মাহে শাবান ও শবেবরাত

মুহাম্মাদ গিয়াসুদ্দীন

হিজরী চান্দ্রবর্ষের অষ্টম ও রামাযানের আগের মাস শা‘বান। শা‘বান রামাযানের আগাম বার্তা বয়ে আনে। হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর এ মাসেই ক্বিবলা পরিবর্তন হয়। অর্থাৎ পূর্ব ক্বিবলা বায়তুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে কা‘বা ক্বিবলা হিসাবে ঘোষিত ও নির্ধারিত হয়। রাসূল (ছাঃ) এ মাসে সবচেয়ে বেশি নফল ছিয়াম রাখতেন। এছাড়া নির্দিষ্ট দিনকে লক্ষ্য রেখে কোনো ইবাদত করেছেন বলে ছহীহ সনদে প্রমাণিত নয়।

শা‘বান মাসে করণীয় :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে বহু ছহীহ হাদীছে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি শা‘বান মাসে সবচেয়ে বেশি ছিয়াম রাখতেন।

عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُوْمُ حَتَّى نَقُوْلَ لَا يُفْطِـرُ، وَيُفْطِـرُ حَتَّى نَقُوْلَ: لَا يَصُوْمُ‏.‏ وَمَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْـرٍ اِلَّا رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِيْ شَعْبَانَ‏.‏

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) একাধারে ছিয়াম রাখা শুরু করতেন, এমনকি আমরা বলাবলি করতাম, তিনি (হয়তো আর) ছিয়াম পরিত্যাগ করবেন না। আবার তিনি ছিয়াম রাখা বন্ধ করতেন। তখন আমরা মনে মনে বলতাম, তিনি হয়তো আর ছিয়াম রাখবেন না। আমি নবী (ছাঃ)-কে রামাযান মাস ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ মাস ছিয়াম রাখতে এবং শা‘বান মাস ব্যতীত অন্য কোনো মাসে এত বেশি (নফল) ছিয়াম রাখতে দেখিনি।[1]  অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ: لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُوْمُ شَهْرًا أَكْثَرَ مِنْ شَعْبَانَ، فَاِنَّهُ كَانَ يَصُوْمُ شَعْبَانَ كُـلَّهُ، وَكَانَ يَقُوْلُ: ‏خُذُوْا مِنَ الْعَمَلِ مَا تُطِيْقُوْنَ، فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَمَلُّ حَتَّى تَمَلُّوْا، وَأَحَبُّ الصَّلَاةِ اِلَـى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا دُوْوِمَ عَلَيْهِ، وَاِنْ قَلَّتْ: ‏وَكَانَ اِذَا صَلَّى صَلَاةً دَاوَمَ عَلَيْهَا‏.‏

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) শা‘বান মাসের ন্যায় এত বেশি (নফল) ছিয়াম আর কোনো মাসে রাখতেন না। তিনি শা‘বান মাস (প্রায়) পুরোটাই ছিয়াম রাখতেন। তিনি সকলকে এ হুকুম দিতেন যে, ‘তোমরা যতদূর আমলের সামর্থ্য রাখো, ঠিক ততটুকুই করো। আল্লাহ (ছওয়াব দানে) অপারগ নন, যতক্ষণ না তোমরা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ো’। রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো এমন ছালাত, যা সর্বদা আদায় করা হয় পরিমাণে তা যত কমই হোক না কেন। রাসূল (ছাঃ)-এর অভ্যাস ছিল, যখন তিনি কোনো (নফল) ছালাত আদায় করতেন, পরবর্তীতে তা জারী রাখতেন।[2]

শাবানের মধ্য রজনীর ফযীলত সম্পর্কিত হাদীছ :

শা‘বানের মধ্য রজনীর ফযীলত সম্পর্কিত যেসব হাদীছ পেশ করা হয়, সেসব হাদীছসমূহের কয়েকটির পর্যালোচনা পেশ করা হলো :

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ فَقَدْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ‏ يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏ ‏.‏ قَالَتْ قَدْ قُلْتُ وَمَا بِي ذَلِكَ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ ‏.‏ فَقَالَ ‏ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ كَلْبٍ‏ ‏‏

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রাতে আমি নবী (ছাঃ)-কে (বিছানায়) না পেয়ে তার খোঁজে বের হলাম। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি বাক্বী কবরস্থানে, তার মাথা আকাশের দিকে তুলে আছেন। তিনি বলেন, ‘হে আয়েশা! তুমি কি আশঙ্কা করেছো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি অবিচার করবেন? আয়েশা (রাঃ) বলেন, তা নয়, বরং আমি ভাবলাম যে, আপনি হয়তো আপনার কোনো স্ত্রীর কাছে গেছেন। তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহ মধ্য শা‘বানের রাতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চাইতেও অধিক সংখ্যক লোকের গুনাহ মাফ করেন’।[3]

ইমাম তিরমিযী (রহিঃ) বলেন, আয়েশা (রাঃ)-এর এই হাদীছ আমি হাজ্জাজের বর্ণিত সনদ (সূত্র) ছাড়া অন্য কোনোভাবে চিনি না। আমি মুহাম্মাদ (রহিঃ)-কে (ইমাম বুখারী) বলতে শুনেছি যে, তিনি হাদীছটিকে দুর্বল বলতেন। তিরমিযী (রহিঃ) বলেন, ইয়াহ্ইয়া ইবনে কাছীর (রহিঃ) উরওয়াহ (রাঃ) থেকে হাদীছ শুনেননি এবং মুহাম্মাদ (রহিঃ) (ইমাম বুখারী) বলেছেন, হাজ্জাজ (রহিঃ) ইয়াহ্ইয়া ইবনে কাছীর (রহিঃ) থেকে শুনেননি।

এ হাদীছটি সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রহিঃ)ও ইমাম তিরমিযী (রহিঃ)-এর মন্তব্যে প্রমাণিত হয় যে, হাদীছটি দু’টো দিক থেকে মুনক্বাতি‘ বা বিচ্ছিন্ন। অপর দিকে এ হাদীছের একজন বর্ণনাকারী হাজ্জাজ ইবনে আরতাহ মুহাদ্দিছীনদের নিকট দুর্বল বলে পরিচিত।

সুধী পাঠক! যারা শবেবরাতের বেশি বেশি ফযীলত বয়ান করতে অভ্যস্ত, তারা তিরমিযী বর্ণিত এ হাদীছটি খুব গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেন অথচ যারা হাদীছটির অবস্থা সম্পর্কে ভালো জানেন, তাদের এ মন্তব্যটুকু গ্রহণ করতে চান না। এ হাদীছটি আমলের ক্ষেত্রে পরিত্যাজ্য হওয়ার জন্য ইমাম তিরমিযী (রহিঃ)-এর এ মন্তব্যটুকু কি যথেষ্ট নয়? যদি তর্কের খাতিরে এ হাদীছটিকে বিশুদ্ধ বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে কী প্রমাণিত হয়? আমরা যারা ঢাকঢোল পিটিয়ে মসজিদে একত্র হয়ে যেভাবে শবেবরাত উদযাপন করি তাদের আমলের সাথে এ হাদীছটির মিল কোথায়?

বরং এ হাদীছে দেখা গেল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিছানা ছেড়ে চলে গেলেন, আর পাশে শায়িত আয়েশা (রাঃ)-কে ডাকলেন না। ডাকলেন না অন্য কাউকে। তাকে জাগালেন না বা ছালাত আদায় করতে বললেন না। অথচ আমরা দেখতে পাই যে, রামাযানের শেষ দশকে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) নিজে রাত জেগে ইবাদাত-বন্দেগী করতেন এবং পরিবারের সকলকে জাগিয়ে দিতেন। বেশি পরিমাণে ইবাদাত-বন্দেগী করতে বলতেন। যদি ১৫ শা‘বানের রাতে কোনো ইবাদাত করার ফযীলত থাকতো, তাহলে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) কেন আয়েশা (রাঃ)-কে বললেন না? কেন রামাযানের শেষ দশকের মতো সকলকে জাগিয়ে দিলেন না, তিনি তো নেক কাজের প্রতি মানুষকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে আমাদের সকলের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি তো কোনো অলসতা বা কৃপণতা করেননি।

শা‘বানের মধ্য রজনীর ফযীলত সম্পর্কিত সচরাচর আরেকটি হাদীছ পেশ করা হয়,

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا يَوْمَهَا ‏.‏ فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُولُ أَلاَ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهُ أَلاَ مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلاَ مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلاَ كَذَا أَلاَ كَذَا حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ ‏  ‏

আলী ইবনে আবু তালেব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন মধ্য শা‘বানের রাত আসে, তখন তোমরা রাত জেগে ছালাত আদায় করবে আর দিবসে ছিয়াম পালন করবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বলেন, আছে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোনো রিযিক্ব প্রার্থনাকারী? আমি রিযিক্ব দান করব। আছে কি কোনো বিপদে নিপতিত ব্যক্তি? আমি তাকে সুস্থতা দান করব। এভাবে ফজর পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে’।[4]

প্রথমত, এ হাদীছটি দুর্বল। কেননা এ হাদীছের সনদে (সূত্রে) ইবনু আবী সাবরাহ নামে এক ব্যক্তি আছেন, যিনি অধিকাংশ হাদীছবিশারদের নিকট হাদীছ জালকারী হিসাবে পরিচিত। এ যুগের বিখ্যাত মুহাদ্দিছ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহিঃ) বলেছেন, হাদীছটি সনদের দিক দিয়ে একেবারেই দুর্বল।

দ্বিতীয়ত, অপর একটি ছহীহ হাদীছের বিরোধী হওয়ার কারণে এ হাদীছটি গ্রহণযোগ্য নয়। সে ছহীহ হাদীছটি হাদীছে নুযূল নামে পরিচিত, যা ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম (রহিঃ) তাদের কিতাবে বর্ণনা করেছেন।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِى فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِى فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِى فَأَغْفِرَ لَهُ ‘মহান আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করে বান্দাদেরকে বলতে থাকেন, যে আমার কাছে দু‘আ করবে, আমি তার দু‘আ কবুল করব। যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে তা দান করব। যে আমার কাছে গুনাহ মাফ চাইবে, আমি তাকে মাফ করব’।[5]  আরেকটি হাদীছ পেশ করা হয়, ওছমান ইবনু আবিল আছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন মধ্য শা‘বানের রাত আসে, তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেয়, আছে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কেউ কিছু চাইবার? আমি তাকে তা দিয়ে দিব’। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মুশরিক ও ব্যভিচারী বাদে সকল প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করা হয়’।[6]

বিখ্যাত মুহাদ্দিছ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহিঃ) হাদীছটিকে তার সংকলন ‘যঈফ আল-জামে’ নামক কিতাবের ৬৫২ নং ক্রমিকে দুর্বল প্রমাণ করেছেন। শবেবরাত সম্পর্কে এ ছাড়া বর্ণিত অন্যান্য সকল হাদীছ সম্পর্কে ইবনে রজব হাম্বলী (রহিঃ) বলেন, এ মর্মে বর্ণিত অন্য সকল হাদীছই দুর্বল।

ইমাম আবুবকর আত-তারতূশী (রহিঃ) তার কিতাব (الحوادث والبدع) ‘আল-হাওয়াদিছ ওয়াল বিদ‘আত’-এ উল্লেখ করেন, ইবনে ওয়াদ্দাহ (রহিঃ) যায়েদ ইবনে আসলাম (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, আমাদের কোনো উস্তাদ বা কোনো ফক্বীহকে মধ্য শা‘বানের রাতকে কোনো রকম গুরুত্ব দিতে দেখিনি। তারা মাকহূলের হাদীছের দিকেও তাকাননি এবং এ রাতকে অন্য রাতের চেয়ে আমলের ক্ষেত্রে মর্যাদা সম্পন্ন মনে করতেন না।

শবেবরাতের পরিচয় :

‘শব’ ফারসী শব্দ। এর অর্থ রাত বা রজনী। ‘বরাত’ শব্দটিও মূলে ফারসী। অর্থ ভাগ্য। দু’শব্দের একত্রে অর্থ হবে, ভাগ্য-রজনী। বরাত শব্দটি আরবী ভেবে অনেকেই ভুল করে থাকেন। কারণ বরাত বলতে আরবী ভাষায় কোনো শব্দ নেই। যদি বরাত শব্দটি আরবী বারাআত শব্দের অপভ্রংশ ধরা হয় তবে তার অর্থ হবে সম্পর্কচ্ছেদ বা বিমুক্তিকরণ। কিন্তু কয়েকটি কারণে এ অর্থটি এখানে অগ্রহণযোগ্য, মেনে নেয়া যায় না-

(১) আগের শব্দটি ফারসী হওয়ায় বরাত শব্দটিও ফারসী হবে, এটাই স্বাভাবিক।

(২) শা‘বানের মধ্য রজনীকে আরবী ভাষার দীর্ঘ পরম্পরায় কেউই বারাআতের রাত্রি হিসাবে আখ্যা দেননি।

(৩) রামাযান মাসের লায়লাতুল ক্বদরকে কেউ কেউ লায়লাতুল বারাআত হিসাবে নামকরণ করেছেন; শা‘বানের মধ্য রজনীকে নয়।

আরবী ভাষায় এ রাতটিকে লায়লাতুন নিছফি মিন শা‘বান বা শা‘বান মাসের মধ্য রজনী হিসাবে অভিহিত করা হয়।

শবেবরাত কি ভাগ্য রজনী? :

অনেকে শবেবরাতকে ভাগ্যরজনী বলে থাকে। তারা দলীল হিসাবে পেশ করেন এই আয়াতটি, إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ- فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ ‘অবশ্যই আমরা তা (কুরআন) এক বরকতপূর্ণ রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি, অবশ্যই আমরা সতর্ককারী, এ রাত্রিতে যাবতীয় প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়’ (দুখান, ৩-৪)।

এ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরে অধিকাংশ মুফাসসির বলেন, এ আয়াত দ্বারা রামাযানের লায়লাতুল ক্বদরকেই বুঝানো হয়েছে। যে লায়লাতুল ক্বদরের চারটি নাম রয়েছে- ১. লায়লাতুল কদর ২. লায়লাতুল বারাআত ৩. লায়লাতুছ ছফ ৪. লায়লাতুন মুবারাকাহ। শুধুমাত্র ইকরিমা (রহিঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, এ আয়াত দ্বারা শা‘বানের মধ্যরাত্রিকে বুঝানো হয়েছে। এটা একটি অগ্রহণযোগ্য বর্ণনা।

আল্লামা ইবনে কাছীর (রহিঃ) বলেন, আলোচ্য আয়াতে মুবারক রাত্রি বলতে লায়লাতুল ক্বদরকে বুঝানো হয়েছে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, اِنَّا  اَنْزَلْنٰهُ  فِیْ لَیْلَةِ  الْقَدْرِ ‘আমরা এ কুরআনকে ক্বদরের রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি’ (ক্বদর, ১)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ‘রামাযান তো সেই মাস যে মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে যা মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক এবং হেদায়াতের স্পষ্ট নিদর্শন ও ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীস্বরূপ)। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন ছিয়াম রাখে। আর যে অসুস্থ অথবা সফরে থাকে সে অন্য সময়ে আদায় করে নেবে’ (বাক্বারাহ, ১৮৫)।

যিনি এ রাত্রিকে শা‘বানের মধ্যবর্তী রাত বলে মত প্রকাশ করেছেন, যেমনটি ইকরিমা (রহিঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি অনেক দূরবর্তী মত গ্রহণ করেছেন। কেননা কুরআনের সুস্পষ্ট বাণী যা রামাযান মাসে বলে ঘোষণা দিয়েছে।[7]  যেমন হাদীছে এসেছে, আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْـرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ ‏‏‏‏ ‘তোমরা লায়লাতুল ক্বদর রামাযানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোতে খোঁজ করো’।[8]

শবেবরাতের ছালাত :

শবেবরাতের ছালাতের প্রথম প্রচলন হয় হিজরী ৪৪৮ সনে। ফিলিস্তীনের নাবলুস শহরের ইবনু আবিল হামরা নামের এক লোক বায়তুল মুকাদ্দাসে আসেন। তার তিলাওয়াত ছিল সুমধুর। তিনি শা‘বানের মধ্য রাত্রিতে ছালাতে দাঁড়ালে তার পিছনে এক লোক এসে দাঁড়ায়, তারপর তার সাথে তৃতীয় জন এসে যোগ দেয়, তারপর চতুর্থ জন। তিনি ছালাত শেষ করার আগেই বিরাট একদল লোক এসে তার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী বছর এলে তার সাথে অনেকেই যোগ দেয় ও ছালাত আদায় করে। এতে করে মাসজিদুল আক্বছাতে এ ছালাতের প্রথা চালু হয়। কালক্রমে এ ছালাত এমনভাবে আদায় হতে লাগে যে, অনেকেই তা সুন্নাত মনে করতে শুরু করে।[9]

প্রথা অনুযায়ী এ ছালাতের পদ্ধতি হলো, প্রতি রাক‘আতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাছ দশবার করে পড়ে মোট একশত রাক‘আত ছালাত পড়া। যাতে করে সূরা ইখলাছ ১০০০ বার পড়া হয়।[10]

মিশকাতের ভাষ্যকার মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (রহিঃ) (মৃ. ১০১৪ হি.) বলেন, জেনে রাখুন, ইমাম সুয়ূত্বী (রহিঃ) (৮৪৯-৯১১ হি.) তার কিতাবে দায়লামী ও অন্যদের আনীত হাদীছসমূহ যেখানে মধ্য শা‘বানে প্রতি রাক‘আতে ১০ বার করে সূরা ইখলাছ সহ ১০০ রাক‘আত ছালাতের যে অগণিত ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, তা সবই মাওযূ‘। তাছাড়া আলী ইবনে ইবরাহীম (রহিঃ)  কোনো এক পুস্তিকায় বলেছেন, মধ্য শা‘বানের রাত্রিতে ছালাতে আলফিইয়াহ নামে প্রতি রাক‘আতে ১০ বার করে সূরা ইখলাছ সহ ১০০ রাক‘আত ছালাত জামা‘আত সহকারে যা আদায় করা হয় এবং যাকে লোকেরা জুম‘আ ও ঈদায়েনের চাইতে গুরুত্ব দিয়ে আদায় করে থাকে, সে বিষয়ে যঈফ বা মাওযূ‘ ব্যতীত কোনো হাদীছ বা আছার বর্ণিত হয়নি।[11]

এ ধরনের ছালাত সম্পূর্ণ বিদ‘আত। কারণ এ ধরনের ছালাতের বর্ণনা কোনো হাদীছের কিতাবে আসেনি। কোনো কোনো বইয়ে এ সম্পর্কে যে সকল হাদীছ উল্লেখ করা হয়, সেগুলো কোনো হাদীছের কিতাবে আসেনি। আর তাই আল্লামা ইবনুল জাওযী[12], ইমাম নববী[13], আল্লামা আবু শামাহ[14], শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া[15], আল্লামা ইবনু আররাক[16], আল্লামা সূয়ূত্বী[17], আল্লামা শাওকানী[18]  (রহিঃ) সহ আরও অনেকেই এগুলোকে বানোয়াট হাদীছ বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন।

একশত রাক‘আত ছালাত পড়া সংক্রান্ত সমস্ত হাদীছই জাল বা বানোয়াট। ঐ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে কিছুই প্রমাণিত নেই।[19]

একশ রাক‘আত ছালাত পড়ার বিদ‘আতটি  মসজিদের মূর্খ ইমামগণ অন্যান্য ছালাতের সঙ্গে যুক্ত করে এই ছালাত চালু করেন। এর মাধ্যমে তারা জনসাধারণকে একত্রিত করার এবং তাদের উপর সর্দারী করা ও পেটপূর্তি করার একটি ফন্দি এঁটেছিলেন মাত্র। এই বিদ‘আতী ছালাতের ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখে নেককার, পরহেযগার ব্যক্তিগণ আল্লাহ্র গযবে যমীন ধ্বসে যাওয়ার ভয়ে শহর ছেড়ে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিলেন।[20]

হাফেয ইরাক্বী (রহিঃ) বলেন, মধ্য শা‘বানের রাতে ছালাত আদায় সম্পর্কিত হাদীছগুলো বানোয়াট বা জাল এবং এটা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি মিথ্যা আরোপের শামিল।

হাফেয ইবনে রজব (রহিঃ) তার কিতাব লাতায়িফুল মা‘আরিফে লিখেছেন, তাবেঈদের যুগে সিরিয়ায় খালিদ ইবনে মাদ‘দান, মাকহূল, লুক্বমান ইবনে আমের প্রমুখ আলেম এ রাতকে মর্যাদা দিতে শুরু করেন এবং এ রাতে বেশি পরিমাণে ইবাদাত-বন্দেগী করতেন। তখন লোকেরা তাদের থেকে এটা অনুসরণ করতে আরম্ভ করল। এরপর লোকদের মধ্যে মতানৈক্য শুরু হলো। বছরা অঞ্চলের অনেক আবেদ এ রাতকে গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু মক্কা ও মদীনার আলেমগণ এটাকে বিদ‘আত বলে প্রত্যাখ্যান করেন। অতঃপর সিরিয়াবাসী আলেমগণ দুই ভাগ হয়ে গেলেন। একদল এ রাতে মসজিদে একত্রিত হয়ে ইবাদত-বন্দেগী করতেন। এদের মধ্যে ছিলেন খালেদ ইবনে মা‘দান, লোক্বমান ইবনে আমের (রহিঃ)। ইসহাক্ব ইবনে রাহ্ওয়াই (রহিঃ)ও তাদের অনুরূপ মত পোষণ করতেন।

আলেমদের অন্যদল বলতেন, এ রাতে মসজিদে একত্রিত হয়ে ইবাদত-বন্দেগী করা মাকরূহ। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত-বন্দেগী করলে তাতে দোষের কিছু নেই। ইমাম আওযাঈ (রহিঃ) এ মত পোষণ করতেন।

শায়খ ইবনে বায (রহিঃ)-এর অভিমত, এই রাতে মসজিদে গিয়ে একাকী বা জামা‘আতবদ্ধভাবে ছালাত আদায় করা, যিকির-আযকারে লিপ্ত হওয়া সম্পর্কে জানা যায় যে, শামের কিছু বিদ্বান এটি প্রথম শুরু করেন। তারা এই রাতে সুন্দর পোশাক পরে ও আতর-সুরমা লাগিয়ে মসজিদে গিয়ে রাত্রি জাগরণ করতে থাকেন। পরে বিষয়টি লোকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কা-মদীনার আলেমগণ এর তীব্র বিরোধিতা করেন। কিন্তু শামের বিদ্বানদের দেখাদেখি কিছু লোক এগুলো করতে শুরু করে। এভাবে এটি জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।[21]

শাবানের মধ্যরাত্রির পরদিন ছিয়াম রাখা :

সে হিসাবে যদি কেউ শা‘বান মাসে ছিয়াম রাখেন, তবে তা হবে সুন্নাত। শা‘বান মাসের শেষ দিন ছাড়া বাকী যে কোনো দিন ছিয়াম রাখা জায়েয বা ছওয়াবের কাজ। তবে ছিয়াম রাখার সময় মনে করতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যেহেতু শা‘বান মাসে ছিয়াম পালন করেছিলেন, তাই তাকে অনুসরণ করে ছিয়াম রাখা হচ্ছে।

অথবা যদি কারও আইয়ামে বীযের নফল ছিয়াম তথা মাসের ১৩, ১৪, ১৫ এই তিনদিন ছিয়াম রাখার নিয়ম থাকে, তিনিও ছিয়াম রাখতে পারেন। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: أَوْصَانِيْ خَلِيْلِـىْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثٍ صِيَامِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَرَكْعَتَـىِ الضُّحَـى، وَأَنْ أُوتِرَ قَبْلَ أَنْ أَنَامَ

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার প্রিয় বন্ধু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে তিনটি বিষয়ের উপদেশ করে গেছেন ১. আমি যেন প্রতি মাসে (১৩, ১৪, ১৫ তারিখে) তিনটি ছিয়াম রাখি ২. চাশতের সময় দুই রাক‘আত ছালাত পড়ি ৩. রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেই বিতরের ছালাত আদায় করি।[22]

কিন্তু শুধুমাত্র শা‘বানের ১৫ তারিখ ছিয়াম রাখা বিদ‘আত হবে। কারণ শরী‘আতে এ ছিয়ামের কোনো ভিত্তি নেই।

শবেবরাতের হালুয়া-রুটি :

শবেবরাতের দিন ওহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দন্ত মোবারক শহীদ হয়েছিল। এজন্য তিনি শক্ত খাবার খেতে না পারায় নরম খাদ্য হিসাবে হালুয়া-রুটি খেয়েছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দাঁত ভাঙ্গার ব্যথায় সমবেদনাস্বরূপ হালুয়া-রুটি খেতে হবে। এ যুক্তিটি হাস্যকর। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দাঁত ভেঙ্গেছিল ওহুদ যুদ্ধে। আর এ যুদ্ধ শা‘বান মাসে হয়নি বরং তা হয়েছিল ৩য় হিজরীর শাওয়াল মাসের ১১ তারিখ শনিবার সকাল বেলায়।[23]

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দাঁত ভাঙলো শাওয়াল মাসে, আর আমরা শাওয়াল মাস আসার দুই মাস আগেই সেই দাঁত ভাঙ্গার ব্যাথা অনুভব করে হালুয়া-রুটি খাচ্ছি!

একেই  উর্দূতে  বলে, ‘নাখুন কাটকে শহীদ হোনা’। অর্থাৎ নখ কেটে শহীদ হওয়া বা শহীদ হওয়ার দাবী করা। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দাঁত যুদ্ধে ভেঙ্গেছিল। এটা তাঁর অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়েছিল। কাজেই ঐ কারণে কারো ইচ্ছাপূর্বক নিজ দাঁত ভাঙ্গা বা সেজন্য হালুয়া-রুটি খাওয়া একেবারেই অযৌক্তিক।[24]

শবেবরাতের রাতের অন্যান্য কুসংস্কার :

এ রাতে অনেক কুসংস্কার রয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মানুষ এগুলোকে নেক কাজ মনে করে শুধু বিভ্রান্তই হচ্ছে না বরং কবীরা গুনাহে লিপ্ত হচ্ছে। এ জাতীয় আপত্তিকর কাজগুলো হলো:

(১) আতশবাজি, তারাবাতি, পটকা ইত্যাদি ফুটানো।

(২) মসজিদ, ঘর-বাড়ী, দোকানপাট ও অন্যান্য জায়গায় আলোকসজ্জা করা; এসব অপচয়ের শামিল। তাছাড়া এটি হিন্দু দিওয়ালী বা দীপাবলি উৎসব হতে গৃহীত। তাই এ ধরনের কর্মকা- বিধর্মীদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কারণে অবশ্যই পরিত্যাজ্য ও বর্জনীয়।

আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিছ দেহলভী হানাফী (রহিঃ) বলেন, এই রাতে আলোকসজ্জা করা হিন্দুদের দীপাবলি উৎসবের অনুকরণ মাত্র। তিনি মধ্য শা‘বানের ফযীলত বিষয়ে বিভিন্ন যঈফ ও মাওযূ‘ হাদীছ উল্লেখ করার পর বলেন, নিকৃষ্ট বিদ‘আতসমূহ যা হিন্দুস্তানের অধিকাংশ দেশে প্রচলিত আছে, সেগুলোর অন্যতম হলো বাড়ী-ঘরে ও প্রাচীরসমূহের উপর আলোকসজ্জা করা ও এগুলো নিয়ে গর্ব করা। আর এ উপলক্ষ্যে দলবদ্ধভাবে আতশবাজি ও আগরবাতি পোড়ানোর খেল-তামাশায় মত্ত হওয়া। এগুলো ঐসব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যেসবের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি কোনো বিশুদ্ধ গ্রন্থে নেই। এমনকি অগ্রহণযোগ্য কোনো কিতাবেও নেই। এ বিষয়ে কোনো হাদীছ বর্ণিত হয়নি; না কোনো যঈফ না কোনো মাওযূ‘। হিন্দুস্তানের দেশগুলোর বাইরে এটি কোথাও প্রচলিত নেই। আরব দেশসমূহের মধ্যে হারামাইন শরীফাইনে নেই। আল্লাহ এ দুই হারামের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করুন! এ দু’টি স্থান ছাড়াও অন্য কোনো স্থানে নেই। অনারব দেশগুলোতেও নেই, হিন্দুস্তানের দেশগুলো ব্যতীত। বরং সর্বোচ্চ ধারণা মতে এটি হিন্দুদের দীপাবলি উৎসবে আলোকসজ্জার প্রথা হতে গৃহীত। কেননা সাধারণভাবে নিকৃষ্ট বিদ‘আতসমূহের রেওয়াজ কুফরী যামানা থেকে হিন্দুস্তানে রয়ে গেছে। সেগুলো মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে পারস্পরিক প্রতিবেশী হওয়া ও মেলামেশার কারণে এবং তাদের মহিলাদের গৃহকর্মী হিসাবে গ্রহণ করা ও তাদের নারীদের বিবাহ করার কারণে। পরবর্তী বিদ্বানগণের মধ্যকার কেউ কেউ বলেছেন, বিশেষ বিশেষ রাত্রে অধিকহারে আলোকসজ্জা করা নিকৃষ্ট বিদ‘আতসমূহের অন্তর্ভুক্ত। কেননা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অধিকহারে আলো জ্বালানো ‘মুস্তাহাব’ হওয়ার পক্ষে শরী‘আতের কোথাও কোনো ‘আছার’ বর্ণিত হয়নি’।[25]

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৬৯।

  1. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৭০।

[3]. মুসনাদে আহমাদ, ৬/২৩৮; সুনানে তিরমিযী, ২/১২১, ১২২।

[4].  সুনানে ইবনে মাজাহ, হা/১৩৮৮; মিশকাত, হা/১৩০৮; মাওযূ‘, যঈফ তারগীব, হা/৬৩২; মাওযূ‘, সিলসিলা যঈফাহ, হা/২১৩২।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৪৫, ৬৩২১, ৭৪৭৬; ছহীহ মুসলিম, ৬/২৩, হা/৭৫৮; আহমাদ, হা/৭৫৯৫।

[6]. ইমাম বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান।

[7].  তাফসীরে ইবন কাছীর, ৪/১৩৭।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/২০১৭।

[9]. ত্বারতূসী, আল-হাওয়াদেছ ও বিদা‘, পৃঃ ১২১, ১২২; ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/২৪৭।

[10]. ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২০৩।

[11]. মিরক্বাত (দিল্লী ছাপা: তাবি), ৩/১৯৭।

[12]. মাওযূ‘আত, ১/১২৭-১৩০।

[13]. আল-মাজমূ‘, ৪/৫৬।

[14]. আল-বায়স, পৃঃ ৩২-৩৬।

[15]. ইক্বতিযাউ ছিরাতিল মুস্তাক্বীম, ২/৬২৮।

[16]. তানযীহুশ শারী‘আহ, ২/৯২।

[17]. আল-আমর বিল ইত্তেবা‘, পৃঃ ৮১; আল-লা‘আলিল মাছনূ‘আহ, ২/৫৭।

[18]. ফাওয়ায়েদুল মাজমূ‘আহ, পৃঃ ৫১।

[19]. আল-লা‘আলিল মাছনূ‘আহ, আহকাম রজব ও শা‘বান, পৃঃ ৪৩ |

[20]. মিরক্বাত (দিল্লী: তাবি), ‘ক্বিয়ামু শাহরি রামাযান’ অধ্যায়, টীকা সংক্ষেপায়িত, ৩/১৯৭-১৯৮।

[21]. শায়খ আব্দুল আযীয ইবনে আব্দুলাহ ইবনে বায, আত-তাহযীর মিনাল বিদা‘(মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: ১৩৯৬ হি.), পৃঃ ১২-১৩।

[22]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮১।

[23]. বায়হাক্বী, দালায়েলুন নবুঅত (বৈরূত: ১৯৮৫), ৩/২০১-২০২।

[24]. মাসিক আত-তাহরীক, ১০ম বর্ষ, ১১তম সংখ্যা, আগস্ট ২০০৭, পৃঃ ১৫-১৬।

[25]. আব্দুল হক্ব দেহলভী (রহিঃ), মা ছাবাতা বিস সুন্নাহ (দিল্লী মুজতাবাঈ প্রেস : আরবী-উর্দূ, ১৩০৯/১৮৯১ খৃ.), পৃঃ ২১৪-২১৫।|