মুমিনের কর্ম ও গুণাবলি


-নাজমুল হাসান সাকিব*

পবিত্র কুরআনের আটটি আয়াতে মুমিনের গুণাবলির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।  এই গুণাবলির তৃতীয়টি হলো,﴿وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ﴾ ‘তারা ক্রোধান্বিত হয়েও ক্ষমা করে দেয়’ (আশ-শূরা, ৪২/৩৭)। এটি সচ্চরিত্রের  উত্তম নমুনা। কারো প্রতি ভালোবাসা অথবা ক্রোধের মাত্রা যখন তীব্র হয়, তখন সুস্থ বিবেকসম্পন্ন ও বুদ্ধিদীপ্ত মানুষও অন্ধ হয়ে যায়।  বৈধ-অবৈধ, সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করার যোগ্যতাও সে হারিয়ে ফেলে। কারো প্রতি ক্রোধান্বিত হলে সাধ্যমতো শক্তি প্রয়োগ করে হলেও মনের ক্ষোভ মিটায় সে। অথচ মুমিনের গুণাবলির বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে, ক্রোধের সময় তারা কেবল বৈধ-অবৈধের সীমায় অবস্থান করেই ক্ষান্ত হয় না; বরং রাগ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা মাফ করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ: কোনো এক এলাকার সাধারণ জনগণ একই এলাকার নেতৃস্থানীয় কাউকে গালমন্দ করল। এতে সে ভীষণ কষ্ট পেল এবং চরম রাগান্বিত হলো। এলাকার নেতা হওয়ার কারণে রাগ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতাও তার আছে। কিন্তু লোকটির শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেয়। আল্লাহ তাআলার বাণী অনুযায়ী এই লোকটিই প্রকৃত মুমিন। যদিও সমপরিমাণ প্রতিশোধ নেওয়া জায়েয, যা মুমিনের সপ্তম গুণ।

মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَالَّذِينَ إِذَا أَصَابَهُمُ الْبَغْيُ هُمْ يَنْتَصِرُونَ﴾ ‘আর (ওগুলো তাদের জন্য) যারা অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে’ (আশ-শূরা, ৪২/৩৯)। অর্থাৎ তারা অত্যাচারিত হলে সমপরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করে এবং এতে সীমালঙ্ঘন করে না। ঠিক ততটুকু প্রতিশোধ গ্রহণ করে, যতটুকু অত্যাচারিত হয়; কিন্তু ক্ষমা করে না। আবার বেশিও করে না তথা সীমালঙ্ঘনও করে না। এটি তাদের তৃতীয় গুণের ব্যাখ্যা। তারা শত্রুকে ক্ষমা করে, তবে এমন কিছু পরিস্থিতি থাকে, যখন ক্ষমা করলে শত্রুর অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন প্রতিশোধ গ্রহণ করাই উত্তম বিবেচিত হয়। এরই বিধান বর্ণনা করে বলা হয়েছে, ﴿وَجَزَاءُ سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا﴾ ‘মন্দের প্রতিদান অনুরূপ মন্দ দিয়ে হয়ে থাকে’ (আশ-শূরা, ৪২/৪০)। তোমরা আর্থিক অথবা শারীরিকভাবে যতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হও, ঠিক ততটুকু ক্ষতিরই সম্মুখীন তাদেরকে করো। তবে শর্ত হলো, তোমার মন্দ কাজটা যেন পাপে পরিণত না হয়।  উদাহরণস্বরূপ: তোমাকে কেউ জোরপূর্বক মদ পান করিয়ে দিল, এখন তাকে মদ পান করিয়ে দেওয়া তোমার জন্য জায়েয হবে না। শরীআত যদিও সমপরিমাণ প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু এ কথাও বলা হয়েছে যে,﴿فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ﴾ ‘যে ক্ষমা করে দেয় ও সংশোধন করে নেয়, তার (উপযুক্ত) বিনিময় আল্লাহর নিকট আছে’ (আশ-শূরা, ৪২/৪০)। এখানে মাফ করাই উত্তম বলে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।  পরবর্তী দুই আয়াতে এরই আরো বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

ইবরাহীম নাখাঈ (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেন, পূর্ববর্তী মনীষীগণ পাপাচার লোককর্তৃক মুমিনদের হেয়প্রতিপন্ন হওয়াকে পছন্দ করতেন না। তবে প্রতিশোধ না নিলে যদি তাদের ধৃষ্টতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, সে ক্ষেত্রে প্রতিশোধ নেওয়াই উত্তম। আর ক্ষমা করা উত্তম তখন, যখন অত্যাচারী অনুতপ্ত হয় এবং তার পক্ষ থেকে অত্যাচারের কোন আশঙ্কা সৃষ্টি হয় না। কাজী আবূ বকর ইবনুল আরাবী এবং কুরতুবী (রাহিমাহুমুল্লাহ)-এর নিকট এটিই পছন্দনীয় অভিমত। তারা বলেন, ক্ষমা ও প্রতিশোধ দুটিই অবস্থাভেদে উত্তম। যে ব্যক্তি অনাচার করার পর লজ্জিত হয়, তাকে ক্ষমা করা উত্তম। আর যে ব্যক্তি তরি জিদ ধরে রাখে এবং অত্যাচারের উপর অটল থাকে, তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া উত্তম। বয়ানুল কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা আলোচ্য আয়াতদ্বয়ে খাঁটি মুমিনের দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন।

﴿هُمْ يَغْفِرُون﴾ তারা ক্ষমা করে দেয় তথা তারা ক্রোধের সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন না, বরং তখনো ক্ষমা ও অনুকম্পার মাত্রা তাদের মধ্যে প্রবল থাকে। ফলে তারা ক্ষমা প্রদর্শন করে।

﴿هُمْ يَنْتَصِرُونَ﴾ তারা প্রতিশোধ গ্রহণ করে তথা অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রেরণা তাদের মনে জাগ্রত হলেও তারা এক্ষেত্রে ন্যায়কে সীমালঙ্ঘন করে না; যদিও ক্ষমা করে দেওয়াই উত্তম।


* শিক্ষার্থী, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা ১২২৯।