।

(১০) ইবনে ফারিস (রহিঃ) বলেন, পনেরো মাস আগে।

(১১) ক্বাযী ঈয়ায ও কুরতুবী এবং ইমাম নববী (ছাঃ) প্রমুখ যুহরী (রহিঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, হিজরতের পাঁচ বছর আগে মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছিল।[6]

(১২) হাফেয ইবনু কাছীর (রহিঃ) খ্যাতনামা জ্যেষ্ঠ তাবেঈ ইবনু শিহাব যুহরী (রহিঃ)-এর বরাতে বলেন, হিজরতের এক বছর পূর্বে মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছিল।[7]

(১৩) আল্লামা ক্বাযী সুলাইমান মানছূরপুরী (রহিঃ)-এর মতে, মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছিল নবুঅতের দশম সনে ২৭ রজবের রাতে।[8]

(১৪) ইংরেজি তারিখ ছিল ৬২০ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ তথা হিজরতের দু’বছর আগে ২৭ রজবের রাতে।[9]

বর্তমানে সবারই মতে, ঐ রাতটা ছিল ২৭ রজবের রাত এবং সালটা ছিল নবুঅতের ১০ম সন।

মিরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা :

রাসূল (ছাঃ) মক্কায় মসজিদে হারাম হতে বুরাকে চড়ার পর জিবরীল (আঃ)-এর সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে রওয়ানা হন। হঠাৎ রাস্তার এক দিকে তিনি একটি বুড়িকে দেখতে পান। তিনি (ছাঃ) বলেন, এটা কে? হে জিবরীল! তিনি বলেন, চলুন, হে মুহাম্মাদ! তিনি চলতে থাকেন। আবার রাস্তার ধারে একটি জিনিস তাকে ডাকলো, আসুন, হে মুহাম্মাদ! তখন জিবরীল (আঃ) তাকে বলেন, চলুন, হে মুহাম্মাদ! তাই তিনি চলতে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহ্র সৃষ্টির মধ্যে কিছু সৃষ্টির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলো। তারা বললেন, আসসালামু আলাইকা, হে হাশির! (যার পরে কেউ নেই)। তখন তাকে জিবরীল (আঃ) বলেন, আপনি সালামের জবাব দিন। তাই তিনি সালামের জবাব দিলেন। তারপর তিনি দ্বিতীয় ও তৃতীয়জনের সাক্ষাৎ পেলেন। তাদেরকেও তিনি ঐরূপ বললেন। পরিশেষে তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে গেলেন। অতঃপর তার কাছে পানি, মদ এবং দুধ পেশ করা হলো। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দুধটাকে গ্রহণ করলেন। অতঃপর জিবরীল (আঃ) বলেন, আপনি স্বভাবজাত প্রকৃতিকে পেয়ে গেছেন। আপনি যদি পানিটা পান করতেন, তাহলে আপনি ডুবে যেতেন এবং আপনার উম্মতও ডুবে যেত। আর আপনি যদি মদটা পান করতেন, তাহলে আপনি পথভ্রষ্ট হতেন এবং আপনার উম্মতও বিভ্রান্ত হয়ে যেত। …তারপর জিবরীল (আঃ) বলেন, সেই বুড়িটা যাকে আপনি রাস্তার ধারে দেখেছিলেন, সে হচ্ছে পৃথিবীর সেই অংশ যতটা বয়স এই বুড়িটার বাকী আছে। আর সে চেয়েছিল যে, আপনি তার প্রতি আকৃষ্ট হন। সে ছিল আল্লাহর দুশমন ইবলীস। সে চেয়েছিল যে, আপনি তার দিকে ঝুঁকে যান। আর যারা আপনাকে সালাম দিয়েছিলেন তারা হলেন ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আঃ)।[10]

এছাড়াও বায়তুল মুকাদ্দাসের পথে আরও অনেক শিক্ষণীয় ঘটনা অবলোকন করেন। তিনি (ছাঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেন এবং সকল নবী (ছাঃ)-এর ইমাম হয়ে তিনি দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করেন। তারপর তিনি (ছাঃ) জিবরীল (আঃ)-এর সাথে প্রথম আসমান হয়ে সপ্তম আসমানে গিয়ে আল্লাহর দীদার লাভে ধন্য হন। রাসূল (ছাঃ) প্রথম আসমান থেকে সপ্তম আসমান পর্যন্ত অনেক নবী (ছাঃ)-এর সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হয়েছিল।

মিরাজের  উপহার :

আনাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে, ‘যখন আমি পালনকর্তা এবং মূসা (আঃ)-এর মাঝে ফিরাফিরি করছিলাম, তখন একবার আল্লাহ বললেন, হে মুহাম্মাদ! এই পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত দিন ও রাতে থাকল। প্রত্যেক ছালাতের জন্য দশ নেকী। তাই ওটা পঞ্চাশ ছালাত হলো। যে ব্যক্তি ভালো কাজের সংকল্প করবে, অতঃপর সে ঐ কাজটা না করবে, তার জন্য একটি নেকী লিখা হবে। কিন্তু সে যদি ওটা করে, তাহলে তার জন্য দশটা নেকী লিখা হবে। আর যে ব্যক্তি একটি মন্দ কাজের সংকল্প করবে, অথচ ওটাকে সে না করবে, তার জন্য কোনো জিনিসই লেখা হবে না। কিন্তু সে যদি ওটাকে করে ফেলে, তাহলে তার জন্য একটি মন্দ লিখা হবে।[11]

বিশিষ্ট ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (আঃ) বলেন, মি‘রাজের রাতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে তিনটি জিনিস দেওয়া হয়েছিল, (১) পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত (২) সূরা বাক্বারার শেষাংশ (৩) তার উম্মতের যে ব্যক্তি কোনো জিনিসকেই আল্লাহর সাথে শরীক করে না তার ধ্বংসাত্মক পাপগুলোকে ক্ষমা করা।[12]

মাহে রজব ও মিরাজে করণীয় ও বর্জনীয় :

রজব মাস ও এ মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাত তথা মি‘রাজ উপলক্ষে আমাদের সমাজে বিভিন্ন সভা-সেমিনারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ইবাদত পালন করা হয়। যেমন-ছালাত, ছিয়াম ইত্যাদি। আসলে এগুলোর কুরআন ও সুন্নাহতে ভিত্তি আছে কিনা এ সম্পর্কে কোনো খেয়াল করা হয় না।  নিম্বে এ সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো।

রজবে ওমরা পালন :

মুসলিমদের কোনো কোনো উপদল রজব মাসকে বিশেষভাবে ওমরা পালনের মাস হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। তাদের বিশ্বাসে রয়েছে, প্রভূত ফযীলত এবং পরকালীন পুরস্কার। প্রকৃত সত্য ও শুদ্ধ মত হলো, রজব অন্যান্য মাসের মত, তার আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই অন্য মাসের তুলনায়। তাতে ওমরা পালনের বিশেষ কোনো ফযীলত বর্ণনা করা হয়নি। ওমরা পালনের ক্ষেত্রে সময় সংশ্লিষ্ট আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী রামাযান মাস এবং হাজ্জে তামাত্তুর জন্য হজ্জের মাসগুলো। এ মাসগুলোয় ওমরা পালনের বিশেষ ফায়দা হাদীছ দ্বারা সাব্যস্ত ও প্রমাণিত। হাদীছের কোথাও এ স্বীকৃতি পাওয়া যায় না যে, রাসূল (ছাঃ) এমাসে ওমরা পালন করেছেন। তাছাড়া, বিষয়টিকে আয়েশা ম সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন।

ছালাতুর রাগায়েব :

রজব মাসের অন্যতম বিদ‘আত ছালাতুর রাগায়েব। এ ছালাত পড়া হয় রজব মাসের প্রথম শুক্রবার মাগরিব ও এশার মাঝে। আর তার আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দিনে ছিয়াম রাখা হয়। এ ছালাতের ভিত্তি একটি বানোয়াট হাদীছ। সেই হাদীছে তার ফযীলত ও পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে।

ছালাতুর রাগায়েব আদায়ের বানোয়াট পদ্ধতি :

আনাস (ছাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘রজব হলো মহান আল্লাহর মাস, আর শা‘বান আমার মাস এবং রামাযান আমার উম্মতের মাস। কোনো ব্যক্তি যদি রজবের প্রথম বৃহস্পতিবার ছিয়াম রাখে এবং শুক্রবার মাগরিব ও এশার মাঝে বারো রাক‘আত ছালাত আদায় করে, প্রতি রাক‘আতে সূরা ফাতিহা পড়ে একবার, সূরা ক্বদর তিনবার, ইখলাছ ১২ বার। এভাবে প্রতি দুই রাক‘আত পর সালাম ফিরায়, তারপর আমার ওপর ৭০ বার এ দরূদ পড়ে, ‘আল্লাহুম্মা ছাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিন আন-নাবিয়্যি ওয়া ‘আলা আলিহ’ অতঃপর একটা সিজদা দেয়, তাতে ৭০ বার পাঠ করে ‘সুব্বূহুন কুদ্দূসুন, রাব্বুল মালাইকিতি ওয়ার রূহ’। তারপর সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে বলে, রব্বিগফির লী, ওয়ারহাম, ওয়া তাজাওয়ায আম্মা তা‘লাম, ইন্নাকা আনতাল আযীযুল আযীম’ ৭০ বার। অতঃপর ২য় সিজদা দেয় এবং প্রথম সিজদায় যা যা পড়েছে, সেগুলো পড়ে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার নিকট তার প্রয়োজন তুলে ধরে দু‘আ করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তা পূরণ করেন’।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! কোনো বান্দা অথবা বান্দী যদি এই ছালাত আদায় করে, তবে তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়, যদিও তা সাগরের ফেনা এবং বৃক্ষরাজির পাতা সমপরিমাণ হয় এবং তার পরিবার-পরিজনের মধ্য থেকে ৭০ জনের জন্য তার শাফা‘আত কবুল করা হয়। আর কবরের প্রথম রজনীতে এই ছালাতের ছওয়াব তার সামনে এসে হাজির হয় উজ্জ্বল চেহারা আর মিষ্টভাষী হয়ে আর বলে, হে আমার বন্ধু! আমি তোমার সেই ছালাতের ছওয়াব যা তুমি অমুক মাসের অমুক রাতে পড়েছিলে। আজ রাতে তোমার নিকট এসেছি যেন তোমার প্রয়োজন পূরণ করি, তোমার নিঃসঙ্গতা ও ভয়-ভীতি দূর করি। যে দিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, সে দিন ক্বিয়ামতের মাঠে তোমার মাথার উপর ছায়া দিব। সুসংবাদ নাও, তোমার প্রভু থেকে কখনোই কল্যাণ বঞ্চিত হবে না’।

উক্ত হাদীছটি ইবনুল জাওযী (রহিঃ) তার জাল হাদীছের কিতাবে উল্লেখ করার পর বলেন, এটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ওপর মিথ্যারোপ ছাড়া কিছুই নয়। এ হাদীছটির রচনাকারী হিসাবে যে ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়, সে হলো ইবনু জুহাইম। মুহাদ্দিছগণ এ মিথ্যারোপকে তার দিকেই সম্বন্ধ করেছেন।[13]

তিনি বলেন, আমাদের শায়খ আব্দুল ওয়াহহাব (রহিঃ) বলেন, এ হাদীছটির সনদের বর্ণনাকারীগণ অজ্ঞাত। এদের পরিচয় জানার জন্য ইলমুর রিজালের কিতাবাদি তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোথাও তাদের সম্পর্কে তথ্য পাইনি।

শাওকানী (রহিঃ) তার আল-ফাওয়ায়িদুল মাজমূ‘আহ কিতাবের ৪৭-৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন, এ হাদীছটি বানোয়াট এবং এর বর্ণনাকারীগণ অজ্ঞাত। আর এটাই ছালাতুর রাগায়েব নামে পরিচিত। হাফেযে হাদীছগণ একমত যে, এটি জাল হাদীছ।[14]

ফিরোযাবাদী (রহিঃ) আল-মুখতাছার কিতাবে বলেন, সর্বসম্মতিক্রমে এটি জাল। অনুরূপ কথা বলেন ইমাম মাক্বদেসী (রহিঃ)। এ হাদীছটি রাযীন ইবনু মু‘আবিয়াহ আল-আব্দারী (রহিঃ)-এর কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কথা হলো, তিনি তার কিতাবে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করতে গিয়ে অনেক বানোয়াট ও অদ্ভুত কথাবার্তা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কোথা থেকে এসব বর্ণনা করেছেন তা জানা যায় না। এটা মুসলিমদের প্রতি তার বিশ্বাসঘাতকতা।[15]

ইবনুল জাওযী (রহিঃ) বলেন, এ হাদীছটির মাধ্যমে বাড়াবাড়ি রকমের বিদ‘আত চালু করা হয়েছে। কারণ, যে ব্যক্তি এ ছালাত পড়তে চায়, তাকে দিনে ছিয়াম রাখতে হবে। দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম থাকলেও হয়তো সে ছিয়াম রাখল। কিন্তু ইফতার করার সময় ভালো করে খাওয়া দাওয়া সম্ভব হলো না। তারপরও মাগরিবের ছালাত আদায় করার পর লম্বা তাসবীহ আর দীর্ঘ সিজদা দিয়ে এই ছালাত পড়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে সেই ব্যক্তির কষ্ট চরম পর্যায়ে পৌঁছবে।

রামাযান মাস আর রামাযানের তারাবীহর ছালাতের ব্যাপারে আমার মনে কষ্ট লাগছে। কীভাবে তথাকথিত এই ছালাতকে রামাযান ও তারাবীহর সাথে টক্কর লাগানো হয়েছে!! সাধারণ লোকজনের নিকট তো এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। যে ব্যক্তি ফরয ছালাতের জামা‘আতে শরীক হতো না সেও এই ছালাতে হাযির হবে।[16]

সর্বপ্রথম কোথায় এবং কখন চালু হল এই ছালাত? :

এই ছালাত সর্বপ্রথম চালু হয় বায়তুল মুকাদ্দাসে। সেটা ছিল ৪৮০ হিজরীর পরে। এর আগে কখনো কেউ এ ছালাত আদায় করেনি।

গাযালী (রহিঃ) আনাস (রাঃ)-এর নামে বর্ণিত উপর্যুক্ত হাদীছটি উল্লেখ করার পর এটির নাম দেন রজবের ছালাত। আর বলেন, এটা পড়া মুস্তাহাব! আরও বলেন, এটি ঐ সকল নিয়মিত ছালাতের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো প্রতিবছর একবার করে আসে। যেমন, শা‘বানের শবেবরাতের ছালাত, রজবের ছালাত ইত্যাদি। এর মর্যাদা যদিও তারাবীহ এবং ঈদের ছালাতের পর্যায়ের নয় তথাপি যেহেতু একাধিক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন, আর বায়তুল মুকাদ্দাসের লোকজনও সর্বসম্মতভাবে নিয়মিত আদায় করে আসছে, এমনকি তারা কাউকে এই ছালাত ছাড়ার অনুমতি দেয় না। তাই এটার উল্লেখ করা ভালো মনে করলাম।[17]

অথচ মোটেও কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না যে, নবী (ছাঃ) বা তার কোনো ছাহাবী কখনো তা পড়েছেন বা পড়তে বলেছেন অথবা কোনো সালাফে ছালেহীন থেকে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।[18]

ছালাতুর রাগায়েবের ব্যাপারে ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহিঃ) বলেন, ছালাতুর রাগায়েবের কোনো ভিত্তি নেই বরং এটি বিদ‘আত। সুতরাং একাকী কিংবা জামা‘আতের সাথে পড়াকে মুস্তাহাব বলা যাবে না। বরং ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, মহান আল্লাহর নবী (ছাঃ) বিশেষভাবে শুধু জুম‘আর রাতে নফল ছালাত পড়তে আর দিনের বেলা ছিয়াম রাখতে নিষেধ করেছেন। ছালাতুর রাগায়েবের ব্যাপারে যে হাদীছটি উল্লেখ করা হয়, তা আলেমগণের সর্বসম্মত মতানুসারে বানোয়াট। কোনো সালাফে ছালেহীন অথবা ইমাম আদৌ এটি উল্লেখ করেননি।[19]

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (ছাঃ) বলেন, অনুরূপভাবে রজব মাসের প্রথম শুক্রবারে ছালাতুর রাগায়েব পড়ার ব্যাপারে হাদীছগুলো বানোয়াট ও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ওপর মিথ্যারোপ।[20]

মিরাজের রাতে নফল ছালাত :

অনেক মুসলিম ভাই ও বোনেরা মি‘রাজ উপলক্ষ্যে কেউ ১২ রাক‘আত, কেউ ২০ রাক‘আত ছালাত আদায় করে থাকেন। ইসলামী শরী‘আতে মি‘রাজের ছালাত বলে কিছু নেই। নফল ছালাত পড়া ছওয়াবের কাজ কিন্তু মি‘রাজ উপলক্ষ্যে নফল ছালাত আদায় করার কোনো ভিত্তি ও প্রমাণ ইসলামে নেই। কাজেই মি‘রাজের নামে নফল ছালাত আদায় করা এবং এর ব্যবস্থা প্রণয়ন করা মানে ইসলামী শরী‘আতে নিজের পক্ষ থেকে কিছু সংযোজন করা। আর এ ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে আমাদের ধর্মে এমন কিছু সংযুক্ত বা উদ্ভাবন করবে, যা তার (শরী‘আতের) অংশ নয় তা প্রত্যাখ্যাত হবে’।[21]

মি‘রাজ উপলক্ষে রজব মাসের ফযীলত সম্পর্কেও বহু জাল হাদীছ শোনা যায়। তন্মধ্যে কতিপয় নিম্বে উদ্ধৃত হলো- ১. আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রজবের প্রথম রজনীতে মাগরিবের ছালাতের পর বিশ রাক‘আত ছালাত আদায় করবে, যার প্রত্যেক রাক‘আতে সূরা ফাতিহা ও সূরা ইখলাছ পড়বে …’। অতঃপর দীর্ঘ হাদীছ বর্ণনা করেছেন। ইবনুল জাওযী (রহিঃ) বলেন, হাদীছটি মাওযূ‘ বা জাল।[22]

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রজবের রজনীতে চৌদ্দ রাক‘আত ছালাত আদায় করবে, যার প্রত্যেক রাক‘আতে সূরা ফাতিহা একবার, সূরা ইখলাছ বিশ বার, কুল আঊযু বিরব্বিল ফালাক্ব তিনবার, কুল আঊযু বিরব্বিন নাস তিনবার পড়বে। অতঃপর ছালাত হতে ফারেগ হয়ে দশবার দরূদ পড়বে… ’ ইত্যাদি। ইবনুল জাওযী (রহিঃ) বলেন, হাদীছটি মাওযূ‘।[23]

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রজবের দিবসে ছিয়াম পালন করবে এবং চার রাক‘আত ছালাত আদায় করবে, যার প্রথম রাক‘আতে একশবার আয়াতুল কুরসী পড়বে…’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ইবনুল জাওযী (রহিঃ) বলেন, হাদীছটি মাওযূ‘। এর সনদে ওছমান নামক রাবী মুহাদ্দিছগণের দৃষ্টিতে পরিত্যক্ত।[24]

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ২৭ রজব (অর্থাৎ মি‘রাজের রাত্রিতে) ইবাদত করবে, তার আমলনামায় একশ’ বছরের ইবাদতের ছওয়াব লিখা হবে’। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহিঃ) বলেন, রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতের ছালাতের ব্যাপারে ওলামায়ে ইসলাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, এটি প্রমাণযোগ্য নয়।[25]

একটি অতি প্রচলিত ভিত্তিহীন হাদীছের দৃষ্টান্ত,  اَلصَّلَاةُ مِعْرَاجُ الْمُؤْمِنِيْنَ ‘ছালাত হলো মুমিনদের মি‘রাজ’।[26] আল্লামা ইবনু রজব, ইবনু হাজার আসক্বালানী, সুয়ূত্বী, মোল্লা আলী ক্বারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিছ (রহিঃ) একবাক্যে বলেছেন, রজব মাসে বিশেষ কোনো ছালাত বা রজব মাসের কোনো দিনে বা রাতে কোনো বিশেষ পদ্ধতিতে বিশেষ ছালাত আদায় করলে বিশেষ ছওয়াব পাওয়া যাবে, এ মর্মে একটি হাদীছও গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বাতিল। কেননা, এ সবই বানোয়াট।[27]

রজব মাসে পশু জবেহ করা একটি জাহেলী কুসংস্কার :

ইসলাম পূর্ব জাহেলী যুগে রজব মাসে মুশরিকদের মধ্যে স্বীয় দেবতা/প্রতিমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু যবাই করার একটি রেওয়াজ ছিল। একে ‘আতীরা’ বলা হত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই শিরকী রেওয়াজের মূলোৎপাটন করেছেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘এখন ফারা এবং আতীরা নেই’।[28]

ইমাম আবুদাঊদ (রহিঃ) বলেন, কেউ কেউ বলেন, ফারা বলা হয় উটের প্রথম ভূমিষ্ঠ বাচ্চাকে। প্রাচীনকালে লোকেরা তাদের উপাস্য ত্বাগূতের জন্য একে বলি দিত। অতঃপর তার গোশত খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করত, চামড়া ঝুলিয়ে রাখত গাছের ডালে। আতীরা বলা হয় রজবের দশ তারিখে উপাস্যের উদ্দেশ্যে যে পশু বলি দেওয়া হয়, তাকে।[29]

আজকাল রজব মাসে খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী (রহিঃ)-এর মাযারে তার ওফাত উপলক্ষ্যে যে ‘উরস’ হয় সেখানে এমন অনেক পশু জবাই করা হয় যা মূর্খ লোকেরা খাজা (রহিঃ) বা তার মাযারের নামে মানত করে থাকে। জাহেলী যুগের ফারা বা আতীরা আর বর্তমানের এসব জবাইকৃত পশুর মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কারও নামে মানত করা, তা যদি পীর-বুযুর্গের নামেও হয় তবুও তা শিরক। আমাদের দেশেও খাজা আজমীরী (রহিঃ)-এর ওফাতকে কেন্দ্র করে জাহেল লোকেরা এমনসব রসম-রেওয়াজ উদ্ভাবন করেছে, যা কঠোরভাবে পরিহার করে চলা উচিত। বিভিন্ন স্থানে লাল কাপড়ে মোড়ানো বিরাট ‘আজমীরী ডেগ’ বসানো হয়। কোথাও কোথাও মাযারের আদলে অস্থায়ী মাযার স্থাপন করা হয়। এরপর খাজা আজমীরী (রহিঃ)-এর উদ্দেশ্যে নযর-নিয়ায ও মানতের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা, চাল-ডাল ইত্যাদি ওঠানো হয়। যা দেওয়াও হারাম এবং ওখান থেকে কিছু খাওয়াও হারাম। যারা এগুলো উঠায়, তারা এগুলো দিয়ে আনন্দ-ফূর্তির আয়োজন করে। ঢোল-তবলা ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে নাচ-গানের আসর বসায়। যেখানে নারী-পুরুষ একসঙ্গে নাচ-গান ও খাওয়া-দাওয়ায় অংশ নেয়, অবাধে মেলামেশা করে এবং নানা ধরনের গর্হিত কাজ করে থাকে, যা নিঃসন্দেহে হারাম।[30]

মিরাজ ও নফল ছিয়াম :

আমাদের অনেক মুসলিম ভাই ও বোন লায়লাতুল ক্বদরের সাথে মিলিয়ে মি‘রাজের নফল ছিয়াম রেখে থাকেন। একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, নফল ছিয়াম যখন ইচ্ছা, তখন রাখা যায় কিন্তু কোন উপলক্ষ্যে নফল ছিয়াম রাখতে হলে অবশ্যই আগে জেনে নিতে হবে যে, আমি বা আমরা যে উপলক্ষে নফল ছিয়াম রাখছি, শরী‘আত সেটাকে অনুমতি দিয়েছে কিনা। মি‘রাজ উপলক্ষ্যে নফল ছিয়াম রাখার কোনো বর্ণনা কুরআন-হাদীছের কোথাও বর্ণিত নেই। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ও তার অনুসারীরা এই দিনে বিশেষভাবে কোনো ছিয়াম রেখেছেন এমন কোনো বর্ণনা হাদীছে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই এই দিনে মি‘রাজ উপলক্ষ্যে ছিয়াম রাখা কোনো ইবাদত হিসাবে গণ্য হবে না। মি‘রাজের নফল ছিয়াম সম্পর্কে অসংখ্য জাল হাদীছ এসেছে। যেমন, আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রজব মাসের ২৭ তারিখ অর্থাৎ মি‘রাজ  দিবসে ছিয়াম পালন করবে, তার আমলনামায় ৬০ মাসের ছিয়ামের নেকী লিখা হবে’।

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ)-এর নামে বর্ণিত জাল হাদীছে আছে, রাসূল (ছাঃ) নাকি বলেছেন, ‘রজব মাস আল্লাহর মাস, শা‘বান মাস আমার মাস এবং রামাযান মাস উম্মতের মাস। অতএব যে ব্যক্তি ঈমানের অবস্থায় নেকীর আশায় রজবের ছিয়াম পালন করবে, তার জন্য আল্লাহর মহাসন্তোষ অবধারিত হয়ে যায় এবং তাকে তিনি জান্নাতুল ফেরদাউসে স্থান দিবেন…। যে ব্যক্তি রজব মাসে ২ থেকে ১৫টি ছিয়াম পালন করবে, তার নেকী পাহাড়ের মতো হবে… সে কুষ্ঠ, শ্বেত ও পাগলামী রোগ থেকে মুক্তি পাবে। … জাহান্নামের সাতটি দরজা তার জন্য বন্ধ থাকবে। … জান্নাতের আটটি দরজা তার জন্য খোলা থাকবে’। জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহিঃ) বলেন, হাদীছটি জাল।[31]

আরও একটি হাদীছ, ‘রজব মাসের ২৭ তারিখ আমি নবুঅত পেয়েছি। সুতরাং যে ব্যক্তি এ দিনে ছিয়াম রাখবে, তা তার ৬০ মাসের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে’।[32]

আরও একটি জাল হাদীছে বলা হয়েছে, ইবনে আব্বাস (রহিঃ) ২৭শে রজবের সকাল থেকে ই‘তিকাফ আরম্ভ করতেন। যোহর পর্যন্ত ছালাতে মাশগূল থাকতেন, যোহরের পর অমুক অমুক সূরা দিয়ে চার রাক‘আত বিশেষ ছালাত আদায় করতেন এবং আছর পর্যন্ত দু‘আতে থাকতেন। তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরূপ করতেন।[33]

শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া (রহিঃ) বলেন, পক্ষান্তরে রজব মাসে ছিয়াম রাখা সংক্রান্ত সবগুলো হাদীছ দুর্বল; বরং মাওযূ‘ (বানোয়াট)। আলেমগণ এর কোনোটির উপর নির্ভর করেন না। ফযীলতের ক্ষেত্রে যে মানের দুর্বল হাদীছ বর্ণনা করা যায়, এটি সে মানের নয়। বরং এ সংক্রান্ত সবগুলো হাদীছ মাওযূ‘ (বানোয়াট) ও মিথ্যা।[34]

ইবনে হাজার আল-আসক্বালানী, মোল্লা আলী ক্বারী, মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আজলুনী, আবদুল হাই লাক্ষ্নৌবী (রহিঃ) প্রমুখ মুহাদ্দিছ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ২৭শে রজবের ফযীলত, এ তারিখের রাতের ইবাদত, দিনে ছিয়াম পালন বিষয়ে বর্ণিত সকল কথাই বানোয়াট, জাল ও ভিত্তিহীন।

ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহিঃ) বলেন, ‘রজব মাসে ছিয়াম রাখা ও নফল ছালাত পড়ার ব্যাপারে যে কয়টি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, সবগুলোই মিথ্যা’।[35]

ইবনে হাজার (রহিঃ) বলেন, ‘রজব মাসের ফযীলত, এ মাসে ছিয়াম রাখা বা এ মাসের বিশেষ বিশেষ দিনে ছিয়াম রাখার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো কিছু বর্ণিত হয়নি। অথবা এ মাসের বিশেষ কোনো রাত্রিতে ছালাত পড়ার ব্যাপারে ছহীহ কোনো হাদীছ নেই’।[36]

সাইয়্যেদ সাবেক (রহিঃ) বলেন, ‘অন্য মাসগুলোর উপর রজব মাসের বিশেষ কোনো ফযীলত নেই। তবে এটি হারাম মাসসমূহের একটি। এ মাসে ছিয়াম রাখার বিশেষ কোনো ফযীলত কোনো ছহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়নি। এ বিশেষ যে কয়টি বর্ণনা রয়েছে, এর কোনোটি দলীল হিসাবে গ্রহণ করার উপযুক্ত নয়’।[37]

শায়খ উছায়মীন (রহিঃ)-কে ২৭ শে রজব ছিয়াম ও ক্বিয়াম পালনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে জবাবে তিনি বলেন, ‘সবিশেষ মর্যাদা দিয়ে ২৭ শে রজবে ছিয়াম ও ক্বিয়াম পালন- বিদ‘আত। আর প্রত্যেকটি বিদ‘আতই ভ্রান্তি’।[38]

অতএব, রজব মাসের সম্মানে বিশেষ ছিয়াম পালন করা, ২৭ শে রজবের রাত্রিকে শবে মি‘রাজ ধারণা করে ঐ রাতকে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা, উক্ত উদ্দেশ্যে বিশেষ কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা, যিকির-আযকার, সাবীনা খতম ও দো‘আর অনুষ্ঠান করা, মীলাদ ও ওয়ায মাহফিল করা, ঐ রাতের ছওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, সরকারী ছুটি ঘোষণা করা ও তার ফলে জাতীয় অর্থনীতির বিশাল অংকের ক্ষতি করা, ছহীহ হাদীছ বাদ দিয়ে মি‘রাজের নামে উদ্ভট সব গল্পবাজি করা, মি‘রাজকে বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণ করতে গিয়ে অনুমান ভিত্তিক কথা বলা, ঐ দিন আতশবাজি, আলোক সজ্জা, কবর যিয়ারত, দান-খয়রাত এবং এ মাসের ফযীলত লাভের আশায় ওমরাহ পালন ইত্যাদি সবই বিদ‘আতের পর্যায়ভুক্ত।[39]

আল্লাহ আমাদেরকে সুন্নাতের অনুসরণ ও বিদ‘আত বর্জনের তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৬৬২।

[2]. ফাতহুল বারী, ৭/২০৩।

[3]. সীরাতে সায়্যিদুল আম্বিয়া, পৃঃ ২৬৮।

[4]. ত্ববাক্কাতু ইবনে সা‘দ, ১/১৬৬।

[5]. যা‘দুল মা‘আদ, ৩/৩৭।

[6]. ফাতহুল বারী, ৭/২০৩।

[7]. মাসিক আত-তাহরীক, সেপ্টেম্বর-২০০৪, পৃঃ ৭।

[8]. রাহমাতুল্লিল আ‘লামীন, পৃঃ ৭০।

[9]. পায়গাম্বারে আযম ওয়া আখির, পৃঃ ৩৪৫।

[10]. তাফসীরে ত্ববারী, ১৫/৫।

[11]. ছহীহ মুসলিম, ১/৩০৪।

[12]. ছহীহ মুসলিম, ১/৯৬; মিশকাত, পৃঃ ৫২৯।

[13]. ইবনুল জাওযী, কিতাবুল মাওযূ‘আত, ২/১২৪-১২৬।

[14]. শাওকানী, ফাওয়ায়িদুল মাজমূ‘আহ, পৃঃ ৪৭-৪৮।

[15]. আবু শামাহ, আল-বায়িস, পৃঃ ৪০।

[16].  কিতাবুল মাওযূ‘আত, ২/১২৫-১২৬।

[17]. ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২০২-২০৩।

[18]. ইমাম ত্বরতুশী, আল-হাওয়াদীছ ওয়াল বিদা, পৃঃ ১২২।

[19]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২৩/১৩২।

[20]. আল-মানারুল মুনীফ, পৃঃ ৯০।

[21]. ছহীহ বুখারী, ১/৩৭১।

[22]. কিতাবুল মাওযূ‘আত, ২/১২৩।

[23]. প্রাগুক্ত।

[24]. প্রাগুক্ত।

[25]. গোলাম রহমান, মাহে মি‘রাজ, মাসিক আত-তাহরীক, ২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা, নভেম্বর-১৯৯৮, পৃঃ ২২।

[26]. মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃঃ ১২৩।

[27]. আল-মাসনূ, পৃঃ ২০৮।

[28]. ইবন মাজাহ, হা/৩১৬৮; মুখতাছার ছহীহ মুসলিম, হা/১২৬০; ইরওয়া, হা/১১৮০; ছহীহ জামে‘ আছ-ছাগীর, হা/৭৫৪৪।

[29]. আস-সুনান, ৩/১০৪।

[30]. মাসিক আল-কাউসার, জুলাই-২০০৯।

[31].  কিতাবুল মাওযূ‘আত।

[32]. তাবয়ীনুল আযাব, পৃঃ ৬৪; তানযীহ, পৃঃ ২/১৬১।

[33]. আল-আছার, আবদুল হাই লাক্ষ্নৌবী, পৃঃ ৭৮।

[34]. শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহিঃ), মাজমূঊল ফাতাওয়া, ২৫/২৯০।

[35]. আল-মানার, আল-মুনীফ, পৃঃ ৯৬।

[36]. তাবয়ীনুল আযাব, পৃঃ ১১।

[37]. সাইয়্যেদ সাবেক (রহিঃ), ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/৩৮৩।

[38]. মাজমূঊ ফাতাওয়া শায়খ উছায়মীন (রহিঃ), ২০/৪৪০।

[39]. মাসিক আত-তাহরীক, সেপ্টেম্বর-২০০৪, পৃঃ ৯।